বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষাঙ্গনে ছাত্র ও শিক্ষকরাজনীতির গুরুত্ব যেন পাঠ্যপুস্তকের গুরুত্বের চেয়ে অনেকটাই বেশি হয়ে দাঁড়িয়েছে। শিক্ষাঙ্গনগুলোর ভগ্নদশা আমাদের বিচলিত করলেও এর লাগাম টেনে ধরতে কর্তৃপক্ষ বরাবরই উদাসীন থাকছে।
শিক্ষাঙ্গনে রাজনীতি না থাকলে গণতান্ত্রিক বিকাশ লাভ হয় না, এমন অজুহাত তুলে যুগের পর যুগ এ দেশে ছাত্ররাজনীতি প্রভাব বিস্তার করেই গেছে। আপাতদৃষ্টিতে শিক্ষাঙ্গনগুলোতে একচিমটি পড়াশোনার সঙ্গে একমুঠো রাজনীতির মিশেলে যে সনদ আমাদের সেবন করতে দেওয়া হচ্ছে, তা বিশ্ববাজারে দুর্বলতার দিক থেকে শীর্ষে।
ছাত্র ও শিক্ষকরাজনীতি বন্ধের জন্য ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনা সরকারের সময় থেকেই আমরা পত্রপত্রিকায় দাবি জানিয়ে আসছি। দলীয় রাজনীতির ঘেরাটোপে শিক্ষার্থীরা যখন জিম্মি, তখন ছাত্ররাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসার জন্য সাধারণ শিক্ষার্থীরা বেশ আগ্রহী হয়ে উঠেছিলেন।
দেশের শীর্ষ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) ছাত্রলীগের (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) ভয়াবহ নির্যাতনে শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডের পর যখন সেখানে সব ধরনের রাজনীতি নিষিদ্ধ থেকেছে, তখন দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা রাজনীতির এই ঘানি টেনেই চলেছেন।
ফলে চব্বিশের জুলাইয়ে শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের অভ্যুত্থানে স্বৈরাচারী আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর যে আশার প্রদীপ জ্বলেছিল, সেই প্রদীপ জ্বালাতে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। ওই সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পরও কয়েক দফা প্রথম আলোতে ছাত্ররাজনীতি বন্ধের বিষয়ে লিখেছি। তবে ওই সরকার দুই দফায় শিক্ষা উপদেষ্টা পরিবর্তন করলেও ছাত্র ও শিক্ষকরাজনীতি বন্ধের ন্যূনতম আগ্রহ দেখায়নি।
এমনকি যে ছাত্রপ্রতিনিধিরা অরাজনৈতিক সংগঠন থেকে রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন হয়েছেন, তাঁদের মুখ থেকেও একবারের জন্য বের হয়নি যে শিক্ষাঙ্গনের রাজনীতি বন্ধ করা প্রয়োজন। বরং কিছু শিক্ষার্থীর দাপটে বিশ্ববিদ্যালয় ও অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ভীতসন্ত্রস্ত থেকেছে। দেশ গঠনের কথা বলে তাঁরা ক্লাসের পরিবর্তে রাজপথেই থেকেছেন। দিন শেষে তাঁরা পুরোনো বন্দোবস্তের ভেতর থেকে নিজেদের বের করতে পারেননি। ফলে চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান থেকে শিক্ষাঙ্গনগুলোর অর্জন খুব একটা চোখে পড়ার মতো ছিল না।
