বিষয়টা এ রকম যে ১০০ টাকার স্বর্ণমুদ্রা ঠিক ১০০ টাকার মূল্য পরিশোধে ব্যবহৃত হতো, যা কিনা বর্তমান সময়ে প্রচলিত কাগজি মুদ্রার ধারণার সম্পূর্ণ বিপরীত। যেমন ১০০ টাকার একটি কাগজের নোট কোনোভাবেই ১০০ টাকার মূল্য বহন করে না; বরং ১০০ টাকার একটি কাগজের নোট গ্রহণযোগ্য করে তোলার জন্য নির্ধারিত সংস্থা কর্তৃক আইন ও ডিক্রি জারির প্রয়োজন হয়।

এ রকম সংবিধিবদ্ধ আইনের কারণে প্রযোজ্য ক্ষেত্রে জনগণ বা ওই দেশের অধিবাসীরা কেউই এ রকম কাগজের নোটের বিনিময়ে দ্রব্য ও সেবা বিনিময়ে অস্বীকার করতে পারে না। বিষয়টি আরও সহজে বলা যায়, কোনো একজন কৃষক তার উৎপাদিত পণ্য, যেমন এক মণ ধান নিয়ে বাজারে গেল। এক মণ ধানের ব্যবহারিক উপযোগিতা রয়েছে। কারণ, ধান থেকে চাল হয় এবং সেই চালের ভাত আমাদের ক্ষুধা মেটায়। এখন ওই কৃষক ধানের বিনিময়ে মাছ, মাংস থেকে শুরু করে অন্যান্য পণ্য বা সেবা নিতে পারত। কিন্তু এক মণ ধানের বিনিময়ে কৃষক ১০০০ টাকার একটি নোট তখনই নেবে, যখন সে নিশ্চিত হবে যে ওই ১০০০ টাকার নোট দিয়ে দিয়ে মাছ–মাংসের মূল্য পরিশোধ সম্ভব এবং সবাই এ রকম কাগজের মুদ্রা বিনা বাক্য ব্যয়ে গ্রহণ করবে।

কাগজি মুদ্রা সবার কাছে‍ গ্রহণযোগ্য করার জন্যই শক্তিশালী আইনের দরকার হয় এবং ডিক্রি জারি করে বলা হয়, ‘চাহিবা মাত্র ইহার বাহককে...টাকা দিতে বাধ্য থাকিবে’। অর্থাৎ কাগজি মুদ্রার গায়ে অন্তর্নিহিত মূল্য থাকে না। কাগজি মুদ্রার মূল্য ডিক্রি এবং মুদ্রা ছাপানোর বিপরীতে রক্ষিত মূল্যবান সম্পদের পরিমাণ ও গুণগত মানের ওপর নির্ভরশীল।

কোনো দেশের সরকার বা সরকার নিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠান সেই দেশের মুদ্রানীতি ঘোষণা, পরিচালনা ও বাস্তবায়নের দায়িত্বে নিযুক্ত থাকে। মুদ্রানীতিতে অর্থের চাহিদার নিরিখে মুদ্রার জোগান যাতে বিঘ্নিত না হয়, তা দেখা হয়। চাহিদার তুলনায় মুদ্রার সরবরাহ বেশি হলে মুদ্রাস্ফীতি দেখা দেবে, যা প্রকারান্তরে মূল্যস্ফীতি ডেকে আনবে এবং মানুষের জীবনমান কমিয়ে কষ্টের কারণ হবে।

অন্যদিকে, প্রয়োজনের তুলনায় মুদ্রা সরবরাহ কম হলে উৎপাদন ব্যাহত হবে, কারণ উৎপাদক কাঁচামাল সংগ্রহ করতে পারবে না এবং শ্রমিকের মূল্য পরিশোধে অক্ষম হবে। সুতরাং, অর্থনীতিতে একটি নির্দিষ্ট সময়ে ঠিক কী পরিমাণ মুদ্রা সরবরাহ প্রয়োজন, তার কাম্য পরিমাণ ঠিক করতে মুদ্রানীতি–বিশেষজ্ঞরা হিমশিম খেয়ে থাকেন। এরূপ পরিস্থিতিতে অর্থনীতিবিদ ও মুদ্রানীতি–বিশেষজ্ঞরা অর্থনীতিতে প্রচলিত বিভিন্ন তত্ত্বের শরণাপন্ন হন এবং তা প্রয়োগের মাধ্যমে মুদ্রার সরবরাহ কাম্যস্তরে রাখতে চেষ্টা করেন।

