বিদ্যুৎ ও জ্বালানি: সরবরাহ ব্যবস্থার সব পর্যায়ে যেভাবে ব্যয় কমানো সম্ভব

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে চলমান সংকট এক দিনে তৈরি হয়নি। কেন এ সংকট তৈরি হলো? নীতি গ্রহণে কোথায় ভুল ও ব্যর্থতা ছিল? এ সংকট থেকে উত্তরণের পথ কী? সংকটের সমাধানের প্রস্তাবসহকারে বিষয়গুলো বিশ্লেষণ করেছেন জ্বালানিবিশেষজ্ঞ এম শামসুল আলম

এম শামসুল আলম

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগের প্রয়োজন আছে। একজন বিনিয়োগকারী মূলধন বিনিয়োগ করবেন, প্রযুক্তিগত ও বাজারঝুঁকি নেবেন এবং দক্ষতার সঙ্গে সেবা দেবেন—এর বিনিময়ে তিনি ন্যায্য ও যৌক্তিক মুনাফা পাবেন। এতে আপত্তির কারণ নেই। সমস্যা তৈরি হয় তখন, যখন বিনিয়োগকারীর মুনাফা নিশ্চিত করা হয়, কিন্তু বিনিয়োগের ঝুঁকি বহন করে রাষ্ট্র বা ভোক্তা। অর্থাৎ মুনাফা ব্যক্তির, ঝুঁকি জনগণের—এমন ব্যবস্থা কোনোভাবেই ন্যায়সংগত হতে পারে না।

একটি সুস্থ বিনিয়োগব্যবস্থায় ঝুঁকি, সেবার মান, দক্ষতা ও মুনাফার মধ্যে যৌক্তিক সম্পর্ক থাকতে হয়। প্রয়োজনীয় ও দক্ষ ব্যয়ের তুলনায় প্রকৃত ব্যয় এবং মুনাফা অস্বাভাবিকভাবে বেশি হলে সেই ব্যবস্থাকে লুণ্ঠনমূলক বলতেই হয়।

প্রতিযোগিতামূলক ক্রয়, দক্ষ ব্যবস্থাপনা ও কার্যকর নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে এ ধরনের ব্যয় অনেকটাই কমানো সম্ভব। কিন্তু জ্বালানিসেবার মূল্য যদি কেবল ‘ব্যয়+মুনাফা’ ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়, তাহলে ব্যয় কমানোর জন্য বিনিয়োগকারীর ওপর কোনো কার্যকর চাপ থাকে না; বরং ব্যয় যত বাড়ে, মুনাফার সুযোগও তত বাড়ে। শেষ পর্যন্ত সেই বাড়তি ব্যয়ের বোঝা গিয়ে পড়ে জনগণের ওপর। 

বাংলাদেশ বর্তমানে অনেকটা সেই কাঠামোগত সমস্যার মধ্যেই রয়েছে

গত দেড় দশকে দেশে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহের ব্যয় অন্যায় ও অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। অস্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতাহীন চুক্তি, অসম শর্ত ও দায়মুক্তির আইনি ব্যবস্থার কারণে এ খাতে জবাবদিহি এবং দক্ষতার সংকট তৈরি হয়েছে। এর ফলে উচ্চ ব্যয়, অদক্ষতা, অনিয়ম ও দুর্নীতি বেড়েছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনও (বিইআরসি) কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি।

এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মূল্যহার, ভর্তুকি এবং সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনায়। বকেয়া বাড়ছে, ঋণের কিস্তি পরিশোধে রাষ্ট্রের সক্ষমতা চাপে পড়ছে। একই সময়ে প্রাথমিক জ্বালানি ও বিদ্যুৎ আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। ফলে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা যেমন ঝুঁকির মুখে পড়ছে, তেমনি ভোক্তার ওপর ব্যয়ের চাপও ক্রমাগত বাড়ছে। 

