এপস্টেইন ফাইলস: ক্ষমতার অন্ধকার অন্দরমহল ও ফুঁসে ওঠা জনতা

জেফরি এপস্টেইন ও তাঁর বান্ধবী গিলেন ম্যাক্সওয়েলছবি: রয়টার্স

সম্প্রতি প্রয়াত যৌন নিপীড়ক জেফরি এপস্টেইন সংক্রান্ত মামলার অনেক নথি, ছবি, ভিডিও প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ। অনেকেই সেটাকে একধরনের আইনি নিষ্পত্তির দিকে যাওয়া ঘটনা হিসেবে ভাবতে চাইছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের কৌঁসুলিরা বলছেন, এসব নথির ভিত্তিতে তাঁরা আর কোনো নতুন অভিযোগ আনবেন না। অনেকে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন করছেন, তাহলে এসব প্রকাশের মানে কী? এ প্রশ্নের উত্তর আদালতের কক্ষে নেই। উত্তরটা আছে রাজনীতির ভেতরে, জনমতে এবং ক্ষমতার প্রতি মানুষের ক্রমবর্ধমান অনাস্থার চিত্রে।

এটাকে আমি বলছি অভিজাত বনাম জনতা বা এলিট বনাম জনগণ। এ দ্বন্দ্ব নতুন নয়। কিন্তু এপস্টেইন ইস্যু এটাকে অস্বস্তিকরভাবে সামনে এনেছে। কারণ, এপস্টেইনের গল্পে কেবল একজন অপরাধী নেই, আছে সেই অপরাধকে সম্ভব করে তোলা নেটওয়ার্ক এবং আছে সেই নেটওয়ার্কের চারপাশে তৈরি হওয়া একধরনের অদৃশ্য সুরক্ষাবলয়। বলয়টি মানুষদের দীর্ঘদিন ধরে দেখিয়েছে যে ক্ষমতাবানদের জন্য আইনকানুন আর সাধারণ মানুষের জন্য আইনকানুনের ধরন এক নয়।

এপস্টেইন ফাইলে ট্রাম্প।
ছবি: রয়টার্স

এপস্টেইন–সংক্রান্ত নথিগুলো থেকে তথ্য নিয়ে নতুন মামলা হবে না—এ ঘোষণা তাই অনেকের কাছে ব্যাপারটির নিষ্পত্তি নয়, বরং উসকানি। কারণ, মানুষ যে ক্ষোভ নিয়ে বসে আছে, সেটি আসলে বিচারহীনতা নিয়ে নয়, বরং ন্যায্যতার অনুপস্থিতি নিয়ে।

যুক্তরাষ্ট্রে জনতার যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে, সেটি কোনো এক দলের একচ্ছত্র সম্পত্তি নয়। এই ক্ষোভ ডেমোক্র্যাটদের ভেতরেও আছে, কনজারভেটিভ ভোটারদেরও ভেতরে আছে। মানুষ বলতে চাইছে, ক্ষমতাবানদের সঙ্গে নীতির সম্পর্ক কি সত্যিই শিথিল? আইন কি সত্যিই সবার জন্য এক?

এ জায়গায় এসে বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত হয়। এপস্টেইন নথি ট্রাম্প প্রশাসনের বিচার বিভাগকে নতুন মামলা করতে বাধ্য করছে না, কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর রাজনৈতিক চাপ বাড়াচ্ছে। বিশেষ করে ট্রাম্পের নিজের সমর্থকদের মধ্যে এ ইস্যু ভাঙন তৈরি করছে। ট্রাম্পের রাজনীতিতে যে ভাষা বারবার ব্যবহার হয়েছে, সেটি জনতার পক্ষে দাঁড়ানোর ভাষা। সেই ভাষার বিপরীতে যদি সাধারণ সমর্থকেরা মনে করেন, অভিজাতদের বেলায় প্রশাসন গা বাঁচিয়ে চলছে, তাহলে তাঁদের আস্থা দুর্বল হয়ে যায়।

আরও পড়ুন

এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে। এপস্টেইন নথিতে যাঁদের নাম আসছে, তাঁরা কেবল ব্যক্তি নন, তাঁরা ক্ষমতার প্রতীকও। যুক্তরাজ্যের সাবেক যুবরাজ অ্যান্ড্রু মাউন্টব্যাটেন এক অর্থে রাজতন্ত্রেরই একটি অংশ। বিল গেটস প্রযুক্তি-পুঁজিবাদের পুরোনো আইকন। ইলন মাস্ক সাম্প্রতিক কালের নতুন প্রযুক্তি–সাম্রাজ্যের আইকন।

যখন এসব নাম একই গল্পে এসে পড়ে, তখন তা আদালতের ফাইলে যতটা না আলোড়ন তোলে, তার চেয়েও বেশি আলোড়ন তোলে রাজনৈতিক ভাবনায়। সাধারণ মানুষের কাছে এটা যেন একধরনের চিহ্ন হয়ে দাঁড়ায়, যেখান থেকে বোঝা যায়, ক্ষমতার ঘরটা কতটা অভেদ্য, আর সেই ঘরের ভেতরে জবাবদিহি কতটা দুর্লভ।

অনেকে ভাবেন, এসব চাপ কি কেবল রাজনৈতিক? আমি বলব, না। এই চাপ ব্যবসায়িকও। কারণ, জনমতের দোলাচল এখন বাজারকে আঘাত করে। বড় করপোরেশনগুলো এখন কেবল পণ্যের গুণে চলে না, চলে আস্থার ওপর। যে মুহূর্তে কোনো ক্ষমতাবান বা বড় ব্র্যান্ড জনমতের চোখে দূষিত হয়ে পড়ে, সেই মুহূর্তে তার অর্থনৈতিক মূল্যও কমে যায়।

