জুলাই বিপ্লব, জনগণের পণ্য ও ফাউ উপভোগের সমস্যা

জুলাইয়ের গ্রাফিতি। ২০২৪ সালের ১৩ আগস্ট বগুড়া সরকারি আজিজুল হক কলেজের দেয়ালেসোয়েল রানা

অর্থনীতিতে জনসাধারণের পণ্য (পাবলিক গুডস) দুটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য দ্বারা সংজ্ঞায়িত হয়: অবর্জনযোগ্যতা (নন-এক্সক্লুডেবিলিটি) এবং অপ্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক ভোগ (নন-রাইভ্যালরি)। অবর্জনযোগ্যতা অর্থ হলো, কোনো জনসাধারণের পণ্য একবার সরবরাহ করা হলে কেউ তার মূল্য পরিশোধ করুক বা না করুক, তাকে সেই সুবিধা ভোগ করা থেকে বিরত রাখা যায় না। উদাহরণস্বরূপ, কোনো নাগরিককে জাতীয় প্রতিরক্ষার সুরক্ষা বা বিশুদ্ধ বাতাসের সুবিধা থেকে বঞ্চিত করা যায় না।

অন্যদিকে অপ্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক ভোগ বলতে বোঝায়, একজন ব্যক্তির কোনো পাবলিক গুডস ভোগ করার ফলে অন্য কারও জন্য তার পরিমাণ বা গুণগত মান কমে যায় না। যেমন একজন যদি একটি আলোকিত পথবাতির নিচে হাঁটেন, তাহলে পরবর্তী ব্যক্তির জন্য সেই আলো ম্লান হয়ে যায় না।

জনসাধারণের পণ্যের পূর্বে উল্লেখিত বৈশিষ্ট্যগুলোর কারণে ফাউ উপভোগের (ফ্রি-রাইডার) সমস্যার সৃষ্টি হয়। কারণ, ব্যবহারকারীদের এই সুবিধা ভোগ করা থেকে বিরত রাখা যায় না। ফলে তাঁরা স্বেচ্ছায় এর জন্য অর্থ প্রদান বা অবদান রাখার তেমন কোনো তাগিদ অনুভব করেন না। তাঁরা অন্যদের অবদানের ওপর ‘ফাউ উপভোগ’ করতে পারেন। এখন অর্থনীতির পাঠ্যপুস্তকে দেওয়া জনসাধারণের পণ্যের সংজ্ঞাটি জুলাই বিপ্লবের অর্জনের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করে দেখা যাক।

জুলাই বিপ্লবে অংশগ্রহণ করে পরবর্তী সময়ে যারা অপরাধ করেছে, তাদের অবশ্যই আইনের আওতায় এনে বিচার করতে হবে এবং আইনের বিধান অনুযায়ী সর্বোচ্চ শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু ভিত্তিহীন অভিযোগ অবশ্যই বন্ধ হওয়া উচিত।

জুলাই বিপ্লব কেবল একজন শাসককে ক্ষমতাচ্যুত করে আরেকজনকে ক্ষমতায় বসায়নি। এটি কিছু বাস্তব ও দৃশ্যমান অর্জন এনে দিয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো: ১. মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং ২. রাষ্ট্রশক্তির নির্মম ব্যবহারের ওপর নিয়ন্ত্রণ। খেয়াল করলেই দেখা যাবে, এই দুটি অর্জনই অবর্জনযোগ্য ও অপ্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক ভোগ, অর্থাৎ এগুলো জনসাধারণের পণ্যের দুটি বৈশিষ্ট্যই পূরণ করে।

অবর্জনযোগ্যতার বিষয়টি দৃশ্যমান। ক্ষমতাচ্যুত সরকারের সহযোগীরাও এখন সেই মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ভোগ করছেন, যা জুলাই ২০২৪-এর আগে ছিল না। একসময় ভিন্নমতাবলম্বীদের শিকার করত যে নির্মম নিরাপত্তাব্যবস্থা, তার ভয় ছাড়াই তাঁরা এখন কথা বলতে পারছেন।

আরও পড়ুন

অপ্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক ভোগের বিষয়টিও স্পষ্ট। সম্প্রতি কার্টুনিস্ট মেহেদী হকের আঁকা একটি কার্টুনে জুলাই বিপ্লবের একজন শীর্ষ নেতাকে স্থূলকায় হিসেবে দেখানো হয়েছে। কার্টুনটিতে এমন ইঙ্গিত করা হয়েছে, তিনি বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে অসৎ উপায়ে লাভবান হয়েছেন। কার্টুনটি অবাধে ছড়িয়ে পড়েছে, যা আগের শাসনামলে কল্পনাও করা যেত না।

আমাদের মনে রাখতে হবে, এর আগে কী ভয়াবহ দমন-পীড়ন চলেছিল। কার্টুনিস্ট ও ব্যঙ্গচিত্রশিল্পীরা কঠোর আইন, ভয়ভীতি প্রদর্শন, শারীরিক আটকসহ নানা নির্যাতনের মুখোমুখি হয়েছেন, যাতে ভিন্নমত দমন করা যায় এবং সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন করা যায়। কার্টুনিস্ট আহমেদ কবির কিশোরকে ২০২০ সালের মে মাসে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অধীনে গ্রেপ্তার করা হয় এবং হেফাজতে নির্যাতনের শিকার হতে হয়। পরে ২০২১ সালের মার্চে তিনি জামিনে মুক্তি পান।

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, ২০১৮ সালে পাস হয়। মানবাধিকার সংগঠনগুলো এই আইনের ব্যাপক সমালোচনা করেছিল। কারণ, এর বিস্তৃত ও অস্পষ্ট ধারাগুলো কার্যত অনলাইন মতপ্রকাশকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করার সুযোগ সৃষ্টি করেছিল। তৎকালীন সরকার নিয়মিতভাবে এই আইন ব্যবহার করে সমালোচনামূলক কার্টুন বা দুর্নীতিবিরোধী ব্যঙ্গচিত্র প্রকাশকারী শিল্পী ও লেখকদের গ্রেপ্তার বা হয়রানি করত।

আরও পড়ুন
আরও পড়ুন

গ্রেপ্তারের নিশ্চিত ভয় কার্টুনিস্ট এবং মূলধারার সংবাদমাধ্যমকে কঠোর স্ব-সেন্সরশিপে বাধ্য করেছিল। রাষ্ট্রের প্রতিশোধ এড়াতে বড় বড় সংবাদপত্র প্রায়ই নিজেদের প্রকাশিত কার্টুন বাদ দিত অথবা সরকারপ্রধানদের সমালোচনামূলক ব্যঙ্গচিত্র প্রকাশই করত না। স্বাধীন প্ল্যাটফর্মে কাজ করা শিল্পীরাও তীব্র নজরদারি এবং গোয়েন্দা সংস্থার চাপের মুখে পড়েছিলেন। ফলে অনেক চিত্রশিল্পী আত্মগোপনে যেতে বাধ্য হন অথবা রাজনৈতিক ব্যঙ্গচিত্র আঁকা সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেন।

এই ভয়ের পরিবেশ ভাঙতে শুরু করে ২০২৪ সালের জুলাই মাসের ছাত্র নেতৃত্বাধীন গণ–অভ্যুত্থানের মাধ্যমে। এই আন্দোলনের সময় সরকারবিরোধী ব্যঙ্গচিত্রের একটি প্রবল ঢেউ দেখা যায়, যা স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অবস্থান নেয় এবং শেষ পর্যন্ত সেই শাসনের পতনের আগে থেকেই প্রতিবাদের শক্তিশালী মাধ্যম হয়ে ওঠে।

তাহলে কেন এখন কেউ কেউ জুলাই বিপ্লবকে ব্যর্থ বলে অভিহিত করেন? ফাউ উপভোগের সমস্যাই এর পূর্ণাঙ্গ একটি ব্যাখ্যা দিতে পারে।

সম্প্রতি কার্টুনিস্ট মেহেদী হকের আঁকা একটি কার্টুন নিয়ে নানা আলোচনা–সমালোচনা দেখা গেছে
ছবি: মেহেদী হকের পেইজ থেকে

জুলাইয়ের অর্জন—মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং রাষ্ট্রের সহিংসতার ওপর নিয়ন্ত্রণ—অর্জিত হয়েছে অসীম আত্মত্যাগের বিনিময়ে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ১ হাজার ৪০০ জন শহীদ হন এবং ৩০ হাজার জন আহত হন; যাঁদের অনেকেই অঙ্গহানি, দৃষ্টিশক্তি হারানো বা গুলিবিদ্ধ হওয়ার মতো স্থায়ী ক্ষতির শিকার হন। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের অদম্য সাহস ও আত্মত্যাগ এবং অসংখ্য সাধারণ নাগরিকের অবদান, যা এই বিপ্লবকে সফল করে।

কিন্তু এই জনসাধারণের পণ্য—মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং রাষ্ট্রের সহিংসতার ওপর নিয়ন্ত্রণ—তাঁদের কাছ থেকেও প্রত্যাহার করা সম্ভব নয়, যাঁরা বিপ্লবের বিরোধিতা করেছিলেন অথবা তখন নীরব দর্শকের ভূমিকায় ছিলেন। এখন তাঁদের কেউ কেউ এই একই মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ব্যবহার করে জুলাই অভ্যুত্থান ও এর নেতাদের গালমন্দ করছেন এবং অনেক ক্ষেত্রেই ভিত্তিহীন অনিয়মের অভিযোগ তুলছেন।

জুলাই বিপ্লবে অংশগ্রহণ করে পরবর্তী সময়ে যারা অপরাধ করেছে, তাদের অবশ্যই আইনের আওতায় এনে বিচার করতে হবে এবং আইনের বিধান অনুযায়ী সর্বোচ্চ শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু ভিত্তিহীন অভিযোগ অবশ্যই বন্ধ হওয়া উচিত।

আমি ব্যক্তিগতভাবে জানি, জুলাই বিপ্লবের কিছু নেতা নিজেদের ২০২৬ সালের নির্বাচনী প্রচারের জন্য ন্যূনতম অর্থের সংস্থান করতেও হিমশিম খেয়েছিলেন।

আমি জুলাই বিপ্লবের শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাই, আহতদের স্মরণ করি এবং এই আন্দোলনের নেতা ও অংশগ্রহণকারী ছাত্র ও খেটে খাওয়া মানুষের অদম্য সাহস ও আত্মত্যাগকে অভিবাদন জানাই।

  • মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান অর্থনীতিবিদ ও সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা

    মতামত লেখকের নিজস্ব