১৪০ কোটি মানুষের দেশ ভারত বিশ্বকাপে নেই কেন

কেরালায় লিওনেল মেসি ও ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর বিশাল কাটআউট।ছবি: সংগৃহীত

ফিফা বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার পর থেকে আবার সেই পুরোনো আক্ষেপ সামনে এসেছে—ভারত কি কখনো ‘বিশ্বের সবচেয়ে বড় শো’-তে খেলতে পারবে?

ভারতের জাতীয় ফুটবল দলকে বলা হয় ‘ব্লু টাইগার্স’। তাদের পথচলা সম্পর্কে যাঁরা দীর্ঘদিন খোঁজখবর রাখেন, তাঁরা জানেন—এই দল এখনো এশিয়া অঞ্চলের বাছাইপর্বের প্রাথমিক ধাপও ঠিকভাবে পেরোতে পারেনি।

আশ্চর্যের বিষয় হলো, বিশ্বকাপ নিয়ে ভারতীয় ফুটবলপ্রেমীদের আগ্রহ কিন্তু কম নয়। পশ্চিমবঙ্গ, কেরালা, গোয়া—এমন অনেক ফুটবল–পাগল রাজ্যে বিশ্বকাপকে ঘিরে উৎসবের মতো পরিবেশ তৈরি হয়। এমনকি মাঠে না থাকলেও ভারত থেকে অনেক সাংবাদিক সরাসরি বিশ্বকাপ কাভার করতে যান।

চারটি বিশ্বকাপ কাভার করেছেন, এমন একজন অভিজ্ঞ ভারতীয় ফুটবল সাংবাদিক মজা করে বলছিলেন, ‘প্রেসবক্সে অনেকেই এখনো জিজ্ঞাসা করেন, “ভারত কি সত্যিই ফুটবল খেলে?” তাঁদের কাছে ভারত মূলত ক্রিকেটের দেশ হিসেবেই পরিচিত।

আরও পড়ুন

শুধু ভারত নয়, বিশ্বের দ্বিতীয় জনবহুল দেশ চীনও বিশ্বকাপে জায়গা করতে পারেনি। তবে এই দুই বড় বাজারের গুরুত্ব ফিফা ভালোভাবেই বোঝে। তাই সম্প্রতি ভারতে বড় ধরনের মিডিয়া স্বত্ব বিক্রির জন্য বিশেষ দলও পাঠিয়েছে।

তাহলে কি ভারতের জন্য বিশ্বকাপে খেলা সব সময়ই দূরের স্বপ্ন হয়ে থাকবে?

ভারতের সাবেক অধিনায়ক এবং দেশের অন্যতম বড় ফুটবল তারকা বাইচুং ভুটিয়া মনে করেন, এটা অসম্ভব নয়—তবে সহজও নয়। তাঁর মতে, ভারত অবশ্যই বিশ্বকাপে খেলতে পারে, কারণ অসম্ভব কিছু নেই।

এশিয়ার দলগুলোর জন্য এখন বিশ্বকাপে জায়গা আরও বেড়েছে। আগে যেখানে কম ছিল, এখন ৪৮ দলের ফরম্যাটে এশিয়া থেকে প্রায় ৮ টি দল খেলার সুযোগ পাচ্ছে। উজবেকিস্তান, জর্ডানের মতো দলও এখন বিশ্বকাপে জায়গা করে নিচ্ছে।

তবে ভুটিয়ার মতে, শুধু সুযোগ থাকলেই হবে না—এর জন্য অনেক কঠোর পরিশ্রম করতে হবে। তিনি আরও বলেন, ভারতের মতো বড় দেশে ফুটবল প্রতিভার কোনো অভাব নেই।

ভারতের জম্মু ও কাশ্মীরের রাজধানী শ্রীনগরের একটি স্টেডিয়ামে ফুটবল খেলছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
ছবি: এএফপি

ভুটিয়া বলেন, এখানে মূল সমস্যা প্রতিভার নয়; বরং সঠিক ব্যবস্থা বা ইকোসিস্টেমের অভাব। তাঁর মতে, ভারতে ফুটবলের জন্য কোনো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে সিরিয়াস কোনো তৃণমূল (গ্রাসরুট) কর্মসূচি নেই। অথচ এটি বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় দলগত খেলা। তাই ফল পেতে সময় লাগবে।

৭৮ বছর বয়সী শ্যাম থাপাও একই কথা বলেন। ১৯৭০ সালের এশিয়ান গেমসে ভারতের ব্রোঞ্জ জয়ে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন।

এটি দেশের সর্বশেষ বড় মহাদেশীয় সাফল্য। তাঁর মতে, টেকসই গ্রাসরুট বা তৃণমূল পর্যায়ের কর্মসূচি খুব জরুরি। বেশি বেশি শিশুকে ফুটবলে আনা দরকার।

তাঁর কণ্ঠে বিরক্তির ছাপও ছিল স্পষ্ট। তিনি বলেন, এখন মধ্যবিত্ত ও উচ্চমধ্যবিত্ত পরিবারের অভিভাবকেরা তাঁদের সন্তানদের ফুটবল থেকে সরিয়ে ক্রিকেটের দিকে নিয়ে যাচ্ছেন। তিনি জানান, তিনি নিজেও বহু বছর ধরে একটি যুব একাডেমি চালান। তাঁর অভিজ্ঞতা হলো—যত বেশি শিশু ফুটবলে আসবে, তত বেশি ভালো প্রতিভা পাওয়া যাবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সর্বভারতীয় ফুটবল সংস্থা এ ধরনের ব্যবস্থা গড়ে তুলতে কী করেছে?

আরও পড়ুন

শ্যাম থাপা আরও বলেন, অনেক অভিভাবক তাঁদের সন্তানদের ক্রিকেট কোচিংয়ে পাঠাচ্ছেন। কারণ, তাঁরা আশা করেন, আইপিএলের মতো টুর্নামেন্টে বড় চুক্তি পাবে। তাঁর মতে, ফুটবলেও ভালো আয় করা সম্ভব—এটা মানুষকে বুঝতে হবে।

এই প্রেক্ষাপটে দেখা যায়, এশিয়া থেকে এবার যে নয়টি দল বিশ্বকাপে জায়গা করে নিয়েছে, তাদের সঙ্গে ভারতের ব্যবধান অনেক বড়। এই দলগুলো হলো—অস্ট্রেলিয়া, ইরান, জাপান, জর্ডান, দক্ষিণ কোরিয়া, উজবেকিস্তান, কাতার, সৌদি আরব এবং ইরাক (প্লে-অফের মাধ্যমে)। এর মধ্যে জর্ডান ও উজবেকিস্তান প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে খেলছে।

দুই নতুন দলই আবার ফিফা র‍্যাঙ্কিংয়ে ভারতের চেয়ে অনেক ওপরে অবস্থান করছে। উজবেকিস্তান বিশ্বে ৫২ নম্বরে, জর্ডান ৬৩ নম্বরে আছে। আর ভারত সাম্প্রতিক ১৮ মাসে বড় পতনের কারণে নেমে এসেছে ১৩৬ নম্বরে। এই র‍্যাংকিংই দেখায়, ভারতীয় ফুটবলের সামনে চ্যালেঞ্জ কতটা বড়।

ভারতীয় ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি, সাবেক ফুটবলার কল্যাণ চৌবে ২০২২ সালে দায়িত্ব নেওয়ার পর বলেছিলেন—‘আমি এমন স্বপ্ন দেখাব না যে আট বছরের মধ্যে ভারত বিশ্বকাপে খেলবে; বরং আমি বলব, আমরা ভারতের ফুটবলকে বর্তমান অবস্থা থেকে এগিয়ে নিয়ে যাব।’ প্রায় চার বছর পর প্রশ্নটা এখন হলো—তাঁর প্রশাসন কি সত্যিই কোনো অগ্রগতি করতে পেরেছে?

অনেকের মতে, দ্রুত উন্নতির বদলে গত তিন বছরে সর্বভারতীয় ফুটবল সংস্থা (এআইএফএফ) বরং উপহাসের বিষয় হয়ে উঠেছে।

২০১৪ সালে সংস্থাটি বড় ধুমধাম করে ঘরোয়া ক্লাবভিত্তিক টুর্নামেন্ট ইন্ডিয়ান সুপার লিগ (আইএসএল) শুরু করেছিল। তখন ব্যবসায়ী, বলিউড তারকা এবং ক্রিকেট–জগতের নামজাদারা এতে যুক্ত হন।

আয়োজন ছিল পেশাদার মানের, বিদেশি ভালো খেলোয়াড়েরাও আসেন। কিন্তু এখন এই লিগের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত।

আইএসএলের সাম্প্রতিক মৌসুমে বড় ধরনের দেরি হয়, কারণ এআইএফএফ বাণিজ্যিক অংশীদার পেতে ব্যর্থ হয়। এতে শত শত ফুটবলারের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়ে এবং ব্যাপক সমালোচনার ঝড় ওঠে।

কলকাতার পথের পাশে মেসির পোস্টার।
ছবি: সংগৃহীত

শেষ পর্যন্ত সংস্থাটি কোনো বাণিজ্যিক অংশীদার ছাড়াই সীমিত আকারে লিগটি চালাতে বাধ্য হয় এবং এখন পরবর্তী মৌসুমের জন্য আবার নতুন করে পরিকল্পনা করছে।

এ পরিস্থিতির মধ্যে কল্যাণ চৌবের ‘ভিশন ২০৪৭’—যেখানে ৩ কোটি ৫০ লাখ শিশুকে ফুটবলে আনার বড় পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছিল। এটি অনেকের কাছে এখন কেবলই ভুলে যাওয়া প্রতিশ্রুতির মতো মনে হচ্ছে। বড় বড় লক্ষ্য আর মাঠের বাস্তব ফলাফলের মধ্যে ব্যবধান আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

২০২৩ সালে একসময় কিছুটা ঘুরে দাঁড়িয়েছিল ভারতীয় দল। একটি আমন্ত্রণমূলক টুর্নামেন্ট এবং সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ জিতে তারা ফিফা র‌্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষ ১০০-তে ফিরে আসে। কিন্তু এরপর সেই অগ্রগতি আবার থমকে যায়।

২০২৬ বিশ্বকাপের জন্য এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশনের বাছাইপর্বের তৃতীয় ধাপে ওঠার আশা জাগিয়েও শেষ পর্যন্ত দলটি ব্যর্থ হয়। এরপর এশিয়ান কাপেও তারা ভালোভাবে জায়গা করে নিতে পারেনি।

এখন সবচেয়ে কাছের লক্ষ্য হলো এশিয়ান কাপের টিকিট পাওয়া, যেখানে এশিয়ার ২৪টি শীর্ষ দল অংশ নেয়।

সাবেক অধিনায়ক সুনীল ছেত্রী কয়েক বছর আগে এক অনানুষ্ঠানিক আলোচনায় বলেছিলেন, লক্ষ্য হতে হবে বাস্তবসম্মত। তাঁর মতে, আগে ধারাবাহিকভাবে এশিয়ান কাপে জায়গা করতে হবে।

শক্তিশালী দলের সঙ্গে খেলার অভিজ্ঞতা অর্জন করতে হবে। যখন ভারত এশিয়ার শীর্ষ ১৫-২০ দলের মধ্যে স্থায়ীভাবে জায়গা করে নিতে পারবে, তখনই বিশ্বকাপের লক্ষ্য বড় করে ভাবা সম্ভব।

বর্তমান পরিস্থিতি এখনো হতাশাজনক। তবে এআইএফএফ নেতৃত্ব একটি নীতিগত পরিবর্তনের জন্য চাপ দিচ্ছে—যেখানে বিদেশে জন্ম নেওয়া ভারতীয় বংশোদ্ভূত (ওসিআই) খেলোয়াড়দের ভারতের হয়ে খেলার সুযোগ দেওয়া হবে।

বর্তমানে ভারতীয় বংশোদ্ভূত হলেও বিদেশি পাসপোর্টধারী খেলোয়াড়দের খেলতে হলে নিজ দেশের নাগরিকত্ব ত্যাগ করতে হয়।

অস্ট্রেলিয়ায় জন্ম নেওয়া রায়ান উইলিয়ামস এই নিয়ম মেনে ভারতের হয়ে খেলেছেন এবং শুরুতেই ভালো পারফরম্যান্স দেখিয়েছেন। যদি এই নীতির পরিবর্তন হয়, তাহলে তা বড় পরিবর্তন আনতে পারে।

এই বিশ্বকাপেই ভারতীয় বংশোদ্ভূত চারজন খেলোয়াড় অন্য দেশের হয়ে খেলছেন। তাঁরা হলেন—কাতারের তাহসিন মোহাম্মদ, অস্ট্রেলিয়ার নিশান ভেলুপিল্লে, নিউজিল্যান্ডের সারপ্রীত সিং এবং কঙ্গোর স্যামুয়েল মাউতুসামি।

এর মধ্যেই ভারতীয় দর্শকেরা আবারও দূর থেকে বিশ্বকাপ দেখবেন—মেসি, রোনালদো, নেইমারদের খেলা উপভোগ করবেন এবং অবাক হয়ে দেখবেন, কুরাসাওয়ের মতো ছোট দেশও বিশ্বকাপে পৌঁছে গেছে।

তখন আবারও একই প্রশ্ন সামনে আসবে—যদি কুরাসাও পারে, তাহলে ভারত পারে না কেন?

  • গৌতম ভট্টাচার্য, বিবিসির ক্রীড়া লেখক।

বিবিসি থেকে নেওয়া।

ইংরেজি থেকে অনূদিত।