ইরান যুদ্ধ আর কত দিন চলবে

যুক্তরাষ্ট্র–ইরান যুদ্ধ এখন অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগে রূপ নিয়েছে। কোনো পক্ষই পিছু হটতে প্রস্তুত নয়।কোলাজ: প্রথম আলো

ইরান যুদ্ধ এখন তৃতীয় মাসে প্রবেশ করেছে। এই যুদ্ধ আর কত দিন চলবে, তা ক্রমেই অনিশ্চিত হয়ে উঠছে। কিছুদিন আগপর্যন্ত মনে হচ্ছিল, দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত এড়ানোর ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের স্বার্থ এক জায়গায় মিলেছে (যদিও ইসরায়েলের ক্ষেত্রে সেটা মেলেনি)। গত মাসে ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র–ইরানের মুখোমুখি বৈঠক অনুষ্ঠিত হলে এ ধারণা আরও জোরালো হয়।

এরপর শান্তিপ্রক্রিয়া স্থবির হয়ে পড়ে এবং পাকিস্তানের (গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক দেশগুলোও সমর্থন দিয়েছে) তীব্র প্রচেষ্টা সত্ত্বেও দ্বিতীয় দফা আলোচনা আর এগোয়নি। পাকিস্তানের সক্রিয় মধ্যস্থতায় পরে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদান ও প্রস্তাব নিয়ে দর-কষাকষি চলতে থাকে। সেই প্রক্রিয়া এখনো অব্যাহত।

এখন পর্যন্ত যুদ্ধবিরতি টিকে আছে। এটি ইতিবাচক। কিন্তু টালমাটাল পরিবেশের মধ্যে এটি একটি নাজুক সমঝোতা। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র—দুই পক্ষ প্রকাশ্যে কঠোর অবস্থান নেওয়ায় সংকট থেকে বের হওয়ার পথ খুঁজে পাওয়া কঠিন করে তুলেছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কখনো সামরিক অভিযান পুনরায় শুরুর হুমকি দিচ্ছেন, আবার কখনো আলোচনার প্রতি আগ্রহের ইঙ্গিত দিচ্ছেন। এতে বোঝা কঠিন হয়ে পড়েছে, তিনি আসলে কী চান।

চাপ সৃষ্টির জন্য হুমকি দেওয়া এক জিনিস, কিন্তু হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর অবরোধের মতো পদক্ষেপ যখন নতুন করে সামরিক সংঘাতের ঝুঁকি বাড়ায়, তখন তা ভিন্ন বিষয়। ইরান তাঁকে জানিয়েছে যে দেশটি ধ্বংসের মুখে—ট্রাম্পের এমন অসৎ দাবিও পরিস্থিতি জটিল করে তোলে। যুদ্ধ শেষ করতে ইরানের তিন ধাপের পরিকল্পনা—যেখানে শুরুতে পারমাণবিক ইস্যুটি বাদ রেখে পরে তা আলোচনার কথা বলা হয়েছিল—ট্রাম্প সেটা প্রত্যাখ্যান করেছেন। তেহরানের সংশোধিত প্রস্তাবও তিনি নাকচ করেছেন।

অন্যদিকে হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ইরান যুক্তরাষ্ট্র, তার উপসাগরীয় মিত্রদের এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর যুদ্ধের বড় ব্যয় বাড়িয়েছে। ইরান দেখিয়েছে, তারা কার্যকরভাবে অসম যুদ্ধ চালাতে পারে এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সামরিক হামলার বড় ধরনের চাপও সহ্য করতে পারে।

দুই পক্ষই এখন নমনীয়তা দেখাতে অনিচ্ছুক। কারণ, এতে প্রতিপক্ষ দুর্বলতা হিসেবে ধরে নিতে পারে এবং নিজেদের ‘জয়’ হিসেবে প্রচার করতে পারে। এর ফলে কূটনৈতিক অচলাবস্থা দীর্ঘায়িত হচ্ছে এবং সংঘাত থেকে দ্রুত বেরিয়ে আসার পথও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। যদি দুই পক্ষ মনে করে যে আপসের চেয়ে বর্তমান উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি বজায় রাখাই কম ক্ষতিকর, তাহলে যুদ্ধ দ্রুত শেষ হওয়ার সম্ভাবনা আরও কমে যায়।

ওয়াশিংটন ও তেহরান যুদ্ধ কবে শেষ হবে, তা নিয়ে ভিন্ন সময়সীমা দিয়েছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প প্রায়ই বলেছেন, এটি কয়েক সপ্তাহ, এমনকি কয়েক দিনের মধ্যেই শেষ হবে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে তিনি ‘শিগগির’ সমাপ্তির সম্ভাবনা নাকচ করে বলেছেন, ভিয়েতনাম ও ইরাকের দীর্ঘ যুদ্ধের তুলনায় ‘চার সপ্তাহ’ কিছুই নয়। ইরানের নেতারা বলেছেন, তাঁরা সংঘাত শেষ করতে প্রস্তুত, তবে ভবিষ্যতে যে আর কোনো আগ্রাসন হবে না, তার নিশ্চয়তা চান। ফলে দুই পক্ষই যুদ্ধ শেষ করতে চাইলেও এমন শর্ত দিচ্ছে, যেটা অপর পক্ষ গ্রহণযোগ্য বলে মনে করছে না।

এ অবস্থায় কোন পক্ষ যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করতে বেশি আগ্রহী, তা নির্ধারণ করা কঠিন। কিছু বিশ্লেষক মনে করেন, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করার ব্যাপারে ইরানের আগ্রহ থাকতে পারে। ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসে এডওয়ার্ড লুস লিখেছেন, দীর্ঘ সময় ধরে কৌশলগত জলপথ বন্ধ রেখে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের ওপর বেশি চাপ সৃষ্টি করতে পারে, বিশেষ করে ট্রাম্পের প্রধান যুদ্ধ–লক্ষ্যই যখন হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া।

এমন যুক্তিও রয়েছে যে ইরান মনে করে, সময় তাদের পক্ষেই আছে। বৈশ্বিক জ্বালানিবাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করে এবং ট্রাম্পের ওপর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ বাড়িয়ে ইরান ভবিষ্যতে আরও ভালো চুক্তি আদায় করতে পারে। তবে দীর্ঘ সংঘাত ইরানের অর্থনৈতিক সংকটও বাড়াবে। মুদ্রাস্ফীতি ইতিমধ্যে রেকর্ড পর্যায়ে। তেলের রপ্তানি সক্ষমতা কমে গেলে তাতে আরও বড় মূল্য দিতে হবে।

যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে ট্রাম্প মনে করেন, দীর্ঘ অবরোধের মাধ্যমে ইরানকে তাঁর শর্তে চুক্তি করতে বাধ্য করা যাবে। তিনি বারবার বলেছেন, মাসের পর মাস এই অবরোধ চালিয়ে যাবেন, যাতে ইরান আলোচনায় বসতে বাধ্য হয়। এতে দ্রুত যুদ্ধ শেষ হওয়ার সম্ভাবনা কমে যায়।

ওয়াশিংটনের ধারণা, ‘গানবোট কূটনীতি’ ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে শ্বাসরোধ করবে, তেল রপ্তানি বন্ধ করবে এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সংকট সৃষ্টি করবে। তখন তেহরানের সামনে যুক্তরাষ্ট্রের শর্ত মেনে নেওয়া ছাড়া আর উপায় থাকবে না। কিন্তু দীর্ঘ অবরোধ ট্রাম্পের নিজেরই লক্ষ্য—নিজের দেশে জ্বালানির মূল্য ও মুদ্রাস্ফীতি কম রাখা—এর বিরুদ্ধে যাবে।

যুক্তরাষ্ট্র–ইরান যুদ্ধ এখন অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগে রূপ নিয়েছে। কোনো পক্ষই পিছু হটতে প্রস্তুত নয়। যদিও দুই পক্ষেরই অর্থনৈতিক স্বার্থে দ্রুত যুদ্ধ শেষ হওয়া উচিত। সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো দীর্ঘস্থায়ী মুখোমুখি অবস্থান—যেখানে সক্রিয় যুদ্ধ না থাকলেও মাঝেমধ্যে সংঘাত জ্বলে উঠবে, কিন্তু কোনো সমাধান হবে না। এতে পরিস্থিতি অত্যন্ত অস্থিতিশীল হয়ে উঠবে এবং ভুল হিসাবের কারণে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধে ফেরার ঝুঁকি বাড়বে। অবশ্যই ইসরায়েল এমন পরিস্থিতি স্বাগত জানাবে।

দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের অর্থনৈতিক প্রভাব বিশ্ব অর্থনীতি এবং বিশ্বের বহু দেশের (বিশেষ করে বৈশ্বিক দক্ষিণের) ওপর পড়বে। বর্তমান পরিস্থিতিকে ‘ইতিহাসের সবচেয়ে বড় তেল সরবরাহের ধাক্কা’ বলা হচ্ছে। এর ফলে জ্বালানিবাজার অস্থির হয়ে উঠেছে। সরবরাহ কমে যাওয়ার আশঙ্কা এবং মজুত হ্রাসের কারণে তেলের দাম বেড়েছে। এলএনজিরও দাম বেড়েছে।

এই জ্বালানিসংকট বিশ্বজুড়ে মুদ্রাস্ফীতি বাড়াচ্ছে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমিয়ে দিচ্ছে এবং মন্দার ঝুঁকি তৈরি করছে। সার, হিলিয়াম, অ্যালুমিনিয়াম ও পেট্রোকেমিক্যালের মতো গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের সরবরাহও ব্যাহত হয়েছে। এর ফলে খাদ্য উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং দরিদ্র দেশগুলোয় খাদ্যের দাম আরও বাড়ছে। জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জ্বালানি ও খাদ্যের দাম বাড়লে কোটি কোটি মানুষ দারিদ্র্যে পড়বে।

এই দীর্ঘ সংঘাতের অর্থনৈতিক প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রকেও ছাড় দিচ্ছে না। জ্বালানির দাম বাড়ায় মুদ্রাস্ফীতির চাপ বেড়েছে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। আসন্ন মধ্যবর্তী কংগ্রেস নির্বাচনের আগে এটি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জন্য রাজনৈতিক ক্ষতির কারণ হতে পারে। কারণ, জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে জনগণের অসন্তোষ বাড়ছে এবং তাঁর জনপ্রিয়তা কমছে। সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, মাত্র ৩০ শতাংশ মানুষ অর্থনীতি পরিচালনায় ট্রাম্পের ভূমিকা সমর্থন করেন এবং ৬১ শতাংশ মানুষ মনে করেন, ইরানে হামলা করা ভুল ছিল।

ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো—যুদ্ধ শুরু করা সহজ, কিন্তু শেষ করা কঠিন। ইরান সংকট সেই সত্যেরই আরেকটি উদাহরণ।

  • মালিহা লোধি যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও জাতিসংঘে নিযুক্ত সাবেক রাষ্ট্রদূত

    দ্য ডন থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত