সহিংস উগ্রবাদের নতুন ঝুঁকিতে বাংলাদেশ, সামনে দুই লড়াই

বাংলাদেশের সামনে এখন চ্যালেঞ্জ খুব পরিষ্কার। সহিংস উগ্রবাদকে অস্বীকার করলে রাষ্ট্র ঝুঁকিতে পড়বে। আবার সন্ত্রাসবাদের ভাষাকে রাজনৈতিক অস্ত্র বানালে প্রকৃত হুমকির বিরুদ্ধে রাষ্ট্র দুর্বল হয়ে যাবে। সহিংস উগ্রবাদের নতুন ঝুঁকি এবং সরকারের চ্যালেঞ্জ নিয়ে লিখেছেন আসিফ বিন আলী

বাংলাদেশে জাতীয় নিরাপত্তা নিয়ে কথা বললে আমরা সাধারণত সীমান্ত, নির্বাচন, বড় শক্তির ভূরাজনীতি, সামরিক সক্ষমতা অথবা বিদেশি শক্তির প্রভাব নিয়ে আলোচনা করি। এগুলো অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু জাতীয় নিরাপত্তার আরেকটি বড় দিক আছে, যেটা আমরা অনেক সময় রাজনৈতিক সুবিধা-অসুবিধার জায়গা থেকে বিবেচনা করি। সেটি হলো সহিংসতাপূর্ণ ধর্মীয় উগ্রবাদ।

এই হুমকি যখন সামনে আসে, তখন কেউ কেউ একে অতিরঞ্জিত বলে উড়িয়ে দেন। আবার কেউ কেউ এই হুমকিকে ব্যবহার করেন রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমন করার জন্য। দুটোই বিপজ্জনক। কারণ, একদিকে অস্বীকার করলে প্রকৃত হুমকি বড় হয়। আর অন্যদিকে রাজনৈতিক অপব্যবহার করলে মানুষের আস্থা নষ্ট হয়।

সরকারি সতর্কতা ও গ্রেপ্তারের ঘটনা

সম্প্রতি ডেইলি স্টারসহ প্রথম সারির কয়েকটি সংবাদমাধ্যমে সরকারি নথির বরাত দিয়ে খবর এসেছে যে জাতীয় সংসদ, শাহবাগ, উপাসনালয়, বিনোদনকেন্দ্র, পুলিশ ও সেনা স্থাপনা, এমনকি বিভিন্ন বাহিনীর অস্ত্রাগারে হামলার আশঙ্কা নিয়ে সতর্কতা জারি করা হয়েছে। এসব খবর যদি একেবারে ন্যূনতম মাত্রায়ও সত্যি হয়,
তাহলে এটিকে সাধারণ আইনশৃঙ্খলার সমস্যা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটা সরাসরি জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন।

এর সঙ্গে আরেকটি উদ্বেগজনক খবর যুক্ত হয়েছে। টাইমস অব বাংলাদেশ ২৬ এপ্রিল ২০২৬ সালে ‘তেহরিক-ই-তালেবান: মিলিট্যান্ট লিংকস উইদিন র‍্যাঙ্কস ট্রিগার ক্র্যাকডাউন’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে, যেখানে বলা হয়, বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর একজন ওয়ারেন্ট অফিসার নিখোঁজ থাকার পর তাঁকে কথিতভাবে টিটিপির একটি আস্তানায় শনাক্ত করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, এ ঘটনায় অভ্যন্তরীণ তদন্ত শুরু হয়েছে এবং বিমানবাহিনীর সদস্যসহ ২০ জনের বেশি মানুষকে আটক করা হয়েছে। এসব দাবি এখনো তদন্তাধীন। তাই এগুলোকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে বলা ঠিক হবে না। কিন্তু অভিযোগ হিসেবেও বিষয়টি ভয়াবহ। কারণ, যদি উগ্রবাদী নেটওয়ার্ক কোনোভাবে প্রশিক্ষিত বাহিনীর ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করে, তাহলে সেটা আর শুধু কয়েকজন বিপথগামী তরুণের সমস্যা থাকে না, সেটা হয়ে দাঁড়ায় রাষ্ট্রের নিরাপত্তাকাঠামোর ভেতরে প্রবেশের চেষ্টা।

