অভিমত–বিশ্লেষণ
বিএনপি কি পুরোনো ক্ষমতাকাঠামো রক্ষা করতে চায়
গণ–অভ্যুত্থানে প্রত্যাশিত রাষ্ট্রীয় সংস্কারের বদলে পুরোনো নির্বাহী আধিপত্যই বজায় থাকবে কি না, তা নিয়ে লিখেছেন কল্লোল মোস্তফা
গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় নির্বাহী বিভাগের একচ্ছত্র আধিপত্য ঠেকাতে বিচার বিভাগ, দুর্নীতি দমন কমিশন, মানবাধিকার কমিশনের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতার কোনো বিকল্প নেই। বাংলাদেশের শাসনব্যবস্থার একটা বড় সংকট হলো, এই প্রতিষ্ঠানগুলো কাঠামোগতভাবেই স্বাধীন নয়। বাংলাদেশ যে বারবার জবাবদিহিহীন স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের খপ্পরে পড়ে, তার অন্যতম কারণও এটা।
জুলাই অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সর্বশেষ স্বৈরশাসনের অবসানের পর দেশের মানুষের প্রত্যাশা তাই স্বৈরতান্ত্রিক ক্ষমতাকাঠামোর প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার। বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় এ লক্ষ্যে বেশ কিছু অধ্যাদেশ জারি করা হয়।
এর মধ্যে রয়েছে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার জন্য জারি করা সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ ও অধস্তন আদালতের তত্ত্বাবধান ও নিয়ন্ত্রণে স্বতন্ত্র সচিবালয় প্রতিষ্ঠার অধ্যাদেশ। দুদকের স্বাধীনতা এবং তদন্ত ও গোপন অনুসন্ধানক্ষমতা বাড়াতে দুর্নীতি দমন কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশ, গুমের মতো অপরাধ প্রতিরোধে গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার (সংশোধন) অধ্যাদেশ, মানবাধিকার লঙ্ঘন প্রতিরোধে মানবাধিকার কমিশনকে শক্তিশালী করতে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ ইত্যাদি।
গণ-অভ্যুত্থানের পর প্রথম নির্বাচিত সরকার হিসেবে বিএনপি সরকারের দায়িত্ব হলো গণ–অভ্যুত্থান ও রাষ্ট্রসংস্কারের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অধ্যাদেশগুলোকে আইনে পরিণত করা।
বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, সরকার বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের বিতর্কিত আন্তর্জাতিক চুক্তি বাতিল বা সংশোধনে কোনো পদক্ষেপ না নিলেও যে অধ্যাদেশগুলোতে জনগণের দীর্ঘদিনের লড়াই–সংগ্রাম ও আশা–আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটেছে, সেগুলো বাতিল, স্থগিত বা সংশোধনের পথে হাঁটছে। সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন না করে সংবিধানের স্বৈরতান্ত্রিক ক্ষমতাকাঠামোর টেকসই সংস্কার নিয়েও তৈরি করেছে অনিশ্চয়তা।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশ যাচাই–বাছাই করার জন্য একটি বিশেষ সংসদীয় কমিটি গঠন করা হয়েছিল। ১৪ সদস্যের কমিটির ১১ সদস্য বিএনপির ও ৩ জন জামায়াতের।
সম্প্রতি এই কমিটি অধ্যাদেশগুলো যাচাই–বাছাই শেষে সুপারিশ জমা দিয়েছে। এতে অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ৯৮টি অধ্যাদেশ কোনো পরিবর্তন ছাড়াই আইনে পরিণত করতে বিল আকারে উপস্থাপনের সুপারিশ করা হয়েছে। ১৫টি অধ্যাদেশ সংশোধন করে বিল আকারে উপস্থাপনের সুপারিশ করা হয়েছে আর ২০টি অধ্যাদেশ আপাতত আইনে রূপান্তর না করার কথা বলা হয়েছে।
সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে এই সুপারিশগুলোতে মূলত সরকারি দল বিএনপির মতামতই প্রতিফলিত হয়েছে। অবশ্য প্রতিবেদনে এ বিষয়ে জামায়াতে ইসলামীর ৩ সদস্যের নোট অব ডিসেন্টের (ভিন্নমত) কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
যে ১৫টি অধ্যাদেশ সংশোধিত আকারে বিল উত্থাপনের সুপারিশ করা হয়েছে, তার মধ্যে বাংলাদেশ শ্রম (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ব্যাংক রেজোল্যুশন অধ্যাদেশ ও পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশের মতো গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ রয়েছে। এসব অধ্যাদেশের কোথায় কী ধরনের সংশোধনী আনা হবে, তা বিশেষ কমিটির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।
ফলে প্রশ্ন উঠেছে, অংশীজনদের সঙ্গে আলাপ–আলোচনা কিংবা বিভিন্ন কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে এসব অধ্যাদেশে যেসব ইতিবাচক সংস্কার করা হয়েছিল, স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর ইন্ধনে সেগুলো আবার পাল্টে যাবে কি না? ফলে এ বিষয়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিতের দাবি উঠেছে।
তবে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ তৈরি হয়েছে যে ২০টি অধ্যাদেশকে আপাতত আইনে রূপান্তর করা হচ্ছে না, সেগুলো ঘিরে। ২০টির মধ্যে ৪টি পুরোপুরি বাতিল এবং ১৬টি এখনই সংসদে বিল আকারে না তোলার সুপারিশ করা হয়েছে। ১৬টি পরবর্তী সময়ে যাচাই–বাছাই করে ‘অধিকতর শক্তিশালী করে’ নতুন বিল উত্থাপনের সুপারিশ করা হয়েছে। ফলে ২০টি অধ্যাদেশ কার্যকারিতা হারাতে যাচ্ছে। যে ৪টি অধ্যাদেশ একেবারে বাতিল করার কথা বলা হয়েছে, তার মধ্যে আছে সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগসংক্রান্ত এবং সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়–সংক্রান্ত অধ্যাদেশ। বাকি ১৬টির মধ্যে রয়েছে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন–সংক্রান্ত, গুম প্রতিরোধ–সংক্রান্ত এবং দুদক–সংক্রান্ত অধ্যাদেশ।
প্রশ্ন উঠতে পারে, এসব অধ্যাদেশ এখন অকার্যকর করে পরে অধিকতর শক্তিশালী করে উত্থাপন করলে সমস্যার কী আছে। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে, এতে কোনো সমস্যা নেই। নির্বাচিত সরকার হিসেবে বিএনপি অন্তর্বর্তী সরকারের সব অধ্যাদেশ হুবহু গ্রহণ করতেও আইনগতভাবে বাধ্য নয়।
মুশকিল হলো, যে কারণগুলো দেখিয়ে অধ্যাদেশগুলো অকার্যকর বা বাতিল করা হচ্ছে, তা এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও স্বাধীন ও শক্তিশালী করার কথা বলে না; বরং এসব প্রতিষ্ঠানের ওপর সরকারের নির্বাহী বিভাগের নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধি বা বজায় রাখার আকাঙ্ক্ষার কথাই বলে। অধ্যাদেশগুলো বাতিল বা স্থগিতের পেছনে সরকারপক্ষ থেকে দেওয়া যুক্তিগুলো খতিয়ে দেখলে এই মনোভাবই স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ
গুম প্রতিরোধে আন্তর্জাতিক কনভেনশনের বিধানাবলি মেনে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ জারি করা হয়। এতে গুমকে ‘চলমান অপরাধ’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়। এর সর্বোচ্চ শাস্তি নির্ধারণ করা হয় মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড।
বিএনপি তার নির্বাচনী ইশতেহারে গুম প্রতিরোধে ‘আন্তর্জাতিক কনভেনশন অনুযায়ী আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ’–এর প্রতিশ্রুতি (বিএনপির ইশতেহার, পৃষ্ঠা ১০) দিলেও এখন গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশকে আইনে পরিণত করতে চাচ্ছে না। সরকারের যুক্তি হলো, জাতীয় নিরাপত্তার কারণে আটকের ঘটনাকে গুমের সংজ্ঞা থেকে বাদ দিতে হবে। সেই সঙ্গে গুমের অভিযোগে নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে তদন্তে সরকারের পূর্বানুমতি লাগবে।
কিন্তু গুম–সংক্রান্ত অধ্যাদেশে এই সংশোধনীগুলো আনা হলে সেটাকে আর আন্তর্জাতিক কনভেনশন অনুযায়ী বলা যাবে না। তা ছাড়া অধ্যাদেশটিতে জাতীয় নিরাপত্তার কারণে কাউকে আটক করতে নিষেধ করা হয়নি। শুধু বলা হয়েছে, গুমের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের নিরাপত্তার অজুহাত অগ্রহণযোগ্য (ধারা ৬)। এর মানে হলো, জাতীয় নিরাপত্তা হোক আর যে কারণেই হোক, কাউকে আটক করলে তা গোপন রাখা যাবে না। নিরাপত্তা বাহিনীগুলো তো বিগত সময়ে সরকারের কথাতেই গুম করেছিল। এসব বাহিনীর বিরুদ্ধে তদন্ত করতে হলে যদি সরকারের আগাম অনুমতির শর্ত থাকে, তাহলে এই আইন করে কোনো লাভ হবে না। কারণ, সরকার নিজের নির্দেশ পালনকারীদের বিরুদ্ধে তদন্তের অনুমতি দেবে না।
