মব বিপ্লব আর বিনিয়োগ জোয়ার একসঙ্গে ঘটে না

২০২৪ সালের আগস্টে অন্তর্বর্তী সরকার যখন ক্ষমতায় এল, তখন গাছের পাতাটিও মনে করত উন্নয়নে এক নবযুগের সূচনা হলো। আওয়ামী লীগ উন্নয়নের বয়ানকে গণতন্ত্রের বিপরীতে দাঁড় করিয়েছিল।

এ কথা সত্য যে ঋণের বোঝা বাড়িয়ে হলেও অবকাঠামোর বেশ কিছু উন্নয়ন হয়েছিল। যেমন পদ্মা সেতু, মহাসড়ক, ফ্লাইওভার, মেট্রোরেল—এ ধরনের স্থাপনাগুলো বিনিয়োগ, নিয়োগ ও জিডিপির প্রবৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখতে শুরু করেছিল। যদিও বাণিজ্য উপদেষ্টা এক নতুন তত্ত্ব দিয়েছেন যে পদ্মা সেতু জিডিপির প্রবৃদ্ধি কমিয়েছে। বাণিজ্য উপদেষ্টার এই হাইপোথিসিস অনেকটা ‘বিড়ি খেলে আয়ু বাড়ে’–জাতীয় তত্ত্ব। 

আওয়ামী লীগ আমলের অবকাঠামোর সবচেয়ে বড় সমালোচনা ছিল যে সেখানে এক টাকার ঘোড়া তিন টাকার দানা খেত। অর্থাৎ প্রতিটিতে দুর্নীতি ছিল। তদুপরি আমলাতান্ত্রিক গড়িমসিতে প্রথাগত অপচয় ছিল অবধারিত। জ্ঞানী–গুণীর নতুন সরকার এগুলো থেকে মুক্ত হয়ে সংস্কার ও বিনিয়োগের এক নবজোয়ার আনবে, এটিই ছিল ধারণা। যাকে অর্থনীতির ভাষায় বলা হয় ‘যৌক্তিক প্রত্যাশা’।

 বিনিয়োগ নিয়ে এত কথা হয় কেন? কারণ, বিনিয়োগ অর্থনীতির এগিয়ে যাওয়ার প্রাণশক্তি। চাহিদার দিক থেকে ভোগ, বিনিয়োগ, সরকারি ব্যয় ও বহির্বাণিজ্যের নেট প্রাপ্তি একটি জাতির অর্থনীতির মোট উৎপাদন নির্ধারণ করে। তবে একটি জাতির উন্নতি বা সক্ষমতার মাপকাঠি হিসেবে মাথাপিছু জিডিপির হিসাবকেই আমরা বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকি। একটি উন্নয়নশীল দেশ যদি জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ১ শতাংশে নামিয়ে আনতে পারে, তাহলে ৬ শতাংশ জিডিপির প্রবৃদ্ধি মানে মাথাপিছু আয় প্রায় ৫ শতাংশ হারে বাড়ানো, যা সোয়া ১৪ বছরে মাথাপিছু আয়কে দ্বিগুণ করে থাকে। দেশ উন্নয়নের সিঁড়ি বেয়ে ওপরে ওঠে। 

জিডিপির উপাদানগুলোর মধ্যে ভোগ প্রায় স্থির—অনেকটা হাতির মতো বড়, তবে খুব সহজেই লাফঝাঁপ করে না, যাকে অর্থনীতিতে ভোগের মসৃণায়ন বা ‘কনজাম্পশন স্মুদিং’ বলা হয়। সরকারি ব্যয় মূলত নির্ভর করে রাজস্ব আয়ের ওপর। বাদ থাকল বিনিয়োগ, যা অনেকটা ঘোড়ার মতো। আলস্য পেলে দাঁড়িয়ে ঘুমায়। উদ্দীপনা পেলে দুরন্ত বেগে ছুটতে পারে। বিনিয়োগের এই দুরন্তপনাকে জন মেনার্ড কিন্স ‘অ্যানিমেল স্পিরিট’–এর সঙ্গে তুলনা করেছেন।

আরও পড়ুন

একটি সরকার ব্যবসার জন্য কতটা ভালো পরিবেশ দিতে পেরেছে এবং ওই রাষ্ট্রে কার্যকর চাহিদা কতটা শক্তিশালী, তার ওপর নির্ভর করছে বিনিয়োগের পাগলা ঘোড়া কত দ্রুত দৌড়াবে। তাই বিনিয়োগ বৃদ্ধিকে একটি সরকারের সক্ষমতা, বিশ্বাসযোগ্যতা ও কৃতিত্বের মাপক হিসেবে ধরা হয়, যেখানে জ্ঞানী–গুণীর অন্তর্বর্তী সরকার বাচনিক প্রতিযোগিতায় কৃতিত্ব দেখালেও বাস্তবে ১৯৮১ সালের পর থেকে সবচেয়ে মন্দ কার্যকারিতা বা ‘উয়র্স্ট পারফরম্যান্স’ দেখিয়েছে। 