সামষ্টিক অর্থনীতিতে মুদ্রার ‘বিনিময় সমীকরণ’ কোন দেশের অর্থ ব্যবস্থায় ঠিক কী পরিমাণ অর্থ সরবরাহ দরকার, তা নির্ধারণে খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি তত্ত্ব। মুদ্রার বিনিময় সমীকরণ তত্ত্বের মূল কথা হলো, একটি দেশে একটি নির্দিষ্ট সময়ে কত অর্থ দরকার, তা নির্ধারিত হয় তিনটি উপকরণ দ্বারা। উপকরণ তিনটি হচ্ছে মুদ্রার ভেলসিটি বা বেগ, প্রচলিত মূল্যস্তর ও সামষ্টিক আয়ের ওপর।

একটি নির্দিষ্ট সময়ে সামষ্টিক আয় অপরিবর্তিত থাকে, কিন্তু মূল্যস্তর নিয়ত পরিবর্তনশীল। এ কারণে মূল্যস্তরকে সামষ্টিক আয় দিয়ে গুণন করে এবং মুদ্রার ভেলসিটি বা বেগ দিয়ে ভাগ করে সেই ভাগফলের সমপরিমাণ মুদ্রা সরবরাহ করাই হচ্ছে ‘কাম্য স্তরের মুদ্রার জোগান’। মুদ্রার জোগান মূলত সরবরাহ সংস্থা বা দপ্তর-অধিদপ্তর দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হলেও মুদ্রার চাহিদা সরবরাহ সংস্থা নিয়ন্ত্রণ করতে বা বেঁধে দিতে পারে না। বিস্তারিতে যাওয়ার আগে মুদ্রার ভেলসিটি বা বেগের বিষয়টি ব্যাখ্যা করা যাক।

মুদ্রার ভেলসিটি মূলত মুদ্রার হাতবদলের হার। উদাহরণ দিয়ে বোঝালে ধরা যাক, একজন ব্যক্তি দিনের শুরুতে ১০০ টাকার একটি নোট নিয়ে বাড়ি থেকে বের হলো। ১০০ টাকা দিয়ে সে রিকশায় চড়ে অফিসে গেল এবং ভাড়া বাবদ ১০০ টাকা পরিশোধ করল। রিকশাওয়ালা সেই ১০০ টাকা দিয়ে দুপুরে খাবার কিনে খেল। খাবারের দোকানদার এই ১০০ টাকা দিয়ে বিকেলে চাল কিনল ইত্যাদি ইত্যাদি।

অর্থাৎ সকালের ওই সুনির্দিষ্ট ব্যক্তির পকেট থেকে খরচ হওয়া ১০০ টাকার একটি নোট উদাহরণস্বরূপ তিনবার হাতবদল হয়ে ৩০০ টাকার সমপরিমাণ পণ্য ও সেবামূল্য পরিশোধে সক্ষম হয়েছে। এই উদাহরণে মুদ্রার ভেলসিটি হচ্ছে তিন।
সরকার ও মুদ্রার সরবরাহকারী সংস্থার অন্যতম চাওয়া থাকে মুদ্রার ভেলসিটি বা বেগ বাড়ানো।

একটি নির্দিষ্টসংখ্যক মুদ্রা যত বেশি হাতবদল হবে, অর্থনীতি তত বেশি গতিশীলতা পাবে। দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের (সেপ্টেম্বর ৯, ২০২২) তথ্যমতে, ২০২২ সালের জুনে বাংলাদেশের প্রচলিত মুদ্রার পরিমাণ প্রায় ২ দশমিক ৫৫ ট্রিলিয়ন টাকা, যার শতকরা ৯২ ভাগ হচ্ছে ১০০০ ও ৫০০ টাকার নোট। এ দেশে প্রচলিত মুদ্রা ২০০, ১০০, ৫০, ২০, ১০, ৫, ২ ও ১ টাকার নোট এবং অন্যান্য ধাতব মুদ্রামানের সমষ্টি শতকরা ৮ ভাগ মাত্র। প্রচলিত মুদ্রা নোটের বিন্যাসে এটা স্পষ্ট যে মানুষের পণ্য ও সেবার চাহিদা মেটাতে তুলনামূলক বড় নোটের প্রয়োজন পড়ছে। সে ক্ষেত্রে মুদ্রার বেগ হ্রাসমান হওয়ার সমূহ কারণ রয়েছে।

