২০২৫ সাল বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বছর ছিল। বড় কোনো ধাক্কা ছাড়াই বছরটি পার করেছে দেশের অর্থনীতি। একদিকে উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, অন্যদিকে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান ধরে রাখার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার চেষ্টা ছিল বছরজুড়ে।
সম্প্রতি বিশ্ববাজারে খাদ্য ও জ্বালানির দাম কমার প্রবণতা এবং দেশের অর্থনীতিতে ধীরে ধীরে স্থিতিশীলতা ফিরে আসার লক্ষণ দেখা দেওয়ায় অনেকেই ২০২৬ সাল নিয়ে আশাবাদী। এই আশাবাদের একটি বড় কারণ ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠেয় জাতীয় নির্বাচন। নির্বাচন-পরবর্তী পাঁচ বছরের জন্য একটি রাজনৈতিক সরকার গঠিত হলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়বে বলে মনে করা হচ্ছে।
এরই মধ্যে কিছু স্বস্তির খবর এসেছে বৈদেশিক লেনদেন ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে। গত এক বছরে অন্তর্বর্তী সরকার রিজার্ভ কমে যাওয়ার ধারা থামাতে সক্ষম হয়েছে। প্রবাসীরা গত কয়েক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ পরিমাণ রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন। তিন বছরের মধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গ্রস রিজার্ভ এখন সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে, প্রায় ৩৪ বিলিয়ন ডলারে। প্রবাসী আয় বাড়ায় বাংলাদেশ ব্যাংক প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যাংকগুলো থেকে ডলার কিনতে পারছে।
চট্টগ্রাম বন্দরের দুটি টার্মিনাল বিদেশি কোম্পানিকে ইজারা দেওয়া এবং ভারতের একাধিক দফা রপ্তানি বিধিনিষেধও নতুন সরকারকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করবে। অর্থনীতির পুনরুদ্ধারে দক্ষ ও সমন্বিত একটি অর্থনৈতিক টিম গঠনও জরুরি।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ‘পাল্টা শুল্ক’ আরোপের পরও রপ্তানি খাতে ইতিবাচক ধারা বজায় ছিল। তবে বিদায়ী বছরের শেষ কয়েক মাসে রপ্তানি কিছুটা হোঁচট খেয়েছে। এর পেছনে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকট আংশিকভাবে দায়ী বলে মনে করা হচ্ছে। পাল্টা শুল্কের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় বিক্রি কমেছে এবং প্রত্যাশামতো ক্রয়াদেশ আসছে না।
একই সঙ্গে চীন ও ভারতের ওপর যুক্তরাষ্ট্র বেশি হারে পাল্টা শুল্ক আরোপ করায় ওই দেশগুলোর উদ্যোক্তারা ইউরোপীয় ইউনিয়নের ক্রেতাদের কম দামে পণ্য দেওয়ার চেষ্টা করছেন। এতে বাংলাদেশের উদ্যোক্তারা তীব্র প্রতিযোগিতার মুখে পড়ছেন। পণ্য ও রপ্তানি বাজারে বৈচিত্র্য আনার কথা বহুদিন ধরে বলা হলেও বাস্তবে তেমন অগ্রগতি হয়নি।
গত বছরে আর্থিক খাত বড় ধরনের চাপে ছিল। খেলাপি ঋণ বাড়ায় ব্যাংক খাতের পরিস্থিতি কঠিন হয়ে পড়ে। তবে দুর্বল পাঁচটি ব্যাংক একীভূত হওয়ায় ২০২৬ সালে ঋণ প্রদান ও আর্থিক স্থিতিশীলতায় কিছুটা শক্ত ভিত্তি তৈরি হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। খেলাপি ঋণ আদায় ও পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার উদ্যোগ থাকলেও এখনো উল্লেখযোগ্য সাফল্য আসেনি। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর জানিয়েছেন, পাচারকারীদের বড় অংশ চিহ্নিত করা গেছে এবং আইনকানুনে প্রয়োজনীয় সংশোধন আনা হচ্ছে। প্রক্রিয়াটি কঠিন হলেও সময়ের সঙ্গে অগ্রগতি সম্ভব বলে তিনি আশাবাদী।
সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী ২৪ নভেম্বর বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে এলডিসি থেকে উত্তরণ ঘটাবে। ব্যবসায়ীরা এই উত্তরণ তিন থেকে ছয় বছর পিছিয়ে দেওয়ার দাবি জানালেও সরকারের অবস্থান স্পষ্ট। নির্ধারিত সময়েই উত্তরণ চায় সরকার।
২১ জানুয়ারি ঢাকায় জাতিসংঘ প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠকে উত্তরণের প্রস্তুতি ও আর্থসামাজিক সূচক পর্যালোচনা করা হবে। আট বছরের দীর্ঘ প্রক্রিয়া ও একাধিক মূল্যায়নের পর জাতিসংঘ এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। হাতে সময় আছে মাত্র ১১ মাস। এলডিসি উত্তরণে রপ্তানি খাতে, বিশেষ করে ওষুধশিল্পে চাপ বাড়তে পারে। বিদেশি স্বল্প সুদে ঋণ পাওয়াও কঠিন হতে পারে। তবে এটি সরকারের একক সিদ্ধান্ত নয়। পিছিয়ে দিতে হলে শক্ত যুক্তি ও আন্তর্জাতিক সমর্থন প্রয়োজন।
টানা কয়েক বছর অর্থনৈতিক চাপ ও অনিশ্চয়তার পর ২০২৬ সাল নিয়ে উন্নয়ন সহযোগী ও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আশার সঞ্চার হয়েছে। ফেব্রুয়ারির সংসদ নির্বাচনের পর রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরলে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে গতি আসতে পারে। আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্য ও জ্বালানির দাম কমলে মূল্যস্ফীতিও কিছুটা কমবে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।
তবে অর্থনীতি পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়াতে সময় লাগবে। নতুন সরকারকে নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে কয়েক মাস সময় দিতে হবে। গ্রহণযোগ্য নির্বাচন ও গণতান্ত্রিক
ক্ষমতা হস্তান্তরের পর নতুন সরকারকে ন্যায্য, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে হবে। চলমান সংস্কার ও নীতিগত স্থিরতা বিনিয়োগ বাড়াতে সহায়ক হবে। এতে কর্মসংস্থান বাড়বে, মানুষের আয় ও ক্রয়ক্ষমতা বাড়বে এবং অর্থনীতিও গতি পাবে। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
নতুন বছরে অর্থনীতির জন্য চারটি অগ্রাধিকার জরুরি। প্রথমত, চলমান সামষ্টিক অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলা। দ্বিতীয়ত, বিনিয়োগ, রপ্তানি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসা এবং অভ্যন্তরীণ চাহিদা পুনরুজ্জীবিত করা। তৃতীয়ত, ব্যাংক, বিমা, নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও পুঁজিবাজারে সুশাসন নিশ্চিত করা। চতুর্থত, একটি সুসংহত অর্থনৈতিক সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়ন।
গত বছর নিত্যপণ্যের উচ্চমূল্য সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় চাপ তৈরি করেছে। খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র প্রকাশ পেতে শুরু করেছে। গত সেপ্টেম্বর শেষে খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা, যা মোট ঋণের প্রায় ৩৬ শতাংশ। এবারও বিশেষ ক্ষমতায় ঋণ পুনর্গঠনের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। প্রায় ৩০০ প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে খেলাপি ঋণের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হলে আরও দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রয়োজন।
গত সরকারের সময়ে লুটপাট হওয়া কয়েকটি ব্যাংক একীভূত করে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ গঠন করা হয়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বিলুপ্ত করে রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগ গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এসব উদ্যোগ থেকে ফল পেতে সময় ও রাজনৈতিক দৃঢ়তা দরকার। এ ছাড়া চট্টগ্রাম বন্দরের দুটি টার্মিনাল বিদেশি কোম্পানিকে ইজারা দেওয়া এবং ভারতের একাধিক দফা রপ্তানি বিধিনিষেধও নতুন সরকারকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করবে। অর্থনীতির পুনরুদ্ধারে দক্ষ ও সমন্বিত একটি অর্থনৈতিক টিম গঠনও জরুরি।
মামুন রশীদ অর্থনীতি বিশ্লেষক
*মতামত লেখকের নিজস্ব