অথচ প্রায় একই সময়ে গণ-অভ্যুত্থান হওয়া আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ নেপালে আন্দোলনকারীদের দল রাষ্ট্রক্ষমতার আস্বাদ পেয়েই যে পরিবর্তনের হাওয়া বইয়ে দিচ্ছে, তা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়ার মতো। শপথ নেওয়ার পরপরই দেশটির নবগঠিত সরকারের প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টির নেতা বালেন্দ্র শাহ যে পদক্ষেপগুলো নিয়েছেন, তা শুধু নেপাল নয়, পুরো অঞ্চলের জন্যই এক গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে।
৩৫ বছর বয়সী এই রাষ্ট্রনেতা আমাদের মতো কোনো সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে শোরগোল করেননি কিংবা মাসের পর মাস ঐকমত্য ও কমিশনের সভা করেননি। ক্ষমতায় গিয়ে দেশের পরিবর্তনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে নিয়ামক, সেই শিক্ষাব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানোর দায়িত্ব তিনি দ্রুত বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে শুরু করে দিয়েছেন।
কথার ফুলঝুরি না ছুটিয়ে গত ২৮ মার্চ দেশটির শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে দলীয় ছাত্রসংগঠন বিলুপ্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের জন্য সব ধরনের দলীয় রাজনীতি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এটি কোনো বিচ্ছিন্ন পদক্ষেপ নয়; বরং বালেন্দ্র শাহর ঘোষিত ১০০ দফা সংস্কার কর্মসূচির অংশ।
শুধু তা–ই নয়, শিক্ষার্থীদের মধ্যে নেতৃত্বগুণ তৈরি করার জন্য প্রথম মন্ত্রিসভার বৈঠকেই আগামী ৯০ দিনের মধ্যে অরাজনৈতিক ‘স্টুডেন্ট কাউন্সিল’ বা ‘ভয়েস অব স্টুডেন্টস’ গঠনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এটি সফল হলে শিক্ষার্থীদের কণ্ঠস্বরও বজায় থাকবে, একই সঙ্গে দলীয় রাজনৈতিক প্রভাবও কমে যাবে।
নেপালের তরুণেরা সে দেশের পুরোনো কাঠামোয় আঘাত করতে পারলেও আমাদের তরুণেরা পুরোনো রাজনৈতিক নেতৃত্বের কাছেই নিজেদের সঁপে দিয়েছেন। বিভাজনের খেলায় মত্ত থেকে কেবল পরিবর্তনের বুলি আওড়ে যাচ্ছেন। এই দ্বিচারিতার কারণে তরুণদের বিপুল আত্মত্যাগ ও রক্তদানকে নিষ্ফলতার দিকে ঠেলে দিয়েছেন খোদ তরুণেরাই।
শুধু শিক্ষাঙ্গন নয়, প্রশাসনকেও অরাজনৈতিক করার উদ্যোগ নিয়েছে নেপাল সরকার। সরকারি কর্মচারী ও শিক্ষকদের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা নিষিদ্ধ এবং দলীয় ট্রেড ইউনিয়ন বিলুপ্তির পরিকল্পনা সেই ধারাবাহিকতারই অংশ। এর লক্ষ্য একটি পেশাদার ও নিরপেক্ষ প্রশাসন গড়ে তোলা। যদিও এই অঞ্চলের দীর্ঘদিনের রাজনীতির প্রেক্ষাপটে এটি অত্যন্ত উচ্চাকাঙ্ক্ষী উদ্যোগ। তবে এ উদ্যোগকে যদি সে দেশের সাধারণ মানুষ মেনে নেন, তাহলে নেপালের সামনের দিনগুলো আর কণ্টকময় হয়ে উঠবে না।
বালেন্দ্র শাহর নেওয়া নেপালের এ সিদ্ধান্ত আমাদের বিবেকের কাছে একটি মৌলিক প্রশ্ন উত্থাপন করেছে। সেটি হলো, শিক্ষাঙ্গনে রাজনীতির প্রয়োজনীয়তা আদৌ আগের মতো আছে কি? নাকি এটি এখন শিক্ষার পরিবেশকে বাধাগ্রস্ত করছে?
