রোগনির্ণয়ের সংকট কাটাতে ল্যাব-মেডিসিনে সংস্কার দরকার

বাংলাদেশে ইনস্টিটিউট অব ল্যাবরেটরি মেডিসিন অ্যান্ড রেফারেল সেন্টার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে। এটি দেশের ল্যাবরেটরি মেডিসিনের শীর্ষ প্রতিষ্ঠান এবং জাতীয় রেফারেন্স সেন্টার হিসেবে কাজ করার কথা। বাস্তবে প্রতিষ্ঠানটি সেবা প্রদানের চাপেই অনেকাংশে ভারাক্রান্ত।ছবি: প্রথম আলো

একটি আধুনিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হলো ল্যাবরেটরি মেডিসিন ও ডায়াগনস্টিকস। সংক্রামক রোগ থেকে ক্যানসার, ডায়াবেটিস, হৃদ্‌রোগ কিংবা কিডনির রোগ—সঠিক ও সময়মতো রোগনির্ণয় ছাড়া কার্যকর চিকিৎসা সম্ভব নয়।

রোগের নজরদারি, মহামারি মোকাবিলা এবং অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স নিয়ন্ত্রণেও শক্তিশালী ল্যাবরেটরি ব্যবস্থা অপরিহার্য। কিন্তু বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার এই গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভটি দীর্ঘদিন প্রয়োজনীয় নীতিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক গুরুত্ব পায়নি।

দেশে সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেবার ব্যাপক সম্প্রসারণ ঘটলেও ল্যাবরেটরি সেবা গড়ে উঠেছে মূলত বিচ্ছিন্ন ও হাসপাতালকেন্দ্রিকভাবে।

ফলে আধুনিক প্রযুক্তি, দক্ষ জনবল, মাননিয়ন্ত্রণ, জাতীয় রেফারেল নেটওয়ার্ক এবং গবেষণার সমন্বিত কাঠামো এখনো দুর্বল।

এখন সময় এসেছে ল্যাবরেটরি মেডিসিনকে স্বাস্থ্যব্যবস্থার একটি মৌলিক স্তম্ভ হিসেবে বিবেচনা করার। এর মধ্য দিয়ে ল্যাবরেটরি মেডিসিনকে একটি আধুনিক, সমন্বিত ও মাননিয়ন্ত্রিত জাতীয় ল্যাবরেটরি নেটওয়ার্ক গড়ে তোলারও গভীর প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। এই প্রয়োজনীয়তাকে প্রথম স্বিকার করতে হবে।

জাতীয় প্রতিষ্ঠান আছে, কিন্তু জাতীয় রেফারেন্স ল্যাবের ভূমিকা সীমিত

বাংলাদেশে ইনস্টিটিউট অব ল্যাবরেটরি মেডিসিন অ্যান্ড রেফারেল সেন্টার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে।

নামের মধ্যেই এর প্রত্যাশিত ভূমিকা স্পষ্ট। এটি শুধু আরেকটি ডায়াগনস্টিক সেন্টার হওয়ার কথা নয়; বরং দেশের ল্যাবরেটরি মেডিসিনের শীর্ষ প্রতিষ্ঠান এবং জাতীয় রেফারেন্স সেন্টার হিসেবে কাজ করার কথা।

কিন্তু বাস্তবে প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে বিপুলসংখ্যক রোগীর দৈনন্দিন পরীক্ষা ও সেবা প্রদানের চাপেই অনেকাংশে ভারাক্রান্ত।

ফলে একটি জাতীয় রেফারেন্স প্রতিষ্ঠানের যেসব গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনের কথা—গবেষণা, প্রশিক্ষণ, নতুন ডায়াগনস্টিক প্রযুক্তির মূল্যায়ন ও প্রবর্তন, কোয়ালিটি অ্যাস্যুরেন্স, দেশের অন্যান্য ল্যাবরেটরিকে কারিগরি সহায়তা, জটিল বা অনিশ্চিত পরীক্ষার ফল পুনর্নিশ্চিতকরণ এবং প্রকৃত রেফারেল ল্যাবরেটরি হিসেবে কাজ করা, সেসব ভূমিকা প্রত্যাশিত মাত্রায় বিকশিত হতে পারেনি।

এই অবস্থার পরিবর্তন জরুরি। প্রতিষ্ঠানটিকে শুধু একটি উচ্চ ভলিউম ডায়াগনস্টিক সেন্টার হিসেবে পরিচালনা করলে এর প্রতিষ্ঠার মূল উদ্দেশ্যই অপূর্ণ থেকে যাবে।