এই জায়গায় আমাদের ঠান্ডা মাথায় ভাবতে হবে। রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সহিংস আদর্শিক যুদ্ধ যারা চালাতে চায়, তারা সব সময় বন্দুক হাতে পাহাড়ে বা দুর্গম চর এলাকায় থাকে না। তারা এখন ফেসবুকে থাকে, ইউটিউবে থাকে, পডকাস্টে থাকে, বিশ্ববিদ্যালয়ের সেমিনারে থাকে, প্রকাশনা সংস্থা চালায়, বই প্রকাশ করে, ধর্মীয় আবেগের ভাষায় রাষ্ট্রবিরোধী প্রচার চালায়। তারা নিজেদের ইসলামের একমাত্র প্রতিনিধি হিসেবে হাজির করে। কিন্তু তাদের প্রকল্প ধর্মের নয়। তাদের প্রকল্প ক্ষমতার। তারা ধর্মকে ব্যবহার করে রাষ্ট্র, সমাজ, বিচারব্যবস্থা, নারী, সংখ্যালঘু, ভিন্নমত, এমনকি ভিন্নমত পোষণকারী আলেমদেরও টার্গেট করে।

আরও পড়ুন

উগ্রবাদীদের নতুন করে উত্থান

গত ২০ মাসে আমরা দেখেছি আল-কায়েদাপন্থী, দায়েশপন্থী, তালেবানপন্থী এবং নিউ জেএমবি ঘরানার নানা বয়ান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আরও প্রকাশ্য হয়েছে। এর আগপর্যন্ত তারা আড়ালেই প্রচার-প্রচারণা চালাত। গত দেড় বছরে রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে তাদের প্রকাশ্য হওয়াটা যেমন আশঙ্কাজনক, আবার এই অর্থেও ইতিবাচক যে তাদের গতিবিধি ও তৎপরতা সম্পর্কে বিস্তারিত অনেক কিছুই সরাসরি জানা যাচ্ছে।

সহিংস উগ্রপন্থী এসব গোষ্ঠীর অনেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এখন প্রকাশ্যে কথা বলে, নিরাপত্তা বাহিনীকে ‘ইসলামের শত্রু’ হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করে, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থাকে অস্বীকার করে এবং এমন এক যুদ্ধের ভাষা তৈরি করে, যেখানে তাদের সঙ্গে দ্বিমত করলেই আপনি শত্রু। এটি কেবল মতপ্রকাশ নয়—যখন কোনো বক্তব্য মানুষকে সহিংসতার দিকে ঠেলে দেয়, যখন সাংবিধানিক রাষ্ট্রকে অবৈধ ঘোষণা করে, যখন বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠনের প্রতি সহানুভূতি তৈরি করে, তখন সেটা জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়।

আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা খুব তিক্ত। ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট জেএমবি দেশের ৬৩ জেলায় প্রায় একই সময়ে বোমার বিস্ফোরণ ঘটিয়েছিল। এটা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না। এটা ছিল রাষ্ট্রকে সরাসরি জানিয়ে দেওয়া যে তারা সাংবিধানিক আইন মানে না, তারা নিজেদের ব্যাখ্যার শরিয়াহ চাপিয়ে দিতে চায়।

এরপর ২০১৬ সালের হোলি আর্টিজান হামলা আমাদের দেখিয়েছে, উগ্রবাদ শুধু গ্রামের মাদ্রাসা বা প্রান্তিক অঞ্চলে সীমাবদ্ধ নয়। এটি শহরের অভিজাত এলাকায় ঢুকতে পারে, ইংরেজি মাধ্যমে পড়া তরুণদের প্রভাবিত করতে পারে এবং ডিজিটাল সংস্কৃতির ভেতর দিয়ে নতুন রূপ নিতে পারে।

সক্রিয় আঞ্চলিক উগ্রবাদের নেটওয়ার্ক

বর্তমানের হুমকিটা আরও জটিল। কারণ, এখন এই উগ্রবাদ কেবল দেশীয় নয়, ‘ট্রান্সন্যাশনাল’। ইতিমধ্যে আমরা জেনেছি, কয়েকজন বাংলাদেশি পাকিস্তানে গিয়ে তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান বা টিটিপির সঙ্গে যুক্ত হয়ে নিহত হয়েছেন। ডেইলি স্টার ২০২৫ সালের ৫ নভেম্বর ‘গোপালগঞ্জ ইয়ুথ কিল্ড ফাইটিং ফর টিটিপি ইন পাকিস্তান’ শিরোনামে রতন ঢালী ও ফয়সাল হোসেনের মৃত্যুর খবর প্রকাশ করে।

প্রথম আলো ২০২৫ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর ফয়সাল হোসেনের পরিবার নিয়ে প্রতিবেদন করে, যেখানে দেখা যায় পরিবার ভেবেছিল সে বিদেশে কাজ করতে গেছে। পরে জানা যায় সে পাকিস্তানে টিটিপি-সংশ্লিষ্ট অভিযানে নিহত হয়েছে। এই ঘটনাগুলো আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখায় যে ট্রান্সন্যাশনাল জিহাদি নেটওয়ার্ক এখন বাংলাদেশি ঘর পর্যন্ত পৌঁছে যাচ্ছে।

টিটিপি কোনো সাধারণ ধর্মীয় সংগঠন নয়। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের নিষেধাজ্ঞা তালিকায় টিটিপিকে আল-কায়েদাসংশ্লিষ্ট সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তাদের লক্ষ্য পাকিস্তানের নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করে নিজেদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী ইসলামি আমিরাত প্রতিষ্ঠা করা। গ্লোবাল টেররিজম ইনডেক্স ২০২৬-এ টিটিপিকে ২০২৫ সালের সবচেয়ে প্রাণঘাতী সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর একটি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

এখন প্রশ্ন হলো, এমন একটি সংগঠনের সঙ্গে যদি বাংলাদেশি নাগরিকদের যোগাযোগ তৈরি হয়, সেটা কি আমরা শুধু ব্যক্তিগত বিভ্রান্তি বলে এড়িয়ে যেতে পারি? পারি না। এটা বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য সরাসরি সতর্কবার্তা।

‘সন্ত্রাসী’ শব্দের অপব্যবহার ও রাজনীতি

বাংলাদেশে ‘সন্ত্রাসী’ শব্দটি বহুবার রাজনৈতিকভাবে অপব্যবহার করা হয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে এই শব্দ বিরোধী রাজনৈতিক কর্মীদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হয়েছে। আবার আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরও দেখা গেছে, নতুন অন্তর্বর্তী সরকার কিছু ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ সদস্যদের বিরুদ্ধে একই রকম ভাষা ব্যবহার করছে, যারা বাস্তবে তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ।

এই প্রবণতা বিপজ্জনক। কারণ, যখন রাষ্ট্র রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে সন্ত্রাসী বলে, তখন প্রকৃত সন্ত্রাসীর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের ভাষাও দুর্বল হয়ে যায়। মানুষ তখন সন্দেহ করতে শুরু করে, আসলেই কি হুমকি আছে, নাকি সরকার আবার রাজনৈতিক খেলা খেলছে?

এই আস্থার সংকটই আজ সবচেয়ে বড় সমস্যা। ‘কাউন্টার টেররিজম’ শুধু অস্ত্র, অভিযান, গোয়েন্দা নজরদারি বা গ্রেপ্তারের বিষয় নয়। কাউন্টার টেররিজমের বড় শক্তি হলো জনআস্থা। একজন বাবা যদি মনে করেন তাঁর ছেলে উগ্রবাদে জড়াচ্ছে, কিন্তু রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রতি যদি তিনি আস্থা না রাখতে পারেন, তাহলে তিনি চুপ থাকবেন। একইভাবে একজন শিক্ষক যদি কোনো ছাত্রের আচরণে বিপজ্জনক পরিবর্তন দেখেন, কিন্তু একই সঙ্গে তিনি যদি মনে করেন বিষয়টি জানালে ছাত্রটি গুম বা নির্যাতনের শিকার হতে পারে, তাহলে তিনিও চুপ থাকবেন। আর এই নীরবতাই উগ্রবাদীদের বিকাশের পথ তৈরি করে দেয়।

আরও পড়ুন

নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর সংস্কার জরুরি

এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের নিরাপত্তা সংস্থাগুলোকে শক্তিশালী করতে হবে, কিন্তু একই সঙ্গে তাদের সংস্কারও করতে হবে। সিটিটিসি, এসবি, এটিইউ, সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা, সীমান্ত কর্তৃপক্ষ, সাইবার ক্রাইম ইউনিট—সবাইকে আধুনিক প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি, জনবল ও সমন্বয় দিতে হবে। কিন্তু তাদের কাজ হতে হবে আইন মেনে। প্রতিটি গ্রেপ্তার নথিভুক্ত হতে হবে। প্রত্যেক সন্দেহভাজনকে আদালতে হাজির করতে হবে। প্রতিটি অভিযোগ প্রমাণের ভিত্তিতে বিচার করতে হবে। মিডিয়া ট্রায়াল, গোপন আটক, গুম, নির্যাতন বা রাজনৈতিক মামলা দিয়ে কোনো রাষ্ট্র দীর্ঘ মেয়াদে নিরাপদ হয় না। এতে অল্প সময়ের জন্য ভয় তৈরি হয়, কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে আস্থা ভেঙে যায়।

বাংলাদেশের সামনে দুই লড়াই

বাংলাদেশকে তাই একসঙ্গে দুই লড়াই করতে হবে। প্রথম লড়াই সহিংস উগ্রবাদের বিরুদ্ধে। দ্বিতীয় লড়াই কাউন্টার টেররিজমের রাজনৈতিক অপব্যবহারের বিরুদ্ধে। এই দুই লড়াই আলাদা না; বরং একে অপরের সঙ্গে যুক্ত। রাষ্ট্র যদি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে সন্ত্রাসী বানায়, তাহলে প্রকৃত সন্ত্রাসী লাভবান হয়। আবার রাষ্ট্র যদি প্রকৃত উগ্রবাদী নেটওয়ার্ককে অবহেলা করে, তাহলে রাষ্ট্র নিজেই ঝুঁকিতে পড়ে।

গত এক দশকে বাংলাদেশ বড় ধরনের সন্ত্রাসী হামলা কমাতে পেরেছে, সংগঠিত জঙ্গি নেটওয়ার্ক ভাঙতে পেরেছে, গোয়েন্দা সক্ষমতা বাড়িয়েছে। এই অর্জনকে স্বীকার করতে হবে। নিরাপত্তা বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা এবং সাধারণ নাগরিকদের সহযোগিতা ছাড়া এটি সম্ভব হতো না। সন্ত্রাসবাদ অনেক সময় চুপচাপ থাকে, তারপর আবার ফিরে আসে। এটি নতুন ভাষা নেয়, নতুন প্ল্যাটফর্ম নেয়, নতুন প্রজন্মের কাছে যায়। মেরুকৃত সমাজ, রাজনৈতিক অবিশ্বাস, দুর্বল প্রতিষ্ঠান, অনলাইন প্রোপাগান্ডা, বিদেশি যুদ্ধের রোমান্টিক বয়ান এবং রাষ্ট্রের ওপর আস্থাহীনতা একসঙ্গে মিললে উগ্রবাদ আবার মাথা তোলে। বাংলাদেশ এই শর্তগুলো আগে দেখেছে। তাই আরেকটি বিপর্যয়ের জন্য অপেক্ষা করার সুযোগ নেই।

তিনটি করণীয়

প্রশ্ন হলো, আমরা কী করব? প্রথমত, ধর্মীয় রক্ষণশীলতা আর সহিংস উগ্রবাদকে আলাদা করতে হবে। ধর্মীয় মত মানেই উগ্রবাদ নয়। রাষ্ট্র কখনো বিশ্বাসকে অপরাধীকরণ করতে পারে না। কিন্তু যারা ধর্মীয় উগ্রবাদের মাধ্যমে সহিংসতা প্রচার করে, সাংবিধানিক রাষ্ট্রকে অস্বীকার করে, বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠনের প্রতি সহানুভূতি তৈরি করে, নিরাপত্তা বাহিনীকে টার্গেট করে, তাদের বিরুদ্ধে আইনের কঠোর প্রয়োগ দরকার।

দ্বিতীয়ত, বিশ্ববিদ্যালয়, মসজিদ, মাদ্রাসা, প্রকাশনা জগৎ, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ও গণমাধ্যমকে এই লড়াইয়ের অংশ হতে হবে। শুধু রাষ্ট্রীয় অভিযান দিয়ে এই সমস্যা সমাধান হবে না। সমাজকে বুঝতে হবে, আল-কায়েদাপন্থী বা দায়েশপন্থী বয়ান কোনো ‘বিকল্প মত’ নয়। এটি শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্র, সমাজ, পরিবার, ধর্মীয় সম্প্রীতি ও নাগরিক স্বাধীনতার বিরুদ্ধে যায়।

তৃতীয়ত, নিরাপত্তা সংস্থাগুলোকে জনআস্থা পুনর্গঠন করতে হবে। তারা রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা লাইন। কিন্তু সেই প্রতিরক্ষা তখনই কার্যকর হবে, যখন মানুষ বিশ্বাস করবে যে তারা পেশাদার, আইন মেনে চলে এবং রাজনৈতিক নির্দেশে কাউকে টার্গেট করে না। অন্ধ সমর্থন নিরাপত্তা দেয় না, দায়মুক্তি তৈরি করে। আবার নিরাপত্তা সংস্থার প্রতি চিরস্থায়ী সন্দেহও বিপজ্জনক। কারণ, এতে গোয়েন্দা কাজ দুর্বল হয়। আমাদের দরকার সমর্থন, কিন্তু সেই সমর্থন হতে হবে জবাবদিহিসহ।

বাংলাদেশের সামনে এখন চ্যালেঞ্জ খুব পরিষ্কার। সহিংস উগ্রবাদকে অস্বীকার করলে রাষ্ট্র ঝুঁকিতে পড়বে। আবার সন্ত্রাসবাদের ভাষাকে রাজনৈতিক অস্ত্র বানালে প্রকৃত হুমকির বিরুদ্ধে রাষ্ট্র দুর্বল হয়ে যাবে। তাই আমাদের দরকার স্পষ্টতা, ভয় নয়; দৃঢ়তা, নির্যাতন নয়; আইন, প্রতিশোধ নয়; জনআস্থা, প্রোপাগান্ডা নয়।

বাংলাদেশকে নিরাপদ রাখতে হলে রাষ্ট্র, সমাজ, ধর্মীয় নেতৃত্ব, গণমাধ্যম, বিশ্ববিদ্যালয় ও নাগরিকদের একসঙ্গে দাঁড়াতে হবে। কারণ, এই লড়াই শুধু কোনো একটি সরকারের নয়। এটি প্রজাতন্ত্রের লড়াই। এটি এমন এক বাংলাদেশের পক্ষে দাঁড়ানোর লড়াই, যেখানে ধর্ম থাকবে মানুষের নৈতিক শক্তি হিসেবে, কিন্তু কোনো উগ্রবাদী গোষ্ঠীর রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে নয়।

  • আসিফ বিন আলী ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ডক্টরাল ফেলো, জর্জিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটি, যুক্তরাষ্ট্র

  • মতামত লেখকের নিজস্ব