একবার ভেবে দেখুন তো, লন্ডনে বসে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী যদি স্কটদের বলে দেন যে—তাদের নিজস্ব পার্লামেন্ট, ফুটবল দল বা জাতীয় পতাকা থাকবে না! কিংবা ওয়েলশবাসীকে বলে দেওয়া হলো—তাদের ভাষা ও সাহিত্য নিষিদ্ধ, স্কুলে তা আর শেখানো যাবে না! এমনটা হলে কী হতো? ক্ষোভের আগুনে হয়তো পুরো যুক্তরাজ্যই ফেটে পড়তো।
অথচ চীনজুড়ে ঠিক এই কাজই করছেন দেশটির কমিউনিস্ট সম্রাট সি চিন পিং। চীনের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৯ শতাংশ; অর্থাৎ সাড়ে ১২ কোটি মানুষই কোনো না কোনো ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী বা ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্য। তাদের ওপরই এখন এটি চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
সি চিন পিংয়ের দাবি, নতুন ‘জাতীয় সংহতি’ আইনের মাধ্যমে দেশের ঐক্য জোরদার হবে এবং সবাইকে মূলধারায় যুক্ত করা যাবে। মান্দারিন ভাষা সবার জন্য বাধ্যতামূলক করলে নাকি মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত হবে, কাজের সুযোগ বাড়বে। সি প্রায়ই বলেন, চীনের শক্তি বাড়াতে সব সংখ্যালঘু জাতিকে ‘ডালিমের দানার মতো একে অপরের সঙ্গে শক্ত করে জমে থাকতে হবে।’
কিন্তু তিব্বতি, মঙ্গোলীয় ও উইঘুরদের মতো জাতিগোষ্ঠীগুলো এই যুক্তি মানতে নারাজ। তারা নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতিকে ভালোবাসে। তাদের কাছে এটি জোরপূর্বক রূপান্তরের চেষ্টা বা একধরনের ‘জাতিগত নিধন’ ছাড়া আর কিছুই নয়।
নতুন এই আইনের বিরুদ্ধে পশ্চিমা সরকারগুলো প্রতিবাদ জানিয়েছে, তবে তা খুব জোরালো নয়। মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল অবশ্য বেশ কড়া ভাষায় এর নিন্দা করেছে। গত মাসে নিউইয়র্কে জাতিসংঘের কার্যালয়ের সামনে ‘ফ্রি তিব্বত’ আন্দোলনের কর্মী লোবগা রাংজেন নামের একজন গায়ে আগুন দিয়ে আত্মহত্যা করেন। এই মর্মান্তিক ঘটনার পর বিশ্ববাসীর দৃষ্টি সাময়িকভাবে তিব্বতের দিকে গিয়েছিল।
তবে চীন সরকারের এমন নিষ্ঠুরতা নতুন কিছু নয়। তিব্বতে সর্বাত্মক দমন-পীড়ন আর সি চিন পিংয়ের বন্দিশিবিরগুলো তাঁর দীর্ঘদিনের ভিন্নমত দমনের চেষ্টার অংশমাত্র। নতুন আইন এবং এর কঠোর শাস্তি সি ও তাঁর দলের কর্তৃত্বকে আরও পোক্ত করবে। দেশ-বিদেশে অবস্থানরত চীনা নাগরিকদেরও আইনের আওতায় আনা হয়েছে, যাতে কেউ প্রতিবাদ করার সাহস না পান।
চীন সরকারের এসব কর্মকাণ্ড দেখে পশ্চিমা বিশ্বের মধ্যে একধরনের হতাশা চলে এসেছে। তারা হয়তো ধরে নিয়েছে যে চীনকে আর ঠেকানো সম্ভব নয়। তিব্বত-উইঘুরদের ওপর অত্যাচার, হংকংয়ে গণতন্ত্র হত্যা, অথবা জিমির লাইয়ের মতো নেতাদের শাস্তি দেওয়া—সবকিছুতেই তারা চুপ। এমনকি গির্জা ও স্বাধীন ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলোকে দমন করলেও কেউ মুখ খুলছে না।
