সস্তা শ্রম বাংলাদেশকে অনেক দূর এনেছে। কিন্তু এখন স্পষ্ট হয়ে উঠছে যে সেই পথের শেষ প্রান্তে আমরা এসে দাঁড়িয়েছি। এলডিসি (স্বল্পোন্নত দেশ) থেকে উত্তরণের পর আধুনিক ওষুধে প্রবেশাধিকার আরও ব্যয়বহুল হবে। অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ ধীরে ধীরে এমন এক জনস্বাস্থ্য সংকটে রূপ নিচ্ছে, যার ক্ষতি আমরা এখনো পুরোপুরি উপলব্ধি করছি না। একই সময়ে আইএমএফ (আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল) বাংলাদেশকে কর-জিডিবি অনুপাত বাড়াতে, রপ্তানির ভিত্তি প্রসারিত করতে এবং কম মূল্য সংযোজনের অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে আসতে চাপ দিচ্ছে। এই ত্রিমুখী চ্যালেঞ্জের একটাই বিচক্ষণ উত্তর, নিজেদের প্রযুক্তিগত ও শিল্প উদ্ভাবনের সক্ষমতা গড়ে তোলা।
একটি অস্বস্তিকর সংখ্যা দিয়ে শুরু করা যাক। গত অর্থবছরে বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত নেমে এসেছে প্রায় ৬ দশমিক ৬ শতাংশে—আগের বছরের প্রায় ৭ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে কমে এবং বিশ্বের যেকোনো অর্থনীতির তুলনায় যা অন্যতম সর্বনিম্ন। অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থার (ওইসিডি) হিসাবে, গোটা এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের মধ্যে এটিই সর্বনিম্ন। প্রতিবেশীরা ধারেকাছেও নেই—নেপাল তার জিডিপির প্রায় ১৮ শতাংশ কর হিসেবে আদায় করে, ভারত ১২ শতাংশের বেশি। পাঁচ দশক ধরে এই অনুপাত দুই অঙ্কের নিচেই আটকে আছে।
এই সংখ্যা কেবল হিসাবরক্ষকের কোনো বিমূর্ত তথ্য নয়। এর অর্থ হলো, ঢাকার একজন মেধাবী রসায়ন স্নাতক প্রকৃত গবেষণা করার জন্য অর্থ দিতে রাজি, এমন কোনো গবেষণাগার খুঁজে পান না এবং শেষ পর্যন্ত অন্য কারও অর্থনীতিতে সেই গবেষণা করতে বিমানে চড়ে বসেন। এভাবেই আমরা নিজেদের সবচেয়ে বড় সম্পদ–মেধা ঘরে তুলতে ব্যর্থ হই। এই মেধা কাজে লাগিয়ে উচ্চ মূল্য সংযোজন করতে পারি না, আর সেই মূল্য থেকে করও আদায় করতে পারি না।
এর অর্থ হলো, দেশের ভেতরে যথেষ্ট রাজস্ব তুলতে না পেরে রাষ্ট্র প্রতিবছর আরও বেশি ঋণ করে, আর ঋণের সুদ পরিশোধই বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় জায়গাটুকু গ্রাস করে ফেলে। যে সরকার সহজে রাজস্ব বাড়াতে পারে না, সে কেবল ব্যয় করে প্রতিযোগিতা-সক্ষমতা ও সমৃদ্ধি কিনতে পারে না। তাকে আরও কঠিন ও মূল্যবান কাজটি করতে হয়—প্রতিটি টাকা থেকে আরও বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জন করা। প্রশ্নটি ‘কত ব্যয় করছি’ তা নয়, প্রশ্নটি হলো ‘কিসে ব্যয় করছি’।
অর্ধশতাব্দী ধরে আমরা সস্তায় সহজ জিনিস বানিয়ে প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছি। স্বল্প মজুরির শিল্প তৈরি পোশাক এখন আমাদের রপ্তানি আয়ের চার-পঞ্চমাংশের বেশি জোগায় এবং লাখ লাখ মানুষকে দারিদ্র্য থেকে তুলে এনেছে। কিন্তু স্বল্প মজুরির ওপর দাঁড়ানো মডেলের একটি অন্তর্নিহিত সীমা আছে। শ্রমিকপ্রতি মূল্য সংযোজন কম থাকে, পণ্য কেবল দামে প্রতিযোগিতা করে, আর সরু মুনাফা সামান্যই কর জোগায়। ঠিক এ কারণেই আইএমএফ একসঙ্গে দুই দিক থেকে বাংলাদেশের ওপর চাপ দেয় কর-জিডিপি অনুপাত বাড়াতে এবং পোশাকের বাইরে রপ্তানি বহুমুখী করতে।
এখন একসঙ্গে দুটি সময়সীমা ঘাড়ে এসে পড়ছে। প্রথমটি এমন এক খাদ, যার কথা বেশির ভাগ নাগরিক জানেনই না। স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে বাংলাদেশ বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) যে ছাড় ভোগ করে, তার সুবাদেই দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো লাইসেন্স ছাড়াই পেটেন্টকৃত ওষুধ বানাতে পারে—আধুনিক ওষুধ আমরা এত সস্তায় পাই মূলত এ কারণেই। ছাড়টি ২০৩৩ সাল পর্যন্ত, কিন্তু কেবল যারা এলডিসির অন্তর্ভুক্ত থাকবে, তাদের জন্য; ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বর গ্র্যাজুয়েশনের সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশ তা হারাবে—নির্ধারিত সময়ের সাত বছর আগেই।
