দৈনিক প্রথম আলোয় প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, জেলা প্রশাসক (ডিসি) সম্মেলনে ৪৯৮টি প্রস্তাবের মধ্যে টিআর ও কাবিখা প্রকল্প খাদ্যের পরিবর্তে নগদ অর্থে বাস্তবায়নের একটি প্রস্তাব এসেছে। উল্লেখ্য, ৩ মে ঢাকায় শুরু হয়েছে ডিসিদের ৪ দিনের বার্ষিক সম্মেলন। সম্মেলনটি প্রশাসনের শুধু গতানুগতিক একটি পরিক্রমা হিসেবে বিবেচনা করা চলে না; এটা অতীত থেকে শিক্ষা, বর্তমানের চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যতের করণীয় সম্পর্কে মাঠ প্রশাসনের প্রধান নির্বাহীদের সরকারের প্রধানমন্ত্রীসহ মন্ত্রী ও সচিবদের নজরে আনার মতো অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় থাকে।
সম্মেলনের প্রস্তুতি হিসেবে ডিসি ও বিভাগীয় কমিশনারদের কাছ থেকে প্রাপ্ত বিভিন্ন প্রস্তাব পর্যালোচনা করে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ মন্ত্রণালয় ও বিভাগভিত্তিক আলোচনার সূচি তৈরি করে। জানা যায়, এবার ৩৪টি অধিবেশনে ৪৯৮টি প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা করা হবে। এর মধ্যে এটিও রয়েছে। এসব কর্মসূচি বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় থাকেন ডিসিরা। তাঁরা অনেকেই জানেন, কীভাবে বা কী করলে জনগণ অধিক উপকৃত হবে। সুতরাং তাঁদের কথা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী ও সচিব বিবেচনা করেন গুরুত্বের সঙ্গে। জানা সম্ভব হয়নি, কোন কোন ডিসি বা বিভাগীয় কমিশনার প্রস্তাবটি করেছেন বা সমর্থন করেন।
এটি মূলত দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়বিষয়ক। তবে খাদ্য মন্ত্রণালয় ও অর্থ বিভাগের সংশ্লিষ্টতা ব্যাপক। প্রস্তাবের সমর্থনেও কিছু কথা বলা যাবে, যেমন আলোচিত টেস্ট রিলিফ (টিআর) ও কাজের বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচি (কাবিখা) প্রকল্পের মালামাল পরিবহনের জন্য বরাদ্দ থাকে অপ্রতুল। এমনকি ক্ষেত্রবিশেষে সংশ্লিষ্ট শ্রমিকেরাও নগদ অর্থ নিতে পছন্দ করেন। তাই গুদাম থেকে বুঝে নেওয়ার পর্যায়ে এগুলোর বেশ কিছু বিক্রি হয়ে যায় খাদ্য ব্যবসায়ীদের কাছে। প্রস্তাবটি যিনি বা যাঁরা করেছেন, তাঁদের ধারণা, এর মাধ্যমে হয়তোবা ব্যবস্থাপনা অধিকতর স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক হবে।
আপাতত এমনটা দৃশ্যমান হলেও বাস্তবতা ভিন্ন। টিআর চালু হয় সম্ভবত ব্রিটিশ কিংবা পাকিস্তান আমলে। আর কাবিখার সূচনা পাকিস্তান আমলে। প্রথম দিকে এটা বৈদেশিক সাহায্যনির্ভর ছিল। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এটা পরিচালনা করতে সহায়তা দিত। এখন দুটি কার্যক্রমই সরকার নিজস্ব সম্পদে বাস্তবায়ন করছে। অবশ্য টিআরে খাদ্যসহায়তা নিকট অতীতে উঠেই গেছে। যুগবাহিত রেওয়াজ অনুসারে টিআরের মাধ্যমে কচুরিপানা, জঙ্গল পরিষ্কারসহ ছোটখাটো মেরামতি কাজে বরাদ্দ দেওয়া হয়।
কাবিখায় থাকে প্রধানত পল্লিপূর্ত কার্যক্রম যথা গ্রামীণ রাস্তাঘাট নির্মাণ, খাল পুনঃখনন ইত্যাদি। কাবিখায় একসময় পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের বড় বড় প্রকল্পও বাস্তবায়িত হতো। এখন সীমিত আকারে কাবিখা চলছে খাদ্যসহায়তার মাধ্যমে। বর্তমান অর্থবছরে এর জন্য ৯০ হাজার মেট্রিক টন চাল ও সমপরিমাণ গম এবং ভূমি মন্ত্রণালয়ের একটি প্রকল্পের ২০ হাজার টন বরাদ্দ রয়েছে। আলোচনা করা প্রাসঙ্গিক, উভয় কর্মসূচি যে সময়ে চলে, তখন গ্রামের মৌসুমি শ্রমিকদের কাজ থাকে না। ফসলের মৌসুম নয় বিধায় খাদ্যশস্যের দামও থাকে কিছুটা ঊর্ধ্বমুখী। এ সময়ে কর্মসংস্থানের পাশাপাশি কিছু খাদ্য সরকারি মজুত থেকে ছাড়া হলে মূল্য স্থিতিশীল রেখে বাজার ক্রেতাবান্ধব হয়।
সারা বছরে সরকারের বিভিন্ন চাহিদা বিবেচনা করে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের গণখাদ্য বিতরণব্যবস্থা (পিএফডিএস) চাহিদা নির্ধারণ করে। এসব চাহিদায় অন্তর্ভুক্ত থাকে বিভিন্ন বাহিনী ও সংস্থায় প্রদেয় রেশন, বাজারদর থেকে কম দামে খোলাবাজারে বিক্রি (ওএমএস), অসহায় বা দুস্থ জনগোষ্ঠীকে খাদ্যসহায়তা, খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি, কাবিখাসহ নানা কার্যক্রম।
এসব কার্যক্রম সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা বিভাগ পরিচালনা করলেও সব খাদ্য সংগ্রহ, পরিবহন ও মজুত করতে হয় খাদ্য মন্ত্রণালয়কে। আর সে মজুতের প্রধান উৎস ফসলের মৌসুমে সরকার নির্ধারিত প্রণোদনা মূল্যে কৃষকের ধান ও মিলারদের মাধ্যমে চাল সংগ্রহ করা। চালকলগুলো ধান কিনে চাল উৎপাদন করে এবং চুক্তিমতো সরকারি গুদামে চাল দেয়। এতে ফসল মৌসুমে সরকার সক্রিয় থাকলে কৃষকের জন্য জোটে প্রণোদনা মূল্য।
হাওর এলাকায় অস্থায়ী ভিত্তিতে যে বাঁধ দেওয়া হয়, সে সময়ে সেখানে থাকে না তেমন কর্মসংস্থানের সুযোগ। মানুষ থাকে অভাব–অনটনে। চাল কিনে খাওয়া তাঁদের পক্ষে অনেকটাই কষ্টসাধ্য হয়
সরকারের কাছে সরাসরি ধান এবং মিলারদের চাল বিক্রি করতে একটি সুনির্দিষ্ট মান রয়েছে। এ মানের সঙ্গে আপস করলে সরকারি অর্থের ব্যাপক অপচয় হবে। তবে শুধু দেশজ উৎপাদন থেকে খাদ্যশস্য পুরোপুরি সংগ্রহ সম্ভব হয় না। যেমন আমাদের গমের চাহিদা ৭০ লাখ টন হলেও দেশজ উৎপাদন কমবেশি ১০ লাখ টন।
সরকারি বিতরণব্যবস্থায় দরকার হয় ৭ লাখ টন। এর পুরোটাই বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। আর চালও চাহিদা মোতাবেক স্থানীয়ভাবে সংগ্রহের ঘাটতি মেটাতে বিদেশ থেকে আমদানি প্রয়োজন। সম্পূর্ণ পিএফডিএসের জন্য সংগ্রহ, মজুত ও বিতরণে খাদ্য মন্ত্রণালয়কে বরাদ্দ দেয় অর্থ বিভাগ।
পিএফডিএস খাতে বিতরণের দুটি মূল উদ্দেশ্যর একটি ফসল মৌসুমে কৃষককে প্রণোদনা দান, অপরটি বাজারমূল্য স্থিতিশীল রাখতে সহায়তা করা। তেমনি টিআর ও কাবিখায় খাদ্যসহায়তাও কর্মসংস্থানের পাশাপাশি বাজারমূল্য স্থিতিশীল রাখতে সহায়ক হয়। এ ক্ষেত্রে যেমন কিছু পরিমাণ খাদ্য ব্যবসায়ীদের কাছে চলে যাওয়ার অভিযোগ আছে, তেমনি আছে রেশনিং ব্যবস্থাতেও। তেমনটা যাতে না যায়, সে জন্য সবাই যতটা সম্ভব নজরদারি করা প্রয়োজন। তা না করে বিষয়টি তুলে দিলে বাজারদরের ওপর বিরূপ প্রতিক্রিয়া পড়তে পারে।
উল্লেখ্য, এসব ব্যবস্থা ত্রুটিমুক্ত—এমনটা বলা যাবে না। তবে ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষের পটভূমিতে গঠিত সিভিল সাপ্লাই ডিপার্টমেন্টের উত্তরসূরি আজকের খাদ্য অধিদপ্তর বিভিন্ন পরীক্ষা–নিরীক্ষার ফসল। এ ব্যবস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কারও কারও বিরুদ্ধে অদক্ষতা ও দুর্নীতির অভিযোগ থাকতে পারে। তবে তার জন্য বিষয়টি ছেঁটে ফেলা ঠিক হবে না। তাদের দক্ষতাও প্রশংসার সঙ্গে উল্লেখ করতে হয়। পিএফডিএস–সংক্রান্ত বার্ষিক চাহিদা প্রায় ৩৬ লাখ টন। অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ দিনে মজুত ছিল ২২ লাখ ১০ হাজার টন। পাইপলাইনে আমদানির অপেক্ষায় ছিল আরও ২ দশমিক ৫ লাখ টন। এটা ওই তারিখে নিকট অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি।
উল্লেখ্য, আমাদের ন্যূনতম নিরাপদ মজুত চাল ও গম মিলে ১৩ লাখ টন। গড়ে তোলা মজুত প্রতিনিয়তই খরচ হচ্ছে। আর খরচ করার জন্যই সংগ্রহ। তাই উভয় ব্যবস্থাই প্রতিনিয়ত সচল রাখতে হয়। এর একটি হচ্ছে কাজের বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচি। আগেই আলোচিত হয়েছে, কাবিখা ও টিআর পিএফডিএসের একটি অঙ্গ। এটি টাকায় রূপান্তর করলে মুদ্রাস্ফীতি বাড়বে। বাজারকে ভোক্তাবান্ধব করার প্রচেষ্টা কিছুটা হলেও থমকে যাবে।
মাঠ প্রশাসনে দীর্ঘকালীন অভিজ্ঞতা এবং অন্তর্বর্তী সরকারের একজন অংশীদার হিসেবে এই নিবন্ধকার বিবেচনা করে, কাবিখা কর্মসূচি কোনো অবস্থাতেই টাকায় রূপান্তর যথোচিত হবে না; বরং পানি উন্নয়ন বোর্ডের অনেক প্রকল্প এর আওতায় আনা যেতে পারে। বিশেষ করে হাওর এলাকায় অস্থায়ী ভিত্তিতে যে বাঁধ দেওয়া হয়, সে সময়ে সেখানে থাকে না তেমন কর্মসংস্থানের সুযোগ। মানুষ থাকে অভাব–অনটনে। চাল কিনে খাওয়া তাঁদের পক্ষে অনেকটাই কষ্টসাধ্য হয়। এ কর্মসূচিসহ সমধর্মী আরও বেশ কিছু কাজ খাদ্যের বিনিময়ে করার বিষয়টি এখন সময়ের দাবি।
আলী ইমাম মজুমদার সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব এবং সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা