মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনার সূত্রপাত পূর্ব ধরাতি গ্রাম। অসুস্থ শরীর নিয়েও এসব ঘটনা ঘটলে আমি অনেক ফোন পাই। গ্রামটি মধুপুর বনের ভেতর। একসময় চিরহরিৎ শালবৃক্ষের বন ছিল এখানে, যেখানে সব পাতা একসঙ্গে ঝরে পড়ত না।
সারা বছর বন সবুজ–সজীব থাকত। আমি এই অঞ্চলে মমিনপুর গিয়েছিলাম প্রথম ছিয়াশি সালে বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে। এখানে আশির দশকের মাঝামাঝি প্রাকৃতিক বন ধ্বংস করে বন বিভাগ রাবারবাগান করে। অপরিণামদর্শী প্রকল্প। বাগান এখন লোকসানি প্রকল্প। ইতিমধ্যে শালবন উজাড়। এই ভুল প্রকল্প, দুর্নীতি ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের দায় কে নেবে এখন?
তারপর বন শিল্প উন্নয়ন করপোরেশন (বিএফআইসি) হলো। আনসার পাহারাদার এল। ৯ মার্চ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মধুপুর বনের একটি গারো নারীর প্রতিবাদের, প্রতিরোধের চেষ্টার ভিডিও নিশ্চয় অনেকে দেখেছেন। সিবলি মাংসাংদের বাড়ি ভেঙে দেওয়ার জন্য আনসার বাহিনীসহ লোকজন এল ভারী ট্রাক্টর নিয়ে। তারা নতুন ঘর নির্মাণের জন্য বসানো খুঁটি ভেঙে ফেলল। সিবলী মাংসাংয়ের পিঠে বাঁধা ছিল শিশুসন্তান। তিনি একটি কাঠ হাতে নিয়ে প্রতিরোধের চেষ্টা করলেন। বাহিনীর হাতে বন্দুক। বন্দুক তাক করল একজন। আরেকজন সিবলীকে ধাক্কা দিয়ে মাটিতে ফেলে দিল। লোকজন জড়ো হতে হতে আনসার-ট্রাক্টর-দখলদার বাহিনী ফিরে গেল।
কেন হাজার হাজার বেকার তরুণের হাহাকার? এখানে কত দুর্ঘটনা ঘটে। কত নারী আত্মহত্যা করেন? আগুনে নিমেষে ছারখার হয়ে যায় কত স্বপ্ন? এই রাজধানীতে নতুন কত মানুষ এসেছেন গ্রাম থেকে একটু ভালো করে বাঁচার আশায়? কত মানুষ ভূমধ্যসাগরে, থাইল্যান্ডের জঙ্গলে, মধ্যপ্রাচ্যে গৃহকর্মীর কাজে গিয়ে মরুতে হাহাকার করেন? প্রখর রোদে টিসিবির ট্রাকের লাইনে দৌড়ান কত মানুষ? কত আশা নিয়ে আপনাদের ক্ষমতায় এনেছেন দেশের বঞ্চিত ও নিপীড়িত মানুষ।
এ ভিডিও ছড়িয়ে পড়ল দ্রুত। প্রতিবাদ হলো। ভিডিও দেখে যে কেউ বলবেন, মধুপুর বনে গারোদের অবস্থা গুরুতর। ভয়াবহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের ছবি এটি। ইতিমধ্যে তরুণ দল প্রতিবাদ করেছে। ইন্টারন্যাশনাল ওয়ার্ক গ্রুপ ফর ইনডিজেনাস অ্যাফেয়ার্স ডেনমার্ক থেকে ভিডিও শেয়ার করেছে। জাপানের একটি মানবাধিকার সংগঠনও উদ্বেগ জানিয়েছে।
মধুপুরে ফোন করে আমি জানলাম, স্থানীয় এমপি, যিনি মন্ত্রী হয়েছেন, খোঁজ নিয়েছেন এবং প্রশাসন থেকে ইউএনও গিয়ে ওই গারো পরিবারের কাছে দুঃখ প্রকাশ করেছেন। কিছু নগদ অর্থ, ঢেউটিনসহ সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন। বন শিল্প করপোরেশনকে নির্দেশ দিয়েছেন ঘরে খুঁটি কিনে দেওয়ার জন্য, যেহেতু তারা এসব ভেঙেছে। আনসার দলকে প্রত্যাহারের ঘোষণাও এসেছে। এসবই ভালো খবর, দুঃখের মধ্যেও।