এটিকে ধীরে ধীরে বাংলাদেশের জাতীয় রেফারেন্স ল্যাবরেটরি এবং ল্যাবরেটরি মেডিসিনের উৎকর্ষ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।

আরও পড়ুন

প্রতিটি হাসপাতালের আলাদা ল্যাব—এই পুরোনো মডেল বদলাতে হবে
বাংলাদেশের সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থায় ল্যাবরেটরি সেবার আরেকটি মৌলিক দুর্বলতা হলো এর অত্যন্ত খণ্ডিত কাঠামো।

এখনো অধিকাংশ হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান নিজস্বভাবে একটি করে ল্যাবরেটরি পরিচালনা করার চেষ্টা করে।

কোথাও রোগীর সংখ্যা বেশি, কোথাও খুব কম; কোথাও আধুনিক যন্ত্র আছে কিন্তু দক্ষ জনবল নেই, আবার কোথাও জনবল থাকলেও প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি, রিএজেন্ট, রক্ষণাবেক্ষণ অথবা মাননিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নেই।

ফলে একই ধরনের যন্ত্রপাতি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে আলাদাভাবে কিনতে হচ্ছে, পৃথকভাবে রিএজেন্ট ও ব্যবহার্য সামগ্রী সংগ্রহ করতে হচ্ছে এবং প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে আলাদা অবকাঠামো ও জনবল ধরে রাখতে হচ্ছে।

অথচ অনেক ক্ষেত্রেই এসব যন্ত্রপাতির পূর্ণ সক্ষমতা ব্যবহার হচ্ছে না। ফলে একদিকে ব্যয় বাড়ছে, অন্যদিকে পরীক্ষার মান ও নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করাও কঠিন হয়ে পড়ছে।

আধুনিক ল্যাবরেটরি মেডিসিন এখন ক্রমেই স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি, মলিকুলার ডায়াগনস্টিকস, ডিজিটাল প্যাথলজি, উন্নত মাইক্রোবায়োলজি, জিনোমিকস, ল্যাবরেটরি তথ্যব্যবস্থা এবং আধুনিক মাননিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠছে।

প্রতিটি ছোট বা মাঝারি হাসপাতালে এসব ব্যয়বহুল প্রযুক্তি ও বিশেষায়িত জনবল আলাদাভাবে রাখা যেমন বাস্তবসম্মত নয়, তেমনি অর্থনৈতিকভাবেও যুক্তিযুক্ত নয়।

বাংলাদেশের তাই এমন ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে যে প্রতিটি হাসপাতালকে সব ধরনের পরীক্ষা নিজস্ব ল্যাবেই করতে হবে।

আরও পড়ুন
আরও পড়ুন

দরকার একটি জাতীয় ল্যাবরেটরি নেটওয়ার্ক

আধুনিক ব্যবস্থা হতে পারে স্তরভিত্তিক ও নেটওয়ার্কভিত্তিক ল্যাবরেটরি ব্যবস্থা। রোগীর নিকটবর্তী স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নমুনা সংগ্রহ এবং জরুরি ও সাধারণ পরীক্ষা হবে; আর জটিল ও বিশেষায়িত পরীক্ষা পাঠানো হবে উচ্চতর সক্ষমতার আঞ্চলিক বা কেন্দ্রীয় ল্যাবরেটরিতে।

এই ব্যবস্থায় উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে থাকবে অপরিহার্য রোগনির্ণয় পরীক্ষার সক্ষমতা; এক বা একাধিক জেলার জন্য থাকবে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন আঞ্চলিক ল্যাবরেটরি কেন্দ্র; বিভাগীয় ও মেডিক্যাল কলেজ পর্যায়ে থাকবে উন্নত ও বিশেষায়িত রোগনির্ণয় সুবিধা; আর সর্বোচ্চ স্তরে জাতীয় প্রতিষ্ঠানটি কাজ করবে জাতীয় রেফারেন্স ল্যাবরেটরি এবং ল্যাবরেটরি মেডিসিনের উৎকর্ষ কেন্দ্র হিসেবে।

এর সঙ্গে গড়ে তুলতে হবে নিরাপদ ও দ্রুত নমুনা পরিবহন নেটওয়ার্ক এবং সমন্বিত ল্যাবরেটরি তথ্যব্যবস্থা। রোগীকে পরীক্ষার জন্য এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে ঘুরতে হবে না।

প্রয়োজনে নমুনা দ্রুত উপযুক্ত ল্যাবরেটরিতে পৌঁছাবে এবং পরীক্ষার ফল ডিজিটালভাবে সংশ্লিষ্ট হাসপাতাল ও চিকিৎসকের কাছে ফিরে আসবে।

এই সংস্কারের মূলনীতি খুবই সহজ—পরীক্ষার জন্য রোগী নয়, প্রয়োজনে রোগীর নমুনা যাবে উপযুক্ত ল্যাবরেটরিতে।

বৃহৎ পরিসরের সুবিধা: কম খরচে উন্নত মান

ল্যাবরেটরি সেবাকে সমন্বিত ও নেটওয়ার্কভিত্তিক ব্যবস্থায় রূপান্তরের একটি বড় সুবিধা হলো বৃহৎ পরিসরে সেবা দেওয়ার মাধ্যমে ব্যয় কমানো এবং মান বাড়ানো।

একটি আধুনিক উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ল্যাবরেটরিতে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক পরীক্ষা করা সম্ভব।

আঞ্চলিক বা কেন্দ্রীয় পর্যায়ে বেশি সংখ্যায় পরীক্ষা করা হলে স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার, যন্ত্রপাতির পূর্ণ সক্ষমতা কাজে লাগানো, বৃহৎ পরিসরে রিএজেন্ট ও ব্যবহার্য সামগ্রী ক্রয়ের মাধ্যমে মূল্য কমানো এবং বিশেষজ্ঞ জনবলের দক্ষ ব্যবহার সম্ভব হয়। এতে প্রতিটি পরীক্ষার গড় ব্যয়ও কমে আসে।

বর্তমানে একই ধরনের পরীক্ষা অসংখ্য প্রতিষ্ঠানে ছোট পরিসরে আলাদাভাবে করার কারণে যন্ত্রপাতি, জনবল, রিএজেন্ট ও মাননিয়ন্ত্রণে ব্যয় বেড়ে যায়, অথচ সব ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত মান নিশ্চিত হয় না।

একটি সুপরিকল্পিত জাতীয় ল্যাবরেটরি নেটওয়ার্ক এই অদক্ষতা কমিয়ে একই সঙ্গে পরীক্ষার মান বাড়াতে এবং ব্যয় কমাতে পারে।

এর সবচেয়ে বড় সুফল পাবেন রোগীরা, কম খরচে, দ্রুত এবং অধিক নির্ভরযোগ্য পরীক্ষার ফল।

আরও পড়ুন
আরও পড়ুন

শুধু যন্ত্র কিনলেই আধুনিক ল্যাব হয় না

আমাদের একটি ভুল ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে—শুধু আধুনিক যন্ত্রপাতি কিনলেই ল্যাবরেটরি আধুনিক বা মানসম্মত হয় না।

পরীক্ষার মান নির্ভর করে পুরো ব্যবস্থার ওপর সঠিকভাবে নমুনা সংগ্রহ ও শনাক্তকরণ, নিরাপদ পরিবহন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ, যন্ত্রের যথাযথ ক্যালিব্রেশন, অভ্যন্তরীণ মাননিয়ন্ত্রণ, বহিরাগত মান যাচাই, জীব–নিরাপত্তা, তথ্য ব্যবস্থাপনা এবং সময়মতো সঠিক ফল প্রদান, প্রতিটি ধাপেই মান নিশ্চিত করতে হয়।

তাই বাংলাদেশে একটি শক্তিশালী জাতীয় ল্যাবরেটরি মান ব্যবস্থাপনা কাঠামো গড়ে তোলা জরুরি।

সরকারি-বেসরকারি সব ল্যাবরেটরির জন্য অভিন্ন মানদণ্ড, স্বীকৃতি বা অ্যাক্রেডিটেশন, দক্ষতা যাচাই এবং বহিরাগত মাননিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা পর্যায়ক্রমে বাধ্যতামূলক করতে হবে।

লক্ষ্য হওয়া উচিত খুব স্পষ্ট। একটি পরীক্ষার ফল ঢাকা, ঝালকাঠি, রংপুর বা কক্সবাজার—যেখান থেকেই আসুক, চিকিৎসক ও রোগী যেন তার মান ও নির্ভুলতার ওপর সমানভাবে আস্থা রাখতে পারেন।

রোগীকে শুধু উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় ছুটতে হবে না; দেশের যে প্রান্তেই পরীক্ষা করানো হোক, সেই ফলের ওপর চিকিৎসক যেন প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।

কারণ একটি ভুল পরীক্ষার ফল শুধু একটি ভুল সংখ্যা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকতে পারে ভুল রোগ নির্ণয়, অপ্রয়োজনীয় ওষুধ, অপ্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচার কিংবা রোগীর জীবন নিয়ে গুরুতর ঝুঁকি।

তাই ল্যাবরেটরির মান নিশ্চিত করা মূলত জনস্বাস্থ্য ও রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করারই অংশ।

জাতীয় রেফারেন্স সেন্টারকে নেতৃত্ব দিতে হবে

এই সংস্কারের কেন্দ্রে থাকতে পারে ইনস্টিটিউট অব ল্যাবরেটরি মেডিসিন অ্যান্ড রেফারেল সেন্টার।

তবে এ জন্য প্রতিষ্ঠানটিকে শুধু রোগীর পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও নিয়মিত সেবা প্রদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে এর জাতীয় ভূমিকা সুস্পষ্টভাবে পুনর্নির্ধারণ করতে হবে।

প্রতিষ্ঠানটি হবে দেশের জাতীয় রেফারেন্স ল্যাবরেটরি এবং ল্যাবরেটরি মেডিসিনের উৎকর্ষ কেন্দ্র। এর প্রধান দায়িত্ব হবে জাতীয় ল্যাবরেটরি নেটওয়ার্কের মানদণ্ড নির্ধারণ, বহিরাগত মাননিয়ন্ত্রণ, প্রশিক্ষণ ও কারিগরি সহায়তা প্রদান।

জটিল ও বিরল পরীক্ষার জন্য এটি হবে দেশের সর্বোচ্চ রেফারেল কেন্দ্র। একই সঙ্গে নতুন রোগনির্ণয় প্রযুক্তি দেশে ব্যবহারের আগে তার মূল্যায়ন ও কার্যকারিতা যাচাইয়ে প্রতিষ্ঠানটি নেতৃত্ব দেবে।

প্রতিষ্ঠানটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হবে গবেষণা ও উদ্ভাবন। উদীয়মান সংক্রামক রোগ, অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স, ক্যানসার, জেনেটিক ও মেটাবলিক রোগ এবং মলিকুলার প্যাথলজিসহ অগ্রাধিকার ক্ষেত্রে গবেষণা ও নতুন রোগনির্ণয় পদ্ধতি উদ্ভাবনের সক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে।

বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিক্যাল কলেজ, বাংলাদেশ মেডিক্যাল রিসার্চ কাউন্সিল এবং দেশি-বিদেশি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কার্যকর অংশীদারত্বের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটিকে দেশের পুরো ল্যাবরেটরি ব্যবস্থাকে নেতৃত্ব ও সহায়তা দেওয়ার সক্ষম একটি জাতীয় উৎকর্ষ কেন্দ্রে রূপান্তর করা সম্ভব।

বাংলাদেশে রোগনির্ণয় সেবার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বেসরকারি খাত দিয়ে থাকে। তাই ল্যাবরেটরি সংস্কার শুধু সরকারি প্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক হলে চলবে না। সরকারি, বেসরকারি ও একাডেমিক—সব ল্যাবরেটরিকে একটি অভিন্ন জাতীয় মাননিয়ন্ত্রণ কাঠামোর আওতায় আনতে হবে।

সরকারি-বেসরকারি সমন্বয় ও কৌশলগত সেবা ক্রয়

বাংলাদেশে রোগনির্ণয় সেবার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বেসরকারি খাত দিয়ে থাকে। তাই ল্যাবরেটরি সংস্কার শুধু সরকারি প্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক হলে চলবে না। সরকারি, বেসরকারি ও একাডেমিক—সব ল্যাবরেটরিকে একটি অভিন্ন জাতীয় মাননিয়ন্ত্রণ কাঠামোর আওতায় আনতে হবে।

একই সঙ্গে সব ধরনের পরীক্ষা প্রতিটি সরকারি প্রতিষ্ঠানে চালু করার পরিবর্তে কৌশলগত সেবা ক্রয়ের সুযোগ তৈরি করা যেতে পারে।

সরকার নির্ধারিত মান ও মূল্য কাঠামোর আওতায় স্বীকৃত ও মানসম্মত বেসরকারি ল্যাবরেটরি থেকে প্রয়োজনীয় রোগনির্ণয় সেবা কিনতে পারে।

কোন সেবা কোথায় সবচেয়ে মানসম্মত, দক্ষ ও সাশ্রয়ীভাবে দেওয়া সম্ভব—তার ভিত্তিতেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।

কোন সেবা কোথায় সবচেয়ে মানসম্মত, দক্ষ ও সাশ্রয়ীভাবে দেওয়া সম্ভব—তার ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।

এতে প্রতিটি সরকারি হাসপাতালে একই ধরনের ব্যয়বহুল অবকাঠামো ও যন্ত্রপাতি স্থাপনের প্রবণতা কমবে। অপ্রয়োজনীয় বিনিয়োগ এড়িয়ে সরকারি অর্থের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

একই সঙ্গে নির্ভরযোগ্য বেসরকারি ল্যাবরেটরির সক্ষমতাকেও জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার অংশ হিসেবে কাজে লাগানো যাবে। শেষ পর্যন্ত এর সুফল রোগীরাই পাবেন—ভালো মানের পরীক্ষা তুলনামূলক কম খরচে পাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে এবং নিজের পকেট থেকে রোগনির্ণয় পরীক্ষার ব্যয়ও কমানো সম্ভব হবে।

আরও পড়ুন
আরও পড়ুন

ডায়াগনস্টিকসকে স্বাস্থ্যসংস্কারের কেন্দ্রে আনতে হবে

এখনই সময় ল্যাবরেটরি ব্যবস্থার সংস্কারের। বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা এখন গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।

সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা, বিশেষায়িত চিকিৎসার পরিধি বাড়ানো এবং মানুষের নিজের পকেট থেকে চিকিৎসা ব্যয় কমাতে হলে রোগনির্ণয় ও ল্যাবরেটরি সেবার সংস্কারকে স্বাস্থ্য খাত সংস্কারের কেন্দ্রীয় অংশে আনতে হবে।

এ জন্য প্রথম পদক্ষেপ হতে পারে একটি জাতীয় ল্যাবরেটরি ও রোগনির্ণয় সেবা কৌশলপত্র প্রণয়ন।

এর আওতায় সরকারি-বেসরকারি ল্যাবরেটরির সক্ষমতা নিরূপণ, স্তরভিত্তিক সেবা নির্ধারণ, রেফারেল নেটওয়ার্ক, নমুনা পরিবহন, ডিজিটাল সংযোগ, দক্ষ জনবল, ক্রয়ব্যবস্থা, মাননিয়ন্ত্রণ ও স্বীকৃতির জন্য একটি বাস্তবায়নযোগ্য রোডম্যাপ তৈরি করতে হবে।

আমাদের লক্ষ্য প্রতিটি হাসপাতালে আরেকটি করে ছোট ল্যাবরেটরি তৈরি করা নয়; বরং সঠিক স্থানে সঠিক সক্ষমতা গড়ে তুলে পুরো দেশকে একটি সমন্বিত ল্যাবরেটরি নেটওয়ার্কে যুক্ত করা।

এতে ব্যয়বহুল প্রযুক্তি ও জনবলের সর্বোত্তম ব্যবহার হবে। এছাড়া এতে একই পরীক্ষা বারবার করার প্রয়োজন কমবে।

পাশাপাশি ভুল রোগনির্ণয় ও অপ্রয়োজনীয় চিকিৎসা কমবে এবং রোগীর ব্যয়ও হ্রাস পাবে।

বাংলাদেশে ইতোমধ্যে একটি জাতীয় ল্যাবরেটরি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এখন প্রয়োজন ইনস্টিটিউট অব ল্যাবরেটরি মেডিসিন অ্যান্ড রেফারেল সেন্টারকে প্রকৃত জাতীয় রেফারেন্স ল্যাবরেটরি ও ল্যাবরেটরি মেডিসিনের উৎকর্ষ কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা এবং তাকে কেন্দ্র করে আধুনিক, ডিজিটাল ও মাননিয়ন্ত্রিত জাতীয় ল্যাবরেটরি নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা।

একুশ শতকের স্বাস্থ্যব্যবস্থা বিশ শতকের ল্যাবরেটরি কাঠামো দিয়ে পরিচালনা করা সম্ভব নয়।

সময় এসেছে বিচ্ছিন্ন ও প্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে বাংলাদেশের ল্যাবরেটরি মেডিসিনকে একটি সমন্বিত জাতীয় রোগনির্ণয় ব্যবস্থায় রূপান্তর করার—যেখানে মানের সঙ্গে কোনো আপস হবে না এবং দেশের প্রতিটি মানুষ, তিনি যেখানেই থাকুন, কম খরচে নির্ভরযোগ্য রোগনির্ণয় সেবা পাবেন।

  • ড. এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার, প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী (প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদা)

    * মতামত লেখকের নিজস্ব।