মনে হচ্ছে, চীনের অর্থনীতি ও সামরিক শক্তি এতই বিশাল যে তাদের ওপর প্রভাব বিস্তার করা কঠিন। তাই অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক না গলানোকেই নিরাপদ মনে করছে অনেকে। ব্রিটেনসহ অধিকাংশ পশ্চিমা দেশ বাণিজ্য নাকি নিরাপত্তা—কোনটি বেছে নেবে, তা নিয়ে দোটানায় রয়েছে। মানবাধিকার প্রশ্নে তারা এখন পুরোপুরি নীরব।
কিন্তু সি চিন পিং শুধু দেশের ভেতরেই থেমে নেই; প্রায় ১৫ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকা ৭৩ বছর বয়সী এই নেতা এখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বেশ আক্রমণাত্মক। তিনি চীনকে বিশ্বের প্রধান শক্তিতে পরিণত করতে চান এবং যুক্তরাষ্ট্রকে পেছনে ফেলতে চান।
যুক্তরাষ্ট্র এখন আশঙ্কায় রয়েছে যে তারা হয়তো এআই যুদ্ধে চীনের কাছে হেরে যাচ্ছে। চীনা বিশ্লেষকদের মতে, উন্নয়নশীল ২৮টি দেশের সঙ্গে চীন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে চুক্তি করার পরই ট্রাম্প এই বৈঠকের প্রস্তাব দেন। ট্রাম্প নিজেও সম্প্রতি বলেছেন যে এআই প্রযুক্তি বিশ্বরাজনীতির মোড় ঘুরিয়ে দেবে। আর যারা এই প্রযুক্তিতে এগিয়ে থাকবে, তারাই একবিংশ শতাব্দীতে বিশ্ব শাসন করবে।
তাঁর মূল লক্ষ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে ক্ষমতা ছাড়ার আগেই তাইওয়ান দখল করা এবং এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে একক প্রভাব বিস্তার করা। মাও সে–তুংয়ের পর নিজেকে চীনের সবচেয়ে প্রভাবশালী নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতেই তাঁর এই প্রচেষ্টা।
২০২৭ সালে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির ২১তম কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হবে। এটি সি চিন পিংয়ের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বছর। আর তাই এখন থেকেই তিনি প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তাঁর একচ্ছত্র ক্ষমতার সামনে এখন আর কোনো বড় বাধা নেই। হেবেই প্রদেশের বিদাইহে শহরের রুদ্ধদ্বার বৈঠকে কমিউনিস্ট পার্টির জ্যেষ্ঠ নেতারা সি চিন পিংয়ের প্রতি একনিষ্ঠ আনুগত্য প্রকাশের আশ্বাস দিয়েছেন। সম্প্রতি চীন সরকার তাদের রাজনৈতিক ও সামরিক বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদের ওপর বড় ধরনের রদবদল বা শুদ্ধি অভিযান চালিয়েছে, যা অনেককে স্ট্যালিনের আমলের কথা মনে করিয়ে দেয়।
বিশ্বজুড়ে চীনের এই আগ্রাসী মনোভাব স্পষ্ট। সম্প্রতি জাপানের সঙ্গে নতুন করে বিতর্ক উসকে দিয়েছে তারা। দক্ষিণ চীন সাগরে ফিলিপাইনকে ক্রমাগত উসকানি দিচ্ছে এবং তাইওয়ানকে ভয় দেখানো অব্যাহত রেখেছে।
সম্প্রতি জাপানের প্রতিরক্ষা বিষয়ক বার্ষিক প্রতিবেদনে চীনকে এক ‘অভূতপূর্ব কৌশলগত চ্যালেঞ্জ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। মার্কিন নৌবাহিনীর জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা স্যামুয়েল পাপারো সতর্ক করে বলেছেন, ওই অঞ্চলে নিজের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে চীন যা ইচ্ছা তা-ই করছে।
সি চিন পিং এখন যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা বিশ্বকে বিভিন্ন দিক থেকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিচ্ছেন। চীন নাকি ইরানকে আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ও ৪০০টি রকেট সরবরাহ করার পরিকল্পনা করছে। ইউক্রেন যুদ্ধেও রাশিয়াকে পরোক্ষভাবে সহায়তা করে যাচ্ছে তারা।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া শুল্কের জবাবে চীনও কড়া পদক্ষেপ নিচ্ছে। গত বছর তারা বিরল খনিজ রপ্তানি বন্ধের হুমকি দিয়েছিল, যা ওয়াশিংটনকে বেশ দুশ্চিন্তায় ফেলেছিল। আর এই তো সেদিন ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন শুল্ক আরোপের জবাবে চীন তাদের ড্রোন প্রযুক্তি বিক্রি বন্ধ করে দিয়েছে।
সি চিন পিংয়ের এই আগ্রাসী হয়ে ওঠার পেছনে ট্রাম্পের নীতিগুলোর বড় ভূমিকা রয়েছে। বিশ্বরাজনীতিতে ট্রাম্পের খামখেয়ালিপনাসুলভ আচরণ আন্তর্জাতিক আইন ও বিভিন্ন দেশের সার্বভৌমত্বকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়েছে। ভেনেজুয়েলা ও গ্রিনল্যান্ড ঘিরে ট্রাম্পের অবস্থান এবং জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া বা ন্যাটোর মতো মিত্রদের সঙ্গে তাঁর টানাপোড়েন চীনের জন্য সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র যখন এশিয়া থেকে মুখ ফিরিয়ে নিজেদের মহাদেশের দিকে বেশি মনোযোগ দিচ্ছে, ঠিক তখনই চীন সেই খালি জায়গা দখল করে নিচ্ছে।
তাই হয়তো গত মে মাসে বেইজিংয়ে বৈঠকের পরপরই আগামী মাসে ওয়াশিংটনে ট্রাম্পের সঙ্গে দেখা করতে রাজি হয়েছেন সি চিন পিং।
এই দুই নেতার আসন্ন বৈঠকের মূল আলোচনার বিষয় হতে পারে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই। যুক্তরাষ্ট্র এখন আশঙ্কায় রয়েছে যে তারা হয়তো এআই যুদ্ধে চীনের কাছে হেরে যাচ্ছে। চীনা বিশ্লেষকদের মতে, উন্নয়নশীল ২৮টি দেশের সঙ্গে চীন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে চুক্তি করার পরই ট্রাম্প এই বৈঠকের প্রস্তাব দেন। ট্রাম্প নিজেও সম্প্রতি বলেছেন যে এআই প্রযুক্তি বিশ্বরাজনীতির মোড় ঘুরিয়ে দেবে। আর যারা এই প্রযুক্তিতে এগিয়ে থাকবে, তারাই একবিংশ শতাব্দীতে বিশ্ব শাসন করবে।
এই শীর্ষ বৈঠক থেকে হয়তো আবারও স্পষ্ট হবে যে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা, তাইওয়ান সংকট এবং বাণিজ্য ও প্রযুক্তি যুদ্ধে সি চিন পিং যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন।
তবে দিন শেষে সি চিন পিং একজন একনায়ক শাসকমাত্র, যিনি জোর করে ক্ষমতায় টিকে আছেন। তিনি দেশের অর্থনৈতিক সংকট মেটাতে ব্যর্থ হচ্ছেন। ভারতের মতো চীনের তরুণসমাজও তাঁর এই দমন–পীড়ন চিরকাল মেনে নেবে না। কে জানে, হয়তো তাঁর এই নতুন ‘জাতীয় সংহতি’ আইনই তাঁর পতনের কারণ হয়ে দাঁড়াবে—যেমনটা যুক্তরাজ্যে ঘটলে হতো।
তাই বিশ্ববাসীকে এখনই সতর্ক হতে হবে। বিশ্ব যখন ইরান, গাজা আর ইউক্রেন নিয়ে ব্যস্ত, ঠিক তখন সি চিন পিং আড়ালে থেকে নিজেদের প্রভাব বিস্তার করে চলেছেন। বিশ্বশান্তি ও সহাবস্থানের পথ বন্ধ করে তিনি আজ এক বড় হুমকি হয়ে উঠছেন।
সাইমন টিসডাল গার্ডিয়ানের আন্তর্জাতিক বিষয়ক কলামিস্ট।
গার্ডিয়ান থেকে সংক্ষেপে অনূদিত।