বিনিয়োগ নিয়ে যে কথা চালু আছে, তা হলো ঘোড়াকে টেনে পানিতে নামানো যায়, কিন্তু জোর করে তাকে পানি খাওয়ানো যায় না। দেশের বিনিয়োগ পরিস্থিতি এ রকমটাই, যদিও কয়েকজন কর্তাব্যক্তির বিক্ষিপ্ত বচন সুধায় মনে হচ্ছে উন্নয়নের হাইস্পিড এই বুঝি শুরু হলো।
জিডিপির অংশ হিসেবে ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ এখন প্রায় শতকরা ২২ ভাগ, যা গত ১১ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। কোভিড-পূর্ব বছরে এটি ২৫ ভাগ ছাড়িয়ে যায়। তারপর কিঞ্চিৎ স্থবিরতার পর কমতে থাকে এবং ২০২৪-এ এটি শতকরা ২৩ দশমিক ৯৬, অর্থাৎ প্রায় ২৪ ভাগে এসে ঠেকে।
এরপর ইউনূস আমলে জ্ঞানী–গুণীদের রাজত্বকালে একটা বাচনিক বিপ্লব সাধিত হলেও বিনিয়োগ ক্রমান্বয়ে অবক্ষয়ের দিকে গেছে। তিন শতাধিক কলকারখানা বন্ধ হওয়ায় প্রচলিত অনেক বিনিয়োগও ভেস্তে গেছে। মব সংস্কৃতির আকস্মিক উত্থানে নতুন উদ্যোক্তারাও জড়সড় ছিলেন। মাত্র ১০ বছরে দেশ যে সিঙ্গাপুরের পথে হাঁটার কথা ছিল, সে পথ শিগগির মিলে গেছে দিগন্তরেখায়। জাতি ছিল একটি নির্বাচিত সরকারের প্রতীক্ষায়।
কিন্তু নির্বাচিত সরকারের প্রথম আট মাসেও বিনিয়োগের পালে হাওয়া লাগেনি। এখানে ইউনূস যুগের ভীতিকর প্রবণতাগুলো জেঁকে বসে আছে। সরকার নতুন বার্তা দিতে পারছে না।
১৯৯১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসার সময় ব্যক্তি বিনিয়োগ ছিল জিডিপির মাত্র সোয়া ১০ ভাগ। বিএনপি সরকার অব্যাহত গতিতে টেনে তুলে ১৯৯৬ সালে এটিকে প্রায় পৌনে ১৬ ভাগে পৌঁছে দিয়েছিল। এটি চাট্টিখানি কথা নয়। কারণ, তখন জ্বালানি, বিদ্যুৎ, যোগাযোগব্যবস্থা, প্রতিষ্ঠানের মান ও সর্বোপরি জনশক্তির উৎপাদনশীলতা এই পর্যায়ে ছিল না।
সাইফুর রহমানের মতো একজন অর্থনেতা নানা বাধা সত্ত্বেও বাজার অর্থনীতির সংস্কার এগিয়ে নিয়ে গেছেন। মূল দর্শনে ছিল দলমত-নির্বিশেষে মানুষের সার্বিক অংশগ্রহণ—কারণ বাজার মানেই মেলা, কারও বিয়েবাড়ি নয় যেখানে প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রিত। সরকার নিজেকেই প্রশ্ন করে দেখতে পারে যে সেই আবহাওয়া এখন বিরাজ করছে কি না।
২০০১ সালে ক্ষমতায় এসে বিএনপি হাতে পায় প্রায় শতকরা ১৮ ভাগের ব্যক্তি বিনিয়োগ। ক্ষমতার শেষ লগ্নে তারা এটিকে শতকরা প্রায় ২১ ভাগে উন্নীত করতে পেরেছিল। অবশ্য এই উন্নতি ১৯৯১-১৯৯৬ কালপর্বের সমতুল্য নয়। তবে বিনিয়োগের প্রবণতা রেখা ঊর্ধ্বমুখীই ছিল, যা এখন আর দেখা যায় না। সরকারের এ নিয়ে আত্মজিজ্ঞাসা থাকা উচিত।
ইউনূস আমলের মন্দাক্রান্ত বিনিয়োগ রোগ যদি বর্তমান সরকারকে পেয়ে বসে, তাহলে বুঝতে হবে যে মব সংস্কৃতির পুরোনো উপসর্গগুলো এই শাসনামলেও রয়ে গেছে। সে অভ্যাসগুলো না ছাড়লে বিএনপি সরকার বিনিয়োগে আগের মতো দক্ষতা দেখাতে সক্ষম হবে না। কূটনীতি ও রাজনৈতিক বিষয়ের সর্বজনীনতা নিশ্চিত না করে অংশগ্রহণমূলক অর্থনীতি সম্ভব নয়। ‘রংধনু জাতি’ তৈরি করতে হলে সাতটি রঙের প্রয়োজন। তিন রং দিয়ে হবে না।
বিএনপি সরকার বিজনেস মডেলের কোনো হোমওয়ার্ক না করেই কাজ শুরু করে দিয়েছে। পুরোনো একটি দোকানের মালিকানা হাতে পেলে নবদোকানির প্রথম কাজ ‘স্টকটেকিং’ বা কী কী জিনিস হাতে পেলাম তার একটি ফর্দ তৈরি করা। কী নেই—তারও একটি তালিকা করা। এর কোনোটিই হয়নি।
এক রাজনৈতিক বিশ্বাসের উদ্যোক্তারা জামাই আদর পেলে এবং আরেক রাজনীতির ব্যবসায়ীরা দৌড়ের ওপর থাকলে কিংবা উচ্চ চাঁদার চাপে থাকলে বিজনেস মডেল কাজ করে না। কারণ, প্রতিটি ব্যবসা বা শিল্পপ্রতিষ্ঠানের থাকে পশ্চাদ্বর্তী ও অগ্রবর্তী সংযোগ, যাকে আমরা ‘ব্যাকওয়ার্ড অ্যান্ড ফরোয়ার্ড লিংকেজ’ বলি। যেমন: বিএনপির একজন বড় নেতা চিনিকলের মালিক হলেও কাজ করতে পারবেন না, যদি আখের জোগানদাতা আওয়ামী কৃষক নেতাকে আট মামলায় পলাতক থাকতে হয়।
অন্যদিকে চিনির বিপণনকর্তা হয়তো চাঁদার ভার সইতে না পেরে আলুর আড়তদার হয়ে গেছেন। ইউনূস আমলে মামলার যে বিস্ফোরণ দেখা গেছে, তার সিংহভাগ তাজা রেখে ব্যবসায়িক ঝুঁকি কমানো সম্ভব নয়। নিবর্তিত ব্যক্তিরা শুধু ভোক্তা হয়ে বেঁচে থাকতে চাইবে। উদ্যোক্তা হবে না। এ রকম একটি ‘ডিফেক্টিভ বিজনেস মডেল’ জিইয়ে রেখে বিনিয়োগ-জোয়ার সম্ভব নয়।
বিএনপি সরকার বিজনেস মডেলের কোনো হোমওয়ার্ক না করেই কাজ শুরু করে দিয়েছে। পুরোনো একটি দোকানের মালিকানা হাতে পেলে নবদোকানির প্রথম কাজ ‘স্টকটেকিং’ বা কী কী জিনিস হাতে পেলাম তার একটি ফর্দ তৈরি করা। কী নেই—তারও একটি তালিকা করা। এর কোনোটিই হয়নি।
অর্থমন্ত্রীর কোনো দর্শন আছে কি না টের পাওয়া যাচ্ছে না, দিকনির্দেশনাও দেখা যাচ্ছে না। তাঁর কথায় ‘ভঙ্গুর’ অর্থনীতি হাতে পেয়েছেন। তাই বছর দুই সময় লাগবে একে ঠিক করতে। সবচেয়ে বড় কথা, এটি যে ভঙ্গুর অর্থনীতি, তারই–বা পরিসংখ্যান কোথায়? আওয়ামী শাসনের শেষ বছরের শতকরা প্রায় ২৪ ভাগ ব্যক্তি বিনিয়োগ—অন্তত সেটি অর্জিত হোক। এগুলোর প্রস্তুতি কর্ম বা গবেষণা কোথায়?
অর্থনীতিবিদেরা বিনিয়োগ নিয়ে এত বিলাপ করেন কেন? কারণ, বিনিয়োগের ঘোড়া ছাড়া শেষতক ভোগের হাতিকে সামনে ঠেলা যায় না। ভোগ আর বিনিয়োগ জিডিপির প্রায় ৯০ ভাগ জায়গা দখল করে থাকে। সরকারের বিনিয়োগ এখন জিডিপির প্রায় সাত ভাগ, যা মোট বিনিয়োগকে ২৯ ভাগে তুলে দেয়। কেউ বলবেন, ব্যক্তি বিনিয়োগ না বাড়ুক, সরকার সে ফাঁকা জায়গা পূরণ করে দেবে। তা হয় না।
দুই বিনিয়োগের দুই ফল। সরকারের বিনিয়োগ রাষ্ট্রের জন্য অনেক বেশি দায় সৃষ্টি করে। কারণ, তাকে কর্জ করে ঘি খেতে হয়, যা দীর্ঘ মেয়াদে জাতির ঘাড়ে ঋণ ও সুদের বোঝা চাপায় এবং বাজেটের গলা চিপে ধরে। আবার কর্জ না করে এনে করের বোঝা জনতার ঘাড়ে চাপিয়েও সরকার তার বিনিয়োগ বাড়াতে পারে। সমস্যা হচ্ছে এতে ব্যক্তি ভোগ কমে যায়, যা ব্যক্তি বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করে।
বাঘে ছুঁলে যেমন আঠারো ঘা, সরকারি বিনিয়োগ বাড়লেও তা ভবিষ্যৎ সরকারগুলোর জন্য নানা সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে। আমলাতন্ত্র যুগোপযোগী হয় না বলে সরকারি বিনিয়োগে অদক্ষতা, অপচয় ও দুর্নীতি বাড়ে, যা প্রতিষ্ঠান নষ্ট করে।
পক্ষান্তরে ব্যক্তি বিনিয়োগ এসব সমস্যার জন্ম দেয় না। বরং এটি নতুন প্রযুক্তি আনে। আনে উদ্ভাবন। নিয়োগ ও আয় বাড়িয়ে রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় কল্যাণ সাধন করে। ব্যক্তি বিনিয়োগ বৃদ্ধির জায়গাটাতে কোনো আপস হয় না। তাই এই সময়ের বড় প্রশ্ন ব্যক্তি বিনিয়োগের বৃদ্ধিতে সরকারের করণীয় কী।
সরকার তিনটি ‘আর’-এর রণকৌশল ঠিক করেছে, যার মধ্যে রয়েছে ‘রিকভারি, রেস্টোরেশন অ্যান্ড রিকনস্ট্রাকশন। এটা কি যুদ্ধ–পরবর্তী কোনো পরিস্থিতি? জিডিপিতে কি কোনো মন্দা বা ‘রিসেশন’ হয়েছে, যে কারণে ‘রিকভারি’র কথা আসছে? ‘রেস্টোরেশন’ যদি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য হয়, তাহলে ঠিক আছে।
কিন্তু এটি তো রণকৌশল নয়, সরকারের প্রথম দায়িত্ব। কী কী অবকাঠামো এখানে বোমাবর্ষণে ধ্বংস হয়েছে যে এখানে রিকনস্ট্রাকশন দরকার? এ তো ১৯৭১ নয়। ১৯৪৪ সালের ব্রেটন উডস সম্মেলনের প্রিয় শব্দ ‘রিকনস্ট্রাকশন’, যা থেকে সেদিন বিশ্বব্যাংকের জন্ম হলো।
যে তিনটি ‘আর’ দিয়ে সরকারের রণকৌশল সাজানো উচিত, সেগুলো হচ্ছে ‘রিভিশন, রিফর্ম অ্যান্ড রি-এনগেজমেন্ট’। ইউনূস আমলে একদল অর্থনীতিবিদ বিনা মূল্যে শ্বেতপত্র করে দিয়েছেন বলে শুনেছি। এখন কিঞ্চিৎ পয়সা দিয়ে হলেও অর্থনীতির একটা অবস্থা যাচাইকরণ বা রিভিশন দরকার।
দ্বিতীয় হচ্ছে আওয়ামী আমলে ক্রম-অবনতিশীল ব্যাংক খাত ও পুঁজিবাজার, যা ইউনূস আমলে আরও ক্ষতের মুখে পড়েছে, তার সংস্কার। তৃতীয় কাজটি হলো অর্থনীতির সব উদ্যোক্তা ও কর্মীকে দলমত বা জাতিধর্ম-নির্বিশেষে আবার উৎপাদনকর্মে সংযুক্ত করা। কূটনীতি ও অভ্যন্তরীণ রাজনীতি অন্তর্ভুক্তিমূলক না হলে অর্থনীতি অন্তর্ভুক্তিমূলক হয় না। আর সেটি না হলে বিনিয়োগের পুনর্জাগরণ কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
ড. বিরূপাক্ষ পাল স্টেট ইউনিভার্সিটি অব নিউইয়র্ক অ্যাট কোর্টল্যান্ড-এ অর্থনীতির অধ্যাপক
মতামত লেখকের নিজস্ব
