তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর এই সময়ে সাংবাদিকতা পেশাটি সম্ভবত অন্য যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি নৈতিক অবক্ষয়ের ঝুঁকির মুখে। ক্লিকবেজড ভিউ আর অসত্য কিংবা আংশিক সত্যের এ প্রতিযোগিতায় সংবাদের কাটতি বাড়াতে সংবাদের শিরোনাম আর ভেতরের বিষয়বস্তু ভয়ংকরভাবে অসংবেদনশীল হয়ে উঠছে। সব ধরনের অসংবেদনশীলতার মধ্যে জেন্ডার অসংবেদনশীলতার বিষয়টি মাত্রা ছাড়াচ্ছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই সাংবাদিকতায় জেন্ডার সংবেদনশীলতার আলাপটি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে।
সাংবাদিকতার প্রাণ ভাষা। তাই প্রথমেই আসি ভাষার প্রসঙ্গে। ভাষা যেমন একদিকে মনের ভাব প্রকাশের মাধ্যম, ঠিক একইভাবে তা আবার শোষণ, বৈষম্য আর নির্যাতন টিকিয়ে রাখারও মাধ্যম। শব্দ নির্বাচন আর প্রয়োগের রাজনীতি যুগে যুগে নির্ধারণ করেছে মানুষের সামাজিক অবস্থান। আমাদের প্রচলিত ক্ষমতাকাঠামোতে নারীর অবস্থান পুরুষের নিচে আর পুরুষ তাঁর উচ্চ অবস্থানটি ধরে রাখতে ও তা পাকাপোক্ত করতে নারীর প্রতি সহিংস ভাষার প্রয়োগ করে চলেছেন বিরামহীন।
পুরুষতান্ত্রিক এই চর্চা থেকে মুক্ত নয় সাংবাদিকতাও। পার্থক্য হলো সাংবাদিকতায় নারীর প্রতি অসংবেদনশীল ভাষা ব্যবহারের ফলাফল হয় অন্য যেকোনো মাধ্যমের চেয়ে বেশি ভয়াবহ। কারণ, গণমাধ্যমের ভাষা মুহূর্তেই বাঁধভাঙা স্রোতের মতো গণমানুষের কাছে পৌঁছে যায়। তাই অসংবেদনশীল সাংবাদিকতা সমাজের জন্য ভয়ংকর।
দ্বিতীয়ত, সাংবাদিকদের মধ্যে জেন্ডার সংবেদনশীল ও নিরপেক্ষ শব্দ ব্যবহারে জ্ঞানের ঘাটতি স্পষ্ট। অনেকে না জেনেই এমন শব্দ ব্যবহার করেন, যা নারীর প্রতি অসম্মানজনক বা পক্ষপাতদুষ্ট। অনেকে আবার মনে করেন, উচ্চশিক্ষা থাকলেই সংবেদনশীলতা আসে। কিন্তু বাস্তবতা হলো শিক্ষিত মানুষের মধ্যেও আমরা প্রায়ই কদর্য ভাষার ব্যবহার দেখি। অর্থাৎ জেন্ডার সংবেদনশীলতা একটি মানসিক ও সামাজিক চর্চা, যা কেবল ডিগ্রির ওপর নির্ভর করে না।
সংবাদমাধ্যমের অভ্যন্তরীণ নীতিমালায় জেন্ডার সংবেদনশীলতাকে স্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। প্রতিটি মিডিয়া হাউসে একটি জেন্ডার গাইডলাইন থাকতে হবে, যেখানে ভাষা ব্যবহার থেকে শুরু করে ছবি, ভিডিও, শিরোনাম—সবকিছুতেই কীভাবে সংবেদনশীলতা বজায় রাখা হবে, তার সুস্পষ্ট নির্দেশনা থাকবে।
ডিজিটাল যুগে এ সমস্যার নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। ভিডিও কনটেন্ট, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম এবং অপ্রাতিষ্ঠানিক ‘মুঠোফোন সাংবাদিকতা’—সব মিলিয়ে ভিউ–বাণিজ্যের চাপে নীতিনৈতিকতা ক্রমেই যেন হারিয়ে যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রেই নারীর ব্যক্তিগত পরিসর লঙ্ঘন করে তাঁর শরীর কিংবা যৌনতাকে লক্ষ্যবস্তু করে কনটেন্ট তৈরি হচ্ছে; যা কেবল অনৈতিকই নয়, রীতিমতো মানবাধিকার লঙ্ঘন।
