মধ্যপ্রাচ্যে রাশিয়া কেন পুরোপুরি ব্যর্থ হচ্ছে

২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে ভাষণ দিচ্ছেন রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভএএফপি

গত সপ্তাহে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে দেওয়া ভাষণে রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ জোর দিয়ে বলেন, ‘জাতিসংঘের অগণিত সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রীয়তা নিশ্চিত করাই এখন মধ্যপ্রাচ্যের মূল ইস্যু এবং এটি সমাধানের সময় এসেছে।’

১৯৪৭ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ফিলিস্তিন বিভাজন সমর্থন করার পর থেকেই ফিলিস্তিনের রাষ্ট্রীয়তার প্রতি সমর্থন মস্কোর অবস্থান হিসেবে বজায় রয়েছে এবং ১৯৯১ সালের ডিসেম্বরে রুশ ফেডারেশন প্রতিষ্ঠার পর থেকেও এটি অপরিবর্তিত আছে।

ইসরায়েলি ঔপনিবেশিকদের বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনিদের কার্যকর বা বস্তুগত সহায়তা দেওয়ার বদলে ১৯৯১ সাল থেকে রুশ ফেডারেশন বড়জোর এক ব্যর্থ দুই–রাষ্ট্র সমাধানের সমর্থনে ফাঁকা কূটনৈতিক বুলি ছড়ানো ছাড়া আর কিছুই দেয়নি; যেখানে একই সঙ্গে ইসরায়েলের সঙ্গে তারা আন্তরিক সম্পর্ক বজায় রেখেছে।

আরও পড়ুন

এমনকি ইউক্রেন যুদ্ধের মাধ্যমে রাশিয়ার বিরুদ্ধে পশ্চিমাদের সর্বাত্মক যুদ্ধে ইসরায়েল প্রকাশ্যে নিজেদের যুক্ত করার পরও রুশরা ইসরায়েলের সঙ্গে তাদের সামরিক জোট ও সম্পর্ক ত্যাগ করেনি।

সেই জোটে এবং অকার্যকর দুই–রাষ্ট্র সমাধানের অব্যাহত সমর্থনের মাধ্যমে ‘উভয় পক্ষকে সমানভাবে দেখা’র ভান করে রুশ ফেডারেশন তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের চেয়েও খারাপ অবস্থানে রয়েছে।

গত সপ্তাহে লাভরভের মতো অর্থহীন কূটনৈতিক ঘোষণাগুলো এক পাশে রাখলে বর্তমান যুদ্ধে ইরানের প্রতি রাশিয়ার হালকা বা কুসুম-কুসুম সমর্থন মূলত যুদ্ধপরবর্তী সময়ে সোভিয়েতদের সতর্ক ভারসাম্য রক্ষা কৌশলের চেয়ে আলাদা কিছু নয়। আর এর মধ্য দিয়ে আরব জনগণের কাছে বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকার যে সোভিয়েত এবং পরবর্তী সময়ে রাশিয়ার ধারা, তা দ্রুত গতিতেই এগিয়ে চলেছে।

নতুন কোনো পথ তৈরির বদলে গত সাড়ে তিন দশকে ইসরায়েলের সঙ্গে বাণিজ্য ও নিরাপত্তা সমন্বয় বৃদ্ধি করা ছাড়া ফিলিস্তিনি এবং জায়নবাদের প্রতি নিজেদের নীতিতে পরিবর্তন আনতে অস্বীকার করেছে রুশ ফেডারেশন।  

এ বাস্তবতাগুলোর আলোকে এটি বেশ আশ্চর্যজনক যে রাশিয়ার শাসকগোষ্ঠীর কেউ এখনো তাদের ব্যর্থ মধ্যপ্রাচ্য নীতি ব্যাপকভাবে পরিবর্তনের কথা ভাবেনি।

আরও পড়ুন

সোভিয়েত বিকল্পসমূহ

রুশ বলশেভিকরা (খ্রিষ্টান ও ইহুদি উভয়ই) কেবল জায়নবাদেরই তীব্র বিরোধিতা করেনি, বরং লিথুয়ানিয়া, পোল্যান্ড ও রাশিয়ার ‘জেনারেল জুয়িশ লেবার বুন্দ’–এর (যা সংক্ষেপে বুন্দ নামে পরিচিত) জায়নবাদবিরোধী ইহুদি জাতীয়তাবাদেরও বিরোধিতা করেছিল।  

রুশ বিপ্লব এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠার পরই জায়নবাদের প্রতি বলশেভিকদের বিরোধিতা রাষ্ট্রীয় নীতিতে পরিণত হয়, অন্যদিকে ‘বুন্দবাদী’ ইহুদি জাতীয়তাবাদের প্রতি তাদের আগের বিরোধিতা কিছুটা শিথিল হয়ে পড়ে। বুন্দ শিগগিরই বিলুপ্ত হয়ে যায় এবং এর অধিকাংশ সদস্য সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টিতে (সিপিএসইউ) যোগ দেয়।

প্রকৃতপক্ষে অনেক সাবেক বুন্দবাদী পার্টির ইহুদি শাখার (ইয়েভসেকসিয়া) কর্মকর্তা হয়ে ওঠেন, যা ইউনিয়নের ইহুদি জনসংখ্যার জন্য সোভিয়েত সাংস্কৃতিক ও ভাষাগত (ইদ্দিশ) নীতিগুলো বাস্তবায়ন করেছিল। সিপিএসইউর ইহুদি শাখাই মূলত দেশে জায়নবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের নেতৃত্ব দিয়েছিল

সোভিয়েত ইউনিয়নে জায়নবাদী সংগঠন তৈরি করা অবৈধ হয়ে পড়ে এবং বিশিষ্ট সোভিয়েত ইহুদি ও খ্রিষ্টান ব্যক্তিরা ভাষণ ও প্রকাশনায় এই বসতি স্থাপনকারী-ঔপনিবেশিক আন্দোলনের তীব্র নিন্দা জানান। তাঁরা জায়নবাদীদের ঔপনিবেশিক হিসেবে বর্ণনা করেন।

সোভিয়েত ও তাদের কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনাল ১৯২০ এবং ১৯৩০-এর দশকে ব্রিটিশ ও জায়নবাদীদের বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনিদের বিদ্রোহ করার অধিকারকে সমর্থন করেছিল এবং জায়নবাদীদের প্রকাশ্যে নিন্দা করেছিল।

একই সময়ে সোভিয়েতরা ১৮ শতকের শেষের দিক থেকে শুরু হওয়া দেশের অভ্যন্তরে ইহুদি কৃষি উপনিবেশ গঠনে জারের পৃষ্ঠপোষকতার নীতি অব্যাহত রাখে।

জারদের অধীন রাশিয়ান ইহুদিদের সাইবেরিয়া, দক্ষিণ রাশিয়া, ককেশাস এবং ক্রিমিয়ায় কৃষি বসতি স্থাপনের জন্য পাঠানো হয়েছিল, যার মধ্যে বেশ কয়েকটি কৃষি বসতি রুশ বিপ্লবের সময়ও সমৃদ্ধ হচ্ছিল।
বিপ্লবের বিরুদ্ধে জারের শ্বেত বাহিনী এবং তাদের পশ্চিম ইউরোপীয় পৃষ্ঠপোষকদের তাণ্ডব ‘পেল অব সেটেলমেন্ট’ অঞ্চলকে তছনছ করে দেয়, যেখানে জারদের আমলে বেশির ভাগ ইহুদি বাস করত। এতে এক লাখের বেশি ইহুদি নিহত হয় এবং জীবিত ব্যক্তিদের জীবিকা ধ্বংস হয়ে যায়।

সে প্রেক্ষাপটেই নবাগত সোভিয়েত সরকার ‘আমেরিকান জুয়িশ জয়েন্ট ডিস্ট্রিবিউশন কমিটি’-এর সঙ্গে যৌথভাবে দক্ষিণ ইউক্রেন, উত্তর ককেশাস, ভলগা অঞ্চল এবং ক্রিমিয়ায় ইহুদিদের জন্য আরও কৃষি উপনিবেশ স্থাপনের জন্য একটি নতুন প্রকল্প পৃষ্ঠপোষকতা ও অর্থায়ন করে। প্রকল্পটি ১৯২৪ থেকে ১৯৩৮ সাল পর্যন্ত চলেছিল।  

ইসরায়েল-ফিলিস্তিন দ্বন্দ্বের মূল কারণগুলোর একটি জেরুজালেমে অবস্থিত পবিত্র আল-আকসা মসজিদ
ছবি: এএফপি

সোভিয়েত জায়ন  

১৯৩৪ সালে সোভিয়েতরা স্থানীয় ক্রিমিয়ান তাতারদের বিরোধিতার কারণে ক্রিমিয়ায় একটি ‘ইহুদি’ প্রদেশ তৈরি করতে অস্বীকার করে এবং তার বদলে বিরোবিদঝান নামে একটি কম জনবহুল অঞ্চলে প্রদেশ তৈরি করে।

এটি জায়নবাদবিরোধী ইহুদি জাতীয়তাবাদীদের সন্তুষ্ট করার উদ্দেশ্যে করা হয়েছিল, যারা ইহুদিবিদ্বেষের বিরুদ্ধে লড়াই করা এবং সোভিয়েত ইহুদিদের মূলধারায় একীভূত করার সোভিয়েত নীতিকে বসতি স্থাপনকারী-ঔপনিবেশিক জায়নবাদের সেরা জবাব হিসেবে দেখেছিল।

অনেক ইহুদি কর্মকর্তা এ প্রকল্পের বিরোধিতা করলেও কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনালের (কমিনটার্ন) ‘ইন্টারন্যাশনাল প্রেস কসপন্ডেন্স’–এ (ইনপ্রেকর) প্রকাশিত বিরোবিদঝানপন্থী একটি প্রবন্ধে বলা হয়েছিল:

‘এখন প্রমাণ মিলেছে যে ইহুদিরা অন্য সব জাতির মতোই কঠোরতম শারীরিক অবস্থার মধ্যেও দূরদর্শী অগ্রদূত হিসেবে একটি অনুন্নত দেশকে সমাজতান্ত্রিক সংস্কৃতির দেশে রূপান্তরিত করতে সক্ষম। সেখানে কোনো ‘আরব সংকট’ নেই, সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থের কোনো দ্বন্দ্ব নেই, এক ইহুদিবিদ্বেষ থেকে অন্য ইহুদিবিদ্বেষে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। সোভিয়েত শক্তির মাধ্যমে ইহুদি সংকটের এটাই আসল সমাধান।’

আরও পড়ুন

‘এমজেড’ নামের এক লেখকের লেখা প্রবন্ধটি ‘সোভিয়েত ইউনিয়নে সমাজতান্ত্রিক নির্মাণ: বিরো বিজান, একটি স্বায়ত্তশাসিত ইহুদি প্রদেশ’ শিরোনামে ১৯৩৪ সালের ১ জুন ইনপ্রেকরের ১৪ নম্বর ভলিউমের ৩২ নম্বর সংখ্যায় প্রকাশিত হয়।

এমনকি নরম জায়নবাদী ও কট্টর কমিউনিস্টবিরোধী হান্না আরেন্টও স্বীকার করে বলেছিলেন, ‘রাশিয়ার বিপ্লব প্রথম এই [জায়নবাদী] দাবির ওপর আঘাত হেনেছে যে ইহুদি সংকটের সমাধান কেবল ফিলিস্তিনেই সম্ভব এবং ফিলিস্তিন গড়ে তোলার মাধ্যমে বা অন্য কথায় ইহুদিদের তাদের আগের পিতৃভূমি থেকে প্রস্থান করার মাধ্যমেই কেবল ইহুদিবিদ্বেষ নির্মূল করা সম্ভব।’

তা সত্ত্বেও সোভিয়েত ইহুদিদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ জাতীয়তাবাদবিরোধী থেকে যায় এবং সোভিয়েত সমাজে একীভূত হওয়াকে সমর্থন করে। কেবল একটি সামান্য শতাংশ বিরোবিদঝানে বা কৃষি উপনিবেশগুলোয় স্থানান্তরিত হয়েছিল, যেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ রাশিয়া, বেলারুশ ও ইউক্রেনের বড় সোভিয়েত শহরগুলোয় চলে যায়—তারা জায়নবাদী, বুন্দবাদী এবং সোভিয়েত-পৃষ্ঠপোষকতাপ্রাপ্ত ইহুদি জাতীয়তাবাদের সব রূপকেই প্রত্যাখ্যান করে।

আরও পড়ুন

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ইহুদিরা সোভিয়েত সমাজে এতটাই একীভূত ছিল যে ১০০ জনের বেশি ইহুদি জেনারেল রেড আর্মিতে সেবা দিয়েছিলেন, যা ইহুদি বলশেভিক লিওন ট্রটস্কি প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনা করেছিলেন।

সোভিয়েত ও তাদের কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনাল ১৯২০ এবং ১৯৩০-এর দশকে ব্রিটিশ ও জায়নবাদীদের বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনিদের বিদ্রোহ করার অধিকারকে সমর্থন করেছিল এবং জায়নবাদীদের প্রকাশ্যে নিন্দা করেছিল।

১৯২৯ সালের ফিলিস্তিনি বুরাক দেয়াল (ওয়েস্টার্ন ওয়াল) বিপ্লবের পর, কমিনটার্নের ইস্ট বিভাগের উপপরিচালক জর্জি সাফোরভ ‘ফিলিস্তিনে জায়নবাদী উপনিবেশগুলোর’ তীব্র নিন্দা জানান এবং ‘ফিলিস্তিনের ইহুদি সম্প্রদায়কে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী অগ্রগামী দল’ বলে বর্ণনা করেন।
তবে যুদ্ধের শেষে এবং হলোকাস্টের পর জোসেফ স্তালিন সম্পূর্ণ উল্টো নীতি গ্রহণ করেন।

দলে দলে ঘরে ফিরছেন ফিলিস্তিনিরা। খান ইউনিস, গাজা, ফিলিস্তিন
ফাইল ছবি: রয়টার্স

জায়নবাদী মোড়  

ব্রিটেন ও তুরস্কে সোভিয়েত দূতাবাসগুলোয় জায়নবাদী লবিং কিছু সাহায্য করেছিল, তবে এটিই মূল কারণ ছিল না। স্নায়ুযুদ্ধের শুরুতে প্রতিক্রিয়াশীল আরব রাজতন্ত্র এবং রক্ষণশীল ফিলিস্তিনি নেতৃত্ব সাম্রাজ্যবাদী পশ্চিমাদের সঙ্গে মিত্রতা করেছিল। যুদ্ধপরবর্তী এ জোট এবং কমিউনিজমের প্রতি তাদের বৈরিতা সোভিয়েতদের ভালো লাগেনি।

জায়নবাদীদের নিজেদের প্রতিশ্রুতিবদ্ধ সমাজতান্ত্রিক এবং স্নায়ুযুদ্ধে নিরপেক্ষ হিসেবে দাবি করার ভানটি ফিলিস্তিনি এবং ইহুদি বসতি স্থাপনকারীদের জন্য একটি এক-রাষ্ট্র সমাধান বা তা না হলে ফিলিস্তিনকে দুটি রাষ্ট্রে বিভক্ত করার নীতি গ্রহণে সোভিয়েতদের রাজি করাতে সাহায্য করেছিল (একটি বসতি স্থাপনকারীদের জন্য এবং অন্যটি স্থানীয় মানুষের জন্য)।

জাতিসংঘে সোভিয়েত রাষ্ট্রদূত আন্দ্রেই গ্রোমিকো ১৯৪৭ সালের এপ্রিলে মস্কো থেকে নতুন নির্দেশনা পান, যা আগের সোভিয়েত জায়নবাদবিরোধী অবস্থানকে সম্পূর্ণ উল্টে দেয়।

গ্রোমিকো ১৯৪৭ সালের মে ও নভেম্বরে আবেগপূর্ণ ভাষণ দেন, যেখানে যুদ্ধের সময় ইহুদিদের সাহায্য করতে ব্যর্থ হওয়ার জন্য পশ্চিম ইউরোপীয় দেশগুলোকে দোষারোপ করার পাশাপাশি ফিলিস্তিনে একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিষয়ে ইহুদি বসতি স্থাপনকারীদের তথাকথিত অধিকার সমর্থন করেন।

আরও পড়ুন

ইসরায়েল যখন স্বাধীনতা ঘোষণা করে, তখন সোভিয়েতরা দ্রুত একে স্বীকৃতি দেয়, যা পুরো আরব বিশ্বের সিংহভাগের বৈরিতা অর্জন করে এবং সোভিয়েত লাইন অনুসরণকারী সমস্ত আরব কমিউনিস্ট পার্টিকে আরব জনগণ থেকে স্থায়ীভাবে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে।

সোভিয়েতরা যদি ভেবে থাকে যে তারা জায়নবাদীদের সমর্থন করে মধ্যপ্রাচ্যে একটি মিত্র পেয়েছে, তবে তারা শিগগিরই তাদের ভুল হিসাব বুঝতে পেরেছিল।

তা সত্ত্বেও নিকিতা ক্রুশ্চেভের অধীন (যিনি আগের বছর স্তালিনের পর পার্টি নেতা হিসেবে স্থলাভিষিক্ত হয়েছিলেন) ১৯৫৪ সালের জুনে ইসরায়েলে সোভিয়েত কূটনৈতিক মিশনকে একটি পূর্ণাঙ্গ দূতাবাসে উন্নীত করা হয়।

তবে আরব প্রজাতন্ত্রগুলোই ছিল সোভিয়েতদের জন্য সবচেয়ে বন্ধুভাবাপন্ন আরব শাসনব্যবস্থা: ১৯৫০-এর দশকের মাঝামাঝি থেকে মিসর, ১৯৫৮ সালের পর ইরাক এবং ১৯৬২ সালের পর আলজেরিয়া, যার পেছনে অন্যরা অনুগামী হয়।

এ ইতিহাসের আলোকে রুশ ফেডারেশনের মধ্যপ্রাচ্যে তাদের অবস্থানের খুব একটা পরিবর্তনের আশা করা উচিত নয়। যতক্ষণ না এটি তার মধ্যপ্রাচ্য কৌশল ব্যাপকভাবে পরিবর্তন করছে, ততক্ষণ পর্যন্ত এটি জায়নবাদী বসতি-উপনিবেশবাদ এবং ইসরায়েলি আঞ্চলিক সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে চলমান সংগ্রামে একটি তাৎপর্যহীন উপাদান হিসেবেই থেকে যাবে।

সোভিয়েতরা ইসরায়েলের সঙ্গে তাদের কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখে, যেখানে আরব প্রজাতন্ত্রের প্রতি তাদের সমর্থন পশ্চিমের সাম্রাজ্যবাদী শক্তির ইসরায়েল ও প্রতিক্রিয়াশীল আরব দেশগুলোর প্রতি সমর্থনের তুলনায় একেবারেই হালকা ছিল।

আমেরিকা ও পশ্চিমাদের সঙ্গে ইসরায়েলের মিত্রতা এবং সোভিয়েতদের প্রতি শত্রুতা এতটাই তীব্র ছিল যে তারা সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধেই প্রচারণায় নেমে পড়ে। যদিও বিশ্ব ইতিহাসে প্রথম সোভিয়েতরাই কথায় ও কাজে ইহুদিবিদ্বেষের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিল, তা সত্ত্বেও তাদের গায়ে ‘ইহুদিবিদ্বেষী’র তকমা এঁটে দেওয়া হয়।

যেহেতু পশ্চিমা দেশের ইহুদিরা ইসরায়েলে স্থানান্তরিত হতে অস্বীকার করেছিল এবং অভিবাসন শুকিয়ে গিয়েছিল, তাই ইসরায়েলিরা তাদের বসতি-উপনিবেশে লোকসংখ্যা বাড়াতে সোভিয়েত ইহুদিদের আনার চেষ্টা করেছিল।

সে প্রেক্ষাপটেই তারা সোভিয়েতদের বিরুদ্ধে ইহুদিবিদ্বেষের অভিযোগ তোলে। কারণ, তারা সোভিয়েত ইহুদিদের ইসরায়েলের উদ্দেশ্যে দেশ ছাড়ার অনুমতি দিতে অস্বীকার করেছিল।

ভ্লাদিমির পুতিন
ছবি: রয়টার্স

কূটনৈতিক সীমাবদ্ধতা

১৯৬৭ সালে তিনটি আরব দেশে ইসরায়েলি আগ্রাসনের পর সোভিয়েতরা এই ইহুদি বসতি-উপনিবেশটির সঙ্গে সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন করে। এরপর ইসরায়েল সোভিয়েত ‘ইহুদিবিদ্বেষের’ বিরুদ্ধে তাদের প্রচারণা আরও তীব্র করে, যতক্ষণ না সোভিয়েতরা শেষ পর্যন্ত নতি স্বীকার করে এবং ১৯৭১ সাল থেকে বড় আকারের ইহুদি অভিবাসনের অনুমতি দেয়। দেশ ত্যাগ করা ব্যক্তিদের অর্ধেকই ইসরায়েলের বদলে যুক্তরাষ্ট্রকে বেছে নিয়েছিল।

এ শিথিলতা ছিল যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্নায়ুযুদ্ধ প্রশমিত রাখার সোভিয়েত প্রচেষ্টার একটি অংশ, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের পক্ষে সোভিয়েতবিরোধী প্রচারণায় নেতৃত্ব দিয়েছিল। সোভিয়েত নেতা মিখাইল গর্বাচেভ ১৯৮৭ থেকে ১৯৮৯ সালের মধ্যে অভিবাসন বিধিনিষেধ শিথিল করেছিলেন, যার ফলে ধসে পড়া ইউএসএসআর থেকে ১০ লাখ সোভিয়েত ইহুদি ইসরায়েলের উদ্দেশে দেশ ছাড়ার সুযোগ পায়।

গর্বাচেভ ১৯৯১ সালের অক্টোবরে ইসরায়েলের সঙ্গে আবার কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করেন। সেই বছরের ১৬ ডিসেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের চাপে সোভিয়েত ইউনিয়ন জাতিসংঘের ‘জায়নবাদ একটি বর্ণবাদ’ প্রস্তাবটি বাতিলের পক্ষে ভোট দেয়, যা তারা ১৯৭৫ সালে সমর্থন করেছিল।

আরও পড়ুন

যদি জায়নবাদের ওপর স্তালিনের এ অবস্থান পরিবর্তন হলোকাস্ট, স্নায়ুযুদ্ধ ও সোভিয়েতপন্থী আরব শাসকদের অভাবের কারণে হয়ে থাকে, তবে রাশিয়ার বিরুদ্ধে বর্তমান পশ্চিমা যুদ্ধ, ফিলিস্তিনিদের ওপর গণহত্যা এবং ইরান ও লেবানন-ফিলিস্তিনি প্রতিরোধের সাম্রাজ্যবাদবিরোধী অবস্থান কি নতুন আরেকটি অবস্থান পরিবর্তনের জন্য যথেষ্ট হবে না?

এটি সত্য, সমস্ত আরব শাসনব্যবস্থা আজও ১৯৪৮ সালের মতোই পশ্চিমাদের পকেটে রয়েছে। তবে তারা রাজনৈতিক ক্ষেত্রের একমাত্র খেলোয়াড় নয়।

জায়নবাদী প্রকল্পের প্রতি পশ্চিমা সমর্থন মূলত রুশ বিপ্লব এবং ‘আন্তর্জাতিক কমিউনিজম’-এর বিরুদ্ধে আঘাত হানার লক্ষ্যে ছিল। এটাকে ইহুদিবিদ্বেষী চার্চিল তার ১৯২০ সালের ‘জায়নবাদ বনাম বলশেভিজম’ প্রবন্ধে ইহুদিদের ‘বিশ্বব্যাপী ষড়যন্ত্র’ হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন।

রাশিয়ান বিপ্লবের বিজয়ের ঠিক পাঁচ দিন আগে ১৯১৭ সালে চার্চিলের তথাকথিত ‘জাতীয় ইহুদিদের’ সমর্থনে ব্রিটেনের বেলফোর ঘোষণা তৈরি করা হয়েছিল, যাতে বিপ্লবের প্রতি রাশিয়ান ইহুদিদের সমর্থন ঠেকানো যায়। তবে সেই পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়েছিল।

আরও পড়ুন

তবে গর্বাচেভের অধীন সোভিয়েত ইউনিয়ন জাতিসংঘের শেষ ভোটগুলোর একটি দিয়েছিল জায়নবাদকে পুনর্বাসিত করার পক্ষে। সোভিয়েত ইউনিয়নের মূল পর্দা নামার ঠিক কয়েক দিন আগে ‘জায়নবাদ একটি বর্ণবাদ’ প্রস্তাব বাতিলের পক্ষে সমর্থন জানিয়ে এটি সোভিয়েত যুগের জায়নবাদ-বিরোধিতাকে চিরতরে মুছে দেয়।

এ ইতিহাসের আলোকে রুশ ফেডারেশনের মধ্যপ্রাচ্যে তাদের অবস্থানের খুব একটা পরিবর্তনের আশা করা উচিত নয়। যতক্ষণ না এটি তার মধ্যপ্রাচ্য কৌশল ব্যাপকভাবে পরিবর্তন করছে, ততক্ষণ পর্যন্ত এটি জায়নবাদী বসতি-উপনিবেশবাদ এবং ইসরায়েলি আঞ্চলিক সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে চলমান সংগ্রামে একটি তাৎপর্যহীন উপাদান হিসেবেই থেকে যাবে।

  • জোসেফ মাসাদ কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক আরব রাজনীতি ও ইতিহাসের অধ্যাপক। মিডল ইস্ট আই থেকে অনূদিত।