ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র: যে তুরুপের তাস এখনও খেলা বাকি

পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী (বাঁয়ে) ইসহাক দার ও সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির (বাঁয়ে) মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সকে স্বাগত জানান। ১১ এপ্রিল ২০২৬, ইসলামাবাদছবি: রয়টার্স

ইরান যুদ্ধের সবচেয়ে অদ্ভুত দিকটি এটি নয় যে উভয় পক্ষের হাতেই প্রভাব বিস্তারের শক্তি রয়েছে; বরং অদ্ভুত বিষয় হলো, কোনো পক্ষই নিজেদের হাতে থাকা সেই শক্তিকে পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারছে না। যুদ্ধবিরতি-পরবর্তী বর্তমান অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে এটিই এই সংঘাতের প্রধান বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ওয়াশিংটনের রয়েছে ইরানের বন্দর ও জাহাজ চলাচলের ওপর চাপ বজায় রাখার মতো শক্তিশালী নৌবাহিনী। বিপরীতে হরমুজ প্রণালিকে স্বাভাবিক হতে না দেওয়ার মতো ভৌগোলিক সুবিধা রয়েছে তেহরানের হাতে। অথচ এর কোনোটিকেই যৌক্তিক পরিণতির দিকে ঠেলে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। কারণ, সেটা করতে গেলে যে ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে, তা কোনো পক্ষেরই নিয়ন্ত্রণে থাকবে না।

ফলে যুদ্ধ এখন সাধারণ যুদ্ধবিরতির ধারণার চেয়েও এক বিপজ্জনক স্তরে পৌঁছেছে। মূলত এই অস্পষ্টতার কারণেই যুদ্ধবিরতি কোনো চূড়ান্ত মীমাংসার পথে হাঁটতে পারছে না। জাহাজগুলো চলাচলে দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে আছে এবং বিশ্ববাজারে বিরাজ করছে চরম অস্থিরতা।

খবর পাওয়া যাচ্ছে যে নতুন করে বিমান হামলা শুরু করা বা সামরিক উপস্থিতি পুরোপুরি গুটিয়ে নেওয়ার ঝুঁকি বিবেচনা করে ডোনাল্ড ট্রাম্প এখন অবরোধ দীর্ঘায়িত করার পক্ষপাতী। সংকীর্ণ রাজনীতিবিদ হিসেবে তাঁর এই সিদ্ধান্ত বেশ কার্যকর মনে হতে পারে। কারণ, আবার হামলা চালালে ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি অবকাঠামোয় বড় ধরনের পাল্টা আঘাত হানতে পারে।

আবার একেবারেই সরে এলে সেটি এক অসম্পূর্ণ অভিযান হিসেবে পর্যবসিত হবে। অন্যদিকে তেহরানের দেওয়া প্রস্তাব মেনে নিলে পরমাণু ইস্যুতে কোনো ছাড় পাওয়ার আগেই ইরান নিজেদের নৌপথের সুবিধাগুলো আবার ফিরে পাওয়ার সুযোগ পাবে।

মধ্যস্থতাকারীদের উপস্থিতিতে আলোচনা ও প্রস্তাব তৈরি হলেও উত্তেজনার মাত্রা কমানোর মতো কোনো সুনির্দিষ্ট কাঠামো দৃশ্যমান হচ্ছে না। কোন ক্রমানুসারে এবং কার আহ্বানে কে কতটুকু ছাড় দেবে, সেই প্রক্রিয়া এখন সাধারণ কোনো টেকনিক্যাল ডিটেইল বা সূক্ষ্ম কৌশলগত বিষয় নয়; বরং সেটিই এখন যুদ্ধের মূল বিষয়বস্তুতে পরিণত হয়েছে।

এই টানাপোড়েনে অবরোধ জারি থাকলেও ইরানের নতি স্বীকার করার সম্ভাবনা ক্ষীণ। সেটি সম্ভব না হলে ওয়াশিংটনের জন্য এই অবরোধ জয়ের পথ হিসেবে কাজ না করে বরং বিজয় যে নাগালের বাইরে, সেই সত্যকেই কেবল দীর্ঘায়িত করবে। এখানে ইরানের অর্থনৈতিক পতন নিয়ে ট্রাম্পের করা মন্তব্যগুলোও গুরুত্বপূর্ণ।

তেহরান নিজেদের বিধ্বস্ত মনে করছে এবং হরমুজ প্রণালি সচল করতে আগ্রহী বলে তিনি যে দাবি তুলেছিলেন, সেটি কেবল প্রতিপক্ষকে চাপে রাখার জন্য নয়। মূলত ইরান চাপের মুখে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হচ্ছে—এমন একটি আখ্যান তৈরির চেষ্টাই ছিল এর উদ্দেশ্য।

ইরানের অর্থনীতি নিঃসন্দেহে কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। গত এপ্রিল মাসের শেষ দিকে খোলাবাজারে ডলারের দর যেভাবে রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছাল, সেটি তাদের সামগ্রিক অর্থনৈতিক আস্থার চরম অবনতির প্রতীক। যুদ্ধ ও দীর্ঘ অবরোধের মুখে বিধ্বস্ত কোনো জনপদের জন্য এমন মুদ্রা অবক্ষয় কল্পনাতীত।

তবে অর্থনৈতিক ভোগান্তি আর রাজনৈতিক পরাজয় এক নয়। কোনো দেশ প্রত্যাশার চেয়েও বেশি সময় ধরে দুর্দিন সহ্য করতে পারে, যখন তাদের শাসকেরা মনে করেন যে চাপের মুখে মাথা নত করলে তাঁদের কর্তৃত্ব টিকিয়ে রাখাই দায় হয়ে যাবে।

ওয়াশিংটনের এই কৌশলের বিরূপ প্রভাব কেবল আঞ্চলিক সীমানায় সীমাবদ্ধ নয়। বিশ্বব্যাংক সতর্ক করেছে, ২০২৬ সালের মধ্যে এই যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্বে জ্বালানির দাম অন্তত ২৪ শতাংশ বাড়তে পারে। সারের দামও ৩০ শতাংশের ওপর বাড়বে, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে বৈশ্বিক খাদ্য সরবরাহ এবং মূল্যস্ফীতির ওপর। এই পরিসংখ্যানগুলো মূলত ওয়াশিংটনের হাতের সবচেয়ে বড় তুরুপের তাসের অন্তরালে লুকিয়ে থাকা বড় ধরনের দুর্বলতাকেই উন্মোচিত করে দেয়।

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের পতাকা
ফাইল ছবি: রয়টার্স

তেহরানের জন্য হরমুজ প্রণালি বড় হাতিয়ার হলেও তার ব্যবহারে ঝুঁকি রয়েছে। হরমুজ কেবল একটি নৌপথ নয়, বরং এটি বিশ্ব অর্থনীতির সবচেয়ে সংবেদনশীল জ্বালানি ধমনি। যুদ্ধের আগে যেখানে দৈনিক শ খানেক জাহাজ এই পথে চলত, এখন সেই সংখ্যা গুটিকয়েকের নিচে নেমে এসেছে। বিমা কোম্পানি ও পণ্যমালিকেরা কোনো বড় রাজনৈতিক বার্তার বদলে এই জলপথের বাস্তব নিরাপত্তার অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন।

ইরান প্রথমেই জলপথ উন্মুক্ত করে দিয়ে এবং হাতে থাকা বড় সুবিধাটি খুইয়ে কোনো আলোচনার টেবিলে বসতে ইচ্ছুক নয়; বরং তেহরান চায় পরমাণু দর-কষাকষির আগেই যুদ্ধ ও সামুদ্রিক অবরোধের অবসান হোক। এই চাওয়া যতটা যৌক্তিক, ঠিক ততটাই বিপজ্জনক। জলপথ আটকে রেখে বিশ্ব অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব সৃষ্টির একটি সীমা রয়েছে।

এটি যত দীর্ঘ হবে, ইরান কেবল ওয়াশিংটনের প্রতিপক্ষ থাকবে না; বরং আমদানিকারক দেশ থেকে শুরু করে বিমা কোম্পানি ও সাধারণ জনগণের কাছে বড় একটি ক্ষোভের কারণ হয়ে দাঁড়াবে। ইরান সময় থাকতে ছাড় না দিলে কূটনৈতিক সুবিধাও হারাবে, আবার দীর্ঘ সময় তাসের চাল হিসেবে একে আঁকড়ে রাখলে বিশ্বজুড়ে তার নিজের প্রতিকূলেই শক্ত জনমত তৈরি হবে।

বর্তমান এই অচলাবস্থার সারমর্ম হলো দুই পক্ষই এমন সব তাস হাতে নিয়ে আছে, যেগুলোর প্রভাব কার্যকর রাখার প্রধান শর্ত হলো, সেগুলো ব্যবহার না করা।

আরও পড়ুন

ওয়াশিংটন চায় না অবরোধ তুলে দেওয়ার সুযোগ ইরান একা কাজে লাগাক আবার ইরান চায় না জলপথ স্বাভাবিক করার পর ওয়াশিংটন নতুন করে অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপ প্রয়োগের পথটি হাতে রাখুক। কেউ প্রথমে সরলে যদি বিপরীত পক্ষ বিশ্বাসঘাতকতা করে, সেই আশঙ্কায় আস্থার বদলে গভীর সন্দেহ এখন যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি নিয়ন্ত্রণ করছে।

মধ্যস্থতাকারীদের উপস্থিতিতে আলোচনা ও প্রস্তাব তৈরি হলেও উত্তেজনার মাত্রা কমানোর মতো কোনো সুনির্দিষ্ট কাঠামো দৃশ্যমান হচ্ছে না। কোন ক্রমানুসারে এবং কার আহ্বানে কে কতটুকু ছাড় দেবে, সেই প্রক্রিয়া এখন সাধারণ কোনো টেকনিক্যাল ডিটেইল বা সূক্ষ্ম কৌশলগত বিষয় নয়; বরং সেটিই এখন যুদ্ধের মূল বিষয়বস্তুতে পরিণত হয়েছে।

সংকটটি দীর্ঘ হওয়ার ফলে এখন এটি আর কেবল তেহরান ও ওয়াশিংটনের ঘরোয়া সমস্যা হিসেবে থাকছে না। এখানে অদৃশ্য হয়েও তৃতীয় সবচেয়ে শক্তিশালী অংশীদার হলো বিশ্ব অর্থনীতি। জ্বালানি তেলের মূল্য থেকে শুরু করে পণ্যের ভাড়া হিসেবে এটি তার নিজস্ব ভাষা বুঝিয়ে দিচ্ছে।

সরকারি স্তরে কেবল যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দিয়েই বড় কোনো বাণিজ্যিক পরিবর্তন আসবে না। যতক্ষণ না জলপথ দিয়ে নিরাপদ ও সহজ জাহাজ চলাচল আবার সুনিশ্চিত হচ্ছে, ততক্ষণ ঝুঁকি বিমার বাড়তি টাকা বা খাদ্যসংকটের সম্ভাবনা কমে আসবে না।

বড় আশঙ্কার বিষয় এটি নয় যে- এই সীমিত পর্যায়ের যুদ্ধ কোনো বৃহৎ ও রক্তাক্ত সংঘাতের দিকে মোড় নেবে! বরং প্রকৃত ঝুঁকি হলো এই যুদ্ধবিরতি একটি দীর্ঘস্থায়ী অবরোধে রূপান্তরিত হওয়া।

এই শান্ত আবহের আড়ালে সামুদ্রিক ঘেরাও অব্যাহত থাকবে, কিন্তু বাইরে হয়তো কামানের গর্জন শোনা যাবে না। ফলাফল হবে অদ্ভুত এক পরিস্থিতি, যেখানে ওয়াশিংটন নিজের অবরোধ কৌশল ব্যর্থ হওয়ার দায় নেবে না, আবার তেহরানও নিজের প্রধান শক্তি বিসর্জনের পথে হাঁটবে না।

  • ড. মুজতবা তৌইসেরকানি আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিশেষজ্ঞ

    মিডিল ইস্ট মনিটর থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত