একেকটি সংখ্যা প্রকাশের পর আমি সারা বিশ্বের অনেক সিনিয়র কেন্দ্রীয় ব্যাংকারদের কাছ থেকে ব্যক্তিগত বার্তা পেতাম। আজ পর্যন্ত আমি যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপান, জার্মানি, দক্ষিণ আফ্রিকা এবং ব্রাজিলে আয়োজিত মোট ছয়টি বিশ্বকাপে যোগ দিতে পেরেছি। সেই অভিজ্ঞতা থেকে আমি তাঁদের সঙ্গে কণ্ঠ মেলাতে পারি, যাঁরা বিশ্বকাপ ফুটবল আসরকে হরেক পদের জাতীয়তা ও সংস্কৃতির অপূর্ব সম্মিলন হিসেবে বর্ণনা করে থাকেন।

২০০৬ সালে জার্মানিতে বিশ্বকাপ আয়োজনের পরে ফ্যান জোনের (বিভিন্ন বড় শহরে ফিফা ও স্বাগতিক শহর কর্তৃপক্ষের আয়োজনে ফুটবলপ্রেমীদের জন্য টিকিটে অথবা বিনা টিকিটে বড় পর্দায় সরাসরি খেলা উপভোগের ব্যবস্থা রাখা হয়। ওই জায়গাগুলোকে সাধারণত ‘ফ্যান জোন’ বলা হয়ে থাকে) আবির্ভাব বিশ্বভ্রাতৃত্বের চেতনাকে সত্যিকার অর্থে মূর্ত করেছিল।

টুর্নামেন্টের আয়োজক হিসেবে কোন দেশকে বাছাই করা হবে, তা বিবেচনার ক্ষেত্রে ফুটবল এবং বিশ্ব অর্থনীতির অবস্থার যোগসূত্রকে আমলে নেওয়ার বিষয়টি অনেকটাই স্পষ্ট। আমি মনে করি, এটি একটি অনিবার্য সত্য যে ২০১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা, ২০১৪ সালে ব্রাজিল, ২০১৮ সালে রাশিয়া এবং এখন কাতারকে স্বাগতিক দেশ হিসেবে নির্বাচন করার পেছনে এই শতাব্দীর প্রথম দুই দশকে তথাকথিত উদীয়মান অর্থনীতির স্থিতিশীল উত্থানকে ভিত্তি হিসেবে ধরা হয়েছিল।

আমি দীর্ঘদিন ধরে ভাবতাম, ব্রিক্সসভুক্ত (ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন এবং দক্ষিণ আফ্রিকা নিয়ে গঠিত গ্রুপ হলো ‘ব্রিক্সস’) বাকি দুটি দেশও ভবিষ্যতে আয়োজকদের গ্রুপে ঠাঁই পাবে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অনেক দেশ যেভাবে অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে, তাতে উচ্চাকাঙ্ক্ষী উদীয়মান-বাজারের দেশগুলো বিশ্বের সবচেয়ে বেশি দেখা এই টুর্নামেন্টের আয়োজক হতে পারবে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়েছে।

কেউ হয়তো প্রশ্ন করতে পারে: ফিফা কি বিশ্ব অর্থনীতিতে কে এগিয়ে আর কে পিছিয়ে তার নির্ণায়ক সূচক হতে পারে? আমি মনে করি পারে।

আমি সন্দেহ করি, আগামী চার সপ্তাহে চলতি টুর্নামেন্টটি কীভাবে অগ্রসর হবে এবং সে পর্যন্ত আমরা কতজন ম্যাচগুলো দেখব—সেটি এই বছরের বিশ্বকাপের তাৎপর্যের সবচেয়ে স্পষ্ট লক্ষণ হতে পারে। কারণ, দলগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতাই শেষ পর্যন্ত ফিফার উপার্জনের মেরুদণ্ড হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে।

ইতিমধ্যে গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে, রাজস্বের কথা মাথায় রেখে এই টুর্নামেন্টকে চতুর্বার্ষিক থেকে দ্বিবার্ষিক ইভেন্টে পরিণত করার বিষয়ে ফিফা চিন্তাভাবনা করছে।

বৈশ্বিক অর্থনীতির ভবিষ্যৎ যদি বিগত ২০-৩০ বছরের অর্থনীতি থেকে খুব আলাদা হয়, তাহলে তা ফিফার সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাব ফেলবে। ২০১০ সাল থেকে যে দেশগুলো টুর্নামেন্টের আয়োজক হয়ে এসেছে, তাদের তুলনায় যদি উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলো বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধিতে কম ভূমিকা রাখে, তাহলে ফিফা সেখানে ভবিষ্যতের প্রতিযোগিতার বিষয়ে উত্সাহী হবে, তা ভাবা কঠিন।

১৯৮০-এর দশক, ১৯৯০-এর দশক, ২০০০-এর দশক এবং ২০১১-২০২০ পর্যন্ত বিশ্বব্যাপী প্রকৃত জিডিপি বৃদ্ধির গড় হার মোটামুটি একই রকম ছিল। সেগুলো ছিল যথাক্রমে, ৩.৩ শতাংশ, ৩.৩ শতাংশ, ৩.৯ শতাংশ এবং ৩.৭ শতাংশ।

সাম্প্রতিক দুটি পূর্ণ দশকে প্রবৃদ্ধি বেড়েছে উদীয়মান বিশ্বের শক্তিশালী প্রবৃদ্ধির কারণে। লক্ষণীয় বিষয় হলো এই সময়কালেই আমরা ফিফাকে ঐতিহ্যগত ফুটবল দুর্গের বাইরে গিয়ে উদীয়মানদের বিশ্বকাপের আয়োজক নির্বাচন করা শুরু করতে দেখি। এখন মনে হচ্ছে, এই প্রবণতাটি এই দশকে উল্টে যেতে পারে, যদিও এই দশক পূরণ হতে এখনো আট বছর বাকি আছে।

এ পর্যন্ত বিশ্বকাপ জিতেছে মাত্র আটটি দেশ। ব্রাজিল পাঁচবার জিতেছে। তারা সব সময় ফুটবলপ্রেমীদের পছন্দের তালিকার শীর্ষে। এই বছরেও তাদের অন্যতম শক্তিশালী বলে মনে হচ্ছে। আর্জেন্টিনা, উরুগুয়ে, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, স্পেন ও ইংল্যান্ড আগের অন্যান্য বিজয়ী। এবারও এদের মধ্য থেকেই কোনো দল বিজয়ী হবে বলে মনে হচ্ছে। আর তাদের মধ্যে মজবুত অর্থনীতির দেশগুলোরই আয়োজক হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে বেশি।

ইংরেজি থেকে অনূদিত, স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট

  • জিম ও’নিল যুক্তরাজ্যের সাবেক অর্থমন্ত্রী