গত শনিবার আমি কাজে ছিলাম। হঠাৎই এক বিকট বিস্ফোরণের শব্দ শুনলাম। সেই মুহূর্ত থেকেই যেন সবকিছু উল্টে গেল। কিছুক্ষণ পর স্কুল থেকে ফোন এল, আমার সন্তানকে নিয়ে যেতে হবে। তাড়াহুড়া করে মেট্রোতে উঠলাম। উত্তরের দিকে ছুটে চলা সেই ট্রেনে সবাই উদ্বিগ্ন। কেউ ফোনে প্রিয়জনের খোঁজ নিচ্ছে, কেউ মোবাইলে খবর দেখছে। সবার মুখে উদ্বেগ, চোখে অনিশ্চয়তা।
এক বছরের মধ্যে এ নিয়ে দ্বিতীয়বার ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ বেছে নিল। হয়তো এটাই এখন নতুন স্বাভাবিকতা। বহুদিন ধরেই ফিলিস্তিনিদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা ইসরায়েল প্রায় দায়মুক্তির অবস্থানে রয়েছে। এখন মনে হচ্ছে, সেই অবাধ অবস্থা মধ্যপ্রাচ্যজুড়েই যুদ্ধ আর আতঙ্ক ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হয়ে গেছে।
এবারের যুদ্ধ আগের চেয়ে ভিন্ন। আগে বলা হতো, হামলাগুলো খুব নির্ভুলভাবে করা হয়। এখন সেই দাবি আর শোনা যাচ্ছে না; বরং হামলা যেন নির্বিচারে চলছে। স্কুল, হাসপাতাল, পুলিশ স্টেশন, শহরের নানা স্থাপনা—সবই আঘাতের লক্ষ্যবস্তু। এমন শক্তি দিয়ে আঘাত করা হচ্ছে, যেন পুরো শহরটাকে ধ্বংস করে দেওয়া যায়।
আমি নিজে দীর্ঘদিন ধরে ইরানের রাষ্ট্রব্যবস্থার সমালোচক। কিন্তু নিজের সরকারের সমালোচনা করা আর নিজের সমাজ ধ্বংস হয়ে যাক তা কামনা করা, এক কথা নয়।
‘বৈরুতিফিকেশন’ শব্দটি হয়তো এখন অভিধানে নেই; কিন্তু থাকা উচিত। এর মানে হলো, ধীরে ধীরে একটি শহরের ওপর নিয়মিত হামলাকে স্বাভাবিক করে তোলা। বিস্ফোরণ, মৃত্যু আর ধ্বংস যেন শহরের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে যায়। একসময় মানুষের কল্পনাশক্তি নিঃশেষ হয়ে যায়, উন্নত জীবনের স্বপ্ন মুছে যায়। দীর্ঘ যুদ্ধ যেমন বৈরুতকে ক্লান্ত ও ক্ষয়িষ্ণু করে দিয়েছে, তেমনই কিছু একটা এখন তেহরানেও ঘটতে শুরু করেছে।
যুদ্ধের কয়েক দিনের মধ্যেই তেহরান ফাঁকা হতে শুরু করেছে। অনেকে ঘরের ভেতর আটকে আছে, অনেকে শহর ছেড়ে চলে গেছে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ এত দিন ইরানিদের কাছে ছিল দূরের কোনো ঘটনা। যেন আরব বিশ্বের কোনো সমস্যা, টেলিভিশনে দেখার মতো খবর। আমাদের বাস্তবতা নয়। কিন্তু এখন যুদ্ধ আমাদের শহরেই এসে দাঁড়িয়েছে। বাস্তব, ভয়াবহ।
