রাজনীতিবিজ্ঞানের একজন শিক্ষার্থী হিসেবে আমি হয়তো রাজনৈতিক সহিংসতার কৌশলগত ব্যবহার, ক্ষমতার বলয় কিংবা সংঘাতের তাত্ত্বিক রূপরেখা নিয়ে বিশদ একাডেমিক আলোচনা করতে পারি। কিন্তু যখন রাজনৈতিক সংঘাতের নির্মম খড়্গ গিয়ে পড়ে ১৮ বছরের এক তরুণের ওপর এবং তাঁকে চিরতরে একটি চোখের দৃষ্টিশক্তি হারাতে হয়, তখন সব গাণিতিক বিশ্লেষণ নিমেষেই থমকে যায়।
সিলেটের মাটিতে এনসিপির ‘জুলাই পদযাত্রা’কে কেন্দ্র করে ঘটে যাওয়া এই মর্মান্তিক ঘটনা আমাদের কেবল বর্তমান রাজনীতির দৈন্যকেই দেখায় না, বরং যে ভঙ্গুর নৈতিক ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আমরা গণতন্ত্রচর্চার দাবি করছি, তাকে চরমভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
প্রখ্যাত রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হ্যারল্ড লাসওয়েল রাজনীতিকে সংজ্ঞায়িত করেছিলেন এভাবে, ‘কে কী পায়, কখন পায় এবং কীভাবে পায়’। কিন্তু আজকের বাংলাদেশের বাস্তবতায় এই সংজ্ঞাকে বদলে নিয়ে আমাদের লিখতে হচ্ছে, ‘কে কী হারায়, কখন হারায় এবং কীভাবে হারায়’। যখন রাজপথের রাজনীতি অর্জনের হিসাব বাদ দিয়ে হারানোর দিকেই পা বাড়ায়, তখন বুঝতে হবে, আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি এক গভীর নৈতিক সংকটে পতিত হয়েছে।
এই সংঘাত ও ধ্বংসাত্মক রাজনীতির ইতিহাস হঠাৎ করে এক দিনে তৈরি হয়নি। যদি আমরা ১৫-১৬ বছরের রাজনৈতিক পরিস্থিতির দিকে পেছন ফিরে তাকাই, তবে দেখব কীভাবে পরিকল্পিতভাবে আমাদের রাজনীতির নৈতিক ভিত্তিটিকে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। তৎকালীন শাসকগোষ্ঠী যে ভাষায় এবং যে দমনমূলক ভঙ্গিতে বিরোধীপক্ষকে কোণঠাসা করে রেখেছিল, তা রাজনীতিতে এক চরম বিষাক্ত পরিবেশের জন্ম দেয়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় যাকে বলা হয় ‘উইনার-টেকস-অল’—সেই অপনীতি পুরো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এর মূল লক্ষ্যই ছিল বিরোধী মতামতকে সম্পূর্ণ স্তব্ধ করে দেওয়া এবং যেকোনো উপায়ে ক্ষমতায় টিকে থাকা।
জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থান কেবল একটি নির্দিষ্ট ব্যবস্থার পরিবর্তনের আন্দোলন ছিল না। এর গভীরে ছিল বছরের পর বছর ধরে জমে থাকা মানুষের ক্ষোভ, অপমান এবং এক দীর্ঘশ্বাসের মুক্তি। মানুষ চেয়েছিল রাজনীতিতে একটি গুণগত ও নৈতিক পরিবর্তন আসুক; জবাবদিহি নিশ্চিত হোক এবং একটি ভারসাম্যপূর্ণ গণতান্ত্রিক পরিবেশ তৈরি হোক।
জুলাই-পরবর্তী বাস্তবতায় আমাদের সামনে সুযোগ ছিল অতীত বিভাজন ও সহিংসতার পথ এড়িয়ে এক নতুন রাজনৈতিক পথরেখা তৈরি করার, যেখানে ভিন্নমতকে কেবল সহ্যই করা হবে না, বরং শ্রদ্ধার চোখে দেখা হবে। কিন্তু অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক যে আমরা সেই বিশাল সম্ভাবনাময় সুযোগটিকে অবহেলা ও পুরোনো রাজনৈতিক আচরণের দরুন নষ্ট করতে বসেছি।
বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির দিকে তাকালে দুটি অতি বিপজ্জনক প্রবণতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এর প্রথমটি হলো রাজনীতিতে ব্যবহৃত ভাষার বিষাক্ততা, যাকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে বলা হয় ‘ন্যাস্টি পলিটিকস’।
গবেষক থমাস জেইটজফ তাঁর ন্যাস্টি পলিটিকস: দ্য লজিক অব ইনসাল্টস, থ্রেটস অ্যান্ড ইনসাইটমেন্ট বইয়ে দেখিয়েছেন, অনেক রাজনৈতিক নেতা ইচ্ছা করেই শালীনতার সীমা লঙ্ঘন করেন, গালাগালি বা চরম অপমানজনক উসকানিমূলক মন্তব্য করে থাকেন। এ ধরনের কৌশল ব্যবহারের প্রধানত দুটি উদ্দেশ্য থাকে। এক. উসকানিমূলক ও বিতর্কিত কথা বলে নিজেকে দ্রুত আলোচনায় নিয়ে আসা বা সব সময় আলোচনায় রাখা। দুই. দলের ‘হার্ডকোর’ সমর্থকদের মধ্যে উদ্দীপনা বজায় রাখা, যাতে তাঁরা প্রতিপক্ষের প্রতি সর্বদাই বিদ্বেষভাবাপন্ন থাকেন।
এ ধরনের নেতিবাচক ভাষা ব্যবহারের চরম মূল্য দিতে হয় পুরো সমাজকে। যখন রাজনীতিতে কেবল গালিগালাজ, ব্যক্তিগত আক্রমণ এবং উসকানিমূলক বক্তব্যের প্রাধান্য ঘটে, তখন সাধারণ ও সুস্থ ধারার মানুষ রাজনীতি থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন। তাঁরা রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার ওপর থেকে সব আস্থা হারিয়ে ফেলেন এবং এতে সার্বিক গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এখানে আরেকটি মারাত্মক প্রবণতা আছে। সেটা হলো এই উসকানিমূলক বক্তব্যের প্রতিক্রিয়া হিসেবে সরাসরি শারীরিক আক্রমণ ও দমন-পীড়নের পথ বেছে নেওয়া। রাজনৈতিক উসকানি নিশ্চিতভাবেই নিন্দনীয়, কিন্তু সেই উসকানিকে সংঘাত বা শারীরিক আঘাতের মাধ্যমে প্রতিহত করার চেষ্টা করা তার চেয়ে বেশি নিন্দনীয়। রাজনৈতিক দলগুলোকে মাথায় রাখা দরকার যে নেতিবাচক কথাবার্তা মানুষ অপছন্দ করলেও, এর চেয়েও মানুষ যেটাকে বেশি অপছন্দ করে, সেটা হচ্ছে সরাসরি আক্রমণ করা।
যখন একটি রাজনৈতিক দল বা গোষ্ঠী প্রতিপক্ষকে স্তব্ধ করতে বলপ্রয়োগ করে, তখন তারা মূলত প্রতিপক্ষকে ‘নিপীড়িত’ হিসেবে জনগণের সহানুভূতি পাওয়ার সুযোগ করে দেয়। একই সঙ্গে এটি আক্রমণকারীদের নিজেদের মধ্যকার ক্ষমতার ঔদ্ধত্য ও স্বৈরাচারী মানসিকতাকে স্পষ্ট করে তোলে। উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এ ধরনের হামলার সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিষ্ক্রিয়তা। যখন পুলিশ বা রাষ্ট্রীয় সংস্থা কোনো আক্রমণ ঠেকাতে এগিয়ে আসে না, তখন বুঝতে হবে ক্ষমতার ভারসাম্য সেখানে অনুপস্থিত।
এই সংকটকালে, বিশেষ করে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলোর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উসকানিমূলক রাজনৈতিক ভাষণের জবাব সহিংসতায় দেওয়া কোনো দূরদর্শী রাজনৈতিক কৌশল হতে পারে না। দলের কর্মীদের এই সহিংস আচরণ এবং তার পক্ষে যুক্তি দাঁড় করানোর চেষ্টা কেবল বিএনপির গণতান্ত্রিক বিশ্বাসযোগ্যতাকেই জনগণের চোখে প্রশ্নবিদ্ধ করবে না, বরং তাদের দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক ভবিষ্যৎকেও সংকটে ফেলবে।
অতীতের স্বৈরাচারী ব্যবস্থার ছায়া এখনো দেশের মানুষের মন থেকে মুছে যায়নি। মানুষ এখনো সেই ক্ষমতার দম্ভ ও নিপীড়নের স্মৃতি বয়ে বেড়াচ্ছে। বিএনপি বা অন্য কোনো রাজনৈতিক দলকে এটি অনুধাবন করতে হবে যে সংঘাত ও জবরদস্তির রাজনীতিকে যদি প্রশ্রয় দেওয়া হয়, তবে জনগণ ধরে নেবে যে জুলাই অভ্যুত্থানের পর রাজনীতিতে কোনো অর্থবহ পরিবর্তন হয়নি।
রাজনীতিবিদদের মনে রাখা দরকার, ২০২৬ সালের নির্বাচনই কোনো চূড়ান্ত বা শেষ নির্বাচন নয়। গণতন্ত্রে জনগণকে বারবার ভোটকেন্দ্রে যেতে হয় এবং প্রতিটি রাজনৈতিক দলের অতীত ও বর্তমান আচরণকে নাগরিকেরা খুব সূক্ষ্মভাবে বিচার-বিশ্লেষণ করেন।
তাহলে এই বিষাক্ত রাজনীতি ও সহিংসতার চক্র থেকে বের হওয়ার উপায় কী? রাষ্ট্রবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে, ‘ন্যাস্টি পলিটিকস’ বা উসকানিমূলক বক্তব্য মোকাবিলার কৌশল কখনোই সংঘাত হতে পারে না। এর কার্যকর সমাধান হতে পারে তিনটি ধাপে: নিম্নমানের ও উসকানিমূলক বক্তব্যকে গুরুত্ব না দিয়ে এড়িয়ে যাওয়া বা উপেক্ষা করা। কটু ভাষার রাজনীতি কেন সমাজের জন্য ক্ষতিকর, সে বিষয়ে জনপরিসরে ইতিবাচক আলোচনা গড়ে তোলা। সহিংসতার আশ্রয় না নিয়ে শক্তিশালী তথ্য ও যুক্তির মাধ্যমে প্রতিপক্ষের অপপ্রচার নস্যাৎ করে দেওয়া।
তবে এর সার্বিক দায়িত্ব মূলত ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলগুলোর ওপরই বর্তায়। ক্ষমতার বলয়ে থেকে অহিংস ও সহনশীল আচরণের পরিবেশ তৈরি করা সরকারেরই প্রাথমিক দায়িত্ব।
সংক্ষেপে গণতান্ত্রিক রূপান্তরের এই ঐতিহাসিক মুহূর্তে আমাদের রাজনীতিকে কেবল ক্ষমতার ভাগাভাগির হিসাব থেকে বের করে এনে এক মজবুত নৈতিক ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। যদি তা না করা যায়, তবে রক্তক্ষয়ী আন্দোলনের মাধ্যমে অর্জিত সম্ভাবনা নস্যাৎ হয়ে যাবে এবং দেশ আবারও এক অনিশ্চিত রাজনৈতিক গহ্বরে পতিত হবে।
আসিফ মোহাম্মদ শাহান রাজনীতি বিষয়ে গবেষক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক
মতামত লেখকের নিজস্ব