এই ব্যর্থতা ঢাকতে সরকার আজকাল নতুন তত্ত্ব দিচ্ছে যে অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে বিনিয়োগে এ রকমই মন্দা আসে। প্রধান উপদেষ্টা বিদেশে গেলেই বলেন যে দেশ নাকি ‘গাজাতুল্য’ হয়েছিল। তিনি নিউইয়র্কে এলে এনপিআর রেডিওর সাংবাদিক বাংলাদেশে মবোক্রেসির বিস্ফোরণের কথা উল্লেখ করেন। তখন প্রধান উপদেষ্টা সরাসরি উত্তর না দিয়ে দোষ চাপিয়ে দেন আগের সরকারের ওপর। তিনি বলেন যে গত ১৫ বছরে বাংলাদেশের অবস্থা ছিল ‘ভূমিকম্পের মতো’। অথচ একাধিক বিশ্ব সংস্থা তো বটেই, এমনকি পাকিস্তানের মতো দেশের পত্রপত্রিকাও বাংলাদেশের ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে প্রশংসা ছাপিয়েছে। 

এক-এগারোর অন্তর্বর্তী সরকার, অর্থাৎ ফখরুদ্দীন সরকারের আমলেও বিনিয়োগ হার কমেনি; বরং তা ২১ থেকে ২২ শতাংশে উঠেছিল। তবে সে সরকার অবশ্য ‘নতুন বন্দোবস্ত’ প্রদান কিংবা জাতিকে ‘অন্ধকার থেকে সভ্যতা’র আলোতে টেনে তোলার চেষ্টা করেনি। তখন আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা ছিল চমৎকার, যা নিয়ে এই অন্তর্বর্তী সরকারের অদক্ষতা ও সদিচ্ছার অভাব ছিল ইতিহাসের সর্বোচ্চ মাত্রায়।

পাকিস্তানের বিখ্যাত সাময়িকী সাউথ এশিয়া বাংলাদেশের ওপর ‘দ্য রাইজিং সান’ শিরোনামে বিশেষ সংখ্যা বের করেছিল। সেখানে প্রচ্ছদেই লেখা ছিল ‘বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সাফল্য এই অঞ্চলের জন্য অভূতপূর্ব ও অনুকরণীয়।’ একাত্তরে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের শত্রুপক্ষও যে কথা স্বতঃপ্রণোদিত হয়েই স্বীকার করে, সে কথা দেশের অনেক জ্ঞানী–গুণীও স্বীকার করতে লজ্জা পান। একে জ্ঞানপাপিত্ব নাকি অকৃতজ্ঞতা—কী বলা যায়, তা পাঠকই ঠিক করবেন। 

বিদেশি বিনিয়োগ পরিস্থিতি নিয়ে গত ৩১ জানুয়ারি প্রথম আলোর অর্থ ও বাণিজ্য পাতায় ‘বিনিয়োগে চমক দেখাতে পারেনি অন্তর্বর্তী সরকার’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনটি ‘বিনিয়োগ কম, আশিক চৌধুরীর চমক কোথায়’ শিরোনামে অনলাইনে প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনের সঙ্গে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ পরিস্থিতি নিয়ে একটি ইনফোগ্রাফিকসও ছিল। প্রতিবেদন প্রকাশের পর বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের বা বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী নিজের ফেসবুক পেজে প্রতিবাদ জানান।

আরও পড়ুন

জনাব চৌধুরীর মতে, শ্রীলঙ্কা বা সুদানের মতো বাংলাদেশে গণ-অভ্যুত্থান–পরবর্তী সময়ে বিদেশি বিনিয়োগ যে নেট নেগেটিভ হয়ে যায়নি, এটিই বড় কথা। সাংবাদিক বুলবুল হাসানের সঙ্গে ডেইলি স্টার–এর প্ল্যাটফর্মে এক সাক্ষাৎকারে তিনি মিসরের অভ্যুত্থান-পরবর্তী বিদেশি বিনিয়োগের কথাও টেনে এনেছেন। অর্থনীতিতে যেমন ‘মুদ্রা বিভ্রম’ একটি রোগ, জনাব চৌধুরীও এ রকম ‘তুলনা বিভ্রম’ রোগে আক্রান্ত। মিসর বা সুদান অভ্যুত্থানের সঙ্গে বাংলাদেশের অভ্যুত্থানের তুলনা হয় না। শ্রীলঙ্কার সঙ্গে কিছুটা তুলনীয় হলেও অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে শ্রীলঙ্কা মূল্যস্ফীতিকে যত দ্রুত সামাল দিয়েছে, বাংলাদেশ তার একাংশও অর্জন করতে পারেনি। 

