বাংলাদেশের এসএসসি পরীক্ষার গত ৩৭ বছরের ইতিহাসে পাসের হারে অস্বাভাবিক রকম ওঠানামা দেখা যায়। ১৯৯০ সালে ছিল সর্বনিম্ন ৩১ দশমিক ২৩ শতাংশ আর ২০২১ সালে সর্বোচ্চ ৯৩ দশমিক ৫৮ শতাংশ। বিএনপি সরকারের আগের দুই মেয়াদে পাসের হার ছিল যথাক্রমে ৬১–৭৩ শতাংশ এবং ৩৫–৫৩ শতাংশের মধ্যে ওঠানামা করেছে।
অন্যদিকে আওয়ামী লীগ সরকারের চার মেয়াদে পাসের হার যথাক্রমে ৪২–৫৫, ৬৮–৮৯, ৭৮–৯৩, ৮০–৯৪ শতাংশের মধ্যে ওঠানামা করেছে। আবার এক-এগারোর সময় পাসের হার ৫৭–৭১ শতাংশের মধ্যে ওঠানামা করেছে। আর অন্তর্বর্তী সরকারের সময় এসএসসিতে পাসের হার ছিল ৬৮ দশমিক ৪৫ শতাংশ। সর্বশেষ এসএসসি পরীক্ষায় পাসের হার ছিল ৬২ দশমিক ২৫।
ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০০০ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত পাসের হার ক্রমে বেড়েছে। বিপরীতে বিগত পাঁচ বছরে তিনটি সরকারের সময় মিলিয়ে পাসের হার ক্রমে কমছে।
কেন পাসের হারের এই ব্যাপক ওঠানামা
প্রথমত, ফলাফল প্রকাশের সময়ের সরকারগুলোর কথাবার্তা থেকে বোঝা যায়, পাসের হারের ওঠানামায় তাদের গুরুতর প্রভাব রয়েছে। কেন একটা জাতীয় পরীক্ষার ফলাফল শিক্ষাসংশ্লিষ্ট কারণের বাইরে সরকারগুলোর দলীয় চরিত্রের পরিবর্তনের সঙ্গে ব্যাপকভাবে ওঠানামা করবে?
একাডেমিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে এটা শিক্ষার ক্ষেত্রে জাতীয় পর্যায়ে বড় প্রশ্নের অবতারণা করে। এটা ন্যায্যতারও প্রশ্ন। একই রকমের একজন ছাত্র এ বছরে পাস, কিন্তু একই রকমের অন্য একজন ছাত্র পরের বছরে অকৃতকার্য হতে পারে। এতে এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল আদৌ ভরসাযোগ্য কি না, সে প্রশ্ন ওঠে।
এভাবে পাসের হার নিয়ে নানা রকম খেলা করা একাডেমিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয়। তবে আগেই যেমন বলা হয়েছে, শুধু এভাবে পাসের হারে বড় ধরনের ওঠানামা ঘটানো কঠিন।
পাসের হারের ওঠানামার সঙ্গে অবশ্য শিক্ষাক্রম, প্রশ্নের ধরন, মূল্যায়ন ও গ্রেডিং পদ্ধতির বড় পরিবর্তনও জড়িত। ১৯৯২ সাল থেকে এমসিকিউ এবং ২০০১ সাল থেকে জিপিএ পদ্ধতি এসেছে। শিক্ষাক্রমও ১৯৯৫–২০১১ সময়ের বিষয়বস্তু ও তথ্যভিত্তিক ধারা থেকে ২০১২–২০২২ সময়ে শিখনফল ও সৃজনশীল চিন্তাভিত্তিক, পরে ২০২৩–২৪ সালে যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতাভিত্তিক হয়েছে।
বিস্তারিত বর্ণনা না করেও বলা যায়, বৈশিষ্ট্যগত কারণে এসব পরিবর্তন পাসের হারের ঊর্ধ্বমুখী যাত্রায় ভূমিকা রেখেছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোয়, বিশেষ করে বিগত দুই বছরে, পাসের হার কমার কয়েকটি সম্ভাব্য কারণ থাকতে পারে। পাসের হার কম দেখিয়ে রাতারাতি শিক্ষার মান বেড়েছে—এমন একটা ধারণা তৈরি করে রাজনৈতিক স্কোরিং তার একটি।
আরেকটি হতে পারে মাঝপথে শিক্ষাক্রম ও মূল্যায়নের পদ্ধতির পরিবর্তন। আবার শিক্ষার্থীদের কিছুটা রাজনীতিমুখিতাও একটি কারণ হতে পারে। এগুলোর একাধিক কারণ একসঙ্গেও কাজ করে থাকতে পারে।
কেবল বেশি নম্বর দিয়ে পাসের হার কতটা বাড়ানো যায়
২০০০ সালের পর থেকে পাসের হারে যে দীর্ঘ ঊর্ধ্বযাত্রা দেখা যায়, বিশেষ করে ২০১৪ সালের মধ্যে তা যে উচ্চতায় পৌঁছে যায় এবং ২০২১ সালে সর্বোচ্চ ৯৩ দশমিক ৫৮ শতাংশ হয়, তার কতটা কেবল বেশি নম্বর দেওয়ার ফল হতে পারে?
উদারভাবে নম্বর দিলে কিছু শিক্ষার্থী অবশ্যই পাস করতে পারে, কিন্তু এরও একটা সীমা আছে। পাস নম্বর ৩৩ হলে ৩০, ৩১ বা ৩২ পাওয়া শিক্ষার্থীকে কয়েক নম্বর দিয়ে পাসের গ্রেডে নেওয়া এক ব্যাপার, আর ১০, ১৫ বা ২০ পাওয়া শিক্ষার্থীকে ৩৩ করা আরেক ব্যাপার।
এমনকি ২৫ পর্যন্ত পাওয়া শিক্ষার্থীদেরও টেনে ৩৩-এ নেওয়া হবে ধরে নিলে মোট শিক্ষার্থীর কত শতাংশ আসলে ২৫ থেকে ৩২-এর মধ্যে থাকতে পারে? বিশেষ করে পাসের হার যখন এমনিতেই অনেক বেশি, তখন এই সীমার মধ্যে থাকা শিক্ষার্থীর সংখ্যা খুব বেশি হওয়ার সুযোগ নেই। কাজেই বেশি নম্বর দিয়ে পাসের হার কয়েক শতাংশ বাড়ানো সম্ভব হলেও শুধু সেটা দিয়ে এই দীর্ঘমেয়াদি ও বড় মাত্রার বৃদ্ধি ব্যাখ্যা করা কঠিন।
তার ওপর পাস নম্বরের কাছাকাছি একটা ধূসর এলাকা থাকেই। একই পরীক্ষক একই খাতা ভিন্ন সময়ে দেখলে কিছুটা ভিন্ন নম্বর দিতে পারেন; দুই পরীক্ষকের নম্বরেও পার্থক্য হতে পারে। কাজেই ৩০, ৩১ বা ৩২ পাওয়া একজন শিক্ষার্থীর অর্জন যে নিশ্চিতভাবেই ৩৩-এর মানে পৌঁছায়নি, সেটা বলা কঠিন। এটা দয়াদাক্ষিণ্যের ব্যাপার নয়, মূল্যায়নের পদ্ধতির সীমাবদ্ধতা।
পাসের হার কি আসল চিত্র দেখায়
এসএসসির যে পাসের হারের কথা আমরা বলছি, সেটা আসলে মূল সমস্যাটাকেই আড়াল করে। একটি স্কুলে দশম শ্রেণিতে ৫০ জন শিক্ষার্থী থাকলে আসল প্রশ্ন হওয়া উচিত, তাদের কতজন শেষ পর্যন্ত এসএসসি পাস করল। টেস্ট পরীক্ষার মাধ্যমে ৩০ জনকে বাদ দিয়ে বাকি ২০ জনকে এসএসসি দিতে পাঠালে সেই ২০ জনই পাস করে শতভাগ পাসের হার অর্জন করতে পারে।
কিন্তু এটা একটা কৃত্রিম অর্জন। ওই ৩০ জন শিক্ষার্থীকে পেছনে রেখে শতভাগ পাসের হারের তৃপ্তির ঢেকুর তোলা আসলে জাতির জন্য কল্যাণকর কিছু নয়। জাতিগতভাবে এগোতে হলে তাদেরও আমাদের তৈরি করতে হবে।
অন্যদিকে পাসের হার কয়েক শতাংশ বাড়ানো-কমানো তেমন কঠিন নয়। টেস্ট পরীক্ষা শিথিল বা কঠোর করে মূল পরীক্ষায় কারা অংশ নেবে, সেটা নিয়ন্ত্রণ করলে পাসের হারে দৃশ্যমান প্রভাব পড়তে পারে। আবার খাতা দেখার সময় একটু সহজ বা কঠিন করে পাসের হার কয়েক শতাংশ উঠিয়ে বা নামিয়ে দেওয়া যেতে পারে। এর জন্য দরকার কেবল প্রশাসনের ওপরের দিক থেকে ইশারা।
কিন্তু এসব প্রক্রিয়ায় অন্যায়ভাবে ভাগ্য বদলে যেতে পারে অনেক শিক্ষার্থীর। এভাবে পাসের হার নিয়ে নানা রকম খেলা করা একাডেমিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয়। তবে আগেই যেমন বলা হয়েছে, শুধু এভাবে পাসের হারে বড় ধরনের ওঠানামা ঘটানো কঠিন।
পাসের হারে বেশি ওঠানামা কেন গোলমেলে
এসএসসি পরীক্ষায় প্রতিবছর ১৮ থেকে ২২ লাখ শিক্ষার্থী অংশ নেয়। এত বড় জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে শিক্ষাক্রম, পরীক্ষার বিষয়বস্তু, প্রশ্নের কঠিনতা ও মূল্যায়নের পদ্ধতি মোটামুটি স্থিতিশীল থাকলে বছরভেদে পাসের হারেও বড় ওঠানামা হওয়ার কথা নয়। নিছক পরিসংখ্যানগত বৈচিত্র্য দিয়ে এ রকম বড় ব্যবধান ব্যাখ্যা করা কঠিন। তারপরও বাস্তবে বড় ব্যবধান দেখা গেলে পরীক্ষা ও মূল্যায়নের পদ্ধতিতে বড় পরিবর্তন বা গুরুতর অসামঞ্জস্যের প্রশ্ন আসে।
দেশভেদে পরীক্ষা ও পাসের সংজ্ঞা এক নয়, কাজেই সরাসরি তুলনা নিয়ে বিতর্কের সুযোগ আছে। তারপরও মোটামুটি ধারণা পেতে তুলনাটা কাজে লাগে। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় শ্রীলঙ্কার পাসের হার ৭৩ থেকে ৭৬ শতাংশের মধ্যে বেশ স্থিতিশীল, ইংল্যান্ডে কোভিডকাল ছাড়া প্রায় ৬৭ শতাংশের আশপাশে, আর মালয়েশিয়ার হার ৯০ শতাংশের ওপরে গেছে।
কোভিডকাল বাদ দিলে ভারতেও বছরভেদে পার্থক্য তুলনামূলক কম। কোভিডের সময়ে আবার একাধিক দেশেই পাসের হার অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে চিত্রটা ভিন্ন। পাসের হার একটা মোটামুটি স্থিতিশীল পর্যায়ে থাকার বদলে বছরভেদে বড় ওঠানামা করেছে, আর বিগত পাঁচ বছরে ক্রমে নিচের দিকে যাচ্ছে।
লক্ষ্য শতভাগ পাস করানোও নয়, আবার কম পাসের হার দেখিয়ে শিক্ষার মান প্রমাণ করাও নয়। লক্ষ্য হওয়া উচিত একটি অর্থবহ শিক্ষাক্রম, মোটামুটি স্থিতিশীল পরীক্ষা ও মূল্যায়নের পদ্ধতি এবং এমন একটি গ্রহণযোগ্য পাসের হার, যা শিক্ষার্থীর প্রকৃত যোগ্যতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
বাংলাদেশে পাসের হার কত হওয়া উচিত
আদর্শভাবে এসএসসি যদি মাধ্যমিক শিক্ষা শেষে একজন শিক্ষার্থীর ন্যূনতম প্রয়োজনীয় যোগ্যতা বা কম্পিটেন্সি অর্জনের স্বীকৃতি হয়, তাহলে যে সেই যোগ্যতা অর্জন করবে, তারই পাস করা উচিত। পাসের হার আগে থেকে ঠিক করার প্রয়োজন নেই। আর একটি ভালো শিক্ষাব্যবস্থার লক্ষ্যও হওয়া উচিত যত বেশি সম্ভব শিক্ষার্থীকে সেই যোগ্যতায় পৌঁছে দেওয়া।
এ আলোচনায় কেবল পাসের হার নির্ধারণই মুখ্য নয়; এখানে শিক্ষাক্রমের উদ্দেশ্যও গুরুত্বপূর্ণ। আমার দৃষ্টিতে এসএসসি পর্যায়ের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত কম্পিটেন্সি। প্রত্যেক শিক্ষার্থীর প্রয়োজনীয় মৌলিক জ্ঞান ও দক্ষতা নিশ্চিত করা।
এইচএসসিতে এর সঙ্গে এক্সিলেন্স বা উৎকর্ষের পার্থক্য আরও গুরুত্বপূর্ণ হবে। কারণ, সেখান থেকে উচ্চশিক্ষার বিভিন্ন পথে শিক্ষার্থী যাবে। বিশ্ববিদ্যালয়ে আবার নির্দিষ্ট লার্নিং আউটকাম অর্জন হবে শিক্ষার মূল মাপকাঠি।
সমস্যা হলো আমাদের বর্তমান এসএসসি পরীক্ষা ও মূল্যায়নের পদ্ধতি সেই যোগ্যতা নিখুঁতভাবে মাপে না। প্রশ্নের কঠিনতা বছরভেদে বদলায়, পরীক্ষকভেদে মূল্যায়নে পার্থক্য হয়, শিক্ষাক্রম ও প্রশ্নের ধরনও পরিবর্তিত হয়। সরকার বদল হলে শিথিলতা-কঠোরতাও আসতে পারে। ফলে এক বছরের ৩৩ আর অন্য বছরের ৩৩ যে ঠিক একই যোগ্যতা নির্দেশ করে, সেটা নিশ্চিত করে বলা কঠিন।
এ বাস্তবতায় যোগ্যতা এবং পার্সেন্টাইল বা শতকমান ধারণার সমন্বয়ে একটি হাইব্রিড পদ্ধতি ব্যবহার করা যায়। অন্যান্য দেশের অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নিয়ে মোটামুটি ৭৫ শতাংশকে কেন্দ্র ধরে ৬৭ থেকে ৮০ শতাংশ পাসের হারকে একটি গ্রহণযোগ্য রেফারেন্স ধরা যেতে পারে। ফলাফল এই সীমার মধ্যে থাকলে যেমন হয়েছে, তেমনই গ্রহণ করা যায়।
এর অনেক বাইরে গেলে প্রশ্ন অস্বাভাবিক সহজ বা কঠিন হয়েছে কি না, কিংবা মূল্যায়নে অসামঞ্জস্য হয়েছে কি না, অথবা অন্য কোনো কারণ আছে কি না, সেগুলো বিবেচনা করে ফলাফল প্রকাশের আগে গ্রেড বাউন্ডারি সমন্বয়ের মতো পাসের নম্বর ৩০ বা ৩৬ বা কাছাকাছি কোনো নম্বরে সমন্বয় করা যেতে পারে।
তবে ৬৭ থেকে ৮০ শতাংশ কোনো চিরস্থায়ী সংখ্যা নয়। একই মান ও মূল্যায়নের পদ্ধতিতে কয়েক বছর ধরে পাসের হার যদি ক্রমে বাড়তে থাকে, সেটা শিক্ষার্থীদের সক্ষমতা বাড়ার লক্ষণও হতে পারে, বিশেষ করে যোগ্যতাভিত্তিক শিক্ষার ক্ষেত্রে।
তখন পাসের হার কৃত্রিমভাবে নামিয়ে না রেখে শিক্ষাক্রম ও পরীক্ষার মান আরও উঁচুতে নেওয়া যেতে পারে। আবার ধারাবাহিকভাবে খুব কম পাসের হারও শিক্ষার্থীদের ব্যর্থতার চেয়ে শিক্ষাব্যবস্থার ব্যর্থতার প্রশ্ন তুলবে।
কাজেই লক্ষ্য শতভাগ পাস করানোও নয়, আবার কম পাসের হার দেখিয়ে শিক্ষার মান প্রমাণ করাও নয়। লক্ষ্য হওয়া উচিত একটি অর্থবহ শিক্ষাক্রম, মোটামুটি স্থিতিশীল পরীক্ষা ও মূল্যায়নের পদ্ধতি এবং এমন একটি গ্রহণযোগ্য পাসের হার, যা শিক্ষার্থীর প্রকৃত যোগ্যতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
মু. আ. হাকিম নিউটন, নিউক্যাসেল বিশ্ববিদ্যালয়, অস্ট্রেলিয়া; মোহাম্মদ কায়কোবাদ, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ।
* মতামত লেখকদের নিজস্ব