নির্বাচিত সরকার কথা রাখবে তো?

বাবার জানাজায় অংশ নিতে প্যারোলে মুক্তি পেয়েছিলেন নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের নেতা রাকিবুল ইসলাম। পায়ে ডান্ডাবেড়ি পরা অবস্থায় জানাজায় অংশ নেন তিনি।ফাইল ছবি

নব্বই ও শূন্য দশকে ক্ষমতার পালাবদলের পর বাংলাদেশে একটা অভিন্ন বিষয় দেখা যেত। নতুন সরকার এসে পূর্ববর্তী সরকারের আমলে করা রাজনৈতিক মামলা প্রত্যাহারের জন্য উচ্চপর্যায়ের কমিটি করে নেতা-কর্মীদের ছাড়ানোর ব্যবস্থা করত। কিন্তু ২০০৯ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ একটানা ক্ষমতায় থাকায় অতীত সরকারের মামলা তুলে নিতে নতুন করে আর কমিটি হয়নি। তবে মামলা–বাণিজ্য চলেছে। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও সেই মামলা–বাণিজ্য বন্ধ হয়নি।

ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের নামে যে হাজার হাজার মামলা করেছিল, তার বড় অংশ ছিল গায়েবি মামলা। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে সেটি রূপ নেয় ভুয়া ও পাইকারি মামলায়। কাউকে ধরে পুরোনো মামলার বেনামি আসামিদের তালিকায় তাঁর নাম ঢুকিয়ে দেওয়া হতো।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে আগের সরকারের বেশির ভাগ মামলা তুলে নিলেও কিছু মামলা থেকে যায়। বিএনপি ক্ষমতায় এসে সেসব মামলাও তুলে নেওয়ার উদ্যোগ নেয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়, আওয়ামী লীগ আমলে বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা রাজনৈতিক হয়রানিমূলক আরও ১ হাজার ২০২টি মামলা প্রত্যাহারের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

এর আগে ৮ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের চার দিন আগে আইন মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছিল, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিএনপি, জামায়াত, হেফাজতে ইসলাম, গণ অধিকার পরিষদসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে করা রাজনৈতিক হয়রানিমূলক ২৩ হাজার ৮৬৫টি মামলা প্রত্যাহারের সুপারিশ করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। এর ফলে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ হয়রানিমূলক মামলা থেকে অব্যাহতি পেয়েছেন।

এটা তো হলো একজন জনপ্রতিনিধির কথা; কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে যে হাজার হাজার পেশাজীবীর বিরুদ্ধে ভুয়া ও প্রতিহিংসামূলক মামলা দেওয়া হয়েছে, তার প্রতিকার কী?

কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে করা মামলাগুলো এখনো প্রত্যাহার করা হয়নি। ওই সরকারের নীতিনির্ধারকেরা এই যুক্তি দেখাতেন যে মামলাগুলো পুলিশ করেনি, করেছেন ভুক্তভোগীরা; কিন্তু অনুসন্ধানে জানা গেছে, অনেক মামলার বাদীরা জানেন না কীভাবে মামলা হয়েছে। স্থানীয় থানা-পুলিশের সহায়তায় স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনীতিকেরা এসব মামলা করিয়েছেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বাদীর সই নেওয়া হয়েছে মাত্র। তাঁরা আসামিদের চেনেনও না।

কেবল ক্ষমতাচ্যুত রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মী নন; সাংবাদিকসহ বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার বহু মানুষ এ ধরনের মামলার শিকার। তাঁদের কেউ কেউ কারাবন্দী, কেউ কেউ জামিনে আছেন। আবার গ্রেপ্তার হওয়ার ভয়ে পালিয়ে থাকা পেশাজীবীর সংখ্যাও কম নয়। এই প্রেক্ষাপটে সম্পাদক পরিষদ গত ২৫ ফেব্রুয়ারি এক বিবৃতিতে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে করা মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলাগুলো দ্রুত প্রত্যাহার করতে নতুন সরকারের কাছে আহ্বান জানিয়েছে।

সম্পাদক পরিষদের ভাষ্যমতে, অন্তর্বর্তী সরকার একাধিকবার সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে হওয়া মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলাগুলো খতিয়ে দেখে মিথ্যা ও হয়রানিমূলকগুলো প্রত্যাহারে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিলেও কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি হয়নি বলে সম্পাদক পরিষদের বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।

অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে কীভাবে অসত্য মামলা করে রাজনীতিকদের হয়রানি করা হতো, তার জ্বলন্ত উদাহরণ নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভী। তাঁর বিরুদ্ধে ডজনখানেক হত্যা মামলা করা হয়েছে। চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানের পর তাঁর বিরুদ্ধে কোনো মামলা করা হয়নি।

যখন সংবাদমাধ্যমে খবর বের হলো সেলিনা হায়াৎ আইভী ‘পরিশীলিত’ আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে আসতে পারেন, তখনই একের পর এক মামলা দিয়ে তাঁকে জেলে পোরা হয়। একটি মামলায় তিনি জামিন পান তো আরেকটি মামলায় তাঁর নাম ঢোকানো হয়। সর্বশেষ খবর হলো বৃহস্পতিবার হত্যার অভিযোগসহ পৃথক পাঁচ মামলায় তাঁকে ছয় মাসের অন্তর্বর্তীকালীন জামিন দিয়েছেন হাইকোর্ট।

গত বছরের ৯ নভেম্বর জামিন পান কারাবন্দী সেলিনা হায়াৎ আইভী। আইভীর আইনজীবী মোতাহার হোসেন সাজু প্রথম আলোকে বলেন, ‘যেদিন হাইকোর্ট থেকে জামিন পান, সেদিনই আরও পাঁচ মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন করা হয়, যা গত বছরের ১৮ নভেম্বর মঞ্জুর হয়।’

আইনজীবী মোতাহার হোসেন আরও বলেন, ‘এই পাঁচ মামলার এজাহারে আইভীর নাম নেই, তিনি দীর্ঘদিন ধরে কারাগারে আছেন, তদন্তেরও কোনো অগ্রগতি নেই—এসব যুক্তিতে আইভীর জামিন চাওয়া হয়। শুনানি নিয়ে হাইকোর্ট রুল দিয়ে আইভীকে ছয় মাসের অন্তর্বর্তীকালীন জামিন দিয়েছেন। তবে অপর পাঁচ মামলায় তাঁর জামিনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের আবেদন শুনানির অপেক্ষায়, তাই এখনই তিনি কারামুক্ত হচ্ছেন না।’

রাষ্ট্রপক্ষ হাইকোর্টের এই রায়ও মেনে নেয়নি এবং এর বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়ার কথা ভাবছে। অর্থাৎ সেলিনা হায়াৎ আইভীকে একজন ‘দুর্ধর্ষ অপরাধী’ হিসেবেই গণ্য করে তাঁকে জামিন থেকে বঞ্চিত করছেন। যে আইভী নারায়ণগঞ্জের সন্ত্রাসী-গডফাদারদের বিরুদ্ধে তিন দশকের বেশি সময় ধরে সংগ্রাম করেছেন, সফলভাবে তিন মেয়াদে সিটি করপোরেশন চালিয়েছেন, তাঁর বিরুদ্ধে যদি এ রকম হত্যা মামলা হয়, তাহলে আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার কোথায় থাকে?

এটা তো হলো একজন জনপ্রতিনিধির কথা; কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে যে হাজার হাজার পেশাজীবীর বিরুদ্ধে ভুয়া ও প্রতিহিংসামূলক মামলা দেওয়া হয়েছে, তার প্রতিকার কী? ডেইলি স্টার–এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, কেবল ২৬৬ জন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে হত্যা বা হত্যাচেষ্টা মামলা দেওয়া হয়েছে। তাঁদের মধ্যে আটক আছেন বেশ কয়েকজন।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ অন্তর্বর্তী সরকারের সময় যেসব হয়রানিমূলক ও অসত্য মামলা হয়েছে, সেগুলো যাচাই–বাছাই করে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলেছেন। এটা আশাব্যঞ্জক। তবে সম্পাদক পরিষদের বিবৃতি উদ্ধৃত করে বলতে চাই, অন্তর্বর্তী সরকার কথা রাখেনি। নির্বাচিত সরকার নিশ্চয়ই রাখবে।

  • সোহরাব হাসান সাংবাদিক ও কবি

  • মতামত লেখকের নিজস্ব