নাগরিকদের প্রস্তাবগুলো কেন ফেলে দেয় মন্ত্রণালয়

বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫’ নিয়ে রাজধানীর শাহবাগে মানববন্ধন।ফাইল ছবি

এই দেশে একসময় যেখানে সরকারি দল ও বিরোধী দলের নেতাদের আলাপ হামেশাই ফাঁস হতো। সেখানে বাকি জনগণের ব্যক্তিগত বলে কিছু থাকার প্রশ্নই আসে না। যে ব্যক্তি মর্যাদার ওপর চলতি সমাজ ও সভ্যতা দাঁড়িয়ে আছে, তা ধুলায় লুণ্ঠিত হয়েছে। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পেছনে বড় কারণ এটাও, তা হলো ব্যক্তির মর্যাদা পুনঃপ্রতিষ্ঠা।

সংস্কারের প্রশ্নে নাগরিকদের প্রত্যাশা ছিল স্পষ্ট। গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা নতুন বাস্তবতায় রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো হবে জবাবদিহিমূলক, স্বচ্ছ ও মানবাধিকারসম্মত। কিন্তু সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা সেই প্রত্যাশার সঙ্গে ক্রমেই সাংঘর্ষিক হয়ে উঠছে।

পুলিশ সংস্কারের অন্যতম প্রধান দাবি ছিল একটি স্বাধীন পুলিশ কমিশন গঠন। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান প্রথম আলোয় লিখেছেন, পুলিশ কমিশন কার্যকর হতে হলে এর প্রথম ও প্রধান শর্ত হলো স্বাধীনতা। সরকার ও পুলিশের প্রভাব থেকে কমিশনকে সম্পূর্ণ মুক্ত থাকতে হবে। তাহলেই পুলিশকে জবাবদিহির আওতায় আনা, ক্ষমতার অপব্যবহার ও দুর্নীতির তদন্ত ভয় ও পক্ষপাতহীনভাবে করা সম্ভব।

কিন্তু প্রস্তাবিত পুলিশ কমিশনের কাঠামোই সেই স্বাধীনতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। পাঁচ সদস্যের কমিশনে একজন অবসরপ্রাপ্ত আমলা ও একজন অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা থাকবেন, যাঁর হাতে থাকবে সদস্যসচিবের দায়িত্ব। উপরন্তু কমিশনের সাচিবিক দায়িত্ব থাকবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন। এখানেই স্পষ্ট স্বার্থসংঘাত তৈরি হয়। যে মন্ত্রণালয়ের অধীন পুলিশ কাজ করে, সেই মন্ত্রণালয়ের হাতেই যদি কমিশনের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ থাকে, তবে কমিশনের স্বাধীনতা কাগুজে রূপেই সীমাবদ্ধ থাকবে।

এ ছাড়া প্রস্তাবিত কাঠামোতে জননিরাপত্তা ও মানবাধিকার রক্ষার ভারসাম্যের কথা বলা হলেও মানবাধিকারকে কোনোভাবেই অগ্রাধিকার দেওয়া হয়নি। জননিরাপত্তার সুস্পষ্ট সংজ্ঞাও অনুপস্থিত। ফলে ইচ্ছেমতো ব্যাখ্যা ও অপব্যবহারের সুযোগ থেকে যাচ্ছে। অথচ নাগরিকদের মতামতের ভিত্তিতে আইন মন্ত্রণালয় যে খসড়া অধ্যাদেশ প্রস্তুত করেছিল, সেখানে এসব প্রশ্নের অনেকটাই মীমাংসা করা হয়েছিল।

একই ধরনের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ সংশোধন অধ্যাদেশের ক্ষেত্রেও। গণ-অভ্যুত্থান–পরবর্তী বাস্তবতায় অন্তর্বর্তী সরকার ইন্টারনেট বন্ধের ক্ষমতা স্থায়ীভাবে বাতিল এবং নজরদারি কাঠামোয় মৌলিক সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে এই অধ্যাদেশের খসড়া প্রকাশ করেছিল। এতে দীর্ঘদিন ধরে মানবাধিকার লঙ্ঘন ও অবৈধ নজরদারির অভিযোগে সমালোচিত ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টার বিলুপ্ত করার প্রস্তাবও ছিল।

এ প্রক্রিয়া অতীতের দমনমূলক নজরদারি রাষ্ট্রের স্মৃতি ফিরিয়ে আনছে। গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীনতা, মানবাধিকার ও জবাবদিহির আকাঙ্ক্ষা কি তবে ধীরে ধীরে বিসর্জন দেওয়া হচ্ছে?

এনটিএমসি সম্পর্কে আদালত ও গুমসংক্রান্ত কমিশন অব ইনকোয়ারির পর্যবেক্ষণ ইতিমধ্যেই গুরুতর অভিযোগের কথা জানিয়েছে। এ কারণেই প্রতিষ্ঠানটি বিলুপ্ত করার দাবি ছিল নাগরিক সমাজের। কিন্তু ১২ ডিসেম্বর মন্ত্রিসভায় উপস্থাপিত সংশোধিত খসড়াটি অনুমোদন পায়নি। পরবর্তী সময়ে গণমাধ্যমে জানা যায়, এনটিএমসি বিলুপ্তি নিয়ে সরকারের ভেতরেই মতভেদ তৈরি হয়েছে।

আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, নাগরিকদের অংশগ্রহণ ও মতামত ছাড়াই ১৫ অক্টোবর একটি গোপন খসড়া আইন প্রণয়ন করা হয়েছে, যেখানে এনটিএমসিকে ভিন্ন নামে পুনর্গঠনের প্রস্তাব এসেছে। প্রস্তাবিত নামগুলো থেকে স্পষ্ট যে নজরদারি কাঠামো আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্যেই এ উদ্যোগ।

১৭ নভেম্বর আইনশৃঙ্খলা-সংক্রান্ত কোর কমিটির বৈঠকে একটি সংস্থার প্রধান দাবি করেন, নজরদারি দুর্বল হলে জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও দেশবিরোধী কর্মকাণ্ড তদারকি কঠিন হয়ে পড়বে। এ যুক্তি সামনে রেখেই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নতুন করে পুরো প্রক্রিয়ার নিয়ন্ত্রণ নিতে চাইছে। প্রতিটি সংস্থা আড়ি পাতায় অংশগ্রহণ চাচ্ছে।

এর ফল হিসেবে প্রকাশিত খসড়া থেকে অন্তত দুটি গুরুত্বপূর্ণ নাগরিক সুরক্ষা বিধান বাদ দেওয়ার প্রস্তুতি ছিল। যেখানে আগে নজরদারি-সংক্রান্ত আবেদন, অনুমোদন ও প্রত্যাখ্যানের পরিসংখ্যানসহ বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ বাধ্যতামূলক ছিল, সেখানে নতুন খসড়ায় তা সীমিত করে সংসদে একটি সাধারণ প্রতিবেদনের উল্লেখ রাখা হচ্ছে।
ইন্টারনেট বা টেলিযোগাযোগ সেবা কখনোই বন্ধ করা যাবে না। এ ছাড়া সিম বা ডিভাইস রেজিস্ট্রেশনের তথ্য ব্যবহার করে কোনো নাগরিককে নজরদারি বা অযথা হয়রানি করা আইনগত দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে। গত ২৪ ডিসেম্বর এমন বিধান রেখে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ (সংশোধন) অধ্যাদেশ চূড়ান্তভাবে অনুমোদন দিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদ।

পূর্ববর্তী খসড়ায় নাগরিক, বিচারক ও সাংবিধানিক সংস্থার প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি আধা বিচারিক কাউন্সিলের প্রস্তাব ছিল। অনুমোদিত খসড়ায় আমলানির্ভর একটি কাউন্সিল গঠনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যার কার্যপ্রণালি, সদস্যদের মেয়াদ ও নিয়োগপ্রক্রিয়া স্পষ্ট নয়। পাশাপাশি নজরদারি কার্যক্রমে যুক্ত কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বিচারিক তদারকির ব্যবস্থাও তেমন শক্ত হয়নি।

এ প্রক্রিয়া অতীতের দমনমূলক নজরদারি রাষ্ট্রের স্মৃতি ফিরিয়ে আনছে। গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীনতা, মানবাধিকার ও জবাবদিহির আকাঙ্ক্ষা কি তবে ধীরে ধীরে বিসর্জন দেওয়া হচ্ছে?

আশা রাখি, ইন্টারনেট-সংযোগ কোনো অবস্থাতেই বন্ধ বা সীমিত করা যাবে না। মানবাধিকার লঙ্ঘনের সঙ্গে জড়িত এনটিএমসিকে ভেঙে দেওয়া হবে। নজরদারি ক্ষমতার অপব্যবহারের জন্য দায়ীদের বিচারের আওতায় রাখার বিধানটির যথাযথ প্রয়োগ হবে।

সর্বোপরি নাগরিকদের অংশগ্রহণ ও মতামতকে প্রাধান্য দিয়ে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ সংশোধন অধ্যাদেশ ২০২৫ গেজেট আকারে প্রকাশিত হোক।

নাহিদ হাসান লেখক ও সংগঠক

ই-মেইল: nahidknowledge1 @gmail. com

*মতামত লেখকের নিজস্ব