সমাধান কী? জেন্ডার সংবেদনশীল হয়ে গড়ে ওঠার প্রথম শিক্ষা যেহেতু পরিবার থেকে শুরু হয়, তাই সেখানে নারীর প্রতি সম্মানবোধ গড়ে তুলতে হবে। কাজটি সহজ নয় মোটেই। এর পাশাপাশি বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ হিসেবে পুরো শিক্ষাব্যবস্থাকে জেন্ডার সংবেদনশীল করে তুলতে হবে।
প্রাক্–প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত প্রতিটি স্তরের কারিকুলামকে জেন্ডার সংবেদনশীল করতে হবে এবং সমতাপূর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। এ জন্য প্রয়োজন সমন্বিত নীতিগত উদ্যোগ এবং বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে কার্যকর সমন্বয়। আমাদের শব্দভান্ডারে জেন্ডার নিরপেক্ষ শব্দের যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে। এই ঘাটতি পূরণে এবং নতুন শব্দ সংযোজন ও অপ্রচলিত শব্দকে প্রচলিত করার জন্য নীতিগত সিদ্ধান্ত প্রয়োজন, প্রয়োজন গবেষণা।
সবচেয়ে বড় কথা হলো সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি ও আচরণগত পরিবর্তন না এলে কোনো উদ্যোগই স্থায়ী হবে না। জেন্ডার সংবেদনশীল সাংবাদিকতা কেন প্রয়োজন—এই বোধ তৈরি না হলে কেবল নিয়মনীতি দিয়ে পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়। পাশাপাশি সাংবাদিকদের জেন্ডার সংবেদনশীলতা বিষয়ে দক্ষ করে তোলাও খুব গুরুত্বপূর্ণ।
ভাষার ব্যবহার, শব্দচয়ন ও উপস্থাপনার ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণ দিতে হবে নিয়মিতভাবে। এ ক্ষেত্রে এককালীন প্রশিক্ষণ যথেষ্ট হবে না; বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ ও বাস্তবতার আলোকে তাঁদের জ্ঞান ও দক্ষতা হালনাগাদ করতে হবে।
সাংবাদিকতায় জেন্ডার সংবেদনশীলতার বিষয়টি এক প্রজন্ম থেকে পরের প্রজন্মে প্রবাহিত হওয়ার প্রক্রিয়াটি চলমান রাখতে হবে, যেন সাংবাদিকতা পেশায় যাঁরা নতুন আসছেন, তাঁরাও এ বিষয়ে নৈতিক দায়বদ্ধতা অনুভব করেন এবং প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন করতে পারেন। সংবাদমাধ্যমে নারী কর্মীদের উপস্থিতি খুবই কম। যত বেশি নারী সাংবাদিকতা পেশায় আসবেন, তত বেশি সংবাদমাধ্যমে জেন্ডার সংবেদনশীলতার পথটি প্রসারিত হবে। এ জন্য প্রয়োজন সংবাদমাধ্যমে নারীবান্ধব কর্মপরিবেশ এবং নারী সাংবাদিকদের সক্ষমতার প্রতি আস্থা ও বিশ্বাস স্থাপন করা।
সংবাদমাধ্যমের অভ্যন্তরীণ নীতিমালায় জেন্ডার সংবেদনশীলতাকে স্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। প্রতিটি মিডিয়া হাউসে একটি জেন্ডার গাইডলাইন থাকতে হবে, যেখানে ভাষা ব্যবহার থেকে শুরু করে ছবি, ভিডিও, শিরোনাম—সবকিছুতেই কীভাবে সংবেদনশীলতা বজায় রাখা হবে, তার সুস্পষ্ট নির্দেশনা থাকবে।
সম্প্রতি প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ ও প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের উদ্যোগে ‘সাংবাদিকতায় জেন্ডার সংবেদনশীলতা’ শিরোনামে একটি ম্যানুয়েল তৈরি করা হয়েছে, যার মাধ্যমে সাংবাদিকদের দক্ষতা উন্নয়ন করা হবে। এ ধরনের উদ্যোগগুলো সমন্বিত ও ব্যাপক হতে হবে। পরিশেষে আমাদের দর্শক-শ্রোতা-পাঠকদেরও সচেতন হতে হবে।
নিশাত সুলতানা লেখক ও উন্নয়নকর্মী
ই–মেইল: [email protected]