জ্বালানি-বিদ্যুৎ খাতের সংকট থেকে উত্তরণের জন্য তাই আমাদের চিন্তার ধরন বদলাতে হবে। শুধু নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ কিংবা উৎপাদনক্ষমতা বাড়ানোকে সাফল্যের মাপকাঠি হিসেবে দেখলে চলবে না। দেখতে হবে—কত ব্যয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে, কে সেই ব্যয় বহন করছে, বিনিয়োগের ঝুঁকি কে নিচ্ছে এবং ভোক্তা কী দামে সেবা পাচ্ছে। 

ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ প্রয়োজন হলেও তা যেন জনস্বার্থ, প্রতিযোগিতা, স্বচ্ছতা ও কার্যকর নিয়ন্ত্রণের বিকল্প হয়ে না দাঁড়ায়, সেটি নিশ্চিত করা জরুরি। আরও জরুরি হলো, অনিয়ম ও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের জবাবদিহির আওতায় আনা। অপরাধ ও অনিয়মের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের সুবিধা ও সুরক্ষা অব্যাহত রেখে কোনো খাতের সংস্কার সম্ভব নয়। শেষ পর্যন্ত সেই ব্যর্থতার দায় বহন করতে হয় সরকার ও জনগণকে।

আরও পড়ুন

বিদ্যুৎ-সংকটের চেয়ে বড় সংকট সামর্থ্যের

বাংলাদেশের বর্তমান জ্বালানিসংকটকে শুধু বিদ্যুৎ বা জ্বালানির ঘাটতি হিসেবে দেখলে সমস্যার প্রকৃত চিত্র পাওয়া যাবে না। এটি একই সঙ্গে একটি আর্থিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংকট। প্রয়োজনের তুলনায় উৎপাদনব্যবস্থা যখন অতিরিক্ত ব্যয়বহুল হয়, অদক্ষতা দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং সেই ব্যয়ের বোঝা ভর্তুকি কিংবা মূল্যবৃদ্ধির মাধ্যমে জনগণের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়, তখন জ্বালানিসংকট শেষ পর্যন্ত ‘সামর্থ্য-সংকটে’ পরিণত হয়। 

ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগে মুনাফা প্রায় নিশ্চিত থাকলে ঝুঁকির ভারসাম্যও নষ্ট হয়। জ্বালানি নিরাপত্তার ঝুঁকি বহন করে রাষ্ট্র ও জনগণ, মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি যায় ভোক্তার ওপর, আর বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা অব্যবহৃত থাকার ঝুঁকি বহন করে ইউটিলিটি। ফলে বিনিয়োগকারী অনেক ক্ষেত্রেই ব্যবসায়িক ঝুঁকি থেকে সুরক্ষিত থাকেন। বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তি ও জ্বালানিচুক্তিতে ঝুঁকির ন্যায্য বণ্টন নিশ্চিত না হলে এই ব্যয় সংকট মোকাবিলা করা সরকারের জন্য কঠিন হবে। আর তাতে সরকার ও জনগণের সামর্থ্যসংকট আরও গভীর হবে। 

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি অর্থনীতির মৌলিক অবকাঠামো। খাদ্য, পানি, পরিবহন ও যোগাযোগের মতোই মানুষের জীবন ও উৎপাদনের জন্য এটি অপরিহার্য। তাই এই খাতের প্রধান লক্ষ্য বাণিজ্যিক মুনাফা হওয়া উচিত নয়। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হওয়া উচিত মুনাফামুক্ত ও দক্ষ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে জনগণের জন্য নির্ভরযোগ্য, সাশ্রয়ী ও টেকসই বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সেবা নিশ্চিত করা। ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগকেও এই জনস্বার্থের লক্ষ্যেই পরিচালিত করতে হবে।

রূপপুরে দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। পাবনা
ছবি: প্রথম আলো

উৎপাদন বাড়ালেই কি খরচ কমবে

বিদ্যুৎ ও জ্বালানিসংকট মোকাবিলায় সরকারের পাঁচ বছর মেয়াদি পরিকল্পনায় উৎপাদনক্ষমতা বৃদ্ধি ও নতুন অবকাঠামো নির্মাণকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এসব উদ্যোগ বিদ্যুৎ ও জ্বালানির ব্যয় কমাবে, নাকি নতুন করে ব্যয়ের বোঝা বাড়াবে?

পরিকল্পনায় অতিরিক্ত বিদ্যুৎ সক্ষমতা উন্নয়নে ১ দশমিক ৫ থেকে ১ দশমিক ৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয়ের কথা বলা হয়েছে। বছরে বিদ্যুতের চাহিদা ৬ শতাংশ বাড়বে ধরে নেওয়া হয়েছে। খুলনা ও বরিশালে আরও দুটি এলএনজি টার্মিনাল, ভোলায় ৪০০ মেগাওয়াটের বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং মাতারবাড়ী ও পায়রায় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।

একই সঙ্গে ২০ শতাংশ স্টোরেজ সক্ষমতাসহ ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা বৃদ্ধির কথা বলা হয়েছে। ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের বেঞ্চমার্ক মূল্যহার ধরা হয়েছে ১০ টাকা ৫০ পয়সা। পাশাপাশি চার হাজার মেগাওয়াট বায়ুবিদ্যুৎ, আরও পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ও গ্রিড বিদ্যুৎ দিয়ে ক্যাপটিভ বিদ্যুৎ প্রতিস্থাপনের উদ্যোগও রয়েছে। 

আরও পড়ুন

কিন্তু শুধু উৎপাদনক্ষমতা বাড়ানো আর নির্ভরযোগ্য ও সাশ্রয়ী জ্বালানিসেবা নিশ্চিত করা এক বিষয় নয়; বরং উৎপাদনক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি সেই ক্ষমতার ব্যয়, ব্যবহার, জ্বালানি সরবরাহ ও অর্থায়নের কাঠামো বিবেচনা না করলে নতুন বিনিয়োগই ভবিষ্যতের আর্থিক বোঝা হয়ে উঠতে পারে। 

প্রকৃত জ্বালানি নিরাপত্তার অর্থ শুধু পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন নয়; রাষ্ট্র ও ভোক্তা—উভয়কে সামর্থ্যসংকট থেকে মুক্ত রাখা। তাই প্রথম কাজ হওয়া উচিত অন্যায়, অযৌক্তিক ও লুণ্ঠনমূলক ব্যয় কমানো। একই সঙ্গে আমদানি-নির্ভরতা কমানো, আর্থিক ও জ্বালানিদক্ষতা বাড়ানো, সাশ্রয়ী নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো, নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করা এবং ভোক্তার অধিকার নিশ্চিত করা জরুরি। 

বিচ্ছিন্ন কিছু নীতিগত উদ্যোগ দিয়ে এই সংকটের সমাধান হবে না। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহের প্রতিটি পর্যায়ের ব্যয় কমাতে হবে। এ জন্য প্রতিটি সমস্যার কাঠামোগত কারণ চিহ্নিত করে তার সঙ্গে সুনির্দিষ্ট সংস্কার যুক্ত করতে হবে। 

কক্সবাজারের মহেশখালীর মাতারবাড়ী কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র
ফাইল ছবি

ক্যাবের প্রস্তাব

এই সামর্থ্যসংকট মোকাবিলায় কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) পক্ষ থেকে পাঁচ বছরের জন্য কয়েকটি প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। 

প্রথমত, সরকারকে মুনাফা গ্রহণ থেকে বিরত রেখে সরকারি বিদ্যুৎ ও জ্বালানিসেবা মুনাফা ও লুণ্ঠনমুক্ত করা। এতে বছরে প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকা সাশ্রয়ের সুযোগ তৈরি হতে পারে। এর মাধ্যমে বিদ্যুৎ খাতকে ভর্তুকিমুক্ত করা, মূল্যবৃদ্ধির চাপ থেকে ভোক্তাকে রক্ষা করা এবং বকেয়া ও ঋণের কিস্তি পরিশোধে সরকারের সক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব হতে পারে। 

দ্বিতীয়ত, বিদ্যমান সক্ষমতা অনুযায়ী ১ হাজার ১০০ এমএমসিএফডির বেশি এলএনজি আমদানি না করা; গ্যাস উন্নয়ন তহবিলের অর্থে বাপেক্সের মাধ্যমে ছাতক (পূর্ব) গ্যাসক্ষেত্রের সম্ভাব্য এক টিসিএফ গ্যাস উত্তোলন করা এবং পুরোনো কূপ সংস্কারের মাধ্যমে উৎপাদন বাড়ানো। 

তৃতীয়ত, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ছয় টাকা মূল্যহারের বিদ্যুৎ জরুরি ভিত্তিতে গ্রিডে যুক্ত করা।

আরও পড়ুন
আরও পড়ুন

চতুর্থত, তরল জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পর্যায়ক্রমে বন্ধ করে বছরে অন্তত ৩০ হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় করা। 

পঞ্চমত, কয়লা আমদানি বাড়িয়ে ৯০ শতাংশের বেশি প্ল্যান্ট ফ্যাক্টরে প্রায় ৭ টাকা ৫০ পয়সা মূল্যহারে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়িয়ে তরল জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রতিস্থাপন করা। 

ষষ্ঠত, ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা বাড়িয়ে গ্রিডের বিদ্যুতের চাহিদা ২০ শতাংশ কমানো। এতে আনুপাতিক হারে জ্বালানি আমদানি ব্যয় কমানোর পাশাপাশি বছরে গড়ে ৫ শতাংশ বিদ্যুতের চাহিদা বৃদ্ধির চাপও সামাল দেওয়া সম্ভব হবে। 

সপ্তমত, অনধিক ৬ টাকা বেঞ্চমার্ক মূল্যহারে ৫ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো। 

অষ্টমত, মার্চেন্ট পাওয়ার প্ল্যান্টসহ ইউটিলিটি স্কেলে আরও ৪ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো, যার বেঞ্চমার্ক মূল্যহার হবে অনধিক ৬ টাকা ৪৮ পয়সা। 

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের ভবিষ্যৎ শুধু কত মেগাওয়াট উৎপাদন করা হবে, তার ওপর নির্ভর করে না। নির্ভর করবে কত কম ব্যয়ে, কতটা দক্ষতার সঙ্গে এবং কার স্বার্থে সেই বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ করা হচ্ছে তার ওপর। তাই সংকট মোকাবিলার মূলমন্ত্র হওয়া উচিত—নতুন ব্যয় নয়, প্রথমে বিদ্যমান ব্যয়ের অপচয় ও লুণ্ঠন বন্ধ করা।

নবমত, ভোক্তার অর্থে গঠিত বিদ্যুৎ উন্নয়ন তহবিলের অর্থ ব্যবহার করে ভোলায় পিডিবির মালিকানায় স্বল্প ব্যয়ে ৪০০ মেগাওয়াট গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো। 

দশমত, জ্বালানি দক্ষতা ও সংরক্ষণ বাড়িয়ে বিদ্যুতের চাহিদা ১৫ শতাংশ কমানো। এতে বছরে গড়ে ১৯ হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় হতে পারে।

একাদশত, রাজস্ব ছাড় সমন্বয় করে আগামী দুই বছরের মধ্যে বাংলাদেশে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের মূল্যহার ভারতের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা। বর্তমানে দেশে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের লেভেলাইজড উৎপাদন ব্যয়হার ৩ টাকা ৮৯ পয়সা। এক মার্কিন ডলারের মূল্য ১২৩ টাকা ধরে ভারতে তা ৩ টাকা ৮৮ পয়সা এবং পাকিস্তানে ৩ টাকা ৯২ পয়সা। এ ক্ষেত্রে বিইআরসির আওতায় উদ্যোক্তাদের সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন। 

