ইউরোপও কি টিকে থাকতে চীনের পথে হাঁটবে

ইউরোপ কি পারবে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে?ফাইল ছবি : রয়টার্স

ইরানে যুদ্ধ শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। তবে যুদ্ধরত দেশগুলোর বাইরে চীন ও ইউরোপেরই এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। জ্বালানির দাম যখন আকাশ ছুঁয়েছে, তখন ইউরোপের নেতারা গাড়ির হেডলাইটের আলোর সামনে থমকে পড়া খরগোশের মতো অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন।

অথচ চীন অত্যন্ত ধীরস্থিরভাবে এই সংকট মোকাবিলা করছে। চলতি সপ্তাহে হতে যাওয়া ডোনাল্ড ট্রাম্প ও সি চিন পিংয়ের শীর্ষ বৈঠকের আগে বেইজিংয়ের এই মাত্রার আত্মবিশ্বাস সত্যিই চোখে পড়ার মতো।

এর কারণ হলো, ‘বিধিহীনতার যুগ’ বা আনঅর্ডারের জন্য চীনের দারুণ প্রস্তুতি রয়েছে। এটি ঠিক বিশৃঙ্খলা নয়, যেখানে নিয়ম থাকে কিন্তু তা মানা হয় না। ‘বিধিহীনতা’ হলো এমন এক পৃথিবী, যেখানে নিয়মের আর কোনো গুরুত্বই অবশিষ্ট নেই। ইউরোপীয় সরকারগুলো যখন পুরোনো বিশ্বব্যবস্থা টিকিয়ে রাখার চিন্তায় মগ্ন ছিল, চীন তখন ঠিকই এই চরম নৈরাজ্যের মধ্যে টিকে থাকার কৌশল বের করে নিয়েছে।

প্রায় দেড় দশক আগেই চীন এই সময়ের পূর্বাভাস পেয়েছিল। তখন ইউরোপীয়রা তাদের নিরাপত্তার দায়িত্ব ন্যাটোর হাতে, বাণিজ্যের নিয়ম বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার হাতে এবং জ্বালানি সরবরাহের দায় রাশিয়া ও উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর ছেড়ে দিয়ে নিশ্চিন্ত ছিল।

ঠিক একই সময়ে বেইজিং গোপনে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেল, খাদ্য ও সেমিকন্ডাক্টর মজুত করেছে। তারা কৌশলে খনিজ সম্পদ ও ভবিষ্যতের প্রযুক্তির বাজার নিজেদের দখলে নিয়েছে।

দারিদ্র্য থেকে বাঁচতে এবং নিজেদের রক্ষা করতে ইউরোপকে এখন এই অরাজক বিশ্বে নিজস্ব শক্তিতে দাঁড়াতে হবে। এর জন্য তাদের চীনের কৌশলই অনুসরণ করতে হবে। চীন যেভাবে তাদের অভ্যন্তরীণ বাজার সুরক্ষিত রেখেছে এবং আগামীর প্রযুক্তিতে নিজেদের অবস্থান মজবুত করেছে, ইউরোপকেও ঠিক তা-ই করতে হবে।

সবাই এখন ট্রাম্পের যুক্তরাষ্ট্রের নাটকীয়তা দেখে মুগ্ধ হচ্ছে। তবে দীর্ঘ মেয়াদে বড় ঝুঁকি হলো, চীন ইউরোপের অর্থনীতিকে গ্রাস করছে। তারা ইউরোপের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা দুর্বল করে দিচ্ছে এবং শহরগুলোকে শিল্পহীন করার চেষ্টা করছে। চীন এখন তার অতিরিক্ত উৎপাদন ও মুদ্রাস্ফীতির সুযোগ নিয়ে ইউরোপের খোলাবাজার দখল করে নিচ্ছে। ফলে ইউরোপ এখন বেইজিংয়ের ব্ল্যাকমেল ও চাপের মুখে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।

ভবিষ্যতের শিল্পগুলোর দিকে তাকালে বিষয়টি স্পষ্ট হয়। ইরানের যুদ্ধের ফলে জ্বালানিসংকটে পড়ে ইউরোপ এখন পরিবেশবান্ধব জ্বালানির দিকে ঝুঁকছে। কিন্তু এই খাতের প্রধান উপাদান, যেমন ব্যাটারি, বৈদ্যুতিক গাড়ি ও সৌর প্যানেলের বাজার এখন চীনা কোম্পানিগুলোর দখলে। এমনকি উইন্ড এনার্জি বা বায়ুবিদ্যুতের সরবরাহব্যবস্থাও চীনের নিয়ন্ত্রণে চলে যাচ্ছে।

ইউরোপের নেতারা
ছবি: রয়টার্স

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, রাশিয়ার হুমকির মুখে ইউরোপ যখন সামরিক শক্তি বাড়াতে চাইছে, তখন তাদের সেই চীনের ওপরই নির্ভর করতে হচ্ছে। এদিকে চীন আবার মস্কোর সবচেয়ে বড় ব্যবসায়িক অংশীদার। ড্রোন সরবরাহের ৮০ শতাংশ এখন চীনের হাতে। যুদ্ধবিমান, ট্যাংক ও গোলাবারুদ তৈরির প্রধান উপাদান ম্যাগনেশিয়ামের ৯৭ শতাংশ সরবরাহ করে চীন।

বেইজিং বারবার দেখিয়েছে যে তারা রাজনৈতিক স্বার্থে এসব সরবরাহ বন্ধ করে দিতে পারে। যেমন ২০২৫ সালের অক্টোবরে শুল্ক নিয়ে দ্বন্দ্বের সময় ট্রাম্পকে পিছু হটতে বাধ্য করেছিল চীন।

অনেক ইউরোপীয় নেতা মনে করেন, বেইজিংয়ের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিলে তাঁরা চীনা বিনিয়োগ হারাবেন। কিন্তু হাঙ্গেরি বা স্পেনের মতো দেশগুলোকে চীন বিনিয়োগের যে লোভ দেখিয়েছে, তা বাস্তবে খুব সামান্যই কার্যকর হয়েছে।

ইউরোপ যদি চীনা পণ্যের ওপর কার্যকর শুল্ক আরোপ না করে, তবে চীনা কোম্পানিগুলো ইউরোপে কারখানা তৈরির বদলে চীন থেকেই পণ্য রপ্তানি করতে বেশি আগ্রহী হবে। এতে ইউরোপে কর্মসংস্থান বাড়বে না; বরং মার্সিডিজ বা পোর্শের মতো বিখ্যাত কোম্পানির শহরগুলো একসময় শিল্পশূন্য হয়ে পড়বে।

আরও পড়ুন

দারিদ্র্য থেকে বাঁচতে এবং নিজেদের রক্ষা করতে ইউরোপকে এখন এই অরাজক বিশ্বে নিজস্ব শক্তিতে দাঁড়াতে হবে। এর জন্য তাদের চীনের কৌশলই অনুসরণ করতে হবে। চীন যেভাবে তাদের অভ্যন্তরীণ বাজার সুরক্ষিত রেখেছে এবং আগামীর প্রযুক্তিতে নিজেদের অবস্থান মজবুত করেছে, ইউরোপকেও ঠিক তা-ই করতে হবে।

ইউরোপীয়দের উচিত হবে তাদের মূলধন যুক্তরাষ্ট্র বা অন্য কোথাও না পাঠিয়ে নিজেদের দেশে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও প্রতিরক্ষা খাতে বিনিয়োগ করা। প্রতিরক্ষাশিল্পকে সংকটমুক্ত রাখতে খনিজ সম্পদের নিজস্ব মজুত গড়ে তুলতে হবে। ইউরোপীয় দেশগুলোকে রাজনৈতিকভাবে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হতে হবে যে তারা শুধু নিজেদের তৈরি ব্যাটারি ব্যবহার করবে এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোয় চীনা প্রযুক্তি বর্জন করবে।

তবে শুধু ঝুঁকি কমানোই যথেষ্ট নয়। ইউরোপকে বুঝতে হবে যে তাদের হাতেও শক্তিশালী অস্ত্র আছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের ‘ট্রেড বাজুকা’ বা বাণিজ্য অস্ত্র ব্যবহার করার সময় এসেছে। ফ্রান্সের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা এখন চীনা পণ্যের ওপর ৩০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের কথা ভাবছেন।

আরও পড়ুন

এ ছাড়া ডিজিটাল মার্কেটস অ্যাক্টের মাধ্যমে টিকটক বা আলিবাবার মতো প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম সীমিত করা সম্ভব। এমনকি ইউরোপ চাইলে চীনের এয়ারবাস বিমানগুলোর সফটওয়্যার আপডেট বন্ধ করে দিয়ে তাদের অর্ধেক বাণিজ্যিক বিমান অচল করে দিতে পারে।

এই পদক্ষেপগুলো চীন ও ইউরোপকে সমপর্যায়ে নিয়ে আসবে। এটি শুধু চীনের ক্ষেত্রেই নয়; বরং ভবিষ্যতে ট্রাম্প যদি ইউক্রেনের সহায়তা বন্ধ করেন বা ইউরোপের প্রযুক্তিগত সুবিধা আটকে দেওয়ার হুমকি দেন, তবে সেই চাপ মোকাবিলাতেও সাহায্য করবে। ইউরোপীয় সরকারগুলো যখন নিয়ম রক্ষার বদলে এই বিশৃঙ্খল বিশ্বে টিকে থাকার কৌশল শিখবে, তখনই তারা সব ধরনের হুমকি মোকাবিলা করতে সক্ষম হবে।

  • মার্ক লিওনার্ড ইউরোপীয় কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের পরিচালক

    গার্ডিয়ান থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত