২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থান শুধু এক স্বৈরাচারী সরকারের পতন ঘটায়নি, এই আন্দোলন আমাদের দেশের কতগুলো মৌলিক বিষয় ও চিন্তাধারাকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে আমাদের সংবিধান নিয়ে, আমাদের জাতীয় সংগীত নিয়ে এবং সর্বোপরি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে। এই মুক্তিযুদ্ধ কি একজন বিশেষ ব্যক্তি বা একটি রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বে সংঘটিত হয়েছিল, নাকি এটি কোনো বিদেশি শক্তির অনুপ্রেরণা ও সহায়তায় হয়েছিল?
সংবিধান বা দেশের শাসনকাঠামো নিয়ে প্রশ্ন তোলা কিংবা এর সংস্কার নিয়ে দাবি তোলা স্বাভাবিক, বিশেষ করে যখন গণ–আন্দোলনের মাধ্যমে একটি অগণতান্ত্রিক সরকারের পতন ঘটে। কিন্তু দেশের ইতিহাস, যার ওপর ভিত্তি করে একটি রাষ্ট্র স্বাধীন হয়েছে, সে রকম একটি মৌলিক বিষয় নিয়ে বিতর্ক দেশের অস্তিত্বকেই নাড়িয়ে দেয়।
তখন তা সব সংস্কারের দাবিকে ছাড়িয়ে যায়। কী কারণে মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল, কেন বাংলাদেশ পাকিস্তানের অংশ হিসেবে থাকতে চায়নি এবং কেন এ যুদ্ধে এত মানুষ জীবন দিয়েছিল, কারা এই যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন বা নেতৃত্ব দিয়েছিলেন—এসব কোনো বিতর্কের বিষয় হওয়ার কথা ছিল না।
এই যুদ্ধ যে শুরু ও শেষ করেছিল বাংলাদেশের জনগণ নিজেদের অধিকার আদায়ের জন্য, এ বিষয়ে কারও মনে সন্দেহ থাকার কথা নয়। এই যুদ্ধ কোনো বিদেশি শক্তির প্ররোচনা বা ষড়যন্ত্র ছিল না, তা নিয়েও প্রশ্ন ওঠার কথা নয়। অথচ স্বাধীনতার পাঁচ দশক পর এসে সেই স্বাধীনতার প্রকৃত ইতিহাস নিয়ে বিতর্ক হচ্ছে। স্বাধীনতার নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে। আজকের প্রজন্মের মধ্যে এ বিষয়ে বিভ্রান্তি তৈরি করা হচ্ছে। এই বিভ্রান্তি কি কেবল রাজনৈতিক কারণে, নাকি আমাদের সবার সামষ্টিক ব্যর্থতার ফল।
২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের কয়েক মাস পর আমার এক তরুণ আত্মীয়র সঙ্গে বাংলাদেশের যুব আন্দোলন এবং শেখ হাসিনার টানা ষোলো বছরের শাসন পতনের কারণ নিয়ে একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ আলোচনা হয়েছিল। ওই আত্মীয় স্বাধীনতার কয়েক বছর পর জন্মেছে, জীবনের একটি বড় অংশ বাংলাদেশে ছাত্র ও পেশাজীবী হিসেবে কাটিয়েছে, এরপর তার সমবয়সীদের মতোই ভালো সুযোগের সন্ধানে দেশ ছেড়েছে।
সে শুনেছে শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন এবং দেশের প্রথম নেতা ছিলেন। আবার এটাও শুনেছে, তাঁর সরকার দুর্নীতিগ্রস্ত ছিল এবং সে কারণেই তাঁকে অভ্যুত্থানে সরিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু শেখ মুজিব কীভাবে দীর্ঘদিন ধরে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বাঙালিদের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন এবং কীভাবে সেই সংগ্রাম শেষ পর্যন্ত দেশের স্বাধীনতার পথ তৈরি করেছিল, সে বিষয়ে তার জানাশোনা ছিল খুবই সামান্য।
বরং সে আমাকে একেবারে নিরীহ ভঙ্গিতে জিজ্ঞাসা করেছিল, শেখ মুজিব কি সত্যিই বাংলাদেশকে স্বাধীন করতে পেরেছিলেন? কারণ, ভারত পাকিস্তানকে ভাঙতে চেয়েছিল, যেহেতু পাকিস্তান ছিল ভারতের শত্রু।
বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গিয়েছিলাম যে এমন এক তরুণ, যার বাবা–মা ও দাদা–দাদিরা ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনীর নৃশংসতা প্রত্যক্ষ করেছেন এবং ভুক্তভোগী হয়েছেন, সে কীভাবে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে এমন এক বিপরীত বয়ান ধারণ করতে পারে। সে কি বাংলাদেশ ছাড়ার পর এমন মানুষের প্রভাবে পড়েছে, যারা বাংলাদেশের বিরোধিতা করত, নাকি স্কুলে তাকে ভুল শেখানো হয়েছিল।
পরবর্তী আলোচনায় বুঝতে পারলাম, বিষয়টি এর কোনোটিই নয়। সে বিভ্রান্ত হয়েছে সময়ের রাজনীতি এবং তার পরবর্তী রাজনীতির কারণে। পাশাপাশি আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার ব্যর্থতার ফলে, যে শিক্ষাব্যবস্থা স্বাধীনতার পর থেকেই ইতিহাস বিকৃতির শিকার। এই তরুণের চিন্তাভাবনায় কোনো ব্যক্তিগত দোষ ছিল না। সে কেবল যা শুনেছে, তা–ই বলছিল। তার কৈশোরে যে ভুল তথ্য শেখানো হয়েছে, তারই পুনরাবৃত্তি করছিল।
ভুল তথ্যের স্তূপের নিচে চাপা পড়ে সে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস দেখতে পায়নি। সে বুঝতে পারেনি কেন বাঙালিদের ন্যায়বিচার, সমতা এবং নিজেদের নেতা বেছে নেওয়ার অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য যুদ্ধ করতে হয়েছিল। কেন নিজেদের মতো করে বাঁচার অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য আরেক শক্তির অধীনতা প্রত্যাখ্যান করতে হয়েছিল?
বাঙালিরা কেন পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে স্বাধীনতা অর্জন করেছিল এবং কেন সেই যুদ্ধ ছিল সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র, কোনো ষড়যন্ত্র বা বিদেশি শক্তির ইন্ধনের ফল নয়—এই প্রশ্ন আবার সামনে এসেছে। এই নতুন বয়ানসহ কিছু দাবি জুলাই আন্দোলনের ফল হিসেবে উঠে এসেছে, যা সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।
এসব দাবির মধ্যে ছিল সংবিধান পরিবর্তন, জাতীয় সংগীত পরিবর্তন এবং বঙ্গবন্ধুর নামে নামকরণ করা প্রতিষ্ঠান ও স্থাপনার পরিবর্তন। উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে বোঝা কঠিন ছিল এসব দাবি কতটা গভীর বা বিস্তৃত এবং এগুলো দায়িত্বশীল রাজনৈতিক মহল থেকে এসেছে কি না।
এটি পরিকল্পিত কৌশল ছিল, নাকি কেবল তরুণদের জোরালো দাবির কাছে নতি স্বীকার, যাই হোক অন্তর্বর্তী সরকার প্রায় এক ডজন সংস্কার কমিশন গঠন করে পরিস্থিতির উত্তাপ কমিয়ে আনে। এসব দাবি পর্যালোচনা করা হয় এবং কমিশনগুলো তাদের বিবেচিত সুপারিশ দেয়, যা এখনো বাস্তবায়নের অপেক্ষায়।
আমরা যখন অপেক্ষা করছি দাবিগুলোর নিষ্পত্তি এবং সংবিধান নিয়ে কী করা হবে, তখন সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে আমাদের স্বাধীনতার বয়ান। এটি কি কেবল ২০২৪ সালের জুলাইয়ের মতো একটি আন্দোলন ছিল, নাকি এটি ছিল বাঙালিদের দীর্ঘ সংগ্রামের ফল, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও জাতিগত নিপীড়ন থেকে মুক্তির সংগ্রাম, একটি সামরিক জান্তার সহায়তাপ্রাপ্ত সরকারের বিরুদ্ধে সংগ্রাম। যে সংগ্রাম দুই দশকের বেশি সময় ধরে চলেছিল এবং তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রতিটি শ্রেণির মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় গড়ে উঠেছিল। আমরা কীভাবে এমন অবস্থায় পৌঁছালাম, যেখানে আমরা আমাদের স্বাধীনতার প্রকৃত ইতিহাস বলতে পারি না, সেই সংগ্রামের নায়কদের কথা বলতে পারি না, তাঁদের ত্যাগের কথা বলতে পারি না।
