‘তুমি সেই বৃষ্টিভেজা কৃষকের বেদনার কথা বলো...’

‘শ্রমিকের ভাগ্য ফিরেছে কি ফেরেনি, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, সমাজে শ্রমের মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কি না।’

অষ্টাদশ শতকের শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্রে ঘটল এক অভাবনীয় শিল্পবিপ্লব। কৃষির উদ্বৃত্তই মালিকদের শিল্পের দিকে ধাবিত করে। তারপর নগরায়ণ হলো, রেল হলো, তুলাসহ বিভিন্ন পণ্য শিল্পজাত হলো, বিদ্যুৎ এল, সব এল। মালিকের পকেট ভারী হল। শুধু ফিরল না শ্রমিকের ভাগ্য। অতি মুনাফার লোভে তাঁদের বঞ্চনা বরং আরও বেড়ে গেল। নিজের কিশোর সন্তানকে কাজে পাঠিয়েও সংসার চালানোর মতো আয় করতে পারল না একটি শ্রমিক পরিবার।

দৈনিক ১২ ঘণ্টা করে সপ্তাহে সাত দিন কাজ করার বাধ্যবাধকতার বিরুদ্ধে অবশেষে রুখে দাঁড়ালেন মার্কিন মুলুকের শ্রমজীবী মানুষ। প্রতিবাদে রাজপথে নেমে এল শ্রমিক সমাজ। অষ্টাদশ শতকের শেষ দিকে অর্থাৎ শিল্পবিপ্লবের প্রাক্কালেই প্রতিবাদের অসংখ্য ঘটনা ঘটল। এর মধ্যে ১৮৮৬ সালের কুখ্যাত হে মার্কেটের দাঙ্গায় নিহত হন বেশ কিছু শ্রমিক। রক্তের বিনিময়ে অবশেষে একদিন প্রতিষ্ঠিত হলো দৈনিক আট ঘণ্টা কাজ সপ্তাহে পাঁচ দিন।

শ্রমিকের ভাগ্য ফিরেছে কি ফেরেনি, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, সমাজে শ্রমের মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কি না। শ্রমের মর্যাদা একটা মনোজাগতিক বিষয় এবং সামন্তীয় দৃষ্টিভঙ্গিই শ্রমের মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পথে সবচেয়ে বড় বাধা।

রবীন্দ্রনাথ জমিদারপুত্র ছিলেন। জীবনের শেষ দিকে রবীন্দ্রনাথ একসময় উপলব্ধি করলেন, যাঁদের শ্রমে এই জগৎ সংসার চলছে, তাঁদের জন্য কিছুই লেখা হয়নি, তাঁর সাহিত্যে সেই শ্রমজীবী মানুষেরই কোনো স্থান হয়নি। এ জন্য তিনি গভীর বেদনা অনুভব করলেন। ১৯৪১ সালে ‘জন্মদিনে’ কবিতায় তিনি লিখলেন:

‘চাষি ক্ষেতে চালাইছে হাল,

তাঁতি বসে তাঁত বোনে, জেলে ফেলে জাল’

একই কবিতায় তিনি তাঁর সীমাবদ্ধতার কথাও উল্লেখ করেন এবং এমন একজন কবির আবির্ভাব কামনা করেন, যিনি তাঁর কবিতায় শ্রমজীবী মানুষের জীবনগাথা রচনা করবেন। তিনি লিখেছেন:

‘আমার কবিতা, জানি আমি,

গেলেও বিচিত্র পথে হয় নাই সর্বত্রগামী

...

যে আছে মাটির কাছাকাছি

সে কবির-বাণী-লাগি কান পেতে আছি’

যদিও রবীন্দ্রনাথ ১৯০৫ সাল থেকেই কৃষিবিজ্ঞান ও কৃষিব্যবস্থার উন্নয়ন এবং সমবায়ের মাধ্যমে কৃষকদের ভাগ্য ফেরানোর জন্য কাজ শুরু করে দিয়েছিলেন। বাংলা ১৩০০ সালে লেখা ‘এবার ফিরাও মোরে’ কবিতায়ও তিনি ‘দরিদ্রের ভগবানের’ মুক্তি আবাহন করেন।

অন্যদিকে কাজী নজরুল ইসলামের জীবন দর্শনই ছিল সাম্যে স্থিত। পরিভাষার অর্থেই তিনি সাম্যবাদী ছিলেন। কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাতা মুজফ্‌ফর আহমদের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ছিলেন। প্রথম জীবনেই তিনি লিখেছেন, ‘কুলি বলে বাবু সা’ব তাঁরে ঠেলে দিল নিচে ফেলে!/...এমন ক’রে কি জগৎ জুড়িয়া মার খাবে দুর্বল?’

এর পরে প্রেমেন্দ্র মিত্র, বিষ্ণু দে, সুভাষ মুখোপাধ্যায় প্রমুখ কবি অনেক কবিতা লিখেছেন শ্রমজীবী মানুষের জীবনকে উপজীব্য করে। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর প্রাগৈতিহাসিক গল্পে এক ভিখারির জীবনের করুণ কাহিনি বর্ণনা করে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করেছেন। কিন্তু তাতে কোনো লাভ হয়নি। বাঙালি সমাজে শ্রমের মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হয়নি, নিম্নবর্ণের মানুষের প্রতি উচ্চবর্ণের মানুষের অবজ্ঞা দূর হয়নি।

চার্লস ডিকেন্স তাঁর অলিভার টুইস্ট উপন্যাসে এক এতিম বালকের জীবনের করুণ কাহিনি বর্ণনা করেছেন। বালকটির উক্তি, ‘আই ওয়াজ বিটেন বিকজ আই ওয়ান্টেড মোর’ অর্থাৎ ‘আর একটা রুটি চেয়েছিলাম বলে ওরা আমাকে প্রহার করেছিল’ আজও আমাদের কানে বেদনার মতো বাজে। এবার অবশ্য বিশ্ব বিবেক জেগে উঠল।

ব্রিটিশ পার্লামেন্টে এই করুণ কাহিনি নিয়ে আলোচনা হলো। সেই বছরই অর্থাৎ ১৮৩৮ সালেই দরিদ্রদের সুরক্ষার জন্য আইন হলো। সারা পৃথিবীতেই তাঁর এ উপন্যাস ব্যাপকভাবে সাড়া জাগায়, মানুষের বিবেককে প্রবলভাবে আঘাত করে। উন্নত দেশগুলোতে এই যে বেকার ভাতার ব্যবস্থা, তার উৎস চার্লস ডিকেন্সের অলিভার টুইস্ট উপন্যাস।

আশির দশক থেকেই বাংলাদেশ অর্থনীতির প্রধান চালিকা শক্তি পোশাকশিল্প। পোশাকশিল্প বাদ দিয়ে বর্তমান বাংলাদেশের অর্থনীতি চিন্তাই করা যায় না; অথচ বাংলাদেশে পোশাকশ্রমিকদের বেতন পোশাক রপ্তানিকারী অন্যান্য দেশের তুলনায় একেবারে নিচের দিকে। আবার নারী শ্রমিকেরা বিভিন্নভাবে নিগ্রহের শিকার হন। নিগ্রহের মধ্যে যৌন হয়রানির ঘটনাই বেশি।

নারীরা যখন অতি অল্প বেতন নিয়ে কাজ করতে বাধ্য হন, তখন তাঁরা সংসারের ব্যয় মিটাতে না পেরে বুকে পাথর বেঁধে যৌন হয়রানিও নীরবে মেনে নেন। হয়তো তাঁর বৃদ্ধ পিতা অসুস্থ, তাঁর জন্য ওষুধ কিনতে হবে, হয়তো ছোট ভাই স্কুলে যায়—তাঁকে টাকা পাঠাতে হবে।

পুঁজির বিকাশ ঘটেছে, মুক্তবাজার অর্থনীতি অনুসরণ করা হচ্ছে; কিন্তু আমরা পুঁজিবাদের উদারতাটুকু অর্জন করতে পারিনি, সমাজে শ্রমের মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত করতে পারিনি। যাঁরা বড় কর্মকর্তা পর্যায়ে সরকারি চাকরি করেন, তাঁদের সেবা দানের জন্য যে সংখ্যায় পিয়ন, পেয়াদা, আরদালি ও সহকারী থাকেন, তা উন্নত দেশে কল্পনাই করা যায় না। সে দেশের একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যও ক্যাফেতে গিয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে কফি কেনেন, নিজের গাড়ি নিজে চালান।

শহুরে মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্তরা তাঁদের বাড়িতে গৃহকর্মী রাখেন, যাঁদের তাঁরা নাম দিয়েছেন কাজের মেয়ে বা কাজের ছেলে। ‘কাজের মেয়ে’ বা ‘কাজের ছেলে’ নামের মধ্যেই নিহিত রয়েছে বাঙালি সমাজের সহস্র বছরের অবজ্ঞার নিদর্শন। এই ‘কাজের ছেলে-মেয়েকে’ অনেক গৃহস্থই খেতে দেন উচ্ছিষ্ট খাবার অথবা আলাদাভাবে রান্না করা মোটা চালের ভাত, শুতে দেন ঘরের মেঝেতে। শুধু রাতে ঘুমানোর সময়টুকু ছাড়া সে সারা দিন কাজ করে। অতএব তাঁর বেতন হওয়ার কথা প্রতিদিন ১৮ ঘণ্টার সমান। অথচ সে মাসে বেতন পায় ৫০০ থেকে ১০০০ টাকা।

আরও পড়ুন

এমন শ্রম শোষণ পৃথিবীর আর কোথাও আছে কি না, আমার জানা নেই। এমন অমানবিক দৃশ্য প্রায়ই দেখা যায় যে ১৫-১৬ বছরের গৃহকর্তার ছেলের স্কুলব্যাগ বহন করে নিয়ে যাচ্ছে ১০-১১ বছরের ‘কাজের মেয়ে’। ‘কাজের ছেলেমেয়েদের’ টেলিভিশন দেখার সুযোগ হলেও সোফায় বসার অনুমতি তাঁদের নেই। গাড়ির ড্রাইভারকেও তাঁরা টেবিলে খেতে দেন না।

বাঙালি সমাজে নিম্নবর্ণের মানুষের প্রতি উচ্চবর্ণের মানুষের এই যে দৃষ্টিভঙ্গি—এ হলো সামন্তীয় দৃষ্টিভঙ্গি। এই দৃষ্টিভঙ্গি সেকেলে ও অনাধুনিক। সামন্তীয় ব্যবস্থা বিলুপ্ত হয়েছে ঠিকই, সামন্তীয় দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন হয়নি মোটেও।

পুঁজির বিকাশ ঘটেছে, মুক্তবাজার অর্থনীতি অনুসরণ করা হচ্ছে; কিন্তু আমরা পুঁজিবাদের উদারতাটুকু অর্জন করতে পারিনি, সমাজে শ্রমের মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত করতে পারিনি। যাঁরা বড় কর্মকর্তা পর্যায়ে সরকারি চাকরি করেন, তাঁদের সেবা দানের জন্য যে সংখ্যায় পিয়ন, পেয়াদা, আরদালি ও সহকারী থাকেন, তা উন্নত দেশে কল্পনাই করা যায় না। সে দেশের একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যও ক্যাফেতে গিয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে কফি কেনেন, নিজের গাড়ি নিজে চালান।

ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীকে দেখা গেছে মেট্রোতে সিট না পেয়ে দাঁড়িয়ে অফিসে যেতে। স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশের অনেক প্রধানমন্ত্রী নিজ হাতে বাজার করে হেঁটে বাড়ি ফেরেন। সাউথ আমেরিকার এক দেশের এক প্রধানমন্ত্রীকে একবার দেখা গেল হেঁটে সেলুনে গিয়ে চুল কেটে আসতে।

ব্যাপক উন্নয়নমূলক কর্মসূচি ও নিরাপত্তা জাল না থাকলে একটা বিভাজিত সমাজে পুঁজিবাদী রাষ্ট্রে সমতা নিশ্চিত করা অসম্ভব। ইংল্যান্ডে আমি দেখেছি, ইউনিভার্সিটিতে কর্মচারী থেকে শুরু করে প্রফেসর পর্যন্ত কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ পুরস্কার পেয়ে থাকেন। বার্ষিক ডিনারে পুরস্কারপ্রাপ্ত সবাই উপাচার্যের সঙ্গে একই টেবিলে খেতে বসেন। যেখানে থাকেন শৌচাগারকর্মী থেকে শুরু করে বিভিন্ন ফ্যাকাল্টির ডিন পর্যন্ত। বাইরে থেকে বোঝার উপায় নেই কে উপাচার্য আর কে শৌচাগারকর্মী।

সাহিত্যে শ্রমজীবী মানুষকে স্থান দেওয়া বা শ্রমজীবী মানুষের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করা যথেষ্ট নয়। শ্রমজীবী মানুষের মুক্তির জন্য সংগ্রামের অবতীর্ণ হতে হবে। বুঝতে হবে, পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় নিম্নবর্ণের মানুষ কখনই তাঁর ন্যায্য পাওনা পাবে না। শ্রমিক শ্রেণিকে ক্ষমতা দখল করে, নির্মাণ করতে হবে নতুন ব্যবস্থা। সে জন্য দরকার সর্বাত্মক বিপ্লব। শ্রম ছাড়া অন্য কোনো সম্পদ নেই যে সর্বহারার, এই বিপ্লবটা তাঁদেরকেই করতে হবে।

স্বামী বিবেকানন্দ, একজন সন্ন্যাসী হয়েও ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, রাশিয়ায় বিপ্লব আসন্ন। ছিলেন ব্রাহ্মণ্যবাদের ঘোরবিরোধী। তিনি কলিযুগকে বলেছিলেন শূদ্র জাগরণের যুগ। শূদ্রের জাগরণ বলতে তিনি আদতে শ্রমিকশ্রেণির শাসনকেই বুঝিয়েছিলেন।

মধ্যবিত্ত-উচ্চবিত্ত এ কাজ করতে চাইলে, তাঁদের হতে হবে মনে–প্রাণে শ্রেণিচ্যুত। এমনই এক মধ্যবিত্ত কবি, নির্মলেন্দু গুণ ‘প্রলেতারিয়েত’ নামে একটি কবিতা লিখে ঝড় তুলেছিলেন। শ্রমজীবী মানুষের জয়গান ও তাঁদের প্রতি গভীর ভালোবাসার প্রকাশ আছে কবিতাটির ছত্রে ছত্রে। কবির ভালোবাসা পেতে হলে, তাঁর প্রেমিকাকে কী কী করতে হবে, তার একটি দীর্ঘ তালিকাও কবি পেশ করেছেন কবিতার মধ্যে:

‘যতক্ষণ তুমি কৃষকের পাশে আছো

যতক্ষণ তুমি শ্রমিকের পাশে আছো

আমি আছি তোমার পাশেই।

যতক্ষণ তুমি মানুষের

শ্রমে শ্রদ্ধাশীল

যতক্ষণ তুমি পাহাড়ী নদীর

মতো খরস্রোতা

যতক্ষণ তুমি পলিমৃত্তিকার

মতো শস্যময়

ততক্ষণ আমিও তোমার।

...

যতক্ষণ তুমি সোনালি ধানের

মতো সত্য

যতক্ষণ তুমি চায়ের পাতার

মতো ঘ্রাণময়

যতক্ষণ তুমি দৃঢ়পেশী শ্রমিকের

মতো প্রতিবাদী

যতক্ষণ তুমি মৃত্তিকার

কাছে কৃষকের মতো নতমুখ—,

ততক্ষণ আমিও তোমার।...’

  • ড. এন এন তরুণ ইউনিভার্সিটি অব বাথ। সাউথ এশিয়া জার্নালের এডিটর অ্যাট লার্জ। [email protected]