দ্বাদশত, বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন কমিটির সুপারিশের আলোকে আদানির কয়লাভিত্তিক বিদ্যুতের মূল্যহার কমিয়ে ভারত থেকে সরকারি পর্যায়ে আমদানি করা কয়লাভিত্তিক বিদ্যুতের মূল্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য করা। তা সম্ভব না হলে চুক্তি বাতিলের বিষয়টি বিবেচনা করা।

ক্যাবের এই পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য বিদ্যুতের গড় উৎপাদন ব্যয় প্রায় ৭ টাকা ৫০ পয়সায় নামিয়ে আনা। এতে বছরে প্রায় ৫২ হাজার কোটি টাকা সাশ্রয়ের সুযোগ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে ভর্তুকি, মূল্যবৃদ্ধি, আমদানি-নির্ভরতা ও সরকারের আর্থিক চাপ কমিয়ে জনগণের সামর্থ্যসংকট মোকাবিলায় কার্যকর ভূমিকা রাখা সম্ভব। 

প্রয়োজন কাঠামোগত সংস্কার

জ্বালানি-বিদ্যুৎ খাতের সংকট থেকে উত্তরণের জন্য তাই আমাদের চিন্তার ধরন বদলাতে হবে। শুধু নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ কিংবা উৎপাদনক্ষমতা বাড়ানোকে সাফল্যের মাপকাঠি হিসেবে দেখলে চলবে না। দেখতে হবে—কত ব্যয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে, কে সেই ব্যয় বহন করছে, বিনিয়োগের ঝুঁকি কে নিচ্ছে এবং ভোক্তা কী দামে সেবা পাচ্ছে। 

এই খাতের সংস্কারের প্রধান ভিত্তি হওয়া উচিত জ্বালানি অপরাধ নির্মূল, দক্ষতা ও স্বচ্ছতা বৃদ্ধি, জাতীয় সক্ষমতা তৈরি, অপ্রয়োজনীয় আমদানি-নির্ভরতা কমানো এবং সরবরাহের প্রতিটি পর্যায়ে ব্যয় হ্রাস। একই সঙ্গে খাতটিকে স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর প্রভাবমুক্ত করে জনস্বার্থ, জবাবদিহি ও দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তার ভিত্তিতে পরিচালনা করতে হবে। 

এ ক্ষেত্রে জাতীয় সংসদের সদস্যদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সংসদীয় রাজনীতিতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বার্থের ইস্যু হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। জ্বালানি খাতে অনিয়ম ও অপরাধের বিচার, সরকারি ব্যয় ও চুক্তির জবাবদিহি এবং ভোক্তার স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজনীয় নীতি ও আইন সংস্কারে সংসদকে কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের ভবিষ্যৎ শুধু কত মেগাওয়াট উৎপাদন করা হবে, তার ওপর নির্ভর করে না। নির্ভর করবে কত কম ব্যয়ে, কতটা দক্ষতার সঙ্গে এবং কার স্বার্থে সেই বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ করা হচ্ছে তার ওপর। তাই সংকট মোকাবিলার মূলমন্ত্র হওয়া উচিত—নতুন ব্যয় নয়, প্রথমে বিদ্যমান ব্যয়ের অপচয় ও লুণ্ঠন বন্ধ করা। সরবরাহের প্রতিটি পর্যায়ে ব্যয় কমানোই হতে পারে জনগণের সামর্থ্যসংকট মোকাবিলার সবচেয়ে কার্যকর পথ। 

এম শামসুল আলম কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা 

*মতামত লেখকের নিজস্ব