জুলাই সনদ ও গণভোট: ঐকমত্য, নাকি চাপিয়ে দেওয়া ‘সম্মতি’

১০ মে প্রথম আলোতে প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সাবেক সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ জুলাই জাতীয় সনদ, গণভোট ও রাষ্ট্র সংস্কার নিয়ে তাঁর অবস্থান তুলে ধরেছেন। তাঁর সেই সাক্ষাৎকারের প্রতিক্রিয়া লিখেছেন মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন শিকদার

১০ মে ২০২৬ তারিখে প্রথম আলোতে প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষক অধ্যাপক আলী রীয়াজ জুলাই জাতীয় সনদ, গণভোট ও রাষ্ট্র সংস্কার নিয়ে তাঁর অবস্থান তুলে ধরেছেন। তাঁর অনেক কথার সঙ্গেই একমত হওয়া যায়। বিশেষ করে ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ, দুর্বল প্রতিষ্ঠান ও ভবিষ্যৎ স্বৈরতন্ত্রের ঝুঁকি নিয়ে তাঁর উদ্বেগ বাস্তবসম্মত। গত দেড় দশকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় বহু প্রতিষ্ঠান কার্যত দলীয় নিয়ন্ত্রণের মধ্যে চলে গিয়েছিল। তাই রাষ্ট্র সংস্কারের দাবি ওঠা স্বাভাবিক।

তবে রাষ্ট্র সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা মানেই এই নয় যে সংস্কারের প্রক্রিয়া প্রশ্নের ঊর্ধ্বে থাকবে। কারণ, সংবিধান, গণভোট বা জুলাই সনদ শুধু রাজনৈতিক দলিল নয়; এগুলো ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রের ভিত্তি তৈরি করবে। তাই এখানে উদ্দেশ্যের পাশাপাশি প্রক্রিয়াও বিশ্বাসযোগ্য, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও আলোচনাভিত্তিক হওয়া জরুরি।

বিতর্কটি নতুন নয়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকেই অধ্যাপক আলী রিয়াজ সংবিধান ‘পুনর্লিখনের’ প্রশ্নটি সামনে আনেন। ২০২৪ সালের ২৯ আগস্ট সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজের এক অনুষ্ঠানে এবং ৩১ আগস্ট ২০২৪ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ‘অরাজনৈতিক’ সংগঠনের উদ্যোগে ‘গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশের সংবিধান: সংশোধন না পুনর্লিখন’ শীর্ষক এক বক্তৃতায় তিনি বলেন, বাংলাদেশের গণতন্ত্র টিকিয়ে রাখতে সংবিধান পুনর্লিখন প্রয়োজন।

এখান থেকেই সমাজের একটি অংশের মধ্যে সন্দেহ-সংশয় তৈরি হতে শুরু করে। কারণ, ১৯৭২ সালের সংবিধান শুধু একটি আইনি দলিল নয়; এটি মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী রাষ্ট্রগঠন, জাতীয় পরিচয়, এমনকি বহু মানুষের আবেগের অংশ। তাই সংস্কার আর পুনর্লিখনের সীমারেখা কোথায়সেই প্রশ্নটি শুরু থেকেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

আরও পড়ুন

২.

আরেকটি বড় প্রশ্ন হলো, জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের ব্যাখ্যা নিয়ে। জুলাই আন্দোলনে যাঁরা রাস্তায় নেমেছিলেন, আহত হয়েছেন, প্রাণ দিয়েছেন, তাঁরা কি সবাই একটি নির্দিষ্ট সাংবিধানিক পরিবর্তনের জন্য আন্দোলন করেছিলেন, নাকি তাঁরা কর্তৃত্ববাদী শাসনের পতন, অবাধ নির্বাচন, নাগরিক স্বাধীনতা ও রাজনৈতিকভাবে মুক্ত পরিবেশ চেয়েছিলেন?