আমরা জানি, সরকারের ওপর মহল মাঠে যে এত কিছু হয়, তা অনেক সময় জানে না। মাঠপর্যায়ের লোকজন অনেক সময় বাড়াবাড়ি করে ফেলে। জয়েনশাহী আদিবাসী পরিষদের নেতারাসহ অনেকে পাশে দাঁড়িয়েছেন এই পরিবারের। তাঁরা এলাকা সফর করেছেন। বন শিল্প করপোরেশন কর্তৃপক্ষও নমনীয় হয়েছে।
এখানে যৌথ সভায় সিদ্ধান্ত হয়েছে, সিবলী মাংসাং-রমেন কুবি দম্পতি নতুন বসতঘর নির্মাণ করতে পারবেন। তাঁদের পরিবারে ওরা ১১ জন ছায়াছবির মতো ১১ সন্তান। নতুন ঘর তো লাগবে। উভয় পক্ষের আলোচনায় সীমানা চিহ্নিত হয়েছে। অবশেষে আপাতদৃষ্টিতে সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধান হয়েছে। কিন্তু জাতীয় উদ্যান এলাকার বনে গারো, কোচ, বর্মণদের প্রথাগত ভূমি অধিকারের আইনগত স্বীকৃতি জরুরি। বহু বছরের জটিল ভূমি সমস্যা নিয়ে এখনই উচ্চপর্যায়ে সংলাপ শুরু করা দরকার।
সেই পাকিস্তান আমল থেকে ন্যাশনাল পার্ক ঘোষণা, পরবর্তী সময়ে নানা ভুল ও দুর্নীতির প্রকল্প এবং স্থানীয় বনবাসীদের হয়রানি ও বন ব্যবস্থাপনা থেকে দূরে রাখার কারণে অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে মানুষের, বন ও পরিবেশের। এখন নতুন সরকার দেশে, যাদের মেয়াদ চার সপ্তাহ পার হয়েছে। নতুন প্রধানমন্ত্রীর কথায় ও আচরণে মানুষ অনেক আশাবাদী। আমরাও। এখানে বহু জাতি, বহু ভাষা, বহু সংস্কৃতির মানুষের জন্য সম্মান ও মর্যাদাপূর্ণ অন্তর্ভুক্তিমূলক ‘বৈচিত্র্যপূর্ণ’ জাতি হবে, একটা জায়গা হবে। সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের স্বীকৃতিই শুধু মিলবে না, সেলিব্রেট করা হবে।
এ দেশের সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ অবর্ণনীয় পরিশ্রম করেন। তাকিয়ে দেখেন মাঠের কৃষকের দিকে, পোশাককর্মী, অটোওয়ালা, রিকশাওয়ালা, সবজি বিক্রেতা, ভ্যানের ফেরিওয়ালা-মাছওয়ালা, ট্রাফিক জ্যামে পানির বোতল, শিশুদের খেলনা বিক্রেতা, চা–বাগানের মানুষ, দলিত বেদে, তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ যাঁরা ভিক্ষা করেন, আরও কত পেশার মানুষ।
কেন হাজার হাজার বেকার তরুণের হাহাকার? এখানে কত দুর্ঘটনা ঘটে। কত নারী আত্মহত্যা করেন? আগুনে নিমেষে ছারখার হয়ে যায় কত স্বপ্ন? এই রাজধানীতে নতুন কত মানুষ এসেছেন গ্রাম থেকে একটু ভালো করে বাঁচার আশায়? কত মানুষ ভূমধ্যসাগরে, থাইল্যান্ডের জঙ্গলে, মধ্যপ্রাচ্যে গৃহকর্মীর কাজে গিয়ে মরুতে হাহাকার করেন? প্রখর রোদে টিসিবির ট্রাকের লাইনে দৌড়ান কত মানুষ? কত আশা নিয়ে আপনাদের ক্ষমতায় এনেছেন দেশের বঞ্চিত ও নিপীড়িত মানুষ।
আমার নিবেদন হলো, দুঃখ-বেদনা-যন্ত্রণা ও অভাব–অনটনের সময় মানুষ যেন সরকারকে কাছে পায়।
সঞ্জীব দ্রং কলাম লেখক ও সংস্কৃতিকর্মী
মতামত লেখকের নিজস্ব
