তেলাপোকাকে কতটা পাত্তা দিচ্ছেন সাফল্য উদ্‌যাপনে বুঁদ মোদি

সিজেপির হাতিয়ার শিক্ষা ও চাকরির পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো দুর্নীতি ও ক্রমবর্ধমান বেকারত্বছবি: এএফপি

টানা ৪ হাজার ৩৯৯ দিন ধরে তাবড় কেষ্ট-বিষ্টুরা যা পারেনি, তেলাপোকারা সেই অসাধ্যসাধন করবে, আন্দোলনে আন্দোলনে জেরবার করে তুলবে সরকারকে, এমন অলক্ষুনে চিন্তা ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও তাঁর অন্ধ ভক্তরা মনে স্থান দিতে রাজি নন। জওহরলাল নেহরুকে ‘ছাপিয়ে যাওয়ার’ সাফল্য উদ্‌যাপনে তাঁরা এখন ব্যস্ত। দেশজুড়ে মোদি-বন্দনা চলছে। মন্দিরে মন্দিরে প্রার্থনা চলছে তাঁর সুস্বাস্থ্য ও মঙ্গল কামনায়। গণমাধ্যমগুলো সয়লাব সরকারি বিজ্ঞাপনে।

জওহরলাল নেহরু প্রধানমন্ত্রী ছিলেন ৬ হাজার ১২৯ দিন। ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট থেকে ১৯৬৪ সালের ২৭ মে মৃত্যু পর্যন্ত। টানা ১৬ বছর। মোদি সেখানে ১২ বছর পূর্ণ করলেন। কিন্তু তাতে কী! বিজেপি বলছে, ১৯৪৭ থেকে ১৯৫২ পর্যন্ত নেহরু ছিলেন অনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী। নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মোদি তাঁকে টপকেছেন! এটাই অনন্য সাফল্য।

প্রধানমন্ত্রীর সুস্বাস্থ্য ও উত্তরোত্তর সাফল্য কামনায় দিল্লির জগন্নাথ মন্দিরে পূজা দিয়েছেন ওডিশার বিজেপি নেতা কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান। তেলাপোকাদের তিরের লক্ষ্য আপাতত তিনিই। তাঁর পদত্যাগ চেয়ে তেলাপোকারা জানিয়েছে, দাবি মানা না হলে আরও বড় আন্দোলন শুরু হবে।

আরও পড়ুন

ধর্মেন্দ্রর ঈশ্বরের শরণাগত হওয়ার সেটাও আরেক কারণ। প্রধানমন্ত্রীর জন্য যতটা, তার চেয়েও বেশি নিজের জন্য। ধর্মেন্দ্র জানেন, তেলাপোকাদের দাবি সমর্থন করেছেন বিরোধী ‘ইন্ডিয়া’ জোট নেতারাও। নিট পেপার লিক ও সিবিএসইর দুর্নীতি নিয়ে তাদের আন্দোলন ‘ইন্ডিয়া’ যথার্থ মনে করেছে। খাঁড়াটা ঝুলছে তাঁর ঘাড়ের ওপরেই।

নরেন্দ্র মোদি বিরোধীদের চাপে চটজলদি কোনো সিদ্ধান্ত আজ পর্যন্ত নেননি। বিরোধীরা দাবি জানাচ্ছে বলে কখনো কোনো মন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে বলেননি। অশ্বিনী বৈষ্ণব ২০২১ সালের জুলাই মাস থেকে রেলমন্ত্রী। তাঁর আমলে অনেক ভয়াবহ ট্রেন দুর্ঘটনা ঘটেছে। দায় ঘাড়ে নিয়ে পদত্যাগের দাবি জানানো হয়েছে বারবার। মোদি মানেননি। অশ্বিনী আজও রেলমন্ত্রী। এপস্টিন ফাইল কেলেঙ্কারির আঁচ পেট্রোলিয়ামমন্ত্রী হরদীপ পুরীর গায়ে লাগতে দেননি। কিন্তু তাই বলে কি ব্যবস্থা নেন না? অবশ্যই নেন। নেন নিজের শর্তে। নিজের সুবিধামতো।

২০২১ সালে মন্ত্রিসভার রদবদলে এক ধাক্কায় বাদ দিয়েছিলেন ১২ জনকে। কোভিড তখন চরমে, অথচ স্বাস্থ্যমন্ত্রী হর্ষবর্ধনকে ছেঁটে ফেললেন! টুইটারের বিরুদ্ধে জিহাদে নেমেছিলেন আইনমন্ত্রী রবিশংকর প্রসাদ। তাঁকে ছাঁটাই করলেন। সরালেন শিক্ষানীতির রূপকার শিক্ষামন্ত্রী রমেশ পোখরিওয়াল, পরিবেশমন্ত্রী প্রকাশ জাভরেকর, সারমন্ত্রী সদানন্দ গৌড়, শ্রমমন্ত্রী সন্তোষ গাঙ্গোয়ারকে।

সরকার সাফল্যের ঢাক পেটালেও সত্য হলো, বিশ্বের চতুর্থ অর্থনীতি ভারতে বেকারত্বের জ্বালা দিন দিন বাড়ছে। তার মধ্যে ঘটে চলেছে নিটসহ বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা। কেন্দ্রীয় ও রাজ্যস্তরে অনাচার বাড়ছে অথচ কেউ দায় নিচ্ছে না। বিরোধীরাও নখদন্তহীন। যে আন্দোলন বিরোধীদের করার কথা, তা করতে সাহসী হলেন কোনো এক অজ্ঞাতকুলশীল অভিজিৎ দিপকে!

তাঁদের কেউ আর মন্ত্রী হতে পারেননি। কাজেই তেলাপোকারা চাইছে বলেই ধর্মেন্দ্র প্রধানকে মোদি সরিয়ে দেবেন মনে হয় না। তা ছাড়া ধর্মেন্দ্রর প্রতি তিনি আস্থাশীল। পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী দায়িত্ব তাঁকেই দিয়েছিলেন। কাজটা তিনি ভালোভাবেই উতরেছেন। তৃণমূল কংগ্রেসের পরিষদীয় ও সংসদীয় দলে ভাঙন ধরানোর প্রধান কারিগরও তিনি। ধর্মেন্দ্র হয়তো তাই নিজেকে খুব একটা বিপদগ্রস্ত মনে করছেন না।

তেলাপোকাদের নিয়ে বিজেপির চিন্তাভাবনারও বদল ঘটেছে। একশ্রেণির বেকার যুবকদের উদ্দেশে ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্তর আলটপকা ‘তেলাপোকা ও পরজীবী’ মন্তব্যের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যঙ্গাত্মক যে আন্দোলন শুরু, যার মধ্য দিয়ে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র (সিজেপি) জন্ম। শুরুতে এর পেছনে বিজেপি ‘পাকিস্তান ও মার্কিন ধনকুবের জর্জ সোরোস’-এর হাত দেখতে পেয়েছিল।

বলা হচ্ছিল, তেলাপোকা আন্দোলন ওদেরই চক্রান্ত। উদ্দেশ্য মোদির ভারতকে দুর্বল করা। কয়েক দিনের মধ্যে সিজেপির অনুগামী সংখ্যা বিজেপিকে ছাপিয়ে গেলে সরকার তাদের ‘এক্স’ হ্যান্ডল ব্লক করে দেয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম যখন তেলাপোকাদের নিয়ে তোলপাড়, আমেরিকা থেকে অভিজিৎ দিপকে যখন জানালেন, ময়দানে নেমে আন্দোলনের নেতৃত্ব দিতে তিনি ভারতে আসবেন, তখন তাঁকে গ্রেপ্তার করার ভাবনাও সরকারি মহলে মাথাচাড়া দিয়েছিল।

আরও পড়ুন

মনে রাখতে হবে, সেই সময় আমেরিকায় অভিজিৎ ও ভারতে তাঁর পরিবারের লোকজনদের প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়। অভিজিৎ ‘এক্স’ হ্যান্ডলে লিখেছিলেন, ‘কে জানে, হয়তো দেশে ফিরলে আমার ঠিকানা হবে তিহার জেল।’ যেদিন রওনা হলেন, সেদিনও লেখেন, ‘ভারতে যাচ্ছি। দেশের সংবিধানের হাতে ভাগ্যকে সঁপে দিয়েছি।’

সুখের কথা, তেমন কিছু ঘটেনি। সমাবেশ রুখতে অতি উৎসাহীরা মামলা করেছিল। দিল্লি হাইকোর্টে আমল পায়নি। রাজধানীর যন্তর মন্তরে সমাবেশ করার অনুমতিও পুলিশ দেয়। সেখানে সিজেপি আলটিমেটাম দিয়েছে, এক সপ্তাহের মধ্যে শিক্ষামন্ত্রী ইস্তফা না দিলে ফের আন্দোলন।

অভিজিৎদের ধরপাকড় না করা ও সমাবেশের অনুমতিদানের নেপথ্য কারণ একাধিক। প্রথম কারণ, তেলাপোকা আন্দোলনের আন্তর্জাতিকতা। ভারতের গণতন্ত্র নিয়ে পশ্চিমা দুনিয়ায় অনেক প্রশ্ন আছে। সেসব প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়েছে প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতিকে। অভিজিৎদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলে আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া দেখা দিত। সরকারকে সমালোচিত হতে হতো। দ্বিতীয় কারণ, শশী থারুরের মতো সরকারের শুভানুধ্যায়ীদের পরামর্শ, যাঁরা মনে করেন গণতন্ত্রে ক্ষোভ প্রকাশের সুযোগ থাকা দরকার। তৃতীয় কারণ, তড়িঘড়ি ব্যবস্থা না নেওয়ার পরামর্শ, যেহেতু তাতে হিতে বিপরীত হতে পারে।

মনমোহন সিং সরকারকে ওই কারণে ভুগতে হয়েছিল নির্ভয়া–কাণ্ড ও আন্না হাজারের আন্দোলনের সময়। সরকারও দেখেছে, নিট পেপার লিক ও সিবিএসই রেজাল্ট কেলেঙ্কারি নিয়ে বিরোধীরা জোরালো কোনো আন্দোলনে নামেনি। তা ছাড়া সিজেপি নিয়ে বিরোধীরাও সন্দিহান। কাজেই শ্রেষ্ঠ পন্থা ‘ওয়েট অ্যান্ড ওয়াচ’।

সরকার সাফল্যের ঢাক পেটালেও সত্য হলো, বিশ্বের চতুর্থ অর্থনীতি ভারতে বেকারত্বের জ্বালা দিন দিন বাড়ছে। তার মধ্যে ঘটে চলেছে নিটসহ বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা। কেন্দ্রীয় ও রাজ্যস্তরে অনাচার বাড়ছে অথচ কেউ দায় নিচ্ছে না। বিরোধীরাও নখদন্তহীন। যে আন্দোলন বিরোধীদের করার কথা, তা করতে সাহসী হলেন কোনো এক অজ্ঞাতকুলশীল অভিজিৎ দিপকে! মুহূর্তের মধ্যে আন্দোলিত হলো যুবসমাজ। যন্তর মন্তরে তেলাপোকা সমাবেশ ও বিক্ষোভ শুধু বিরোধী-ব্যর্থতার উদাহরণ নয়, সেটা ছিল শাসক ও বিরোধীদের প্রতি যুবসমাজের অনাস্থারও প্রকাশ।

সাফল্যে বুঁদ থাকা সরকার স্বীকার না করলেও সত্য হলো ভারতের কর্মসংস্থানের ক্যানভাস বড় বর্ণহীন। বড়ই অনুজ্জ্বল। চাকরি–বাকরির হাল কেমন, আজিম প্রেমজি বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘স্টেট অব ওয়ার্কিং ইন্ডিয়া’র সর্বশেষ রিপোর্ট তা দেখিয়েছে।

রিপোর্ট অনুযায়ী, ১৫ থেকে ২৫ বছর বয়সী শিক্ষিত ও স্নাতকদের ৪০ শতাংশ এবং ২৫ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের ২০ শতাংশই বেকার। দেশে ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সীর সংখ্যা ৩৭ কোটি ৭০ লাখ। তাঁরা কর্মক্ষম জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ। স্কুল-কলেজে লিঙ্গবৈষম্য কমেছে। উচ্চশিক্ষায় ভর্তির হার দ্বিগুণ হয়েছে। শ্রমবাজারে শিক্ষিতদের প্রবেশ বেড়ে চলেছে। ফি বছর গ্র্যাজুয়েট হচ্ছে ৫০ লাখ। অথচ চাকরি হচ্ছে মাত্র ২৮ লাখের!

সিজেপির হাতিয়ার শিক্ষা ও চাকরির পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো মারাত্মক দুর্নীতি ও ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব। সন্তানের ভবিষ্যৎ চিন্তায় শঙ্কিত মধ্যবিত্ত ভারতীয়ের মন তাই এত আলোড়িত। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে বেরিয়ে সবে ময়দানে নেমেছে তেলাপোকারা। সামাজিক আন্দোলনকে রাজনৈতিক করে তোলা সহজ নয়।

বাংলাদেশ, নেপাল বা শ্রীলঙ্কায় যা সফল, ভারতের মতো বিশাল, বৈচিত্র্যপূর্ণ ও নানা ভাষাভাষীর দেশ, যেখানে পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতি দিন দিন মাথাচাড়া দিচ্ছে, সেখানে তা কতটা সম্ভবপর, প্রশ্ন সেটাই।

  • সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায় প্রথম আলোর নয়াদিল্লি প্রতিনিধি

    মতামত লেখকের নিজস্ব