বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলার বাহিনীকে পরাজিত করার কয়েক দিন পর রবার্ট ক্লাইভের বাহিনী রাজধানী মুর্শিদাবাদে প্রবেশ করছিল। বাহিনীতে সেনাসংখ্যা ছিল হাজার তিনেক, যার তিন ভাগের দুই ভাগই ভাড়া করা দেশি সেনা। ৮০০ থেকে ১ হাজারজন ছিলেন ইংরেজসহ ইউরোপীয় সেনা।
মুর্শিদাবাদের রাস্তায় ক্লাইভদের দেখতে হাজারো মানুষ ভিড় করেছিলেন। পরবর্তীকালে ক্লাইভ এক চিঠিতে লিখেছিলেন, ‘শহরটি (মুর্শিদাবাদ) কল্পনার অতীত জনবহুল ও সমৃদ্ধ। এর অধিবাসীর সংখ্যা লন্ডনের চেয়েও বেশি। আমরা মাত্র অল্প কয়েকজন সৈন্য নিয়ে শহরের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হয়েছি। নগরবাসী যদি ইচ্ছা করত, তবে লাঠি ও পাথর দিয়েই আমাদের ধ্বংস করে দিতে পারত।’
এ অঞ্চলে শাসক ও নাগরিকের মধ্যে বিচ্ছিন্নতার ইতিহাসটা যে অনেক প্রাচীন, রবার্ট ক্লাইভের চিঠিটা তার একটি ধ্রুপদি উদাহরণ। ব্রিটিশ ও পাকিস্তান পর্বের ২৫০ বছরের ঔপনিবেশিক শাসন সেই বিচ্ছিন্নতার দেয়ালটা আরও চিরস্থায়ী ভিত্তির ওপর দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। ব্রিটিশ শাসকদের শিক্ষাদর্শনের মূলে ছিল এমন একটি মধ্যস্বত্বভোগী তৈরি করা, যারা গায়ের রঙে কালো বা বাদামি হলেও চিন্তা ও কাজে হবে শ্বেতবর্ণের। ঔপনিবেশিক আইন, শাসনকাঠামো, আমলাতন্ত্র—সবটাই গড়ে তোলা হয়েছিল এই দর্শনের ওপর ভিত্তি করে।
এ অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘ ও রক্তক্ষয়ী উপনিবেশবাদবিরোধী লড়াইয়ের পরও রাষ্ট্র, আইন, শাসনকাঠামো ও শিক্ষায় গণতান্ত্রিক রূপান্তর হতে পারেনি রাজনৈতিক দলগুলোর ব্যর্থতা ও আপসের কারণে। বাংলাদেশ পর্বের ৫৫ বছরের অগণতান্ত্রিক, স্বৈরতান্ত্রিক ও কর্তৃত্ববাদী শাসনও এই ব্যর্থতা ও আপসের ইতিহাসেরই ধারাবাহিকতা। এর বিপরীতে জনগণের ইতিহাস হলো প্রতিরোধ আর আত্মদানের।
চব্বিশের অভ্যুত্থানকে একদিকে যেমন দল-মত-শ্রেণিনির্বিশেষে ইতিহাসের অনন্য এক ঐক্য হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা যায়, অন্যদিকে জনগণ থেকে চূড়ান্ত বিচ্ছিন্ন একটি কর্তৃত্ববাদী শাসক গোষ্ঠীর পতন হিসেবেও ব্যাখ্যা করা যায়। চব্বিশের অভ্যুত্থানে কিছু সময়ের জন্য হলেও জনতা মালিক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল। মানুষ মনে করেছিল, এবার একটা পরিবর্তন হবে, অনেক দূরের দেশের রাষ্ট্র, সরকার এবার তাদের কাছে আসবে। তবে একটি কেন্দ্রহীন ও কেন্দ্রীয় আকাঙ্ক্ষাহীন অভ্যুত্থানে (উত্তরাধুনিক তত্ত্বের সঙ্গে মিলিয়ে পড়ুন) সাধারণত যা ঘটে, বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি।
নাগরিককে অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার প্রশ্নে খুবই জরুরি সংস্কার থেকে পিছু হটায় নাগরিকেরা সেই আগের মতোই নিষ্ক্রিয় নাগরিক হয়ে গেলেন। নাগরিকদের ক্ষমতাহীন করে তোলার ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী সরকার ও বিএনপি সরকারের দায় আছে। আবার জামায়াত, এনসিপি ও নাগরিক সমাজ—কেউই তাদের দায় এড়াতে পারে না। কিছু বিবৃতি ও প্রতীকী কিছু কর্মসূচি ছাড়া তাদের কাউকেই জোরালো অবস্থান নিতে দেখা যায়নি; বরং উপজেলায় এমপিদের জন্য কার্যালয় প্রতিষ্ঠার মতো প্রস্তাবে বিরোধী দল বিরোধিতা করেনি।
দৃশ্যপট থেকে জনতা ক্রমেই সরে গেছে, তার জায়গায় বিভিন্ন পুরোনো ও নতুন সংগঠিত শক্তিগুলো অভ্যুত্থানের মালিকানার দাবি নিয়ে হাজির হতে থাকে। এর মধ্যে অন্তর্বর্তী সরকার ও কিছু রাজনৈতিক দলের প্রশ্রয়ে কিছু উগ্রপন্থী গোষ্ঠী নিজেদের অতি ক্ষমতায়িত মনে করতে শুরু করল। মব সহিংসতা ও নাগরিক অধিকার দমনের নতুন পর্ব শুরু হয়। নারী, জাতিগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘু, বাউল-পীর-মাজারপন্থী ও লিবারেল চিন্তার লোক, যাঁরা অভ্যুত্থানের অনেক আগে থেকেই সরব ছিলেন এবং অভ্যুত্থানের অন্যতম কেন্দ্রীয় শক্তি ছিলেন, তাঁরা আক্রান্ত ও কোণঠাসা হতে শুরু করেন।
একটি শক্তিশালী শাসন পতনের পর নতুন যে জনপ্রত্যাশার জোয়ার তৈরি হয়েছিল, তার হাত ধরেই অন্তর্বর্তী আমলে সংস্কারের উদ্যোগ শুরু হয়েছিল। সংস্কার কমিশনগুলো বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ ও জনগণের মতামত নিয়েই প্রতিবেদনগুলো তৈরি করেছিল। সেই আমলেই ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলোর চাপে নারী কমিশনের প্রতিবেদন এবং আমলাদের চাপে জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন ‘ডিপ ফ্রিজে’ তুলে রাখা হয়।
দুদক ও পুলিশ সংস্কারের প্রতিবেদন থেকেও জনসাধারণ সুফল পায়, এমন বিষয়গুলো আমলাদের চাপে কাটছাঁট করা হয়। একপর্যায়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার উদ্যোগ ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে রাজনৈতিক দলের দর-কষাকষির উদ্যোগে পরিণত হয়। পুরো প্রক্রিয়া থেকে জনগণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। আগ্রহ হারিয়ে ফেলায় নির্বাচনের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক সরকার আসুক, এমন প্রত্যাশাই তাদের একমাত্র চাওয়া হয়ে ওঠে। রাজনৈতিক দল খুব স্বাভাবিকভাবেই এটিকে সুযোগ হিসেবে কাজে লাগায় এবং সংস্কার উদ্যোগকে নিজেদের ইচ্ছা-অনিচ্ছার বিষয়ে পরিণত করে।
ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশনে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলের যে অধ্যাদেশগুলো বাতিল হয়েছে কিংবা সংশোধন করে পরবর্তী সময়ে বিল আকারে উত্থাপনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তার সবগুলোই রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারসংশ্লিষ্ট। এ সব অধ্যাদেশ আইন আকারে পাস হলে সরকার ও ক্ষমতাসীনদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা যেত, একই সঙ্গে তার সুফল নাগরিকেরাও পেতেন।
নাগরিকের কাছে অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার প্রশ্নে খুবই জরুরি সংস্কার থেকে পিছু হটায় নাগরিকেরা সেই আগের মতোই নিষ্ক্রিয় নাগরিক হয়ে গেলেন। নাগরিকদের ক্ষমতাহীন করে তোলার ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী সরকার ও বিএনপি সরকারের দায় আছে। আবার জামায়াত, এনসিপি ও নাগরিক সমাজ—কেউই তাদের দায় এড়াতে পারে না। কিছু বিবৃতি ও প্রতীকী কিছু কর্মসূচি ছাড়া তাদের কাউকেই জোরালো অবস্থান নিতে দেখা যায়নি; বরং উপজেলায় এমপিদের জন্য কার্যালয় প্রতিষ্ঠার মতো প্রস্তাবে বিরোধী দল বিরোধিতা করেনি।
স্থানীয় সরকার সংস্থা থাকার পরও সরকার যখন এলাকার উন্নয়নে এমপিদের জন্য বরাদ্দ দ্বিগুণ করেছে, তখনো তাদের সমর্থন করতে দেখা গেছে। অথচ এই দুটি সিদ্ধান্তই স্থানীয় সরকারব্যবস্থাকে পঙ্গু করে এমপিদের একক ক্ষমতাকে সংহত করার উদ্যোগ।
গত পাঁচ মাসের অভিজ্ঞতা বলে, বিএনপি সরকার অর্থনীতিকে তাদের মূল রাজনৈতিক এজেন্ডা হিসেবে নিয়েছে। ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ডের মতো কর্মসূচির পাশাপাশি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির চেষ্টা করছে। বৈরী পরিস্থিতিতে যে বিশাল বাজেট ঘোষণা করেছে, সেটা এরই প্রতিফলন। দেশি-বিদেশি উৎস থেকে অর্থ সংগ্রহে সরকারের একটা মরিয়া প্রচেষ্টা দেখা যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর, আইএমএফের সঙ্গে নতুন ঋণ কর্মসূচির আবেদন, বিশ্ববাজারে বন্ড ছেড়ে ঋণ নেওয়ার চিন্তার পেছনে মূলত এই দৃষ্টিভঙ্গি কাজ করেছে।
দুদক, জনপ্রশাসন, পুলিশ, বিচার বিভাগ, মানবাধিকার কমিশনের সংস্কার ছাড়া অর্থনৈতিক কর্মসূচি বাস্তবায়নের বড় ঝুঁকি ও বিপদ রয়েছে। এ ক্ষেত্রে সরকারকে দলীয় লোকজন ও আমলাতন্ত্রের ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়তে হয়। এই নির্ভরতা যত বাড়ে, নাগরিকদের থেকে সরকারের বিচ্ছিন্নতা তত বাড়ে।
প্রতিষ্ঠানগুলোর গণতান্ত্রিক রূপান্তরের প্রশ্নটিকে বাইরে রেখে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিনির্ভর উন্নয়নপ্রচেষ্টা রাষ্ট্র ও নাগরিকদের জন্য কতটা বিপর্যয় তৈরি করতে পারে, তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ আওয়ামী লীগের শক্তিশালী রাষ্ট্র ও কর্তৃত্ববাদী শাসনের মডেল। এর বিপরীতে অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরের দুর্বল শাসনে নাগরিকদের চূড়ান্ত অসহায়ত্বও আমরা দেখেছি।
দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া বিএনপির সামনে বাংলাদেশকে গণতান্ত্রিক রূপান্তরের একটি বড় সুযোগ এসেছে। ইতিহাসের ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়ার সুযোগও পেয়েছে তারা। শক্তিশালী শাসন ও দুর্বল শাসনের মধ্যবর্তী পথে কি হাঁটতে পারবে বাংলাদেশ।
মনোজ দে প্রথম আলোর সম্পাদকীয় সহকারী
মতামত লেখকের নিজস্ব