তবু শহরের কোথাও কোথাও জীবনের ছোট ছোট চিহ্ন এখনো আছে। পার্কে, শপিং সেন্টারে, ছোট ছোট আড্ডায় মানুষ জড়ো হয়। কয়েক দিন আগে তেহরানের একটি পার্কে কয়েকজন তরুণের সঙ্গে দেখা হয়েছিল। তারা আড্ডা দিচ্ছিল নিজেদের ভেতরের চাপ কিছুটা কমাতে। তারা হাসি-ঠাট্টা করছিল, নিজেদের দুর্ভাগ্য নিয়েই মজা করছিল। হয়তো ইরানিরাই যেকোনো কষ্টের মধ্যেও হাসির কিছু খুঁজে নিতে পারি। তাদের সঙ্গে কিছু সময় কাটিয়ে আমার ভেতরের উদ্বেগও একটু হালকা হয়েছিল। বিদায়ের সময় তাদের একজন শুধু বলল, ‘মরে যেয়ো না।’
কথাটির সরলতা আর নির্মম সত্য আমাদের বাস্তবতাকে স্পষ্ট করে দেয়। এখন সবচেয়ে বড় কথা শুধু বেঁচে থাকা। কোনোভাবে টিকে থাকা।
এই আলাপ আমি সহানুভূতি পাওয়ার জন্য করছি না। আমরা ক্লান্ত, বারবার ভুক্তভোগীর ভূমিকায় হাজির হতে হতে। আরও ক্লান্ত সেই কথিত ‘মানবিক যুদ্ধ’-এর গল্প শুনতে শুনতে, যেখানে বলা হয়, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য যুদ্ধ করা হচ্ছে।
এই যুক্তিগুলো নতুন নয়। বলা হয়, একটি দেশ পারমাণবিক বোমা বানানোর একেবারে কাছাকাছি। বলা হয়, মানুষকে স্বৈরশাসন থেকে মুক্ত করতে হবে। বলা হয়, এক ভয়ংকর হুমকির সামনে দাঁড়িয়ে আছে বিশ্ব। ইরাক, আফগানিস্তান, লিবিয়া—সব জায়গাতেই এই গল্প বলা হয়েছে। আর শেষ পর্যন্ত এর মূল্য দিয়েছে সাধারণ মানুষ।
যারা পশ্চিমা সামরিক হস্তক্ষেপ নিয়ে প্রশ্ন তোলে, তাদেরও সহজেই নানা তকমা দেওয়া হয়। বলা হয়, তারা নাকি শাসকগোষ্ঠীর সমর্থক, কিংবা সন্ত্রাসের পক্ষের মানুষ। এই চিত্রনাট্য আমরা আগেও দেখেছি। শুধু দেশ বদলায়, গল্প একই থাকে।
আমি নিজেও দীর্ঘদিন ধরে ইরানের রাষ্ট্রব্যবস্থার সমালোচক। কিন্তু নিজের সরকারের সমালোচনা করা আর নিজের সমাজ ধ্বংস হয়ে যাক তা কামনা করা, এক কথা নয়। সীমান্তের দুই পাশে অনেক মানুষ আছে, যারা অন্য রকম এক বিশ্ব কল্পনা করে। এমন এক বিশ্ব, যেখানে আধিপত্য আর সাম্রাজ্যবাদ নেই। যেখানে শান্তিই হবে ভিত্তি। সম্ভবত আমরা এক অন্ধকার সময়ের দিকে এগোচ্ছি। এমন এক সময়, যখন কূটনীতির জায়গা নেবে গুলি আর বোমা।
তবু আরেকটি সম্ভাবনাও আছে। আরও বেশি মানুষ ধীরে ধীরে যুদ্ধের যন্ত্র আর গণতন্ত্র রপ্তানির এই শিল্পের ভেতরের সত্যটা দেখতে শুরু করেছে। যদি কোনো আশা থেকে থাকে, তা সেখানেই। আশা নিহত আছে সেই সব মানুষের মধ্যে, যারা মানতে নারাজ যে অন্তহীন যুদ্ধই পৃথিবীর একমাত্র ভবিষ্যৎ।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তেহরানবাসীর চিঠি
দ্য গার্ডিয়ান থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত