জমাদিউস সানি মাসের বরকত ও ইবাদত

শীত ও গরমের মৌসুমে বিশেষ ইবাদতের প্রসঙ্গে কোরআনুল কারিমে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘কুরাইশদের অনুরাগ হেতু! তাদের আকর্ষণ শীত ও গ্রীষ্মে অভিযানে। অতএব তারা যেন এই (কাবা) গৃহের প্রভুর ইবাদত করে। যিনি তাদের ক্ষুধায় অন্ন দান করেছেন এবং শঙ্কায় নিরাপত্তা বিধান করেছেন।’ (সুরা-১০৬ কুরাইশ, আয়াত: ১-৪)

আরবি বর্ষপঞ্জির ষষ্ঠ চান্দ্র মাস হলো ‘জমাদিউস সানি’। এর পূর্বের মাস হলো ‘জমাদিউল আউয়াল’; এটি আরবি বর্ষের পঞ্চম চান্দ্রমাস। এর বাংলা অর্থ হলো প্রথম জুমাদা ও দ্বিতীয় জুমাদা বা প্রথম শীত ও দ্বিতীয় শীত; অর্থাৎ শীতকালের প্রথম মাস ও শীতকালের দ্বিতীয় মাস।

এই দুটি হলো জোড়া মাস। আরব দেশে তৎকালে এই দুই মাস ছিল শীতকাল। আরবিতে এই মাস দুটির নাম হলো প্রথমটি ‘আল জুমাদাল উলা’ ও দ্বিতীয়টি ‘আল জুমাদাল উখরা’ বা ‘আল জুমাদাল আখিরাহ’ অথবা ‘আল জুমাদাস সানিয়াহ’।

সহজ করে বললে, প্রথমটি: ‘জুমাদাল উলা’; দ্বিতীয়টি: ‘জুমাদাল উখরা’ বা ‘জুমাদাল আখিরা’ অথবা ‘জুমাদাস সানিয়াহ’। ইমাম ফাররা (রহ.) বলেন, আরবি মাসের নামগুলো পুরুষবাচক, তবে ‘জুমাদা’ এই দুই মাস নয়; এই দুটি স্ত্রীবাচক। তিনি আরও বলেন, ‘জুমাদা’ শব্দের পুরুষবাচক প্রয়োগ দেখলে বুঝতে হবে এটি ‘শাহার’ শব্দের প্রতিশব্দ রূপে ব্যবহৃত হয়েছে।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘পরকালে নেককার মুমিন জান্নাতিগণের কোনো আফসোস থাকবে না; তাদের আফসোস থাকবে শুধু ওই সময়ের জন্য যে সময়গুলো তারা নেক আমল ছাড়া অতিবাহিত করেছে বা বেহুদা কাটিয়েছে।’ (তিরমিজি)

এই সূত্রে আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশে এই মাস দুটি ‘জমাদিউল আউয়াল’ ও ‘জমাদিউস সানি’ নামে সমধিক পরিচিত। (আল মুনজিদ)। ইমাম আবু হানিফা (রহ.) বলেন, ‘জুমাদা’ হলো শীতকাল। একত্রে এই দুই মাসকে ‘জুমাদায়ান’ বা ‘জুমাদায়িন’ বলা হয়, এই দুটি হলো ‘জুমাদা’ এর দ্বিবচন; অর্থ হলো ‘জুমাদাদ্বয়’। ‘জুমাদা’ এর বহুবচন হলো ‘জুমাদাত’, অর্থাৎ জুমাদাসমূহ। (লিসানুল আরব, ইবসে মানযূর)

কোরআন মজিদে ‘জুমাদা’ শব্দটি ‘জামিদাহ’ রূপে মাত্র একবার রয়েছে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন, ‘তুমি পর্বতমালা দেখছ, মনে করছ উহা “জামিদাহ” (স্থির অবিচল), অথচ তা মেঘপুঞ্জের ন্যায় সঞ্চরমান। ইহা আল্লাহরই সৃষ্টি নৈপুণ্য, যিনি সবকিছুকে করেছেন সুষম। তোমরা যা করো, সে সম্পর্কে তিনি সম্যক অবগত।’ (সুরা-২৭ নমল, আয়াত: ৮৮)

অন্যান্য মাসের মতো এই মাসেও অধিক পরিমাণে নেক আমল করা বাঞ্ছনীয়। যথা: নফল নামাজ, নফল রোজা, দান খয়রাত ইত্যাদি। পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ নামাজের পাশাপাশি পাঁচ ওয়াক্ত নফল নামাজ, তথা তাহাজ্জত, ইশরাক, চাশত, জাওয়াল ও আওয়াবিন নামাজ আদায় করা।

কাজা রোজা থাকলে পুরা করা; মান্নত রোজা থাকলে তা আদায় করা। মাসের ১ তারিখ, ১০ তারিখ, ২৯ ও ৩০ তারিখ রোজা রাখা এবং চাঁদের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখ ‘আইয়ামে বিদ’–এর সুন্নাত রোজা রাখা। সপ্তাহে প্রতি সোমবার, বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার নফল রোজা করা। বিশেষত ‘জুমাদাল উখরা’ তথা ‘দ্বিতীয় জুমাদা’ মাসে ‘রজব’ মাসের প্রস্তুতি হিসেবে আরও বেশি নেক আমল এবং অধিক পরিমাণে নফল নামাজ ও নফল রোজা পালন করা।

সময়ের গুরুত্ব সম্পর্কে আল্লাহ রাব্বুল ইজ্জাত বলেন, ‘সময়ের শপথ! নিশ্চয় মানুষ রয়েছে নিশ্চিত ক্ষতিতে। তারা ব্যতীত যারা ইমান এনেছে, আর নেক আমল করেছে। এবং একে অন্যকে সত্যের উপদেশ দিয়েছে ও একে অন্যকে ধৈর্যে উৎসাহ জুগিয়েছে।’ (সুরা-১০৩ আসর, আয়াত: ১-৩)

দোয়া কালাম, দরুদ ও সালাম, তাসবিহ তাহলিল, তাওবা ইস্তিগফার, জিকির ও তিলাওয়াত, সদকা খয়রাত ইত্যাদি আমলের মাধ্যমে মাসটি অতিবাহিত করলে, নিশ্চিত তার বরকতে ফজিলত ও কল্যাণ লাভ হবে। অন্যথায় সময়ের অপচয়ের জন্য অনুতাপ ও অনুশোচনা করতে হবে।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘পরকালে নেককার মুমিন জান্নাতিগণের কোনো আফসোস থাকবে না; তাদের আফসোস থাকবে শুধু ওই সময়ের জন্য যে সময়গুলো তারা নেক আমল ছাড়া অতিবাহিত করেছে বা বেহুদা কাটিয়েছে।’ (তিরমিজি)

আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা নেক আমলের প্রতিযোগিতা করো।’ (সুরা-২ বাকারা, আয়াত: ১৪৮) প্রতিযোগিতায় অগ্রগামী হওয়ার জন্য প্রয়োজন বাড়তি নফল ইবাদত। যেসব দিবস ও মাসের বিশেষ ফজিলত ও বিশেষত্ব কোরআন হাদিসে উল্লেখ হয়নি, তাতে অধিক নেক আমল করলে আমলকারী অবশ্যই অন্যদের অপেক্ষা এগিয়ে যাবেন।

  • মুফতি মাওলানা শাঈখ মুহাম্মাদ উছমান গনী

    যুগ্ম মহাসচিব, বাংলাদেশ জাতীয় ইমাম সমিতি; সহকারী অধ্যাপক, আহ্ছানিয়া ইনস্টিটিউট অব সুফিজম

    [email protected]