১৫ জানুয়ারি প্রথম আলো অনলাইনে ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক নাদিম মাহমুদের ‘সপ্তম শ্রেণির বিজ্ঞান বই: হুবহু চুরি আর গুগলের অনুবাদে শিক্ষার্থীরা কী শিখবে?’ শিরোনামে একটি নিবন্ধ ছাপা হয়। লেখক সেখানে ধরে ধরে দেখিয়েছেন, বইটিতে কীভাবে বিজ্ঞান জার্নালগুলো থেকে হুবহু কপি আর পেস্ট করা হয়েছে কিংবা গুগল ট্রান্সলেটরের অনুবাদ ছাপা হয়েছে। বইটির সম্পাদকেরা বিবৃতিতে জানিয়েছেন, ‘তাঁরা লজ্জিত ও বিব্রত।’ কিন্তু প্রশ্ন হলো, এ ক্ষেত্রে বিব্রত ও লজ্জিত হওয়াটাই কি যথেষ্ট! এর চেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, এনসিটিবি কি সব দায়বদ্ধতার ঊর্ধ্বে?

যে বৈষম্য থেকে মুক্তির জন্য মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল, ৫১ বছরে সেই বৈষম্যই প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে। অভিজাত ব্যক্তিদের সন্তানদের জন্য ইংরেজি মাধ্যমে শিক্ষা আর সর্বসাধারণের জন্য সাধারণ, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা। দুই ব্যবস্থায় দুই ধরনের নাগরিক তৈরি হচ্ছে। একদিকে দেশে-বিদেশে অদক্ষ ও সস্তা শ্রমের জোগানদার শ্রমজীবী শ্রেণি, অন্যদিকে এক্সিকিউটিভ বা যেটাকে হোয়াইট কালার জব বলা হচ্ছে। রাষ্ট্র, সরকার, সমাজের সব পর্যায়ে এই বৈষম্যচর্চার নীতি খোলাখুলিভাবে চলছে।

জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড নয়, শিক্ষার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভাগ, দপ্তর, অধিদপ্তর কি তাদের দায়িত্ব ঠিকমতো পালন করছে? মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) কথাই ধরা যাক। পাঠ্যবই কিংবা শিক্ষাক্রম প্রস্তুতের পর সেটা বাস্তবায়নের দায়িত্ব সংস্থাটির হাতে। বাংলাদেশে শিক্ষা নিয়েই সবচেয়ে বেশি পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলে। কয়েক বছর পরপর শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যবইয়ের বদল হয়। সবশেষ ২০০৮ সালে দেশে সৃজনশীল শিক্ষাপদ্ধতির বাস্তবায়ন শুরু হয়েছিল। কিন্তু মাউশির তথ্য থেকে এখন পর্যন্ত ৩৮ শতাংশের বেশি বিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা সৃজনশীল প্রশ্ন প্রণয়ন করতে পারেন না। ফলে ১৪ বছরেও প্রতি আড়াই জন শিক্ষকের একজন যে সৃজনশীল পদ্ধতি আত্মস্থ করতে পারেননি,  তার প্রমাণ এই জরিপ।

এরই মধ্যে আবার নতুন শিক্ষাক্রম নিয়ে তোড়জোড় চলছে। ১ জানুয়ারি প্রথম, ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণিতে নতুন শিক্ষাক্রমের বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। আগামী বছর থেকে অন্য শ্রেণিগুলোয় নতুন শিক্ষাক্রমের বাস্তবায়ন শুরু হবে। নতুন শিক্ষাক্রমে শিক্ষায় আমূল পরিবর্তন এসেছে। নতুন নতুন বিষয় যেমন যুক্ত হচ্ছে, সেই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের মূল্যায়নের পদ্ধতিতেও বদল আসছে। নতুন শিক্ষাক্রমে প্রাথমিক থেকে উচ্চমাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত প্রচলিত পরীক্ষার চেয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শ্রেণিকক্ষে যা শিখছে, তার ধারাবাহিক মূল্যায়নও বেশি হবে।

এখানে প্রশ্ন হলো, যেসব শিক্ষক এই শিক্ষাক্রম বাস্তবায়ন করবেন, তাঁরা নিজেরা কতটা প্রস্তুত? নতুন শিক্ষাক্রমে যেসব বিষয় যুক্ত করা হয়েছে, তা পড়ানোর শিক্ষক কোথা থেকে আসবেন? সমাধানের উপায় হিসবে হাজির করা হয়েছে শিক্ষক প্রশিক্ষণ। এ জন্য জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড একটা পথরেখা তৈরি করে। কিন্তু নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরুর আগে বাস্তবে সেই প্রশিক্ষণ পাননি শিক্ষকেরা। শেষ মুহূর্তে তড়িঘড়ি করে অনলাইনে এক ঘন্টা প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হলেও প্রায় এক তৃতীয়াংশ শিক্ষক প্রশিক্ষণের বাইরে থেকে যান। (দুই দিনে সব শিক্ষক এক ঘণ্টার অনলাইন প্রশিক্ষণ নিতে পারেননি: প্রথম আলো, ২৫ ডিসেম্বর ২০২২)

শিক্ষার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভাগ, অধিদপ্তরের যখন এ রকম হযবরল অবস্থা, তখন শিক্ষা নিয়ে আরেকটি ভয়াবহ সংবাদ জানা যাচ্ছে দ্য ডেইলি স্টার এর এক সংবাদে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি), বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (ব্যানবেইস) ও ডিরেক্টরেট অব প্রাইমারি এডুকেশনের তথ্যের বরাতে ১৪ জানুয়ারি ‘১.৭ মিলিয়ন স্টুডেন্টস ড্রপ আউট ইন প্যানডেমিক’ শিরোনামে এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ২০২০-২১ সালে দেশে প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা স্তরে ঝরে গেছে ১৭ লাখ ৬২ হাজার শিক্ষার্থী।

ইউজিসির হিসাবে, ২০২০-২১ সালে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষার্থী কমেছে ২০২১ সালে সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় শিক্ষার্থী ছিলেন ৪৪ লাখ ৪১ হাজার ৭১৭ জন। ২০২০ সালে এ সংখ্যা ছিল ৪৬ লাখ ৯০ হাজার ৮৭৬। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে শিক্ষার্থী কমেছে ২ লাখ ৪৯ হাজার ১৫৯ জন। বর্তমানে দেশে ৫৩টি (২০২১ সাল পর্যন্ত ৫০টি) সরকারি এবং ১০৮টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। এর মধ্যে বেশি কমেছে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর (জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়সহ) শিক্ষার্থী—এ সংখ্যা ২ লাখ ৩০ হাজারের বেশি। বাকি শিক্ষার্থীরা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের। কমে যাওয়া শিক্ষার্থীদের বেশির ভাগই ছাত্র। এ ছাড়া মাধ্যমিকে শিক্ষার্থী কমেছে ৬২ হাজার ১০৪ জন। আর প্রাথমিকে কমেছে সাড়ে ১৪ লাখ।

২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষেই সাড়ে সতেরো লাখ শিক্ষার্থী ঝরে পড়েছে। কোভিড মহামারির অভিঘাতটা একটি প্রজন্মের শিশু ও তরুণদের ওপর কতটা আছড়ে পড়েছে, তা এ তথ্য থেকেই স্পষ্ট। মহামারিতে পরিবারগুলো অর্থনৈতিক সামর্থ্য হারানোয় সন্তানদের শিক্ষার ওপরই খড়্গ চালাতে বাধ্য হয়েছে। বাস্তব সত্য হচ্ছে, কোভিডকালে ঝরে পড়লেও এসব শিক্ষার্থী আর কখনোই শ্রেণিকক্ষে ফিরতে পারবে না। এর যেমন তাৎক্ষণিক ও ব্যক্তিগত প্রভাব আছে, সেই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি ও সামষ্টিক প্রভাবও আছে। তারা শুধু শিক্ষার সুযোগ থেকেই বঞ্চিত হলো না, দক্ষ মানবসম্পদ হওয়া থেকেও বঞ্চিত হলো। আবার এত শিক্ষার্থীর ঝরে পড়ার বাস্তবতা যে মহামারিকালের জন্যই সত্য, তেমনটা নয়। ২০২২ সালেও উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানির উচ্চমূল্যের কারণে জীবনযাত্রার যে অসহনীয় ব্যয় বেড়েছে, তাতেও ঝরে পড়ার এ ধারাবাহিকতা যে অব্যাহত থাকবে, তা বলাই বাহুল্য।

প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা মিলিয়ে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীর সংখ্যা চার কোটির ওপর। বিশ্বের খুব কম দেশেই মোট জনসংখ্যা এতটা হবে। শিক্ষার্থীদের বিশাল এই সংখ্যা বাস্তবে অনেকের জন্য সুযোগ হিসেবে দেখা দিয়েছে। সেটা হলো ব্যবসা। শিক্ষাক্রম বদল থেকে শুরু করে পাঠ্যবই প্রণয়ন, ছাপানো এবং শিক্ষক নিয়োগ, গাইড ও সহায়ক বই প্রকাশ, প্রাইভেট-কোচিং—এ সবকিছুই একসূত্রে গাঁথা। যে বৈষম্য থেকে মুক্তির জন্য মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল, ৫১ বছরে সেই বৈষম্যই প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে। অভিজাত ব্যক্তিদের সন্তানদের জন্য ইংরেজি মাধ্যমে শিক্ষা আর সর্বসাধারণের জন্য সাধারণ, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা। দুই ব্যবস্থায় দুই ধরনের নাগরিক তৈরি হচ্ছে। একদিকে দেশে-বিদেশে অদক্ষ ও সস্তা শ্রমের জোগানদার শ্রমজীবী শ্রেণি, অন্যদিকে এক্সিকিউটিভ বা যেটাকে হোয়াইট কালার জব বলা হচ্ছে। রাষ্ট্র, সরকার, সমাজের সব পর্যায়ে এই বৈষম্যচর্চার নীতি খোলাখুলিভাবে চলছে।

শেষটা করা যাক জাতিসংঘ শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা ইউনেসকোর গ্লোবাল এডুকেশন মনিটরিং রিপোর্ট দিয়ে। সন্তানদের শিক্ষার পেছনে বাংলাদেশের প্রতি পরিবারকে মোট ব্যয়ের ৭১ শতাংশ জোগান দিতে হয়, যা দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বোচ্চ। আর সরকার ব্যয় করে মাত্র ২৯ শতাংশ। ইউনেসকোর এই প্রতিবেদন শিক্ষা খাতে সরকারের ভূমিকাকে কি প্রশ্নবিদ্ধ করে না?

  • মনোজ দে প্রথম আলোর সম্পাদকীয় সহকারী