২০১০ সালের শীতকাল। গণিত ক্যাম্পের এক কোণে বসে থাকা আমি তখন ১৩ বছর বয়সী এক কিশোর। সেই বয়সে অধ্যাপক মাহবুবুল আলম মজুমদার ছিলেন আমাদের কাছে এক বিশাল, রহস্যময় চরিত্র—যাঁকে আমরা আড়ালে বলতাম ‘ধোঁয়ার বাইরের কেউ’। তাঁর নাম শুনলেই গায়ে কাঁটা দিত।
এমআইটি, স্ট্যানফোর্ড, কেমব্রিজের মতো বিশ্বের সেরা সেরা প্রতিষ্ঠানের ডিগ্রি; থিওরেটিক্যাল ফিজিকস ও অ্যাপ্লায়েড ম্যাথমেটিকসে পিএইচডি; ইম্পেরিয়াল কলেজ থেকে পোস্টডক্টরাল—এই প্রোফাইল আমাদের কল্পনারও বাইরে ছিল। দ্বিতীয় কোনো বাংলাদেশির এমন শিক্ষাগত যাত্রার কথা আমরা তখন জানতাম না।
শুনেছিলাম, হাইস্কুলের ছাত্র থাকা অবস্থায় তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান নিয়ে রচনা লিখে হোয়াইট হাউসে প্রেসিডেন্ট রিগানের হাত থেকে প্রথম পুরস্কার নিয়েছেন। পরে প্রেসিডেন্ট বুশের কাছ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ৪০ জন তরুণ বিজ্ঞানীর একজন হিসেবে সম্মাননা পেয়েছেন। এমন একজন মানুষের সামনে কথা বলা তো দূরের কথা, তাঁর পাশে দাঁড়াতেই আমাদের ভয় লাগত।
সেই শীতেই প্রথম তাঁর সঙ্গে আমার অর্থবহ কথোপকথন হয়। তিনি আমাদের শোনান নাজিয়া আপুর গল্প—একজন গণিত ক্যাম্পার ও অলিম্পিয়াড পদকজয়ী, যিনি তখন পড়ছিলেন এমআইটিতে। মাহবুব স্যার বললেন, জীববিজ্ঞানের একটি সমস্যা সমাধান করতে না পেরে নাজিয়া টানা তিন দিন হাত গুটিয়ে বসে ছিলেন। সমস্যাটি সমাধান না হওয়া পর্যন্ত তিনি কিছুতেই ছাড়েননি।
এরপর স্যার আমাদের দিকে তাকিয়ে এমন একটি কথা বলেছিলেন, যা আমার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়: ‘গণিতে যারা তোমার চেয়ে ভালো, তার মানে এই নয় যে তারা তোমার চেয়ে বেশি বুদ্ধিমান। এর মানে হলো, তারা একটা সমস্যার পেছনে পাগলা কুকুরের মতো লেগে থাকতে পারে।’ এ কথাটি আমার মনে গভীরভাবে গেঁথে যায়। মেধার চেয়ে যে অধ্যবসায়, লেগে থাকার ক্ষমতাই আসল—এই উপলব্ধি আমার সব ভয় দূর করে দেয়। সেই মন্ত্র বুকে ধারণ করেই আমি এগোতে থাকি। এর ফলেই পরের বছর, ২০১১ সালে, আমি তৎকালীন সর্বকনিষ্ঠ সদস্য হিসেবে জাতীয় গণিত দলে জায়গা করে নিতে সক্ষম হই।
অধ্যাপক মাহবুবুল আলম মজুমদার শুধু একজন গণিতের কারিগর নন। তিনি একজন স্বপ্নদ্রষ্টা, একজন অভিভাবক ও সহযোদ্ধা—যিনি দুই দশক ধরে নিঃস্বার্থভাবে বাংলাদেশের তরুণদের গণিতের ভয় দূর করে বিজ্ঞানমনস্ক করে তুলছেন।
সময় গড়িয়ে যায়। তিন–চার বছর পর আমি আর সেই ভিতু কিশোর নই; বাংলাদেশের হয়ে দুটি ব্রোঞ্জ ও একটি রৌপ্যপদকজয়ী একজন অলিম্পিয়ান। এই সময়ে মাহবুব স্যারের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে আমি নতুন করে আবিষ্কার করি ‘মানুষ’ মাহবুবুল আলম মজুমদারকে। তিনি আমাকে নতুন প্রজন্মের গণিত ক্যাম্পের শিক্ষার্থীদের প্রশিক্ষণের দায়িত্ব দেন। তখন বুঝতে পারি, তিনি সমস্যার সমাধান শুধু বোর্ডে সীমাবদ্ধ রাখতেন না; আমাদের মানসপটে আরও বড় একটি ক্যানভাসে ছবি আঁকতেন। গণিতের ভয় দূর করে তিনি আমাদের আত্মবিশ্বাসী করে তুলতেন।
যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে নিশ্চিত অধ্যাপনার ক্যারিয়ার ছেড়ে তিনি দেশে ফিরেছিলেন একটি স্বপ্ন নিয়ে—বাংলাদেশের তরুণদের নিয়ে কাজ করার স্বপ্ন। মেধাবী ছাত্রদের শুধু বিদেশে পাঠানোই তাঁর লক্ষ্য ছিল না, যদিও তিনি আমার মতো অনেকের ক্ষেত্রে তা করেছেন। তাঁর সুপারিশপত্র ও ব্যক্তিগত উৎসাহই আমার এমআইটিতে ভর্তির পথে বড় ভূমিকা রেখেছে, যার জন্য আমি তাঁর কাছে চিরকৃতজ্ঞ। তবে তিনি জানতেন, সব মেধাবী বাংলাদেশি এমআইটিতে যাওয়ার সুযোগ পাবে না। তাই তিনি দেশেই বিশ্বমানের শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রত্যয়ে কাজ শুরু করেন। এই পথ ধরেই আজ তিনি ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক।
প্রথম আলোর উদ্যোগে পরিচালিত জাতীয় গণিত অলিম্পিয়াড দলের তিনি অবৈতনিক কোচ। তাঁর ঐকান্তিক প্রচেষ্টার ফলেই ভারতের বাইরে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে একমাত্র বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডে স্বর্ণপদক অর্জন করেছে। ২০০৬ সাল থেকে নিভৃতে যে গণিত আন্দোলনের নেতৃত্ব তিনি দিয়ে আসছেন, তা আজ প্রথম আলোর সহায়তায় ৬৪টি জেলায় বিস্তৃত। তাঁর হাতে গড়া ‘পাইপলাইন’ ব্যবস্থার কারণেই আজ প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিশুরাও গণিতে জয়ের স্বপ্ন দেখতে শিখেছে।
পাশাপাশি আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডে তাঁর যুক্ত হওয়ার আগে ২০০৫ সালে বাংলাদেশের মোট স্কোর ছিল ২৫২-এর মধ্যে মাত্র ৩। তাঁর নেতৃত্বে ২০১৬ সালে সেই স্কোর বেড়ে দাঁড়ায় ১১২-তে। শুধু তা–ই নয়, এই প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ দুবার ভারতকে হারিয়েছে—যা নিঃসন্দেহে এক অসাধারণ অর্জন।
২০২৩ সালে জাপানে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডে আমি আর প্রতিযোগী নই; আমি দলের সহ-নেতা, মাহবুব স্যারের সহযোগী। সেখানেই প্রথমবার নিজ চোখে দেখি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দলনেতা হিসেবে তাঁর অনন্য ভূমিকা। উত্তরপত্র মূল্যায়নে বিচারকদের সঙ্গে যুক্তিনির্ভর দর–কষাকষি—এই কঠিন দায়িত্ব তিনি দক্ষতার সঙ্গে সামলান। একটি নম্বর যে ব্রোঞ্জকে রৌপ্যে বা রৌপ্যকে স্বর্ণে বদলে দিতে পারে, তা তিনি জানেন এবং সেই লড়াই তিনি করে যাচ্ছেন ২০০৬ সাল থেকে।
জাপানের সেই দিনগুলোয় তিনি আমার কাছে কেবল কোচ নন, বন্ধু হয়ে উঠেছিলেন। গবেষণায় আমাকে উৎসাহ দিয়েছেন, জীবনের লক্ষ্য নির্ধারণে দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। আমরা একসঙ্গে ভাবতাম—আজকের ১০ বছর বয়সী শিশুটি যেন আমাদের চেয়েও ভালো সুযোগ পায়। তাঁর উৎসাহেই মেয়েদের অলিম্পিয়াডে অংশগ্রহণ বেড়েছে, এসেছে আন্তর্জাতিক পদক। তিনি তাঁর মায়ের নামে মেয়েদের জন্য একটি বিশেষ পদকের প্রবর্তনও করেছেন।
অধ্যাপক মাহবুবুল আলম মজুমদার শুধু একজন গণিতের কারিগর নন। তিনি একজন স্বপ্নদ্রষ্টা, একজন অভিভাবক ও সহযোদ্ধা—যিনি দুই দশক ধরে নিঃস্বার্থভাবে বাংলাদেশের তরুণদের গণিতের ভয় দূর করে বিজ্ঞানমনস্ক করে তুলছেন। সৌদি আরব তাঁকে বিপুল অর্থের বিনিময়ে তাদের ম্যাথ অলিম্পিয়াড দলের কোচ করতে চেয়েছে, তিনি রাজি হননি। তাঁর এই অসামান্য অবদানের জন্য বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম চিরঋণী।
• ড. নূর মোহাম্মদ সফিউল্লাহ ‘এমআইটি টেকনোলজি রিভিউ’-এর বিশ্বের ৩৫-এর কম বয়সী ৩৫ জন উদ্ভাবকের একজন
* মতামত লেখকের নিজস্ব