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্ররাজনীতি একসময় নেতৃত্বের বিকাশ, গণতান্ত্রিক চর্চা ও সামাজিক সচেতনতার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত হতো। কিন্তু বাস্তবতা হলো, দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশে এই ছাত্ররাজনীতি ক্রমে দলীয় স্বার্থ রক্ষার হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। শিক্ষার্থীদের দাবিদাওয়া উপেক্ষিত থেকে গেছে, আর বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অনেক সময় পরিণত হয়েছে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ও প্রভাব বিস্তারের মাঠে।
বছরের পর বছর এ দেশে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করতে এসে লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতির কারণে অসংখ্য শিক্ষার্থীকে প্রাণ দিতে হয়েছে।
ক্লাস ফেলে ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে ক্ষমতাসীন দলগুলোর পক্ষে স্লোগান দিতে বাধ্য হতে হয়েছে শিক্ষার্থীদের। আবাসিক হলগুলোতে প্রাতিষ্ঠানিক নিয়মে আসন পাওয়ার কথা থাকলেও তা চলে গেছে ছাত্রনেতাদের কবজায়। দলীয় পরিচয় ছাড়া শিক্ষক নিয়োগ হয় না। সনদের চেয়েও মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের সুপারিশের দৌরাত্ম্যে উপাচার্য থেকে শুরু করে সাধারণ শিক্ষক নিয়োগ পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াই থাকে প্রভাবশালীদের নিয়ন্ত্রণের মধ্যে। ফলে এ দেশের শিক্ষাঙ্গনগুলো অদক্ষতা ও অপেশাদার শিক্ষাব্যবস্থার খপ্পরে আবদ্ধ।
নেপাল ছাত্ররাজনীতি বন্ধ করে অরাজনৈতিক ছাত্র সংসদ গঠনের পরিকল্পনা হাতে নিয়ে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বগুণ তৈরির প্রতি মনোযোগ দিয়েছে। অথচ আমাদের দেশে এ রকম অরাজনৈতিক ছাত্র সংসদ বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোতে থাকার পরও সেগুলো যুগের পর যুগ ধরে কার্যত অচল হয়ে আছে।
চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ নির্বাচন হলেও সেখানে অরাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মটি ব্যবহৃত হয়েছে দলীয় রাজনীতির ব্যানারে। দেশের রাজনৈতিক দলগুলো মনে করে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে ক্ষমতার যাত্রা মসৃণ হয়।
ফলে ক্ষমতাসীন ও বিরোধীদলীয় রাজনীতির মারপ্যাঁচে ছাত্র ও শিক্ষকরাজনীতি বন্ধের উদ্যোগ কোনো সরকারই গ্রহণ করতে পারেনি বা ন্যূনতম সদিচ্ছাও প্রকাশ করতে পারেনি।
নেপালের তরুণেরা সে দেশের পুরোনো কাঠামোয় আঘাত করতে পারলেও আমাদের তরুণেরা পুরোনো রাজনৈতিক নেতৃত্বের কাছেই নিজেদের সঁপে দিয়েছেন। বিভাজনের খেলায় মত্ত থেকে কেবল পরিবর্তনের বুলি আওড়ে যাচ্ছেন। এই দ্বিচারিতার কারণে তরুণদের বিপুল আত্মত্যাগ ও রক্তদানকে নিষ্ফলতার দিকে ঠেলে দিয়েছেন খোদ তরুণেরাই।
এ কথা সত্য, আমাদের সমাজের গভীরে রাজনীতি নিবিড়ভাবে প্রোথিত। সেটিকে কেবল প্রশাসনিক নির্দেশে সম্পূর্ণভাবে দূর করা কঠিন। অনেক ক্ষেত্রে এটি অদৃশ্য রূপে থেকে যেতে পারে। ফলে এ ধরনের সংস্কারের সাফল্য নির্ভর করবে এর সঠিক প্রয়োগ, নজরদারি ও বিকল্প ব্যবস্থার কার্যকারিতার ওপর।
নেপালের এই পদক্ষেপগুলো তাই শুধু প্রশাসনিক সংস্কার নয়; বরং এটি একটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন। সেখানে শিক্ষাকে রাজনৈতিক প্রভাব থেকে মুক্ত করে একটি স্বতন্ত্র ও পেশাদার ক্ষেত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার দৃশ্যমান চেষ্টা রয়েছে।
আমাদের মনে রাখতে হবে, গুণগত শিক্ষার মূল লক্ষ্য হলো জ্ঞানচর্চা, চিন্তার স্বাধীনতা ও মানবিক বিকাশ। আর এই অনুষঙ্গগুলো যখন ব্যাহত হয়, তখন বুঝতে হবে আমরা সঠিক পথে নেই। আমাদের উচ্চশিক্ষাকে লাইনচ্যুত করেছে দলীয় লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতি। আমরা যদি সত্যিই বিশ্বায়নে নিজেদের তৈরি করতে চাই, তাহলে শাসকগোষ্ঠীসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে শিক্ষার গুণগত বিকাশে অবশ্যই ঐকমত্যে আসতে হবে। আর সেই ঐকমত্যের প্রধান শর্ত হবে দলীয় রাজনীতিমুক্ত শিক্ষাঙ্গন।
ড. নাদিম মাহমুদ, গবেষক, ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়
ই-মেইল: [email protected]
মতামত লেখকের নিজস্ব