মানুষের মধ্যে নগদ টাকা হাতে রাখার ঝোঁক বৃদ্ধি পেলে নিঃসন্দেহে মুদ্রার ভেলসিটি বা বেগ কমে যাবে। তাহলে প্রশ্ন জাগতে পারে, মানুষ কেন নগদ টাকা হাতে রাখবে? অর্থনীতিবিদ জে এম কেইন্সের সুবিখ্যাত ‘নগদ পছন্দ তত্ত্ব’ অনুযায়ী মানুষ তিন কারণে নগদ টাকা হাতে রাখবে। এক, নিত্যব্যবহারের জন্য; দুই, ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা বৃদ্ধি পেলে বা আশঙ্কা থাকলে এবং তিন, অল্প লাভ বা মুনাফার সুযোগ থাকলে সে ক্ষেত্রে বিনিয়োগের জন্য।

বর্তমানে বাংলাদেশের অর্থনীতির চরিত্র বিশ্লেষণে দেখা যায়, মানুষের নিত্যব্যবহারের জন্য নগদ টাকার চাহিদা বেড়ে গেছে। বিষয়টি প্রচলিত মূল্যস্তরের অস্বাভাবিক উল্লম্ফন বা মুদ্রাস্ফীতির জন্যও বটে। যেমন কয়েক মাস আগেও যে তেলের দাম ছিল লিটারপ্রতি ৮৯ টাকা, এখন তা ১৩০ টাকা। যে কারণে আগে ১০ লিটার তেল কিনতে কোনো গাড়ির মালিককে ৮৯০ টাকা পকেটে রাখলেই চলত, এখন সমপরিমাণ তেলের জন্য তাকে ১ হাজার ৩০০ টাকা হাতে রাখতে হচ্ছে। ৫০ টাকার পাউরুটির মূল্য ১০০ টাকা হওয়ার কারণে ক্রেতাকে দ্বিগুণ টাকা হাতে রাখতে হচ্ছে। চাল, ডাল, লবণ, সাবান, শ্যাম্পু, চিনি, তরিতরকারি, মাছ, মাংস, বাসভাড়া, কাগজ, কলম, ওষুধের মূল্য, স্কুল–কলেজ–ডাক্তারের ফি ইত্যাদি সব ক্ষেত্রেই মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষকে পূর্বের তুলনায় বেশি বেশি নগদ টাকা হাতে রাখতে হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে মার্কিন ডলার মূল্য ধরে রাখতে ব্যর্থ হওয়ায় দেশে দেশে শুরু হওয়া মুদ্রাস্ফীতির আগুনে ঘি ঢালছে। সেই সঙ্গে সুযোগসন্ধানী দেশি–বিদেশি ব্যবসায়ীদের দুষ্টচক্র তো রয়েছেই, যারা জনগণকে জিম্মি করে কৃত্রিম সরবরাহসংকট সৃষ্টির মাধ্যমে মুনাফা লুটে থাকে।

ভবিষ্যৎ নিয়ে মানুষের শঙ্কা ও অনিশ্চয়তা সবই বেড়ে গেছে। একদিকে মূল্যস্ফীতির কশাঘাত, অন্যদিকে দেশে দেশে চলমান যুদ্ধ, সেসব যুদ্ধে বহুপক্ষের অংশগ্রহণের আশঙ্কা, করোনা মহামারি–পরবর্তী দেশে দেশে মুদ্রাস্ফীতি, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ডামাডোলে মানুষের ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তায় ভরে উঠছে।