কাজেই এই অধ্যাদেশ সংশোধন করে জাতীয় নিরাপত্তার নামে গুমের সুযোগ ও তদন্তে সরকারের পূর্বানুমতির শর্ত যুক্ত করা হলে নিরাপত্তা বাহিনীগুলোর মাধ্যমে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে গুমের সুযোগ থেকেই যাবে।
মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ
মানবাধিকার কমিশনকে স্বাধীন ও কার্যকর সংস্থা হিসেবে প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বেশ কিছু মৌলিক পরিবর্তন এনে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন সংশোধন অধ্যাদেশ করা হয়। কমিশনকে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে তদন্তের ক্ষমতা দেওয়া হয়, যার মধ্যে গুমসংক্রান্ত অপরাধও রয়েছে।
এই অধ্যাদেশ বাতিলের বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে যুক্তি হচ্ছে, কমিশন কোনো মন্ত্রণালয়ের আওতায় না থাকায় তদারকি কীভাবে হবে। নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে তদন্তের আগে সরকারের অনুমতি লাগবে। গ্রেপ্তারে আদালতের পরিবর্তে সরকারের অনুমতি লাগবে। বাছাই কমিটিতে আরও সরকারি প্রতিনিধি যোগ করতে হবে।
সরকারের এসব যুক্তি গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ, মানবাধিকার কমিশন যদি সরকারের মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকে, তাহলে আলাদা করে এই কমিশন করার প্রয়োজন থাকে না। কমিশন গঠনের উদ্দেশ্যই হলো স্বাধীন প্রতিষ্ঠান তৈরি করে নির্বাহী বিভাগের মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের তদন্ত করা।
এখন সরকারের যুক্তি মেনে এই কমিশনে যদি সরকারি প্রতিনিধি আরও বাড়ানো হয়, কমিশনের তদন্তে যদি সরকারের অনুমোদন লাগে, গ্রেপ্তারের ক্ষেত্রেও যদি আদালতের বদলে সরকারের অনুমতি লাগে, তাহলে এই কমিশনের স্বাধীনতা বলে কিছু থাকবে না।
এ ধরনের সংশোধনী আনতে চাওয়ার অর্থ হলো, বিগত সরকারের আমলে যেভাবে মানবাধিকার কমিশন সরকারের আজ্ঞাবহ প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করেছে, বিএনপিও সে রকম আজ্ঞাবহ মানবাধিকার কমিশন চায়।
দুর্নীতি দমন কমিশন (সংশোধিত) অধ্যাদেশ
এই অধ্যাদেশের মাধ্যমে সাত সদস্যের বাছাই কমিটি গঠন করে দুদকে কমিশনার নিয়োগের বিধান করা হয়েছিল। এই বাছাই কমিটিতে অন্তত তিনজন সরকারি প্রতিনিধি থাকবেন। বিএনপি সরকার বাছাই কমিটিতে আরও বেশি সরকারি প্রতিনিধি যুক্ত করতে চায়। সাত সদস্যবিশিষ্ট সার্চ কমিটিতে তিনজনের বেশি সরকারি প্রতিনিধি যুক্ত করার অর্থ হলো, কমিটিতে সরকারি প্রতিনিধিরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ হবেন। ফলে সরকারের পছন্দের ব্যক্তি দুদকের কমিশনার হবেন। এতে ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত আশা করা যায় না।
অথচ বিএনপি নির্বাচনী ইশতেহারে বলেছিল, ‘দুর্নীতি দমন কমিশন ও দুর্নীতি দমন আইন সংস্কারের পাশাপাশি পদ্ধতিগত সংস্কারের মাধ্যমে দুদকের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা হবে। দুদক সংস্কার–সংক্রান্ত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কর্তৃক গৃহীত সংস্কারগুলো যথেষ্ট নয় বলে বিএনপি মনে করে।’ (বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহার, পৃষ্ঠা ৯)
বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, বিএনপি দুদক অধ্যাদেশে যে সংশোধনী চায়, তা দুদকের স্বাধীনতা বৃদ্ধির বদলে আরও আজ্ঞাবহ করে তুলবে।
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা
বিএনপি বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার অধ্যাদেশগুলো সংশোধন করার কথা বলছে না। সরাসরি বাতিল করে দেওয়ার কথা বলছে। এই অধ্যাদেশগুলো হলো সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ ও সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ। অথচ বিএনপি নির্বাচনী ইশতেহারে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার কথা বলেছিল। সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ বিষয়ে বলেছিল, সংবিধানের ৯৫(২)(গ) অনুচ্ছেদ অনুসারে বিচারপতি নিয়োগ আইন প্রণয়ন করা হবে। (বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহার, পৃষ্ঠা ১০)
