ইয়াবাসহ সব মাদক ঠেকাতেই হবে

সারা দেশে মাদকাসক্ত মানুষদের, বিশেষ করে উঠতি শিশু-কিশোর, তরুণ-যুবা আর যুব নারীদের চরম অসহায় দশা দেখা যাচ্ছে।অলঙ্করণ: প্রথম আলো

আমাদের এই ১৮ কোটি মানুষের দেশে বর্তমানে ৮২ লাখ শিশু-কিশোর, নারী-পুরুষ, বয়স্ক মানুষ মাদকাসক্তির কবলে পড়ে আছে।

সরকারের একটি শক্তিশালী মন্ত্রণালয়ের অধীন বিশাল পরিমাণের রাষ্ট্রীয় অর্থ, বিশাল বিশাল অফিস ভবন, অসংখ্য গাড়ি ও অন্যান্য লজিস্টিক সাপোর্ট আর বিপুল কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা হচ্ছে; তারপরও মাদক নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়ে মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর একটা অপদার্থ দপ্তর হিসেবে গণমানুষের এন্তার নিন্দা কুড়াচ্ছে।

সারা দেশে মাদকাসক্ত মানুষদের, বিশেষ করে উঠতি শিশু-কিশোর, তরুণ-যুবা আর যুব নারীদের চরম অসহায় দশা দেখা যাচ্ছে। কিন্তু প্রতিকারশূন্য পরিস্থিতি সমগ্র দেশবাসীকে হতাশায় ডুবিয়ে দিচ্ছে।

এ মুহূর্তে যে মাদকটির বিস্তার গোটা দেশের তরুণসমাজকে ধ্বংস করে দিচ্ছে, তা হলো ইয়াবা।

এই ইয়াবা বিস্তারের সঙ্গে যাঁদের নাম বারবার উঠে এসেছে, তাঁদের মধ্যে এক নম্বরে ছিলেন কক্সবাজারের একজন সাবেক সংসদ সদস্য। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকাকালেই তিনি মাদক মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছিলেন।

আরও পড়ুন

ভারতে পলাতক মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনার অতি প্রিয়পাত্র এই সংসদ সদস্য এবং তাঁর স্বজনেরা মিলে গত তিন দশকে একটি বড় মাদক চক্র গড়ে তুলেছিলেন বলে অনেকবার সংবাদমাধ্যমে খবর ছাপা হয়েছে।

স্থানীয় লোকজনের ধারণা, ওই সংসদ সদস্য এবং তাঁর পরিবার-পরিজন মাদক চোরাকারবারি করে যে সম্পদ গড়ে তুলেছেন তার অর্থমূল্য দেড় লাখ কোটি টাকার নিচে নয়।

কক্সবাজারের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে জানে, সীমান্তের এপারে এবং ওপারের মিয়ানমার অংশে বিস্তৃত মাদক উৎপাদন কেন্দ্র ও বিশাল বাজার গড়ে উঠেছে।

মিয়ানমারের সামরিক জান্তার জেনারেলদের সঙ্গে যুক্ত এই মাদক উৎপাদন ও বিপণন নেটওয়ার্কের মাধ্যমে হেরোইন, ইয়াবা, মারিজুয়ানা, আইস, কোকেনসহ নানা ধরনের অবৈধ মাদকদ্রব্য সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ছে। এই চোরাকারবার ইতিমধ্যে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও কুখ্যাতি অর্জন করেছে।

আরও পড়ুন

অভিযোগ রয়েছে, মাদক চক্রের সঙ্গে জড়িত সেই সাবেক সংসদ সদস্য রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে দীর্ঘদিন ধরেই আইনের আওতার বাইরে ছিলেন। প্রচণ্ড বিতর্ক ও বদনামের কারণে একসময় তাঁকে সরাসরি মনোনয়ন না দিয়ে তাঁর স্ত্রীকে সংসদ সদস্য করা হয়।

স্থানীয়ভাবে প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, বিপুল অর্থের প্রভাবে প্রশাসনের একটি অংশ, কিছু রাজনীতিক এবং সংশ্লিষ্ট মহল এই চক্রকে রক্ষা করেছে।

অনেক ক্ষেত্রে সাক্ষ্য প্রভাবিত করা কিংবা মামলার গতিপথ পরিবর্তনের অভিযোগও শোনা যায়। ফলে আইনের মাধ্যমে এই গোষ্ঠীকে দমন করা কার্যত কঠিন হয়ে পড়ে।

এই বাস্তবতা কেবল কক্সবাজারেই নয়, দেশের অন্যান্য মাদক চক্রের কাছেও পরিচিত, এবং তারা এই ব্যবস্থার সুযোগ নিয়ে নিজেদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।

প্রকৃতপক্ষে আমাদের মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী একদিকে ঘুষ–বাণিজ্যে জড়িয়ে পড়েছেন, অন্যদিকে নিজেদের ও পরিবার-পরিজনের নিরাপত্তা নিয়ে সব সময় আতঙ্কে থাকেন। ফলে তাঁরা কার্যকর ভূমিকা পালনে ব্যর্থ হন।

আরও পড়ুন

এখানে একটি ঘটনা উল্লেখ করা প্রাসঙ্গিক। স্বৈরাচার এরশাদের আমলে একবার দেশে মাদক নিয়ন্ত্রণ দপ্তরে তুমুল আলোড়ন সৃষ্টি হয়। খবর ছড়িয়ে পড়ে যে চোরাকারবারিদের কাছ থেকে একসঙ্গে ৪৪ কেজি (৪৪ কিলোগ্রাম) হেরোইন নামের মারাত্মক অবৈধ মাদকদ্রব্য আটক করা হয়েছে।

দপ্তরের এক শীর্ষ কর্মকর্তা এটিকে বিশাল সাফল্য হিসেবে ব্যাপকভাবে প্রচার করতে থাকেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দেখা যায়, ওই ৪৪ কেজি হেরোইন যুক্তরাজ্যে পাচারের উদ্দেশ্যে পাঠানো হচ্ছিল, এবং ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থা স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড সেই চালানটি আটক করে।

এ ঘটনায় বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বা মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত সীমিত—প্রায় নগণ্য।

এ ধরনের ঘটনা প্রমাণ করে যে সংশ্লিষ্ট অনেক কর্মকর্তা বাস্তবতার চেয়ে কৃতিত্বের দাবিতে বেশি আগ্রহী। মূলত দুর্নীতি, অদক্ষতা এবং ভীতির সংস্কৃতি তাঁদের কার্যত অকার্যকর করে রেখেছে।

বিশ্বব্যাপী অবৈধ মাদকদ্রব্য উৎপাদন ও চোরাকারবার সম্পর্কে কিছু তথ্য পাঠকের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক কার্যালয় (ইউএনওডিসি) সূত্রে জানা যায়, বিশ্বব্যাপী অবৈধ মাদক ব্যবসার একটি বিশাল ছায়া অর্থনীতি।

আরও পড়ুন

এর মাধ্যমে প্রতিবছর বিশ্বজুড়ে অবৈধ মাদক বিক্রি থেকে আনুমানিক শত শত বিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় হয়। এই লেনদেনের পরিমাণ ওঠানামা করলেও ধারণা করা হয়, এই বৈশ্বিক ব্যবসার মূল্য বছরে প্রায় ৪০০ বিলিয়ন থেকে ৬৫০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের মধ্যে, যা অনেক বৈধ আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে।

অবৈধ মাদক উৎপাদন ও পাচারের ক্ষেত্রে ‘গোল্ডেন ক্রিসেন্ট’ এবং ‘গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেল’ বিশ্বের সবচেয়ে কুখ্যাত অঞ্চল হিসেবে পরিচিত। ‘গোল্ডেন ক্রিসেন্ট’ বা সোনালি অর্ধচন্দ্র অঞ্চলটি মধ্য ও দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়ার সংযোগস্থলে অবস্থিত, যেখানে আফগানিস্তান, ইরান ও পাকিস্তান অন্তর্ভুক্ত।

ঐতিহাসিকভাবে আফগানিস্তান বিশ্বে আফিম ও হেরোইনের অন্যতম প্রধান উৎপাদক দেশ হিসেবে পরিচিত।

অন্যদিকে, ‘গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেল’ অঞ্চলটি মিয়ানমার, থাইল্যান্ড ও লাওসকে নিয়ে গঠিত। এই দুই অঞ্চল মিলিয়ে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ অবৈধ মাদক উৎপাদন ও পাচার হয়, যার আর্থিক পরিমাণ শত শত বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়।

বিশেষভাবে পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাজারে ‘সিনথেটিক’ বা কৃত্রিম মাদক থেকে বছরে প্রায় ৭১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় হয়।

গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেল অঞ্চলে কৃত্রিম মাদক, বিশেষত মেথামফেটামিন (ক্রিস্টাল মেথ ও ইয়াবা ট্যাবলেট), উৎপাদন দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর প্রধান উৎপাদনকেন্দ্র মিয়ানমারের শান রাজ্য, যেখানে ধীরে ধীরে প্রচলিত আফিম উৎপাদনের পরিবর্তে কৃত্রিম মাদক উৎপাদন স্থান করে নিচ্ছে।

অভিযোগ রয়েছে, মিয়ানমারের সামরিক জান্তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন গোষ্ঠী এই মাদক উৎপাদন ও পাচারের সঙ্গে জড়িত। তারা বিশেষ করে ইয়াবাসহ বিভিন্ন ধরনের মাদক উৎপাদন করে বাংলাদেশে পাচার করছে।

এর পাশাপাশি অন্যান্য অজানা মাদকদ্রব্যও নিয়মিতভাবে দেশে প্রবেশ করছে, যার মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অবৈধ অর্থ উপার্জিত হচ্ছে। এই অবৈধ প্রবাহের ফলে বাংলাদেশের সমাজ ও তরুণ প্রজন্ম মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়ছে।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রসহ মেক্সিকো, বলিভিয়া এবং আরও অনেক দেশে অবৈধ মাদক উৎপাদন, পাচার ও ব্যবহার চলমান রয়েছে। ব্যাপক প্রচেষ্টা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র সরকার এ সমস্যার কার্যকর প্রতিরোধে পুরোপুরি সফল হতে পারেনি।

বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের তরুণ-তরুণীদের একটি অংশ এই অবৈধ কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে; তারা একদিকে মাদক কারবারে যুক্ত হচ্ছে, অন্যদিকে মাদকাসক্তি বিস্তারের মাধ্যমেও সামাজিক ক্ষতি ডেকে আনছে।

আপন ভাই-বোনও অনেক সময় এই সহিংসতা থেকে রেহাই পাচ্ছে না। মাদকাসক্ত তরুণদের কারণে কন্যাশিশু, কিশোরী এবং ছেলেশিশুদের জীবনযাপন ভয়াবহভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। অনেক নারী মাদকাসক্তদের দ্বারা ধর্ষণ ও হয়রানির শিকার হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এসব অপরাধ নিয়ন্ত্রণে চরমভাবে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে। সব মিলিয়ে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে যে সার্বিক ক্ষতি হচ্ছে, তার হিসাব করলে দেখা যায়, শুধু মাদক–সংক্রান্ত অপরাধের কারণে বছরে কমপক্ষে পাঁচ লাখ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে।

বাংলাদেশেও বছরে বিপুল অঙ্কের অবৈধ মাদক চোরাকারবার পরিচালিত হয় বলে ধারণা করা হয়। এটি একটি সুসংগঠিত নেটওয়ার্কে পরিণত হয়েছে, যা অনেকের কাছেই ‘ওপেন সিক্রেট’। দেশের কিছু অঞ্চলকে মাদক পাচারের রুট হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে রয়েছে।

পাচার হওয়া মাদকের বড় একটি অংশ দেশের অভ্যন্তরেই অপব্যবহার হয়ে মাদকাসক্তি বাড়াচ্ছে—এমন প্রমাণও পাওয়া যায়।

এ দেশে প্রায় ৮২ লাখ তরুণ-তরুণী, যুবক-যুবতী ও বয়স্ক মানুষ মাদকাসক্তির ভয়ংকর ছোবলে আক্রান্ত হয়ে নিজেদের, নিজেদের পরিবারের এবং স্বজনদের জীবন ও পারিবারিক সুস্থ সংস্কৃতি ধ্বংসের পথে ঠেলে দিচ্ছে।

মাদকের টাকার জন্য অনেক ক্ষেত্রে সন্তান মা–বাবার ওপর পর্যন্ত হামলা করছে, এমনকি হত্যাকাণ্ডের ঘটনাও ঘটছে।

আপন ভাই-বোনও অনেক সময় এই সহিংসতা থেকে রেহাই পাচ্ছে না। মাদকাসক্ত তরুণদের কারণে কন্যাশিশু, কিশোরী এবং ছেলেশিশুদের জীবনযাপন ভয়াবহভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। অনেক নারী মাদকাসক্তদের দ্বারা ধর্ষণ ও হয়রানির শিকার হচ্ছে।

এই পরিস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এসব অপরাধ নিয়ন্ত্রণে চরমভাবে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে। সব মিলিয়ে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে যে সার্বিক ক্ষতি হচ্ছে, তার হিসাব করলে দেখা যায়, শুধু মাদক–সংক্রান্ত অপরাধের কারণে বছরে কমপক্ষে পাঁচ লাখ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে।

এই ভয়াবহ পরিস্থিতি মোকাবিলায় শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একক প্রচেষ্টা যথেষ্ট নয়; বরং জনগণের সম্মিলিত উদ্যোগ এবং সামাজিক সচেতনতা অত্যন্ত জরুরি।

  • খায়রুল কবির খোকন বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ও সংসদ সদস্য

    মতামত লেখকের নিজস্ব