সুন্দরবনের বেঙ্গল টাইগার, পার্বত্য চট্টগ্রামের বুনো হাতি, সিলেটের লাউয়াছড়ার চিত্রা হরিণ, হাওরের পরিযায়ী পাখির ঝাঁক কিংবা গ্রামবাংলার অসংখ্য সরীসৃপ—এসব নিয়ে আমাদের জীববৈচিত্র্য শুধু জাতীয় সম্পদ নয়, বৈশ্বিকভাবেও গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু দ্রুত নগরায়ণ, বনভূমি সংকোচন, অবকাঠামো নির্মাণ, শিল্পায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে মানুষ-প্রাণী সংঘাত উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। প্রায় প্রতিদিনই সংবাদমাধ্যমে দেখা যায়, হাতির মৃত্যু, হাতির আক্রমণে মানুষের প্রাণহানি, সাপ পিটিয়ে হত্যা, কিংবা ‘হাঁস-মুরগি খেয়েছে’ অভিযোগে মেছো বাঘ বা বনবিড়ালের নির্মম পরিণতি।
অন্যদিকে পাচার চক্রের হাত থেকে স্তন্যপায়ী প্রাণী, পাখি, কচ্ছপ ও সরীসৃপ উদ্ধার হওয়ার খবরের সংখ্যাও কম নয়। তাতে ধারণা করা যায়, এ ধরনের বহু প্রাণী দেশ থেকে পাচার হয়ে যাচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে বন্য প্রাণী উদ্ধার এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হিসেবে সামনে এসেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো এই উদ্ধার কার্যক্রম কতটা বৈজ্ঞানিক ও দায়িত্বশীলভাবে পরিচালিত হচ্ছে?
মনে রাখা দরকার, বন্য প্রাণী উদ্ধার কোনো আবেগের বিষয় নয়, এটি একটি বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া। এটি কোনো প্রদর্শনমূলক কাজ নয়; এটি প্রযুক্তিনির্ভর বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া। উন্নত দেশগুলোতে উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালিত হয় নির্দিষ্ট আন্তর্জাতিক মানভিত্তিক পদ্ধতি বা স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর (এসওপি) অনুযায়ী।
বন্য প্রাণী ধরা, সেগুলোকে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় আনা-নেওয়া, প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া, কোয়ারেন্টিনে রাখা, স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা, আচরণ মূল্যায়ন এবং পুনঃস্থাপন করা—এই সবকিছুই একটি সুসংগঠিত কাঠামোর মধ্যে সম্পন্ন হয়। বাংলাদেশে অধিকাংশ ক্ষেত্রে এই কাঠামো অনুপস্থিত।
এখনো দেশে পূর্ণাঙ্গ আন্তর্জাতিক মানের বন্য প্রাণী উদ্ধার ও পুনর্বাসন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হয়নি। সীমিত অবকাঠামো থাকলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অপর্যাপ্ত। এখানে নেই বিশেষায়িত বন্য প্রাণী হাসপাতাল, পূর্ণকালীন প্রশিক্ষিত ভেটেরিনারিয়ান, প্রাণী পরিচর্যাকারী, পর্যাপ্ত খাদ্য ও চিকিৎসাসুবিধা।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মাঝেমধ্যে উদ্ধারকৃত শকুন বা সাপ হাতে নিয়ে ছবি তোলা, লোকালয়ে ধরা পড়া প্রাণীকে দূরের কোনো বনে ছেড়ে দেওয়া, কিংবা সংশ্লিষ্ট প্রাণীটির যথাযথ আবাসস্থলের তোয়াক্কা না করে শহরের পাশের কোনো উদ্যানেই অবমুক্ত করার দৃশ্য দেখা যায়। এসব দৃশ্য জনসচেতনতা বাড়াতে পারে, কিন্তু তা প্রাণীর দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিশ্চিত করে না।
এর জন্য উদ্ধারকাজে প্রশিক্ষিত জনবল, নিরাপদ সরঞ্জাম ও প্রাণীর আচরণ সম্পর্কে গভীর জ্ঞান অপরিহার্য। এসবের অভাব প্রাণীর জন্য যেমন ক্ষতিকর, তেমনি উদ্ধারকারীর জন্যও বিপজ্জনক।
ভুল অবমুক্তি: ‘উদ্ধার’ থেকে মৃত্যুর পথে
একটি বড় সমস্যা হলো বন্য প্রাণীর নির্বিচার পুনঃস্থাপন। শহরে ধরা পড়া সাপ বা অন্য প্রাণীকে অনেক দূরের বনে ছেড়ে দেওয়া হয়। কখনো কখনো তা করা হয় নদী, মহাসড়ক বা সম্পূর্ণ ভিন্ন বাস্তুতন্ত্র অতিক্রম করিয়ে।
সংবাদে এসেছে, দেশের কয়েকটি সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সুন্দরবনের বাইরে ধরা কিছু বন্য প্রাণীকে নাটকীয়ভাবে সুন্দরবনে অবমুক্ত করেছে। আবার সুন্দরবনে উদ্ধার হওয়া বাঘকে চিকিৎসার জন্য খুলনায় নেওয়া হয়েছে। লোকালয়ঘেঁষা এলাকা থেকে উদ্ধার করা মেছো বাঘ বা বনবিড়ালকে দূরবর্তী অন্য বনে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গেছে, অধিকাংশ সরীসৃপ এবং অনেক স্তন্যপায়ী প্রাণীর নিজস্ব আবাসস্থলের প্রতি প্রবল অনুরাগ (সাইট ফিডেলিটি) থাকে। তারা নিজেদের এলাকায় খাদ্য, আশ্রয়, নিরাপদ চলাচলের পথ ও প্রজননস্থল সম্পর্কে পরিচিত থাকে। এমনকি স্থানীয় শত্রু-মিত্র সম্পর্কেও তাদের ধারণা থাকে। দূরে ছেড়ে দিলে তারা প্রায়ই আগের এলাকায় ফেরার চেষ্টা করে। ফলে প্রাণীগুলো সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যায়, শিকারির হাতে পড়ে, খাদ্যসংকটে ভোগে, স্থানীয় প্রাণীর সঙ্গে সংঘাতে জড়ায়, রোগ সংক্রমণের ঝুঁকিতে পড়ে।
অর্থাৎ অজ্ঞতাবশত অনেক সময় আমরা ‘উদ্ধার’ করে প্রাণীটিকে নীরব মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিই।
কোয়ারেন্টিন ও স্বাস্থ্য পরীক্ষা
উন্নত বিশ্বে উদ্ধার করা প্রাণীকে সরাসরি বনে ছেড়ে দেওয়া হয় না। তার আগে কোয়ারেন্টিন কেন্দ্রে রাখা হয়। সংক্রামক রোগ, পরজীবী সংক্রমণ, শারীরিক আঘাত, পুষ্টিগত অবস্থা ইত্যাদি পরীক্ষা করা হয়।
বাংলাদেশে অধিকাংশ ক্ষেত্রে এ ব্যবস্থা নেই। ফলে এক অঞ্চল থেকে উদ্ধার প্রাণী অন্য অঞ্চলে অবমুক্ত হলে নতুন রোগ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়, যা দীর্ঘ মেয়াদে পরিবেশগত ভারসাম্যের জন্য মারাত্মক হয়ে ওঠে।
আন্তর্জাতিক মানের পুনর্বাসন কেন্দ্রের অভাব
এখনো দেশে পূর্ণাঙ্গ আন্তর্জাতিক মানের বন্য প্রাণী উদ্ধার ও পুনর্বাসন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হয়নি। সীমিত অবকাঠামো থাকলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অপর্যাপ্ত। এখানে নেই বিশেষায়িত বন্য প্রাণী হাসপাতাল, পূর্ণকালীন প্রশিক্ষিত ভেটেরিনারিয়ান, প্রাণী পরিচর্যাকারী, পর্যাপ্ত খাদ্য ও চিকিৎসাসুবিধা।
একটি আধুনিক পুনর্বাসন কেন্দ্রে যা যা থাকা উচিত, তা হলো বিশেষায়িত বন্য প্রাণী হাসপাতাল, পূর্ণকালীন প্রশিক্ষিত বন্য প্রাণী চিকিৎসক ও কেয়ারগিভার, পর্যাপ্ত খাদ্য ও পানীয়, আচরণ বিশ্লেষক, প্রাকৃতিক পরিবেশসমৃদ্ধ বড় এনক্লোজার, রিলিজ-পূর্ব মূল্যায়নব্যবস্থা এবং রিলিজ-পরবর্তী বৈজ্ঞানিক মনিটরিং প্রযুক্তি।
বর্তমানে অধিকাংশ ক্ষেত্রে উদ্ধার করা প্রাণীকে দ্রুত ছেড়ে দেওয়া হয়, অথবা দীর্ঘদিন খাঁচায় আটকে রাখা হয়। অথচ এর কোনোটিই গ্রহণযোগ্য নয়।
চাই স্বতন্ত্র ও আধুনিক বন্য প্রাণী বিভাগ
বাংলাদেশে বন বিভাগ থাকলেও তার এমন কোনো স্বতন্ত্র, আধুনিক ও শক্তিশালী বন্য প্রাণী বিভাগ নেই, যার নিজস্ব বাজেট, জনবল, গবেষণা ইউনিট, জরুরি উদ্ধার শাখা থাকবে। উন্নত দেশগুলোতে বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনা একটি বিশেষায়িত পেশা। সেখানে থাকে ২৪ ঘণ্টার জরুরি হটলাইন, আঞ্চলিক জরুরি ব্যবস্থা নেওয়ার টিম, উদ্ধারকাজের জন্য বানানো বিশেষ যানবাহন, মানসম্মত তথ্য সংরক্ষণব্যবস্থা, বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও নীতিনির্ধারণ কাঠামো।
আমাদের দেশে প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতা, জনবলসংকট ও বাজেট-ঘাটতির কারণে এ ধরনের কার্যকর উদ্যোগ বাধাগ্রস্ত হয়।
প্রশিক্ষণ ও নিরাপত্তার ঘাটতি
অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, সাপ বা কোনো হিংস্র প্রাণী ধরতে গিয়ে উদ্ধারকারী নিজেই আহত হচ্ছেন। এর পেছনের মূল কারণগুলো হলো প্রজাতি শনাক্তকরণে ভুল করা, আচরণগত জ্ঞানের অভাব ও নিরাপত্তা সরঞ্জামের অভাব।
বন্য প্রাণী উদ্ধার একটি দক্ষতানির্ভর পেশা; এটি শখের কাজ নয়। প্রশিক্ষণ ও সার্টিফিকেশন ছাড়া এই কাজ পরিচালনা বিপজ্জনক।
সামাজিক মনোভাবের পরিবর্তন জরুরি
এখনো সমাজে ‘সাপ মানেই বিষধর’, ‘বন্য প্রাণী মানেই ক্ষতিকর’—এমন ভুল ধারণা প্রচলিত আছে। সঠিক শিক্ষা ও সচেতনতা ছাড়া মানুষ বনাম প্রাণী সংঘাত কমানো কঠিন। বন্য প্রাণী দেখলেই হত্যা নয়; সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো—এই সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।
সব মিলিয়ে বন্য প্রাণী সংরক্ষণ, উদ্ধার ও পুনর্বাসনে কিছু জরুরি উদ্যোগ নিতে হবে। প্রথমত, স্বতন্ত্র বন্য প্রাণী বিভাগ গঠন করতে হবে। দ্বিতীয়ত, জাতীয় এসএপি প্রণয়ন ও বাধ্যতামূলক বাস্তবায়ন করতে হবে। তৃতীয়ত, আন্তর্জাতিক মানের উদ্ধার ও পুনর্বাসন কেন্দ্র স্থাপন করতে হবে। চতুর্থত, প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্সিং ব্যবস্থা চালু করতে হবে। পঞ্চমত, অবমুক্তি-পরবর্তী বৈজ্ঞানিক নজরদারি করতে হবে। ষষ্ঠত, জাতীয় জরুরি হটলাইন চালু করতে হবে। সবশেষে জনসচেতনতা কর্মসূচি জোরদার করতে হবে।
ড. রেজা খান বন্য প্রাণী সাফারি ও চিড়িয়াখানা গবেষক এবং সংরক্ষণ বিশেষজ্ঞ
*মতামত লেখকের নিজস্ব