ইতিহাস কখনো কখনো এমন নির্মম বিদ্রূপ করে, যা কল্পনাকেও হার মানায়। ‘স্যাটানিক ভার্সেস’ বিতর্কের সময় বাক্স্বাধীনতার পক্ষে যেভাবে পশ্চিমা দুনিয়া সোচ্চার হয়েছিল কিংবা ‘জ্য সুই শার্লি’ স্লোগানের মাধ্যমে মতপ্রকাশের অধিকারের প্রতি যে একাত্মতা দেখানো হয়েছিল—তা আজও অনেকের মনে গেঁথে আছে। তখন বলা হয়েছিল, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিঃশর্ত, আপসহীন।
এমনকি কারও অনুভূতিতে আঘাত লাগলেও সেই স্বাধীনতা খর্ব করা যাবে না। ভলতেয়ারের নামে প্রচলিত সেই বিখ্যাত উক্তি—‘তোমার কথার সঙ্গে আমি একমত নই, কিন্তু তোমার বলার অধিকার রক্ষায় আমি জীবন দেব’—প্রায় মন্ত্রের মতো উচ্চারিত হয়েছে। অরওয়েলের সতর্কবাণীও উদ্ধৃত হয়েছে বারবার।
কিন্তু আজ, যখন ফিলিস্তিনের প্রসঙ্গ সামনে এসেছে, তখন যেন সেই সব নীতির ভিত্তিই নড়ে গেছে। যাঁরা এত দিন বাক্স্বাধীনতার সবচেয়ে বড় প্রবক্তা ছিলেন, তাঁরাই এখন তার সীমা টেনে দিতে চাইছেন। এই পরিবর্তন কোনো আচমকা ঘটনা নয়, বরং অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
দশকের পর দশক ধরে পশ্চিমা সরকারগুলো নিজেদের উদার গণতন্ত্রের আদর্শ হিসেবে তুলে ধরেছে। তারা বলেছে, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, ভিন্নমতের প্রতি সহনশীলতা এবং প্রতিবাদের অধিকার—এগুলো তাদের সমাজব্যবস্থার মেরুদণ্ড। এমনকি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধেও কথা বলা দেশপ্রেমের অংশ হিসেবে গণ্য হয়েছে। কিন্তু গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান শুরু হওয়ার পর থেকেই এ অবস্থানের মধ্যে স্পষ্ট পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে।
ব্রিটেনের কথাই ধরা যাক। সেখানে সরকার ‘প্যালেস্টাইন অ্যাকশন’ নামের একটি সংগঠনকে সন্ত্রাসবাদী ঘোষণা করেছে। এ সিদ্ধান্ত শুধু সরকারের একতরফা পদক্ষেপ নয়, পার্লামেন্টেও এটি বিপুল সমর্থন পেয়েছে। এটি ৩৮৫ জন সংসদ সদস্যের ভোটে পাস হয়েছে। অর্থাৎ রাজনৈতিক মতপার্থক্য সত্ত্বেও এই প্রশ্নে একটি বিস্ময়কর ঐকমত্য তৈরি হয়েছে।
এরপর যা ঘটেছে, তা আরও উদ্বেগজনক। সাধারণ মানুষ (যাঁদের মধ্যে রয়েছেন পুরোহিত, প্রবীণ নাগরিক, এমনকি শারীরিকভাবে অক্ষম ব্যক্তিরাও) শুধু একটি প্ল্যাকার্ড হাতে নিয়ে দাঁড়ানোর জন্য পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়েছেন। সেই প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল, ‘আমি গণহত্যার বিরোধিতা করি’ বা ‘আমি প্যালেস্টাইন অ্যাকশনকে সমর্থন করি’।
প্রশ্ন উঠছে, এটা কি কেবল আইনের প্রয়োগ, নাকি মতপ্রকাশের অধিকার দমনের একটি সুপরিকল্পিত প্রক্রিয়া?
যুক্তরাষ্ট্রে পরিস্থিতি আরও জটিল এবং উদ্বেগজনক। ট্রাম্প প্রশাসনের সময় থেকে শুরু হওয়া একধরনের কড়াকড়ি এখন আরও বিস্তৃত হয়েছে। বিশেষ করে ফিলিস্তিনপন্থী অবস্থান নেওয়া বিদেশি শিক্ষার্থীরা নজরদারি, জিজ্ঞাসাবাদ, এমনকি গ্রেপ্তারের মুখে পড়ছেন।
মাহমুদ খালিল ও রুমেইসা ওজতুর্কের ঘটনাই ধরা যাক। তাঁদের বিরুদ্ধে কোনো সহিংসতার অভিযোগ নেই। তবু তাঁদের আটক করা হয়েছে। ওজতুর্কের ক্ষেত্রে অভিযোগ ছিল, তিনি একটি মতামত লেখার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, যেখানে তাঁর বিশ্ববিদ্যালয়কে ইসরায়েল-সংযুক্ত কোম্পানিগুলোর সঙ্গে আর্থিক সম্পর্ক ছিন্ন করার আহ্বান জানানো হয়েছিল। একটি মতামত লেখাই যদি অপরাধ হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ভবিষ্যৎ কোথায় দাঁড়ায়?
এখানেই শেষ নয়। মার্কিন কংগ্রেসে একের পর এক প্রস্তাব আনা হচ্ছে, যার উদ্দেশ্য ইসরায়েলবিরোধী মতকে নিয়ন্ত্রণ করা। বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে এমন আইন তৈরি হচ্ছে, যেখানে ইসরায়েল বয়কটের বিরোধিতা করা হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ওপর রাজনৈতিক ও আর্থিক চাপ তৈরি করা হচ্ছে, যাতে তারা ফিলিস্তিনপন্থী আন্দোলন দমন করে।
ফলাফলও দৃশ্যমান। অনেক শিক্ষাবিদের চাকরি গেছে। অনেক অনুষ্ঠান বাতিল হয়েছে। বক্তাদের আমন্ত্রণ ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছে। সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে প্রচার চালানো হয়েছে। এককথায়, একটি ভয় ও আত্মনিয়ন্ত্রণের সংস্কৃতি তৈরি করা হয়েছে, যেখানে মানুষ নিজের মতপ্রকাশের আগে দশবার ভাবতে বাধ্য হচ্ছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—কেন ইসরায়েলকে এই বিশেষ সুরক্ষা দেওয়া হচ্ছে? কেন অন্য কোনো রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে যে সমালোচনা স্বাভাবিক, এখানে তা ‘বিদ্বেষ’ হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে? কোনো রাষ্ট্রই তো সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়। চীন, সৌদি আরব বা অন্য কোনো দেশের বিরুদ্ধে সমালোচনা করলে তা গ্রহণযোগ্য, কিন্তু ইসরায়েলের ক্ষেত্রে তা হঠাৎ করেই বিতর্কিত হয়ে ওঠে কেন?
এই প্রবণতা শুধু বাক্স্বাধীনতার সীমাবদ্ধতা নয়, এটি গণতন্ত্রের মৌলিক কাঠামোকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। কারণ, গণতন্ত্রের প্রাণশক্তি হলো মুক্ত বিতর্ক। যদি মানুষ রাষ্ট্রের নীতি নিয়ে প্রশ্ন তুলতে না পারে, তাহলে সেই রাষ্ট্রের জবাবদিহি কোথায়?
মেহদি হাসান সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও উপস্থাপক
দ্য গার্ডিয়ান থেকে নেওয়া। অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