ভারতের রাজনীতির খোলনলচে বদলে যাচ্ছে

ভারতের রাজনীতি দীর্ঘদিন ধরেই একধরনের কঠিন আঞ্চলিকতার ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে ছিল। আসাম, কেরলম, পাঞ্জাব, তামিলনাড়ু ও পশ্চিমবঙ্গের মতো রাজ্যগুলোতে ভাষাভিত্তিক পরিচয়, সামাজিক সংস্কার আন্দোলন এবং গভীরভাবে প্রোথিত ধর্মনিরপেক্ষ বা বহুত্ববাদী ঐতিহ্য মিলিয়ে এমন এক রাজনৈতিক কাঠামো তৈরি হয়েছিল, যাকে বিশ্লেষকেরা বলতেন ‘ফেডারেলিজমের দুর্গ’। এই দুর্গ দীর্ঘদিন কেন্দ্রীয় সরকারের মতাদর্শিক প্রভাব থেকে নিজেকে আলাদা রাখতে সক্ষম হয়েছিল। কিন্তু পাঁচটি রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল দেখাচ্ছে, সেই দুর্গে বড় ফাটল ধরেছে।

সবচেয়ে নাটকীয় পরিবর্তন দেখা গেছে পশ্চিমবঙ্গে। ১৫ বছর ধরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তাঁর দল তৃণমূল কংগ্রেসকে হিন্দুত্ববাদী কেন্দ্রীকরণের বিরুদ্ধে এক শক্তিশালী প্রতিরোধ বলেই ধরা হতো। বাঙালি সাংস্কৃতিক গর্বের ভিত্তিতে দাঁড়ানো তাদের ‘সাবঅলটার্ন সেক্যুলারিজম’ ২০২১ সালের নির্বাচনেও ভারতীয় জনতা পার্টিকে প্রতিহত করতে পেরেছিল।

কিন্তু ২০২৬ সালের এপ্রিল-মে মাসের নির্বাচনী প্রচারে চিত্রটা বদলে যায়। আর জি কর কাণ্ডকে (এক তরুণী চিকিৎসকের নৃশংস ধর্ষণ ও খুন, যা গোটা রাজ্যে নারীর নিরাপত্তা নিয়ে তীব্র প্রতিবাদের জন্ম দেয়) সামনে এনে বিজেপি হিন্দুত্ব এবং বাঙালি পরিচয়ের মধ্যে এক সেতুবন্ধ তৈরি করতে সক্ষম হয়। পাশাপাশি তৃণমূলের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও প্রশাসনিক ঔদ্ধত্যের অভিযোগ তুলে তারা জনমত ঘুরিয়ে দেয়। ফলাফল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, ২৯৪টি আসনের মধ্যে ২০৭টিতেই জয় পায় বিজেপি।

তবে বিতর্কও কম নয়। নির্বাচন কমিশনের ‘বিশেষ নিবিড় সংশোধন’প্রক্রিয়ায় ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বলা হয়েছিল, ডুপ্লিকেট, স্থানান্তরিত বা মৃত ভোটারদের নাম বাদ দেওয়া হবে। কিন্তু বাদ পড়া ৯০ লাখ মানুষের মধ্যে ৩৪ লাখ আপিল করেন, যার মধ্যে ২৭ লাখ আপিল নির্বাচন হওয়ার সময়ও নিষ্পত্তি হয়নি। ফলে তাঁরা ভোট দিতে পারেননি।

পুরোনো আঞ্চলিক শক্তিগুলো যখন দুর্বল হয়ে পড়ছে, তখন সামনে দুটি সম্ভাবনা—একদিকে বিজেপির আধিপত্য আরও সুসংহত হওয়া, অন্যদিকে বিরোধী শক্তির পুনর্গঠন। আগামী বছরের শুরুতে গোয়া, মণিপুর, পাঞ্জাব, উত্তরাখন্ড ও উত্তর প্রদেশের নির্বাচন সেই দিকটাই স্পষ্ট করে দেবে।

বিজেপির জয়ের ব্যবধান ছিল প্রায় ৩০ লাখ ভোট। বিরোধীরা তাই অভিযোগ তুলেছে। যদিও বিশ্লেষকেরা বলছেন, মাত্র ৪৬টি কেন্দ্রে বাদ পড়া ভোটের সংখ্যা জয়ের ব্যবধানের চেয়ে বেশি ছিল, ফলে ফলাফল মূলত বদলাত না।

এই জয়ের প্রভাব পশ্চিমবঙ্গ ছাড়িয়ে গেছে। তৃণমূলকে পরাজিত করে বিজেপি তাদের জাতীয় কর্মসূচির এক শক্তিশালী বিরোধীকে সরিয়ে দিয়েছে। বিশেষত মুসলিম সম্প্রদায়কে চাপের মুখে ফেলে এমন নানা উদ্যোগের ক্ষেত্রে তারা আগের চেয়ে আরও আগ্রাসী হয়েছে। আরও বড় কথা, এই ফল দেখিয়ে দিল—কোনো শক্তিশালী আঞ্চলিক পরিচয়ও টিকতে পারে না, যদি তা অজনপ্রিয় শাসনের সঙ্গে যুক্ত থাকে।

