বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় পথকুকুরকে খাবার দেওয়া বা চিকিৎসা করানো মানুষদের নিয়ে কটূক্তি, হুমকি, অপমান ও শারীরিক হয়রানির অভিযোগ নতুন নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসব ঘটনার বর্ণনা কিংবা ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে কিছু মানুষের প্রতিক্রিয়া আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে; যেন ক্ষুধার্ত প্রাণীকে খাবার দেওয়া কোনো সামাজিক অপরাধ।
একজন মানুষ অন্য আরেকজন মানুষের সঙ্গে দেখা হলে কথা বলেন। একটা বিড়াল দেখে অনেকে মায়া অনুভব করেন। পাখিকে খাবার দিলে সেটিকে ভালো কাজ বলে মনে করা হয়। কিন্তু রাস্তায় একটি কুকুরকে খাবার দিতে দেখলেই কেন যেন কারও কারও ভেতর থেকে এক অদ্ভুত ক্রোধ বেরিয়ে আসে। গত মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) এ রকম পরিস্থিতির মুখোমুখি হন সুমাইয়া রহমান। ঢাকার বনশ্রী এলাকায় কয়েকটি পথকুকুরকে খাবার দেওয়ার সময় ৫০ থেকে ৬০ জন মানুষ রীতিমতো মব করে তাঁকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করেন (প্রথম আলো, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬)।
কুকুরের প্রতি এই অতিরিক্ত বিদ্বেষের উৎস কোথায়? এর একটি অংশ সম্ভবত সামাজিক অভ্যাসে। ‘কুকুর’ শব্দটা বাংলা ভাষায় সবচেয়ে বড় গালিগুলোর একটি। যে প্রাণীর নাম দিয়ে মানুষকে ছোট করা হয়, তার প্রতি সহমর্মিতা গড়ে উঠবে কী করে?
কুকুরের প্রতি মানুষের ভয় থাকতে পারে। বিরক্তিও থাকতে পারে। কারও কুকুরের কামড়ের অভিজ্ঞতা থাকতে পারে। ছোট সন্তানকে নিয়ে উদ্বেগ থাকতে পারে। এসব অনুভূতির বাস্তব ভিত্তি আছে। কিন্তু ভয় আর ঘৃণা এক জিনিস নয়। আপত্তি আর সহিংসতাও এক জিনিস নয়।
অন্যদিকে কুকুরকে প্রায়ই শহরের অস্বস্তিকর দৃশ্যের অংশ হিসেবে দেখা যায়। ময়লার স্তূপের পাশে কুকুর, রাতের বেলায় ঘেউ ঘেউ, রাস্তায় দলবদ্ধভাবে ঘোরাফেরা, কখনো তাড়া করা বা কামড়ানোর ঘটনা, এসব অভিজ্ঞতা অনেক মানুষের মনে কুকুর সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তৈরি করে।
একটি সমস্যা আছে মানেই সেই সমস্যার সঙ্গে যুক্ত প্রতিটি প্রাণী ঘৃণার যোগ্য নয়। বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত, কেন শহরের রাস্তায় এত অনিয়ন্ত্রিত বর্জ্য? কেন রাস্তার কুকুরকে টিকা দেওয়া আর নিউটার করার কার্যক্রম নেই? কেন আক্রমণাত্মক প্রাণী নিয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার কার্যকর কাঠামো নেই?
একটি কুকুর আপনার পছন্দের প্রাণী না–ও হতে পারে। তাকে আদর করার প্রয়োজন নেই। তাকে নিজের বাড়িতে নেওয়ারও প্রয়োজন নেই। কিন্তু সে ক্ষুধার্ত হলে তাকে খাবার দেওয়া একজন মানুষকে গালি দেওয়ার কী প্রয়োজন? সে আহত হলে চিকিৎসা করাতে চাওয়া মানুষটিকে মারধর করার কী প্রয়োজন? সে আপনার পছন্দের নয় বলে তার প্রতি নিষ্ঠুর হওয়ার অধিকার আপনাকে কে দিয়েছে?
এই প্রশ্নগুলোর বদলে প্রায়ই সবচেয়ে সহজ লক্ষ্য কুকুরটিকে বেছে নেওয়া হয়। কুকুরের প্রতি বিদ্বেষ ধীরে ধীরে এমন এক সামাজিক আচরণে পরিণত হয়েছে, যেখানে তাকে তাড়ানো, পাথর ছোড়া, মারধর করা বা বিষপ্রয়োগের মতো নিষ্ঠুরতাকেও কেউ কেউ স্বাভাবিক বলে ভাবতে শুরু করেছেন।
এখানে ক্ষমতার প্রশ্নও জড়িত। পথকুকুর নির্বিবাদ, প্রতিবাদহীন। যাকে আঘাত করলে কোনো জবাবদিহি নেই, তাকে আঘাত করা অনেকের কাছে রাগ ঝাড়ার সহজ পথ। আর যিনি তাকে খাওয়ান, তিনি প্রায়ই একা, প্রায়ই নারী, প্রায়ই সমাজের চোখে ‘বাড়াবাড়ি’ করা মানুষ। ফলে আক্রমণটা দুদিক থেকেই নিরাপদ মনে হয়।
এর সঙ্গে আরেকটি বিষয়ও জড়িয়ে আছে। আমাদের সমাজে প্রাণীর প্রতি মমতাকে অনেক সময় অপ্রয়োজনীয় বিলাসিতা হিসেবে দেখা হয়; যেন মানুষের এত সমস্যা থাকতে প্রাণীর জন্য কেন সময় বা অর্থ খরচ করা হবে!
কিন্তু এই যুক্তির মধ্যে একটি মৌলিক সমস্যা আছে। মানুষের সমস্যা আছে বলেই প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুর হওয়া যায় না। একজন মানুষ একই সঙ্গে মানুষের জন্য কাজ করতে পারেন, আবার একটা আহত প্রাণীকে চিকিৎসা করাতে পারেন। একটি পথশিশুকে সাহায্য করা এবং একটি কুকুরকে খাবার দেওয়া পরস্পরবিরোধী কাজ নয়। মানবিকতা কোনো সীমিত সম্পদ নয় যে এটা একটি প্রাণীকে দিলে আরেকজন মানুষ তা থেকে বঞ্চিত হবেন। বরং একটি সমাজের মানবিকতার পরিধি বোঝা যায় সেই সমাজ দুর্বল ও অসহায় প্রাণীর প্রতি কেমন আচরণ করে তার মধ্য দিয়ে।
প্রাণীর প্রতি মমতা দেখানো মানুষ মানেই মানুষের প্রতি উদাসীন মানুষ নন। বরং যে মানুষ নিজের সময়, অর্থ ও শ্রম ব্যয় করে একটি ক্ষুধার্ত প্রাণীকে খাবার দেন বা চিকিৎসা করান, তিনি কোনো না কোনোভাবে দায়িত্ববোধেরই প্রকাশ ঘটাচ্ছেন। তাঁর পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন থাকতে পারে, তাঁর সঙ্গে নিয়ম নিয়ে আলোচনা হতে পারে, কিন্তু তাঁর মানবিকতাকে অপমান করার অধিকার কারও নেই।
কুকুরের প্রতি মমতা দেখানো মানুষকে অপমান করার প্রবণতা তাই শুধু প্রাণীপ্রেমের বিরোধিতা নয়। এটি মতের অমিলকে সহিংসতায় পরিণত করার প্রবণতা। আজ বিষয় কুকুর, কাল অন্য কিছু। আজ একজন প্রাণীপ্রেমীকে অপমান করা হচ্ছে, কাল অন্য কোনো নাগরিককে তার ভিন্ন পছন্দের জন্য হেনস্তা করা হতে পারে।
একটি কথা পরিষ্কারভাবে বলা দরকার, কুকুরকে ভালো না বাসার অধিকার আছে, কুকুরকে ভয় পাওয়ার অধিকার আছে, কিন্তু কুকুরকে ঘৃণা করার নামে মানুষকে নির্যাতন করার অধিকার কারও নেই।
একইভাবে প্রাণীপ্রেমীদেরও বুঝতে হবে যে সহমর্মিতা মানে দায়িত্বহীনতা নয়। যেখানে খাবার দেওয়া হচ্ছে, সেখানে পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে হবে। মানুষের চলাচলের বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হবে। কোনো প্রাণী আক্রমণাত্মক হলে বিষয়টি যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে জানাতে হবে।
সবশেষে ফিরে আসি সেই প্রশ্নে: কুকুরের প্রতি এত ঘৃণা কেন? হয়তো কারণ আমরা কুকুরকে ভয় পাই। হয়তো সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কিছু ধারণাও এতে ভূমিকা রাখে। কিন্তু কোনো কারণই নিষ্ঠুরতাকে ন্যায্য করে না।
একটি কুকুর আপনার পছন্দের প্রাণী না–ও হতে পারে। তাকে আদর করার প্রয়োজন নেই। তাকে নিজের বাড়িতে নেওয়ারও প্রয়োজন নেই। কিন্তু সে ক্ষুধার্ত হলে তাকে খাবার দেওয়া একজন মানুষকে গালি দেওয়ার কী প্রয়োজন? সে আহত হলে চিকিৎসা করাতে চাওয়া মানুষটিকে মারধর করার কী প্রয়োজন? সে আপনার পছন্দের নয় বলে তার প্রতি নিষ্ঠুর হওয়ার অধিকার আপনাকে কে দিয়েছে?
একটি সভ্য সমাজে এ প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে হয়।
ড. মো. আবু নাসের ক্যালিফোর্নিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটি বেকার্সফিল্ডের কমিউনিকেশনস বিভাগের চেয়ারপারসন।