জুলাই গণ–অভ্যুত্থান ছিল বহুমাত্রিক। সেখানে বিএনপি, জামায়াত, বামপন্থী, ইসলামপন্থী, সাধারণ শিক্ষার্থী, রাজনৈতিকভাবে নির্দলীয় তরুণ—সবাই অংশ নিয়েছিলেন। কিন্তু পরে যখন একটি নির্দিষ্ট সাংবিধানিক প্রকল্পকে ‘জুলাইয়ের একমাত্র বৈধ আকাঙ্ক্ষা’ হিসেবে দেখানোর প্রবণতা দেখা যায়, তখন প্রশ্ন তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। শাসন পরিবর্তনের নৈতিক শক্তি আর একটি নির্দিষ্ট সাংবিধানিক প্রকল্পের ওপর দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় ঐকমত্য—এই দুই বিষয় এক নয়।

রাজনৈতিক তাত্ত্বিক হান্না অ্যারেন্ড তাঁর অন রেভোল্যুশন বইয়ে দেখিয়েছেন, বড় গণ-আন্দোলনের পর প্রায়ই ছোট কিন্তু সংগঠিত কিছু গোষ্ঠী নিজেদের সেই আন্দোলনের একমাত্র বৈধ ‘ব্যাখ্যাকারী’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়। ফরাসি বিপ্লব, ইরানের ইসলামি বিপ্লব কিংবা আরব বসন্তের অভিজ্ঞতায়ও এমন প্রবণতা দেখা গেছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও তা–ই প্রশ্ন উঠেছে—গণ–অভ্যুত্থানের নৈতিক শক্তিকে ব্যবহার করে কি একটি নির্দিষ্ট সাংবিধানিক প্রকল্প সবার ওপর প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা হয়েছে?

৩.

এই প্রশ্ন আরও তীব্র হয় জুলাই সনদ তৈরির প্রক্রিয়া নিয়ে। আলোচিত সাক্ষাৎকারে অধ্যাপক আলী রীয়াজ দাবি করেছেন, প্রক্রিয়াটি অংশগ্রহণমূলক ছিল। কিন্তু ‘অংশগ্রহণ’ বলতে কাদের বোঝানো হচ্ছে? ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় শুরুতে নারীদের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি ছিল না। পরে সীমিতভাবে কিছু নারীকে যুক্ত করা হয়েছিল। ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু, পাহাড়ি জনগোষ্ঠী, ভিন্নমতাবলম্বী বুদ্ধিজীবী ও নাগরিক সমাজের পরিচিত অনেককেই সেভাবে সামনে দেখা যায়নি।

এই সমালোচনাকে আরও জোরালো করেছেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সারা হোসেন। গত ২১ এপ্রিল জাতীয় প্রেসক্লাবে এক আলোচনায় তিনি জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের কাজের প্রক্রিয়াকে ‘সিলেকটিভ প্রসেস’ বলেন এবং প্রশ্ন তোলেন, সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ ছাড়া এটিকে কীভাবে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া বলা যায়?

এখানে আওয়ামী লীগ প্রসঙ্গটি খুব সংবেদনশীল। আওয়ামী লীগের বিচার ও রাজনৈতিক জবাবদিহি এক বিষয়, কিন্তু তাদের সমর্থক বড় জনগোষ্ঠীকে কার্যত আলোচনার বাইরে রেখে নতুন রাষ্ট্রীয় কাঠামো তৈরি করা ভিন্ন বিষয়। কারণ, বাংলাদেশের বাস্তবতায় আওয়ামী লীগ শুধু একটি দল নয়; বহু মানুষের রাজনৈতিক পরিচয় ও আবেগের অংশ। তাই সেই জনগোষ্ঠীকে পুরোপুরি বাদ রেখে দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় বন্দোবস্ত তৈরি করলে ভবিষ্যতে বৈধতা ও স্থিতিশীলতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যেতে পারে

৪.

