গত ২৫ ফেব্রুয়ারি ড. আহসান এইচ মনসুরকে অপসারণের পর পোশাকশিল্প ব্যবসায়ী মোস্তাকুর রহমানকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর নিয়োগ করা হয়েছে। দেশের ইতিহাসে এই প্রথম একজন ব্যবসায়ী গভর্নর পদে আসীন হলেন। নতুন সরকারের এই সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
২০২৪ সালের ১৪ আগস্ট বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের দায়িত্ব গ্রহণ করেন ড. আহসান মনসুর। আইএমএফের অবসরপ্রাপ্ত উচ্চ পদের কর্মকর্তা ড. মনসুরের গভর্নর নিয়োগ সর্বমহলে প্রশংসিত হয়েছিল। ওই সময় আর্থিক খাত প্রায় ‘মেল্টডাউনের’ পর্যায়ে উপনীত হয়েছিল। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ২০২৩ সালের আগস্টে যেখানে ৪৮ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছিল, সেখান থেকে বেধড়ক লুটপাটের শিকার হয়ে বিপজ্জনকভাবে কমতে কমতে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট মাত্র ২০ বিলিয়ন ডলারে নেমে গিয়েছিল। ডলারের বাজারদর ২০২২ সালে ছিল ১ ডলার সমান ৮৭ টাকা, সেখান থেকে দ্রুত অবমূল্যায়নের মাধ্যমে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ১ ডলারের দাম দাঁড়িয়েছিল ১২৫ টাকা। দেশের ৬১টি ব্যাংকের মধ্যে ১১টি দেউলিয়া হওয়ার দ্বারপ্রান্তে উপনীত হয়েছিল।
পতিত স্বৈরশাসক হাসিনার সাড়ে পনেরো বছরের শাসনামলে সবচেয়ে বেশি লুণ্ঠনের শিকার হয়েছিল ব্যাংকিং খাত। দেশে ৬১টি ব্যাংকের প্রয়োজন না থাকা সত্ত্বেও হাসিনার খামখেয়ালি সিদ্ধান্তে তাঁর আত্মীয়স্বজন, আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা এবং হাসিনার পৃষ্ঠপোষকতায় অলিগার্ক ব্যবসায়ী ও ‘রবার ব্যারন’–এ পরিণত হওয়া লুটেরাদের পুঁজি লুণ্ঠনের অবিশ্বাস্য সুযোগ করে দেওয়ার জন্য এতগুলো ব্যাংকের লাইসেন্স দেওয়া হয়েছিল। একজন ব্যক্তিকে বা একক গোষ্ঠীকে সাতটি ব্যাংকের ওপর নিয়ন্ত্রণ স্থাপন করতে দেওয়ার দ্বিতীয় নজির বিশ্বের কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না।
অন্তর্বর্তী সরকার-গঠিত শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির গবেষণা থেকে প্রমাণিত হয়েছে, এই সাতটি ব্যাংক থেকে প্রায় দুই লাখ কোটি টাকা আত্মসাৎ করে বিদেশে পাচার করে দিয়েছিল এস আলম গ্রুপ। ২০১৭ থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত ৭ বছরে এই গ্রুপটি বিভিন্ন কায়দায় ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ থেকে লুট করে নিয়েছে প্রায় ৭০ হাজার কোটি টাকা, যার ফলে ব্যাংকটি দেউলিয়া হওয়ার দ্বারপ্রান্তে উপনীত হয়েছিল। পতিত সরকারের ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী লুটে নিয়েছেন ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংককে। শেখ হাসিনার শিল্প ও বেসরকারি বিনিয়োগ উপদেষ্টা সালমান রহমানের মালিকানার প্রতিষ্ঠান বেক্সিমকো বিভিন্ন ব্যাংকের কাছে খেলাপি ঋণ রেখে গেছে ৫০ হাজার কোটি টাকার বেশি।
আহসান মনসুরকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর নিয়োগ করার পর দেড় বছরে ব্যাংকিং খাতে বেশ কিছুটা স্থিতিশীলতা ফিরে এলেও খেলাপি ঋণ সমস্যার কোনো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করা যায়নি। বরং তাঁর আমলে আগের মতো খেলাপি ঋণ লুকিয়ে ফেলার তৎপরতা না থাকায় বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক প্রকাশিত ক্ল্যাসিফায়েড ঋণের অনুপাত বাড়তে বাড়তে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ৩৬ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়। যদিও পুনঃ তফসিলীকরণের নিয়মনীতি শিথিল করায় তা ডিসেম্বরে আবার ৩১ শতাংশে নেমে আসে। এতে আশ্বস্ত হওয়ার কিছু নেই। আরও গুরুতর বিষয় হলো, বাংলাদেশের খেলাপি ঋণের সিংহভাগই বিদেশে পাচার হয়ে গেছে। পাচারকৃত খেলাপি ঋণের কোনো অংশই ব্যাংকে ফেরত আসবে না, অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরে এক টাকাও ফেরত আসেনি। এটা সত্ত্বেও আহসান মনসুর দেড় বছরে ব্যাংকিং খাতের এই বিপর্যস্ত অবস্থাকে অনেকখানি সফলভাবে সামাল দিতে সক্ষম হয়েছিলেন।
বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দ্রুত বৃদ্ধির ধারাবাহিকতায় ড. মনসুরের অপসারণের তারিখে—২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬—৩৫ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করেছিল। ডলারের বাজারদর এক বছরের বেশি সময় ধরে ১২২ টাকায় স্থিতিশীল রাখতে পেরেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বিপর্যস্ত ইসলামী ব্যাংক আবার ঘুরে দাঁড়াতে সক্ষম হয়েছে। ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকও বিপর্যয় অনেকখানি কাটিয়ে উঠেছে। দেউলিয়াত্বের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যাওয়া পাঁচটি ইসলামি ধারার ব্যাংককে একীভূত করে গঠিত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকও সফলভাবে কার্যক্রম শুরু করতে পেরেছে। ব্যাংকের মোট আমানত আবার ১৮ লাখ কোটি টাকা অতিক্রম করেছে। ব্যাংকের ঋণের হারও ১১ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পেতে যাচ্ছে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে।
ঋণের সুদহার কমানোর জন্য প্রবল চাপ থাকলেও ড. মনসুর মূল্যস্ফীতির হার কমানোর লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের স্বার্থে ওই চাপে নতি স্বীকার করেননি। ২০২৬ সালের ৩০ জুন শেষ হতে যাওয়া ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রেমিট্যান্স প্রায় ৩৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছে যাবে বলে আশাবাদ সৃষ্টি হলেও ইরান বনাম যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের চলমান যুদ্ধের কারণে মার্চ থেকে রেমিট্যান্সের প্রবাহ কমে যাওয়ার আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে। দেশের ব্যালান্স অব পেমেন্টসের চলতি অ্যাকাউন্টে শেখ হাসিনার শাসনামলের শেষ তিন বছর ধরে সৃষ্টি হওয়া মারাত্মক ঘাটতি অবস্থার পরিবর্তে আবারও উদ্বৃত্ত পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে, ফিন্যান্সিয়াল অ্যাকাউন্টের বিপজ্জনক ঘাটতি পরিস্থিতির অবসান হয়েছে। ওপরে বর্ণিত তথ্য-উপাত্তগুলো সাক্ষ্য দিচ্ছে, দেশের আর্থিক খাত স্বৈরশাসক শেখ হাসিনার লুটপাটতন্ত্র কাটিয়ে গত দেড় বছরে আবার স্থিতিশীল অবস্থায় উপনীত হয়েছে।
এ অবস্থায় দুঃখজনকভাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন বৃদ্ধির জন্য প্রণীত বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার সংশোধনী প্রস্তাবটি অন্তর্বর্তী সরকার আটকে দেয়। অর্থঋণ আদালত আইন সংশোধনের প্রস্তাব ও ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধনের প্রস্তাবটিও আটকে দেওয়া হয়। এর ফলে ব্যাংক খাত সংস্কারে একটি বিশাল সুযোগ হারায় দেশ। খেলাপি ব্যাংকঋণ সংকটটির সমাধানের কিছু যুক্তিগ্রাহ্য পরিবর্তনের প্রস্তাব দিয়েছিলেন ড. মনসুর, যা বানচাল হয়ে যায়। এই প্রস্তাবগুলো আটকে দেওয়াকে সমীচীন বলা যাবে? বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসনের ইস্যুটি কোনো রাজনৈতিক সরকার কি মেনে নেবে?
আমার দুঃখ হচ্ছে, এমন প্রশংসনীয় সাফল্য অর্জনকারী গভর্নর ড. মনসুরকে বিদায় নিতে হয়েছে। সরকারের সঙ্গে তাঁর চুক্তির মেয়াদ আরও দুই বছরের বেশি বাকি থাকা সত্ত্বেও তাঁর সঙ্গে কোনো আলাপ-আলোচনা ছাড়াই হঠাৎ করে চুক্তিটি বাতিল করা হয়। নবনির্বাচিত রাজনৈতিক সরকার তাদের পছন্দসই ব্যক্তিদের সরকারের বিভিন্ন পদে বসাবে—এতে কোনো অস্বাভাবিকতা নেই। কিন্তু ড. মনসুরের নেতৃত্বে বাংলাদেশ ব্যাংক অর্থনীতির বিপর্যয় যেভাবে সফলভাবে মোকাবিলা করেছে, তাঁকে এভাবে অপসারণ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। তাঁর সঙ্গে সৌজন্যমূলক আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে চুক্তি বাতিল করলে ব্যাপারটা নিন্দনীয় হতো না। যেভাবে তাঁকে বিদায় করে একজন ব্যবসায়ীকে গভর্নর নিয়োগ করা হলো, তার মাধ্যমে প্রমাণ করা হলো যে রাজনৈতিক আনুগত্যই গভর্নরের প্রধান বৈশিষ্ট্য হতে হবে। এটা অর্থনীতির জন্য বিপজ্জনক হতে পারে। বিশেষত, খেলাপি ব্যাংকঋণের ব্যাপারে নতুন গভর্নরের দৃষ্টিভঙ্গি বেশি নমনীয় হলে তা ব্যাংকিং খাতে আবারও বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
অতীতে স্বৈরশাসক শেখ হাসিনার শাসনামলের বাংলাদেশ ব্যাংকের দুজন গভর্নর ফজলে কবির এবং আব্দুর রউফ তালুকদারের দুর্বল ভূমিকার কারণেই দেশের ব্যাংকিং খাতে লুটপাটতন্ত্র শক্তিশালী হয়েছিল। বাংলাদেশ ব্যাংক হলো আর্থিক খাতের নীতি-নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান, তাই ব্যাংকগুলোকে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করার ব্যাপারে গভর্নরের ভূমিকা সব সময় সরকারের পছন্দসই না হওয়াই স্বাভাবিক। তবে আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতার প্রশ্নটি যতটা রাজনৈতিক আনুগত্যের, তার চেয়ে অনেক বেশি নীতিগত।
মইনুল ইসলাম অর্থনীতিবিদ ও অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
মতামত লেখকের নিজস্ব