সংবিধানের ৯৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, প্রধান বিচারপতির সঙ্গে পরামর্শ করে অন্যান্য বিচারপতি নিয়োগ দেবেন রাষ্ট্রপতি। আর ৯৫(২)(গ)–তে সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগের যোগ্যতা নির্ধারণ করে আইন প্রণয়নের কথা বলা আছে। ৯৫(২)(গ)–তে বিচারক নিয়োগে আইন করার কথা থাকলেও দীর্ঘদিন এটা হয়নি। ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকার এ বিষয়ে অধ্যাদেশ জারি করে। তাতে বলা হয়, সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগে বিচারক নিয়োগের জন্য উপযুক্ত ব্যক্তি বাছাই করবে ‘সুপ্রিম জুডিশিয়াল অ্যাপয়েন্টমেন্ট কাউন্সিল’। প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে স্বতন্ত্র এই কাউন্সিল যোগ্য ব্যক্তির নাম রাষ্ট্রপতি বরাবর সুপারিশ করবে। রাষ্ট্রপতি এই সুপারিশ অনুযায়ী বিচারপতি নিয়োগ দেবেন।
কাজেই বিএনপির উচিত সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশটি আইনে পরিণত করা, যেন তার প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ‘দলীয় বিবেচনার ঊর্ধ্বে উঠে কেবলমাত্র জ্ঞান, প্রজ্ঞা, নীতিবোধ, বিচারবোধ ও সুনামের কঠোর মানদণ্ড যাচাই করে’ বিচারক নিয়োগ দেওয়া যায়। বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, বিএনপি অন্তর্বর্তী সরকারের করা সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ সরাসরি বাতিল করে দিচ্ছে।
এবার আসা যাক সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ প্রসঙ্গে। বিএনপি নির্বানী ইশতেহারে সুস্পষ্টভাবে বলেছিল, ‘অধস্তন আদালতসমূহের নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলা বিধান সুপ্রিম কোর্টের ওপর ন্যস্ত করা হবে। বিচার বিভাগের জন্য সুপ্রিম কোর্টের নিয়ন্ত্রণাধীন পৃথক সচিবালয়কে আরও শক্তিশালী করা হবে।’ (বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহার, পৃষ্ঠা ১০)
অধস্তন আদালতসমূহের নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলা বিধান সুপ্রিম কোর্টের ওপর ন্যস্ত করার জন্যই অন্তর্বর্তী সরকার একটি স্বতন্ত্র সচিবালয় প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ জারি করে। এই অধ্যাদেশ অনুসারে, বিচারকাজে নিয়োজিত বিচারকদের পদায়ন, পদোন্নতি, বদলি, শৃঙ্খলা ও ছুটিবিষয়ক সব সিদ্ধান্ত ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক বিষয় এই সচিবালয়ের হাতে থাকবে। আর এই সচিবালয়ের নিয়ন্ত্রণ থাকবে প্রধান বিচারপতির হাতে।
বিএনপি সরকারের উচিত, তার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুসারে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে প্রণীত সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশকে আইনে পরিণত করা। বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, বিএনপি তার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে সুপ্রিম কোর্টের নিয়ন্ত্রণাধীন পৃথক সচিবালয়কে আরও শক্তিশালী করার বদলে একেবারে বাতিল করে দিচ্ছে।
শেষ কথা
অন্তর্বর্তী সরকারের যেসব অধ্যাদেশ নির্বাহী বিভাগের একচ্ছত্র আধিপত্য সীমিত করার সম্ভাবনা তৈরি করেছিল, সেগুলোকেই বিএনপি সরকার হয় বাতিল করছে, নয়তো এমনভাবে সংশোধনের কথা বলছে, যা তাদের কার্যকারিতা ক্ষুণ্ন করবে। এতে গণ–অভ্যুত্থানে প্রত্যাশিত রাষ্ট্রীয় সংস্কারের বদলে পুরোনো নির্বাহী আধিপত্যই বজায় থাকবে। এখন মূল প্রশ্ন হলো, বিএনপি গণতান্ত্রিক রূপান্তরের পথে এগোবে নাকি স্বৈরাচারী ক্ষমতাকাঠামোকেই টিকিয়ে রাখবে—এই সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক রূপান্তর কতটা বাস্তবায়িত হবে আর কতটা আবারও প্রতিশ্রুতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে।
কল্লোল মোস্তফা লেখক ও গবেষক
মতামত লেখকের নিজস্ব
