সত্যি তো! রানির এক প্রহরের প্রমোদের জন্য কত টাকাপয়সা, ধনরত্ন চলে যায়। আর কয়েকটা বাড়িঘর পুড়ে গেছে, তাতে কী এমন ক্ষতি! ২০১২ সালে হলমার্ক যখন সোনালী ব্যাংকের চার হাজার কোটি টাকা লোপাট করেছিল, আমাদের প্রিয় অর্থমন্ত্রী (এখন প্রয়াত) আবুল মাল আবদুল মুহিত তখন বলেছিলেন, চার হাজার কোটি টাকা তেমন কোনো টাকাই নয়।

ঘূর্ণিঝড় সিত্রাংয়ের আঘাতে ৩৫ জন মানুষ মারা গেছেন। ঝড়ে ঘরবাড়ি, চিংড়িঘের, পুকুর ও ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ২৬ অক্টোবর ২০২২ প্রথম আলোর প্রধান খবরই ছিল এটা, ভেঙে পড়া ঘরবাড়ি আর গাছের নিচে অসহায় মানুষের ছবি। তার শিরোনাম—‘৩৫ প্রাণহানি, ফসলের ব্যাপক ক্ষতি।’ কিন্তু দেশের মানুষের কোনো বিকার নেই। ফেসবুকে এই দুঃখজনক খবর ‘ট্রেন্ডি’ হলো না। বরং ওই দিনের ‘হট-টপিক’ ছিল খিচুড়ির ছবি।

২৫ সেপ্টেম্বর ২০২২ পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলার মাড়েয়া বাজারের পাশে করতোয়া নদীর আউলিয়া ঘাট থেকে শতাধিক মানুষ নিয়ে শ্যালো ইঞ্জিনচালিত একটি নৌকা বদেশ্বরী মন্দিরের দিকে যাচ্ছিল। নদীর ওপারে মন্দির, এ সময় পূজা আর মেলা ছিল। ছোট্ট একটা শ্যালো ইঞ্জিনের নৌকায় শতাধিক যাত্রী ওঠেন। যখন নৌকাটা ছাড়ছিল, তখনই ছিল টলায়মান। তীব্র খরস্রোতা বর্ষার নদীর অনেকটা পাড়ি দেওয়ার পর নৌকা কাত হয়ে ডুবে যায়। ৬৯ যাত্রী মারা যান, আরও নিখোঁজ তিনজনের সন্ধান আর পাওয়া যায়নি। একটা ভিডিও আছে ফেসবুকে, ইউটিউবে। সেখান থেকে কপি করে এই লেখার অনলাইন ভার্সনে আমরা ভিডিওটা পোস্ট করছি। (ভিডিওর লিংক: https://www.facebook.com/watch/?v=626640239083061)

যদি সম্ভব হয়, আপনারা আপনাদের যন্ত্রে ভিডিওটা দেখে নেবেন। তাহলে অন্তত আমাদের পাষাণহৃদয় একটুখানি কেঁপে উঠতে পারে! ৬৯ জন মানুষ মারা গেল। আরও তিনজন নিখোঁজ। কিন্তু এই রাষ্ট্র এতখানি বিচলিত হলো না। আমাদের নাগরিক সমাজ একটুখানি থমকে দাঁড়াল না। জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত হওয়ার প্রশ্নই আসে না। আমরা নিজেরাই তো একটু ‘আহা’ও বললাম না। মৃত্যু এতই সহজ এখানে! জীবন এতই সস্তা! মৃতরা কেবলই সংখ্যা!

রাষ্ট্র কেন এত নির্বিকার? জানি, সরকার তদন্ত কমিটি করেন, পঞ্চগড়ের ঘটনায় দায়ী করা হয়েছে ইজারাদারদের। কোনোই সন্দেহ নেই, নৌকায় অতিরিক্ত যাত্রী নেওয়া হয়েছিল। ভিডিওতেই তা স্পষ্ট। এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ করার জন্য তদন্ত করা আর তা থেকে শিক্ষা নেওয়া, পরবর্তী দুর্ঘটনা রোধ করতে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। ঘূর্ণিঝড় সিত্রাংয়ের পূর্বাভাসে আবহাওয়া অধিদপ্তর তিনবার তিন কথা বলেছে। সন্ধ্যায় বলা হয়েছিল, ‘এটি মধ্যরাতে বা ভোরে ভোলার কাছ দিয়ে উপকূল অতিক্রম করতে পারে। রাত ১০টায় জানানো হলো, এক ঘণ্টা আগে এটা ভোলার কাছ দিয়ে উপকূল অতিক্রম শুরু করেছে। আর সবার আগে দুপুরবেলায় বলা হয়েছিল, এটা পটুয়াখালীর খেপুপাড়ার কাছ দিয়ে বরিশাল-চট্টগ্রাম উপকূল অতিক্রম করতে পারে।’ আবহাওয়ার পূর্বাভাসবিদেরা বলবেন, আমরা ঝড়ের গতিপ্রকৃতি দেখে পূর্বাভাস দিয়েছি, সিত্রাং নিজেকে বদলালে আমরা কী করব?

কর্তৃপক্ষের কর্তব্য হবে, এটা নিয়েও একটা তদন্ত কমিটি করা; আমাদের পূর্বাভাস এত অস্থির কেন? যন্ত্রপাতির অভাব, দক্ষ লোকের অভাব, নাকি বিশ্লেষণের ভুল? আমরা তো দেখি, ভারত কিংবা আমেরিকা থেকে যে পূর্বাভাস দেওয়া হয়, তা ঘড়ির কাঁটা ধরে মিলে যায়! আমরা কি উন্নত দেশগুলোর আবহাওয়ার পূর্বাভাসের সঙ্গে সমন্বয় করে থাকি, নাকি প্রবল জাতীয়তাবাদী অভিমানে ‘আমরাই স্বয়ংসম্পূর্ণ, কাজেই আমরাই পারি’ বলে নিজেদের প্রেডিকশন নিয়ে আত্মগর্বিতভাব দেখিয়ে থাকি! মূর্খের দর্প মারাত্মক আর তার হাতে যদি লক্ষজনের জীবন-মরণ সম্পদের ভার থেকে থাকে, তাহলে তার চেয়ে ভয়াবহ ব্যাপার আর কিছুই হতে পারে না!

যে প্রশ্ন তোলার জন্য এই লেখার সূত্রপাত, তা হলো আমরা নাগরিকেরা কবে এত আত্মকেন্দ্রিক হয়ে উঠলাম! কীভাবে হলাম! কেন ৬৯ জনের মৃত্যু কিংবা ৩৫ জনের মৃত্যু আর আমাদের মনে ছায়াপাত করছে না? কেন ‘আপনি বাঁচলে বাপের নাম’ মনোভাব নিয়ে চলছি সবাই! হাশরের ময়দানে বাবা সন্তানকে চিনবে না, স্বামী স্ত্রীকে চিনবে না। আমাদের কি সেই দশা হলো! নিজেদের ফ্ল্যাটে কেউ মারা গেলে আমরা খবর পাই না, খবর রাখিও না। হঠাৎ লোবানের গন্ধ পেলে হয়তো নিজের মৃত্যুর কথা একবার ভাবি! কিন্তু এই বাংলাদেশ তো এমন ছিল না। ১৯৭০ সালের ঘূর্ণিঝড়ের সময় পুরো বাংলাদেশ উপকূলে ছুটে গিয়েছিল। ১৯৮৮ সালের বন্যার সময় পুরা ঢাকা ত্রাণকাজে ব্যস্ত এবং নিবেদিত হয়ে উঠেছিল। জগন্নাথ হলের ছাদ ভেঙে পড়লে ঢাকাবাসী ছুটে চলে গিয়েছিল উদ্ধারকাজে অংশ নিতে! ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিতে যখন খবর ছড়াল যে পুলিশ গুলি করে ছাত্র হত্যা করেছে, তখন পুরান ঢাকাবাসীও প্রতিবাদে রাস্তায় বেরিয়ে এসেছিল, সেই ঢেউ ছড়িয়ে পড়েছিল সারা দেশে। তখন কিন্তু ফোন ছিল না, মুঠোফোনের প্রশ্নই আসে না; ফেসবুক তো কল্পনারও অতীত।

তাহলে আমাদের এই সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলো কি আমাদের অসামাজিক করে তুলল? যোগাযোগের মাধ্যম আমাদের যোগাযোগবিচ্ছিন্ন করে ফেলল? কানেকটিভিটির কালে আমরা পরস্পরের কাছ থেকে দূরে সরে যাচ্ছি? শুধু তা–ই নয়, দুর্যোগ, দুর্বিপাক, মানুষের কষ্টকে আমরা দাঁও মারার সুযোগ হিসেবেও নিচ্ছি! করোনা টেস্ট করার নাম করে টেস্ট না করেই টাকা নেওয়া থেকে শুরু করে ডলার সংকট দেখেই প্রতিযোগিতা করে ডলারের দাম বাড়িয়ে মুনাফা করা—এ হলো আমাদের নিষ্ঠুর অর্থগৃধ্নুতার সামান্য উদাহরণ।

পণ্ডিতেরা বলেন, পুঁজি গড়ে ওঠার কাল হলো লুটতরাজের কাল। ব্রিটেনেও যখন পুঁজি গড়ে উঠেছিল, তারা দস্যুবৃত্তিই করেছিল। কিন্তু তারা তো পৃথিবীর নানা জায়গায় উপনিবেশ আর দস্যুবৃত্তি করে অর্থ, ধন, সম্পদ নিজেদের দেশে নিয়ে গিয়েছিল। আমাদের দেশের লুটেরা ধনিকেরা, তস্কর, দস্যুরা (ভূমিদস্যু, বনখেকো, বালুখেকো, শেয়ারমার্কেট লুটেরা, টেন্ডারদস্যু, ব্যাংকলুটেরা, পদ বিক্রেতা, নিয়োগ বিক্রেতা, প্রশ্নপত্র বিক্রেতা, ক্যাসিনোসম্রাট, মাদকসম্রাট, চাঁদাবাজির গডফাদার, আদম পাচারকারী ইত্যাদি) তো দেশের টাকা বিদেশে পাচার করে দিচ্ছেন। দেশটা তো ঝাঁঝরা ফাঁপা হয়ে যাচ্ছে! এদিকেই বা রাষ্ট্রের নজর কই, মাথাব্যথার লক্ষণ কই, প্রতিকার-প্রতিবিধানের দৃষ্টিগ্রাহ্য উদ্যোগ কই? নাকি এ সবই সামান্যই ক্ষতি!

পঞ্চগড়ে ৬৯ জন মারা গেলে রাষ্ট্রীয় শোক হয় না। ঘূর্ণিঝড়ে ৩৫ জন মারা গেলে আমরা বলি, যাক, অল্পের ওপর দিয়েই গেল। এর কারণ, মৃতেরও শ্রেণিবিন্যাস আছে। ব্রিটেনের রানি মারা গেলে অবশ্যই আমাদের শোক করতে হবে। কিন্তু পঞ্চগড়ে মালতী রানী মারা গেলে কে রাখে তার খোঁজ? রবীন্দ্রনাথের ভাষায় বলতে চাই:
‘হে মোর দুর্ভাগা দেশ, যাদের করেছ অপমান,
অপমানে হতে হবে তাহাদের সবার সমান!’
রবীন্দ্রনাথ এই কবিতায় সাবধান করে দিয়েছেন:
‘দেখিতে পাও না তুমি মৃত্যুদূত দাঁড়ায়েছে দ্বারে,
অভিশাপ আঁকি দিল তোমার জাতির অহংকারে।
             সবারে না যদি ডাক,
             এখনো সরিয়া থাক,
আপনারে বেঁধে রাখ চৌদিকে জড়ায়ে অভিমান—
মৃত্যুমাঝে হবে তবে চিতাভস্মে সবার সমান।’

  • আনিসুল হক প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক ও সাহিত্যিক