ধীরগতিতে নথিগুলোকে প্রকাশ করা ক্ষতস্থান থেকে ব্যান্ডেজকে ধীরে ধীরে টানার মতো। এতে ব্যথা দীর্ঘ হয়, ক্ষোভ দীর্ঘ হয়, মনোযোগ দীর্ঘ হয়। একবারে সব প্রকাশ করলে হয়তো ক্ষতটা দ্রুত দেখা যেত, তারপর ধীরে ধীরে শুকাত। কিন্তু এভাবে টেনে টেনে প্রকাশ করলে ক্ষতটা রোজ নতুন করে জ্বলে ওঠে।

এ কারণেই গেটস বা মাস্কের মতো মানুষের নামগুলোর ক্ষেত্রে রাজনৈতিক উত্তাপ ব্যবসায়িক ঝড়ও ডেকে আনতে পারে। এদিকে অ্যান্ড্রুর ক্ষেত্রে তা রাজনৈতিক ও সামাজিক বিপর্যয় আরও ঘনীভূত করতে পারে। কারণ, রাজপরিবারের প্রতি জনসমর্থনের ভিত্তিটাই নৈতিকতার ধারণার সঙ্গে জড়িত।

এখন প্রশ্ন আসে, যদি ভবিষ্যতে কখনো কোনো আইনি উদ্যোগ নেওয়া হয়, তাহলে বিদেশে থাকা ব্যক্তিদের সহযোগিতা কীভাবে আসবে? যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের সম্পর্ক ঐতিহাসিকভাবে ঘনিষ্ঠ। প্রত্যর্পণ, আইনি সহায়তা, গোয়েন্দা সহযোগিতা—এসব কাঠামো তাত্ত্বিকভাবে সহজ। কিন্তু বাস্তবে এপস্টেইন ইস্যুতে এসব সহজ হবে—এমনটা মনে করার কারণ নেই। কারণ, এখানে মামলা হলে তা আর শুধু অপরাধের মামলা থাকবে না, হয়ে উঠবে ক্ষমতার মামলা। আর ক্ষমতার মামলা মানেই রাষ্ট্রগুলোর জন্য কূটনৈতিক অস্বস্তি।

(ওপরে বাঁ থেকে ডানে) ডোনাল্ড ট্রাম্প, জেফরি এপস্টেইন, (নিচে বাঁ থেকে ডানে) ইলন মাস্ক, বিল গেটস
ফাইল ছবি: রয়টার্স

এ পরিস্থিতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কণ্ঠস্বর হওয়া উচিত ছিল ভুক্তভোগীদের। কিন্তু তাঁদের মধ্যে এখন কাজ করছে প্রবল হতাশা ও ক্ষোভ। কারণ, যা প্রকাশিত হয়েছে, তা তাঁদের চোখে অসম্পূর্ণ। ভুক্তভোগীরা বলছেন, আরও বিপুল নথি এখনো অপ্রকাশিত আছে। তাঁরা এটাও দেখছেন, প্রশাসন ধীরে ধীরে, খণ্ড খণ্ডভাবে নথি ছাড়ছে।

এপস্টেইন ইস্যুতে এই কৌশল উল্টো কাজ করছে। কারণ, ধীরে ধীরে তথ্য ছাড়লে মানুষের মনে সন্দেহ জমে। মানুষ ভাবতে শুরু করে, আসলে কী লুকানো হচ্ছে? ষড়যন্ত্র তত্ত্ব তখন আর কেবল একশ্রেণির মানুষের বিনোদন থাকে না, তা মূলধারার আলোচনার অংশ হয়ে ওঠে।

ধীরগতিতে নথিগুলোকে প্রকাশ করা ক্ষতস্থান থেকে ব্যান্ডেজকে ধীরে ধীরে টানার মতো। এতে ব্যথা দীর্ঘ হয়, ক্ষোভ দীর্ঘ হয়, মনোযোগ দীর্ঘ হয়। একবারে সব প্রকাশ করলে হয়তো ক্ষতটা দ্রুত দেখা যেত, তারপর ধীরে ধীরে শুকাত। কিন্তু এভাবে টেনে টেনে প্রকাশ করলে ক্ষতটা রোজ নতুন করে জ্বলে ওঠে।

আরও পড়ুন

প্রশাসন যদি জনতার এই ক্ষোভকে গুরুত্ব না দেয়, যদি তারা পরিষ্কারভাবে না বলে যে বাকি নথি কখন প্রকাশিত হবে, তাহলে এপস্টেইন ইস্যু আরও বড় হয়ে উঠবে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা এটাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করবে আর সাধারণ মানুষ এটাকে দায়মুক্তির আরেকটা প্রমাণ হিসেবে ধরে নেবে।

এপস্টেইন নথির প্রকাশকে আদালতের ফলাফল দিয়ে বিচার করলে আমরা ভুল বুঝব। এটা মূলত ক্ষমতার প্রতি আস্থার সংকটের প্রতিফলন। বিচার বিভাগ নতুন অভিযোগ না আনলেও এই এপস্টেইন ইস্যু এখানেই থেমে যাবে না। কারণ, মানুষ এখন আর কেবল আদালতের রায় শুনতে চায় না, তারা দেখতে চায়, রায়গুলো ক্ষমতাধরদের চ্যালেঞ্জ করতে পারছে কি না!

  • এলেনা শর যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম সিপুরের জ্যেষ্ঠ সম্পাদক
    ডয়চে ভেলেকে দেওয়া ইংরেজি সাক্ষাৎকারের শ্রুতলিখনের অনুবাদ