যে দেশ নিজের অত্যাবশ্যক ওষুধ বানাতে পারে না, কিংবা পুরোনো অ্যান্টিবায়োটিক অকার্যকর হয়ে পড়লে নতুন ওষুধ উদ্ভাবনে সহায়তা করতে পারে না, সে দেশ স্বাস্থ্যের জরুরি অবস্থায় সার্বভৌম নয়। ওষুধের নিরাপত্তাই জাতীয় নিরাপত্তা।
এখানে তৈরি প্রায় এক-পঞ্চমাংশ ওষুধ অন্যত্র পেটেন্টকৃত; ওই তারিখের পর সেগুলোর জন্য লাগবে লাইসেন্স বা ব্যয়বহুল বিকল্প। ফলে নতুন ক্যানসারের ওষুধ, আধুনিক ইনসুলিন ও বায়োলজিকসের দাম বাড়বে। সাধারণ মানুষের জন্য আধুনিক ওষুধের সাশ্রয়ী মূল্য তাই আক্ষরিক অর্থেই ঘড়ি-গণনার মুখে; আর এর একমাত্র রক্ষাকবচ, নিজেদের ওষুধ নিজেরা তৈরি ও উদ্ভাবনের সক্ষমতা।
দ্বিতীয় সময়সীমাটি আরও ধীর ও আরও মারাত্মক: অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স, যেখানে ব্যাকটেরিয়া বিবর্তিত হয়ে সেই অ্যান্টিবায়োটিককে পরাস্ত করে, যা একসময় তাদের মেরে ফেলত। এটি ইতিমধ্যে বিশ্বজুড়ে বছরে প্রায় ৫০ লাখ মৃত্যুর সঙ্গে জড়িত এবং বহুল-উদ্ধৃত পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৫০ সাল নাগাদ বছরে এক কোটি মানুষের প্রাণ কেড়ে নিতে পারে। ভারী সংক্রমণের বোঝা, ব্যাপক ও অনিয়ন্ত্রিত অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার এবং আমদানিকৃত উপকরণের ওপর প্রায় সম্পূর্ণ নির্ভরশীলতা নিয়ে বাংলাদেশ চরম ঝুঁকিতে। এক হিসাবে, কেবল ২০১৯ সালেই বাংলাদেশে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্সের জন্য দায়ী মৃত্যুর সংখ্যা ছিল প্রায় ২৬ হাজার ২০০।
নির্ভরযোগ্য জাতীয় উপাত্ত এখনো অপ্রতুল, তবে আইসিইউতে চিত্রটি সবচেয়ে ভয়াবহ, দেশের হাসপাতালগুলোতে সংক্রমণে মৃত্যুর হার প্রায় ২১ শতাংশ থেকে বেড়ে ৫০ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। কারণ, এই প্রাণঘাতী জীবাণুর চার-পঞ্চমাংশই এখন সর্বশেষ সারির অ্যান্টিবায়োটিককেও পরাস্ত করে। যে দেশ নিজের অত্যাবশ্যক ওষুধ বানাতে পারে না, কিংবা পুরোনো অ্যান্টিবায়োটিক অকার্যকর হয়ে পড়লে নতুন ওষুধ উদ্ভাবনে সহায়তা করতে পারে না, সে দেশ স্বাস্থ্যের জরুরি অবস্থায় সার্বভৌম নয়। ওষুধের নিরাপত্তাই জাতীয় নিরাপত্তা।
সামনের সময়ের জন্য রপ্তানির নগদ প্রণোদনা ভুল কৌশল। প্রথম সমস্যাটি প্রত্যেক রপ্তানিকারক অভিজ্ঞতা থেকেই জানেন: ক্রেতারা জানেন প্রণোদনা আছে, তাই তাঁরা প্রায় টাকায়-টাকায় সমপরিমাণ ছাড় দাবি করে সেটি আলোচনার টেবিলে কেড়ে নেন। ফলে করদাতা শেষ পর্যন্ত বিদেশি ক্রেতাকে ভর্তুকি দেন, আমাদের মুনাফা সংকুচিত হয়, আর একটি নতুন সক্ষমতা, একটি পেটেন্ট কিংবা একজন প্রশিক্ষিত বিজ্ঞানীও তৈরি হয় না। দ্বিতীয় সমস্যাটি আইনি: গ্র্যাজুয়েশনের পর রপ্তানিনির্ভর নগদ প্রণোদনা এমনিতেই বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার নিয়মের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ হয়ে পড়বে।
বাংলাদেশের পরবর্তী প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা আলোচনার টেবিলে হারিয়ে যাওয়া কোনো ভর্তুকি দিয়ে কেনা যাবে না। সেটি তৈরি হবে গবেষণাগারে—যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধা ও শিল্পের বাস্তব অভিজ্ঞতা একসঙ্গে কাজ করবে, আর রাষ্ট্র গ্রহণ করবে সেই প্রাথমিক ঝুঁকি, যা একা কোনো প্রতিষ্ঠান নিতে পারে না। জ্ঞান এমন এক সম্পদ, যা ব্যবহারে ক্ষয় হয় না; বরং চক্রবৃদ্ধি হারে বাড়ে। একবার উদ্ভাবনের সক্ষমতা তৈরি হলে তার সুফল একটি পণ্য বা একটি প্রতিষ্ঠানে সীমাবদ্ধ থাকে না—তা ছড়িয়ে পড়ে পুরো অর্থনীতিতে। গ্র্যাজুয়েশনের ঘড়ি-গণনা আসলে সেই সিদ্ধান্তেরও ঘড়ি-গণনা।
এস এম সাইফুর রহমান রাসায়নিক প্রকৌশলী ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক, অ্যাকটিভ ফাইন কেমিক্যালস লিমিটেড
*মতামত লেখকের নিজস্ব