এর পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে। প্রথমত আবেগগত দূরত্ব। দ্বিতীয়ত স্বাধীনতার ইতিহাসের রাজনৈতিক ব্যবহার। তৃতীয়ত আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার অসংগতি ও সততার অভাব। এগুলো একটু বিস্তারিতভাবে বলা প্রয়োজন।
প্রথমত আবেগগত দূরত্ব। ১৯৭১ সালের পর জন্ম নেওয়া প্রজন্মের কাছে যুদ্ধের কোনো প্রত্যক্ষ স্মৃতি নেই। তাদের স্মৃতি দ্বিতীয় বা তৃতীয় হাতের, যা অনেক সময় যান্ত্রিক। তুলনা করা যায় তাদের বাবা–মা ও দাদা–দাদিদের অভিজ্ঞতার সঙ্গে, যাঁরা প্রিয়জন হারিয়েছেন, ভয় ও বাস্তুচ্যুতির মধ্য দিয়ে জীবন কাটিয়েছেন। যন্ত্রণাহীন স্মৃতি একধরনের বিমূর্ততায় রূপ নেয়।
দ্বিতীয়ত ১৯৭১ সালের রাজনৈতিকীকরণ। মুক্তিযুদ্ধকে রাজনৈতিক দলগুলো, বিশেষ করে আওয়ামী লীগ, নিজেদের সম্পত্তি হিসেবে দাবি করেছে। ১৯৭১–এর চেতনা রাজনৈতিক আনুগত্যের পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে। এই চেতনাকে একদলীয় পরিচয়ের সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে, পুরো জনগোষ্ঠীর পরিচয় হিসেবে নয়। ক্ষমতাসীন প্রতিটি দল তাদের অনুগতদের পুরস্কৃত করেছে এবং অন্যদের প্রান্তে ঠেলে দিয়েছে। যুদ্ধাপরাধের বিচার নৈতিকভাবে অপরিহার্য হলেও তা রাজনৈতিক রং ধারণ করেছে।
তৃতীয়ত এবং সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় শিক্ষা। যারা মুক্তিযুদ্ধ প্রত্যক্ষ করেনি, তারা শাসক দলের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য অনুযায়ী সাজানো গল্প শুনেছে। প্রতিটি সরকার ক্ষমতায় এসে পাঠ্যবই বদলেছে, স্বাধীনতার বয়ানকে নিজেদের লক্ষ্য অনুযায়ী সাজিয়েছে। ১৯৭৫–এর পর শেখ মুজিবের ভূমিকা খাটো করা হয় এবং জিয়াউর রহমানকে বড় করে দেখানো হয়। এরশাদের সময় থেকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর নৃশংসতা কমিয়ে দেখানো শুরু হয়। চলতি বছরের শুরু থেকে চালু হওয়া নতুন পাঠ্যবইয়ে বলা হয়েছে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন শেখ মুজিব নয়, জিয়াউর রহমান। অথচ শেখ হাসিনার শাসনামলে পাঠ্যবইয়ে শেখ মুজিবকে জাতির পিতা এবং স্বাধীনতার একমাত্র নায়ক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছিল।
তবু বর্তমান প্রজন্মের বিভ্রান্তি নিয়ে বিশেষজ্ঞদের কিছু পর্যবেক্ষণে আশার আলো রয়েছে। তরুণদের বিভ্রান্তি ১৯৭১ অস্পষ্ট বলে নয়, বরং সত্যকে রাজনীতি, অবহেলা ও পরিচয় সংকটের নিচে চাপা দেওয়ার ফল। তাদের স্কুলে যা শেখানো উচিত তা হলো, ১৯৭১ ছিল গণহত্যা ও মুক্তিযুদ্ধের বছর। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী পরিকল্পিত নৃশংসতা চালিয়েছিল। স্থানীয় সহযোগীরা ছিল এবং তাদের ভূমিকা স্বীকার করতে হবে। ভারত কৌশলগত কারণে হস্তক্ষেপ করেছিল, নিছক পরোপকারের জন্য নয়। স্বাধীনতা ভালো শাসন নিশ্চিত করেনি।
তরুণেরা ১৯৭১–কে প্রত্যাখ্যান করে না, তারা প্রত্যাখ্যান করে যেভাবে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস শেখানো হয়েছে, ব্যবহার করা হয়েছে এবং রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে প্রয়োগ করা হয়েছে। জুলাই ২০২৪–এর আন্দোলন একটি নতুন, সম্ভবত পুনর্গঠিত বাংলাদেশের সূচনা করেছে। বহুল প্রত্যাশিত নির্বাচন একটি নতুন সরকার আনবে, যে সরকার এ দেশের জন্মের স্বপ্ন বাস্তবায়নে সক্ষম হবে বলে আশা করা যায়। মুক্তিযুদ্ধ ছিল বাস্তব এবং এতে অংশ নিয়েছিল পুরো দেশ, কেবল একজন মানুষ বা একটি দল নয়।
জিয়াউদ্দিন চৌধুরী সাবেক সরকারি কর্মকর্তা ও লেখক
*মতামত লেখকের নিজস্ব