গণভোটের প্রশ্নেও একই ধরনের সমস্যা আছে। অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেছেন, একসঙ্গে অনেক প্রস্তাবের ওপর গণভোট (বান্ডেলড রেফারেন্ডাম) আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। তিনি তুরস্ক, তিউনিসিয়া ও কেনিয়ার উদাহরণ দিয়েছেন। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, একজন নাগরিক হয়তো বিচার বিভাগের স্বাধীনতা চান, কিন্তু সংবিধান পরিষদের কিছু ক্ষমতা নিয়ে আপত্তি রাখতে পারেন। কেউ হয়তো স্থানীয় সরকার শক্তিশালী করার পক্ষে, কিন্তু অন্য কোনো প্রস্তাবের বিরুদ্ধে। তাহলে শতাধিক পৃষ্ঠার জটিল সাংবিধানিক প্রস্তাবকে কেন কয়েকটি ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ প্রশ্নে সীমাবদ্ধ করা হলো?

তুরস্কের ২০১৭ সালের গণভোটের উদাহরণও খুব সতর্কভাবে দেখা দরকার। ইউরোপের নিরাপত্তা ও সহযোগিতা সংস্থা (ওএসসিই) এবং কাউন্সিল অব ইউরোপের যৌথ পর্যবেক্ষক দল তাদের প্রতিবেদনে বলেছিল, সেই গণভোট ‘আনলেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’, অর্থাৎ অসম প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। বিরোধী পক্ষ সমান সুযোগ পায়নি এবং ভোটাররা সংস্কারের গুরুত্বপূর্ণ দিক সম্পর্কে নিরপেক্ষ তথ্য পাননি (ওএসসিই অফিস ফর ডেমোক্রেটিক ইনস্টিটিউশনস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস, ১৭ এপ্রিল ২০১৭)। তাই তুরস্ককে উদাহরণ হিসেবে আনা গেলেও সেটিকে আদর্শ গণতান্ত্রিক উদাহরণ বলা কঠিন।

বাংলাদেশের গণভোটের ফল নিয়েও একই ধরনের প্রশ্ন রয়েছে। নির্বাচন কমিশনের তথ্যানুযায়ী, ভোটদানে অংশগ্রহণ ছিল প্রায় ৬০ শতাংশ, আর এর মধ্যে প্রায় ৬৮ শতাংশ ‘হ্যাঁ’ ভোট পড়ে। অর্থাৎ ‘হ্যাঁ’ ভোট জয়ী হলেও এটিকে পুরো জাতির প্রশ্নাতীত সাংবিধানিক ঐকমত্য বলা কঠিন। কারণ, উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষ ভোটই দেননি, আবার বড় একটি অংশ ‘না’ ভোটও দিয়েছে। তাই এটিকে চূড়ান্ত জাতীয় সমাধান হিসেবে দেখানোর আগে আরও দীর্ঘ জনসম্পৃক্ত আলাপ-আলোচনার প্রয়োজন ছিল।

আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাও একই কথা বলে। ইংল্যান্ডে ব্রেক্সিট নিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ডেভিড রানসিম্যান তাঁর ‘আ উইন ফর প্রপার পিপল? ব্রেক্সিট অ্যাজ আ রিজেকশন অব দ্য নেটওয়ার্কড ওয়ার্ল্ড’ লেখায় দেখিয়েছেন, জটিল রাষ্ট্রীয় প্রশ্নকে খুব সহজ ‘হ্যাঁ’-‘না’ ভোটে নামিয়ে আনলে সমাজে দীর্ঘমেয়াদি বিভাজন তৈরি হতে পারে।

দক্ষিণ আফ্রিকার সাংবিধানিক রূপান্তর নিয়েও গবেষক হেইঞ্জ ক্লাগ তাঁর ‘সাউথ আফ্রিকার কনস্টিটিউশনাল কোর্ট: এনাবলিং ডেমোক্রেসি অ্যান্ড প্রোমোটিং ল ইন দ্য ট্রানজিশন ফ্রম অ্যাপারথাইড’ গবেষণায় দেখিয়েছেন, দীর্ঘ আলোচনা ও রাজনৈতিক সমঝোতা ছাড়া স্থিতিশীল পরিবর্তন সম্ভব হতো না।

রাজনৈতিক তাত্ত্বিক ইয়ুর্গেন হ্যাবারমাসও তাঁর বিটুইন ফ্যাক্টস অ্যান্ড নর্মস: কন্ট্রিবিউশনস টু আ ডিসকোর্স থিওরি অব ল অ্যান্ড ডেমোক্র্যাসি বইয়ে বলেছেন, গণতন্ত্রের বৈধতা শুধু ভোটের মাধ্যমে নয়; বরং সচেতন ও তথ্যভিত্তিক জন–আলোচনার মাধ্যমেও তৈরি হয়।

৫.

এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সাইকোলজিক্যাল ডাইমেনশন বা মনস্তাত্ত্বিক দিক আছে, যা নিয়ে খুব বেশি আলোচনা হয়নি। গণ-অভ্যুত্থানের পর মানুষ সাধারণত দ্রুত স্ট্যাবিলিটি বা স্থিতিশীলতা চায় এবং অনিশ্চয়তা শেষ করতে চায়। সেই আবেগের মধ্যে অনেক সময় ‘ভুল পক্ষে’ অবস্থান নেওয়ার ভয়ও কাজ করে। ফলে গণভোটে দেওয়া রায় যে সব সময় গভীর সাংবিধানিক বোঝাপড়ার প্রতিফলন, এমনটা নিশ্চিত করে বলা কঠিন।

এখানে বিশেষভাবে লক্ষণীয় যে নির্বাচনের আগে অনলাইন প্রচারণায় একটি বড় দলকে ‘সংস্কারবিরোধী’ বা ‘জুলাইবিরোধী’ হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছিল। অনেক পর্যবেক্ষকের মতে, তখন বিএনপির মধ্যেও একধরনের ডিফেনসিভ পলিটিক্যাল সাইকোলজি বা রক্ষণাত্মক রাজনৈতিক মানসিকতা তৈরি হয়েছিল। দ্রুত নির্বাচন আদায় করা, ‘জুলাইবিরোধী’ তকমা এড়ানো এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা থেকে বের হওয়া—এমন বাস্তবতার মধ্যেই দলটিকে অনেক সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল।

এখানে বিএনপিরও কিছু সমালোচনা আছে। দেশের অন্যতম বড় রাজনৈতিক দল হিসেবে তারা চাইলে আরও জোরালোভাবে অংশগ্রহণমূলক আলোচনার দাবি তুলতে পারত। ইতিহাসও দেখায়, জনগোষ্ঠীর একটা বড় অংশকে দীর্ঘ সময় রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার বাইরে রাখলে ভবিষ্যতে অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। এ ক্ষেত্রে একটি বড় উদাহরণ হতে পারে ইরাকে বাথ পার্টি। ইরাকে সাদ্দাম হোসেনের পতনের পর তাঁর দল বাথ পার্টি ও এর সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের রাজনীতির বাইরে রাখার ফলে সুন্নিদের বড় অংশ কার্যত রাষ্ট্র থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এটা পরে দেশটিতে দীর্ঘ সহিংসতা ও সংকট তৈরি করে।

৬.

অধ্যাপক আলী রীয়াজ ওই সাক্ষাৎকারে বারবার বলেছেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না হলে বাংলাদেশ আবার স্বৈরতন্ত্রের দিকে ফিরে যেতে পারে। স্বৈরতন্ত্র নিয়ে তাঁর এই ভয়ের কারণ পুরোপুরি অযৌক্তিক নয়। কিন্তু এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, গণতান্ত্রিক বিতর্ক কি সব সময় ভয় বা আশঙ্কাকে কেন্দ্র করে পরিচালিত হওয়া উচিত?

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দেখা গেছে, ভবিষ্যতের ভয় বা আশঙ্কাকে ব্যবহার করে দ্রুত রাজনৈতিক ঐকমত্য তৈরির চেষ্টা হয়েছে। ভারতে যেমন ‘হিন্দুরা বিপদে’ ধরনের ভাষা রাজনৈতিক মেরুকরণের হাতিয়ার হয়েছে, তেমনি অন্য দেশেও ‘রাষ্ট্র ভেঙে যাবে’, ‘ধর্ম হারিয়ে যাবে’ বা স্বৈরাচার ফিরে আসবে’—এ ধরনের ‘এক্সিস্টেনশিয়াল ফিয়ার’ বা ‘অস্তিত্বগত ভয়’ পলিটিক্যাল প্রজেক্ট বা রাজনৈতিক প্রকল্পের অংশ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।

সমাজবিজ্ঞানী ব্যারি গ্লাসনার তাঁর দ্য কালচার অব ফিয়ার বইয়ে দেখিয়েছেন, ‘ভয়কেন্দ্রিক’ রাজনৈতিক ভাষা অনেক সময় ডেলিবারেটিভ ডেমোক্রেসি বা আলোচনাভিত্তিক গণতন্ত্রের পরিসর সংকুচিত করে। ফলে বাংলাদেশেও যদি এমন ধারণা তৈরি হয় যে ‘জুলাই সনদ নিয়ে প্রশ্ন তুললেই স্বৈরতন্ত্র ফিরে আসবে’, তাহলে তা স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক আলোচনাকে সীমিত করতে পারে।

অধ্যাপক আলী রীয়াজ ‘ফ্যাক্টাম ভ্যালেট’ প্রসঙ্গেও বলেছেন, গণভোট অধ্যাদেশে কোনো আইনি ত্রুটি ছিল না। কিন্তু এখানে প্রশ্ন শুধু লিগ্যালিটি (আইনি বৈধতা) নয়; বরং লেজিটিমেসি (রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা) নিয়েও। কারণ, এই পুরো প্রক্রিয়া নিয়ে রাজনৈতিক দল, সংবিধানবিশেষজ্ঞ ও নাগরিক সমাজের মধ্যেই বড় ধরনের মতভেদ রয়েছে। ইতিহাস থেকে দেখা যায়, আইনি বৈধতা আর রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা সব সময় এক জিনিস নয়।

৭.

এই বিতর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সমাধানের পথ এখনো পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়নি। বর্তমান সংসদ ‘নিখুঁত’ কি না, তা নিয়ে কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন। কারণ, গত নির্বাচন পুরোপুরি অংশগ্রহণমূলক হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তারপরও বর্তমান সংসদই এখন জনগণের ভোটে নির্বাচিত একমাত্র সাংবিধানিক প্ল্যাটফর্ম। এ কারণে জুলাই সনদ, গণভোট ও রাষ্ট্র সংস্কারের প্রশ্নে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য পথ হতে পারে—এই সংসদকে কেন্দ্র করে আবারও একটি অংশগ্রহণমূলক আলোচনা শুরু করা।

এ আলোচনা শুধু সংসদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে হবে না। সংখ্যালঘু প্রতিনিধি, নারী প্রতিনিধি এবং যাঁরা নিজেদের সংস্কারপ্রক্রিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন মনে করেছেন, তাঁদেরও এতে যুক্ত করতে হবে। সবার অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি না হলে মানুষের মধ্যে এমন সন্দেহ আরও বাড়তে পারে—‘জনগণের আকাঙ্ক্ষার’ ভাষা আগে থেকেই ঠিক করা কোনো রাজনৈতিক প্রকল্পকে বৈধতা দেওয়ার হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহার হচ্ছে কি না?

প্রতিশোধমূলক রাজনীতি নয়, বাংলাদেশের জন্য এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ইনক্লুসিভ ডেমোক্রেটিক সেটেলমেন্ট বা অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতান্ত্রিক বন্দোবস্ত, যেখানে ভিন্নমতের মানুষও নিজেদের ভবিষ্যৎ দেখতে পাবে। আমাদের মনে রাখতে হবে, রাষ্ট্র শুধু আইনকানুন, নথি দিয়ে চলে না, রাষ্ট্র টিকে থাকে রাজনৈতিক আস্থা ও পারস্পরিক বিশ্বাসের ওপর।

  • মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন শিকদার শিক্ষক ও গবেষক, রাষ্ট্র ও সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়

  • মতামত লেখকের নিজস্ব