তামিলনাড়ুতে আবার অন্য ছবি। পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে রাজ্যটি দুই দ্রাবিড় দলের দ্বন্দ্বে আবদ্ধ ছিল। কিন্তু এবার সেই সমীকরণ ভেঙে দিয়েছেন চলচ্চিত্র তারকা চন্দ্রশেখরন জোসেফ বিজয়। তাঁর দল তামিলাগা ভেত্রি কাজগম রাজনীতির নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে।

দ্রাবিড় পরিচয়ের প্রচলিত রাজনীতির বদলে বিজয় ভরসা রেখেছেন তরুণ প্রজন্মের হতাশা ও পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষায়। তাঁর প্রচারে সিনেমার আবহ, ফ্যান ক্লাবের সংগঠন এবং ডিজিটাল যুগের ভাষা—সব মিলিয়ে এক নতুন ধরনের রাজনৈতিক আকর্ষণ তৈরি হয়। ২৩৪ আসনের মধ্যে ১০৮টি জিতে তাঁর দল রাজ্যের বৃহত্তম শক্তি হয়ে উঠেছে।

কেরলমে দীর্ঘদিন ধরে বাম রাজনীতির প্রভাব ছিল প্রবল। ১৯৫৭ সালে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রথম কমিউনিস্ট সরকার গঠনের ইতিহাস রয়েছে এই রাজ্যে। ১৯৭৭ সাল থেকে বামফ্রন্ট এবং কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন জোট পর্যায়ক্রমে ক্ষমতায় এসেছে।

২০২১ সালে বামফ্রন্ট সেই ধারায় ব্যতিক্রম ঘটিয়ে টানা দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় আসে। কিন্তু এবার তাদের ‘কেরল মডেল’ বড় ধাক্কা খেয়েছে। বিপুল সরকারি ঋণ, প্রায় সাড়ে চার লাখ কোটি টাকার বোঝা এবং বয়স্ক নেতৃত্বের সঙ্গে নতুন প্রজন্মের দূরত্ব—সব মিলিয়ে তারা জনসমর্থন হারায়। কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন জোট ১৪০টির মধ্যে ১০২টি আসন জিতে ক্ষমতায় ফিরে আসে।

এই ফল কংগ্রেসকে নতুন করে শক্তি জুগিয়েছে। একই সঙ্গে কমিউনিস্ট পার্টির জন্য তৈরি হয়েছে অস্তিত্বের সংকট। মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়নের পরাজয়ের পর প্রায় অর্ধশতাব্দীর মধ্যে প্রথমবার তারা ভারতের কোথাও ক্ষমতায় নেই। ফলে তারা কার্যত একটি চাপ সৃষ্টিকারী গোষ্ঠীতে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে।

আসামে আবার ভিন্ন চিত্র। সেখানে বিজেপি নেতৃত্বাধীন সরকার নিজেদের অবস্থান আরও মজবুত করেছে। মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি জনসংখ্যা ও অভিবাসন প্রশ্নকে সামনে এনে প্রচার চালান। বাংলাদেশি অনুপ্রবেশের ইস্যু তুলে তিনি নিজেকে স্থানীয় হিন্দু ও অসমিয়াদের রক্ষক হিসেবে তুলে ধরেন। ফলাফল, ১২৬ আসনের মধ্যে ৮২টিতে জয়, যা তাদের সর্বকালের সেরা ফল।

এই ফল দেখাচ্ছে, জাতিগত উদ্বেগ ও ধর্মীয় পরিচয়ের রাজনীতি এখনো অত্যন্ত কার্যকর। এই মডেল ভবিষ্যতে অন্য সীমান্তবর্তী রাজ্যেও প্রয়োগের সম্ভাবনা রয়েছে।

এই সব নির্বাচনী ফলাফল মিলিয়ে ভারতের সামাজিক ও ধর্মীয় বিভাজন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। ভোটার তালিকার সংশোধন এবং ধর্মীয় পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতির জোর বাড়ায় রাজনৈতিক ক্ষেত্র ক্রমেই দ্বিধাবিভক্ত হচ্ছে।

মে মাসের নির্বাচন হিন্দু-মুসলিম বিভাজনকেও আরও তীব্র করেছে। একদিকে বিজেপির প্রচারে হিন্দু ভোটারদের মধ্যে সাংস্কৃতিক ও জনসংখ্যাগত আতঙ্কের কথা উঠে এসেছে, অন্যদিকে মুসলিম ভোটাররা ছোট দল ছেড়ে কংগ্রেসের মতো বড় বিরোধী শক্তির দিকে ঝুঁকেছেন। আসামে কংগ্রেসের ১৯ জন বিজয়ীর মধ্যে ১৮ জনই মুসলিম।

পুরোনো আঞ্চলিক শক্তিগুলো যখন দুর্বল হয়ে পড়ছে, তখন সামনে দুটি সম্ভাবনা—একদিকে বিজেপির আধিপত্য আরও সুসংহত হওয়া, অন্যদিকে বিরোধী শক্তির পুনর্গঠন। আগামী বছরের শুরুতে গোয়া, মণিপুর, পাঞ্জাব, উত্তরাখন্ড ও উত্তর প্রদেশের নির্বাচন সেই দিকটাই স্পষ্ট করে দেবে।

  •  শশী থারুর জাতিসংঘের সাবেক আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল ও বর্তমানে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের নেতা

  • স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট, অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