এসব কারণে ভবিষ্যতে মানুষের জীবনযাপন, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা, বাসস্থান প্রভৃতি ক্ষেত্রে খরচের প্রাক্কলন করা দুরূহ হয়ে উঠেছে। বিলাসী তো বটেই, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবাসামগ্রীর দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সরবরাহ চেইন ভেঙে পড়ার উপক্রম। অতি প্রয়োজনীয় প্রাথমিক জ্বালানি, তথা তেল-গ্যাসের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ প্রাপ্তির অনিশ্চয়তা তো কাটেইনি, উপরন্তু বিশ্বব্যাপী খাদ্যসংকটের পরিপ্রেক্ষিত বিরাজ করছে এবং দুর্ভিক্ষের পূর্বাভাস পাওয়া যাচ্ছে।

আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে মার্কিন ডলার মূল্য ধরে রাখতে ব্যর্থ হওয়ায় দেশে দেশে শুরু হওয়া মুদ্রাস্ফীতির আগুনে ঘি ঢালছে। সেই সঙ্গে সুযোগসন্ধানী দেশি–বিদেশি ব্যবসায়ীদের দুষ্টচক্র তো রয়েছেই, যারা জনগণকে জিম্মি করে কৃত্রিম সরবরাহসংকট সৃষ্টির মাধ্যমে মুনাফা লুটে থাকে। এরূপ বাস্তবতায় মানুষ ভবিষ্যতের নগদ টাকা সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছে এবং বেশি বেশি নগদ টাকা হাতে রাখছে।

নগদ টাকা হাতে রাখার তৃতীয় কারণ হলো, মানুষ কিছু লাভের আশায় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ করে স্বল্প সময়ের জন্য। এ ক্ষেত্রে মানুষ তাদের বিনিয়োগকে সুযোগ ব্যয়ের সঙ্গে তুলনা করে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, দেশে প্রচলিত সুদের হার বেশি হলে মানুষ সঞ্চয়ে উৎসাহিত হয় এবং সুদের হার কম হলে সঞ্চয় তথা বিনিয়োগে নিরুৎসাহিত হয়। বাংলাদেশে বর্তমানে প্রচলিত সঞ্চয় ও বিনিয়োগে সুদের হার নিম্নগামী।

একদিকে সরকার সঞ্চয়পত্রে সুদের হার কমিয়েছে, অন্যদিকে ব্যাংকব্যবস্থায় সুদের হার নির্দিষ্ট করে দিয়েছে, যেখানে সাধারণ ও স্বল্পমেয়াদি সঞ্চয়কারীরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আমানতের সুদের হার ৬ শতাংশের মাত্রা বেঁধে দেওয়ায় ব্যাংক ৬ শতাংশের নিচে সুদ দিচ্ছে। আবার মূল্যস্ফীতি সমন্বয়ের কথা বলা হলেও তা আর বিবেচনায় আনা হচ্ছে না। নামমাত্র সুদের হার ৫ বা ৬ শতাংশ এবং মুদ্রাস্ফীতি দুই অঙ্কের বেশি হওয়ায় জনগণের প্রকৃত সুদের হার ঋণাত্মক।

সুতরাং স্বল্প পুঁজির মানুষ এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীরা ব্যাংক বা অন্য কোন ক্ষেত্রে স্বল্পমেয়াদি বিনিয়োগের মাধ্যমে অল্প কিছু লাভের আশা ছেড়েই দিয়েছে। তারা বাধ্য হয়ে নগদ টাকা হাতে রাখছে।

মানুষের নগদ টাকা হাতে রাখার প্রবণতা কমানো না গেলে মুদ্রার ভেলসিটি বা বেগ ব্যাহত হবে। সে ক্ষেত্রে বাজারে মুদ্রাসংকট দেখা যেতে পারে, যা দেশের বিদ্যমান নাজুক বিনিয়োগ পরিবেশকে আরও নাজুক করে তুলতে পারে। সে পরিস্থিতিতে মূলধন ও শ্রমবাজারে অস্থিরতা এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দিতে পারে।

  • ড. শহীদুল জাহীদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং অ্যান্ড ইনস্যুরেন্স বিভাগের অধ্যাপক।