আসলে বাংলাদেশকে চিনতে হলে বাংলাদেশের ইতিহাসই যথেষ্ট—যেখানে অভ্যুত্থান, বিশ্ব আর্থিক বিপর্যয় ও গণমহামারি—সবই রয়েছে; কিন্তু কখনো
বিনিয়োগের এতটা পতন ঘটেনি, যা এই সরকারের আমলে ঘটল। বাংলাদেশের ইতিহাস থেকে বোঝা যায় যে অভ্যন্তরীণ ব্যক্তি বিনিয়োগ না বাড়লে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ে না। কারণ, বিদেশিরা অত বোকা নন। এই সরকারের আমলে অভ্যন্তরীণ ব্যক্তি বিনিয়োগই কমেছে সর্বোচ্চ মাত্রায়, যা বিদেশি বিনিয়োগ কমিয়েছে কিংবা সেভাবে বিনিয়োগ বাড়তে প্রণোদনা দেয়নি। এই সরকার ঘরই সামাল দিতে পারেনি। আবার বিদেশিদের ডেকে এনে সিন্দাবাদের দৈত্য বা ‘রিজিওনাল হাব’ হওয়ার রূপকথা শোনাচ্ছে। 

আরও পড়ুন

১৯৯০ সালের গণ-অভ্যুত্থানের সময় বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে ব্যক্তি বিনিয়োগ ছিল জিডিপির সাড়ে ৯ শতাংশ। ১৯৯১ সালে তা কমা তো দূরের কথা; বরং তা বেড়ে সোয়া ১০ ভাগে উন্নীত হয়েছিল। এরপর প্রতিবছরেই তা ধীরগতিতে বেড়ে গেছে। অভ্যুত্থানজনিত কোনো প্রভাব বিনিয়োগে আঁচ লাগেনি। ২০০৮-০৯ ছিল বিশ্বমন্দার বছর, যার মূলে ছিল ‘গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইসিস’। এই দুই বছর এবং এর পরের দুই বছর তথা ২০১০ ও ২০১১ সালে বাংলাদেশে ব্যক্তি বিনিয়োগের গড় ছিল শতকরা ২২ ভাগ। কোনো বছরই তা সাড়ে ২১ ভাগের নিচে নামেনি। 

বিনিয়োগ ধীরগতিতে বাড়তে বাড়তে ২০১৯ সালে শতকরা সোয়া ২৫ ভাগে উন্নীত হয়। সেটিই ছিল বাংলাদেশের জন্য সর্বোচ্চ ব্যক্তি বিনিয়োগের হার। পরের বছর অর্থাৎ কোভিডের বছরে তা খুব একটা নামেনি—সোয়া ২৫ থেকে মাত্র ২৪ ভাগে নেমেছিল এবং ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত তা গড়ে ২৪ শতাংশেই স্থির ছিল। সেখান থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত এটি ২২ দশমিক ৪৮ শতাংশে নেমেছে। ২০২৬ সালের অর্থবছরে ব্যক্তি বিনিয়োগ আরেকটু শোচনীয় হবে বলে অনুমান করা যায়। 

১৯৮১ সাল থেকে ৪৫ বছরের ইতিহাসে এক বছরে এই ১.৫ শতাংশ বিন্দু বা ‘পার্সেন্টেজ পয়েন্ট’-এর পতন আর কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় না। এখানে ‘ইউনূস ম্যাজিক’ কাজ করেনি। যদিও প্রধান উপদেষ্টা বলেছিলেন, তিনি অর্থনীতিকে মজবুত অবস্থায় রেখে যাবেন। বিনিয়োগপতি আশিক চৌধুরী ১০ বছরে এ দেশকে সিঙ্গাপুর বানানোর স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন। সিঙ্গাপুর তো দূরের কথা, অনেক ম্যাক্রো সূচকে অবস্থা এখন সদা বিপদগ্রস্ত পাকিস্তানের চেয়েও নিচে। 

এক-এগারোর অন্তর্বর্তী সরকার, অর্থাৎ ফখরুদ্দীন সরকারের আমলেও বিনিয়োগ হার কমেনি; বরং তা ২১ থেকে ২২ শতাংশে উঠেছিল। তবে সে সরকার অবশ্য ‘নতুন বন্দোবস্ত’ প্রদান কিংবা জাতিকে ‘অন্ধকার থেকে সভ্যতা’র আলোতে টেনে তোলার চেষ্টা করেনি। তখন আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা ছিল চমৎকার, যা নিয়ে এই অন্তর্বর্তী সরকারের অদক্ষতা ও সদিচ্ছার অভাব ছিল ইতিহাসের সর্বোচ্চ মাত্রায়। মব বিপ্লব আর বিনিয়োগ জোয়ার একসঙ্গে ঘটে না। 

ড. বিরূপাক্ষ পাল যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ইউনিভার্সিটি অব নিউইয়র্ক কোর্টল্যান্ড-এ অর্থনীতির অধ্যাপক

*মতামত লেখকের নিজস্ব