উলিপুরের চরে হাজারো তাঁত, তুলার চাষ কই

উলিপুর উপজেলার সাহেবের আলগা ইউনিয়নের মাঝের আলগা চর।ছবি: প্রথম আলো

আসুন নিজেদের শরীরের দিকে তাকাই। আপনার গায়ে কী কী আছে? পাঞ্জাবি, লুঙ্গি, গামছা বা শার্ট, প্যান্ট, চপ্পল। চপ্পল ছাড়া বাকিগুলো কিসে তৈরি? তুলায়। আর যদি নারী হন? শাড়ি, ব্লাউজ ও অন্যান্য পরিধেয়। কানে? সোনা, রুপা বা ইমিটেশন। অর্থাৎ মানবশরীরে পরিধেয় সবকিছুতে তুলার পরিমাণই বেশি।

এবার বাড়ির ভেতরে তাকাই। বাড়িতে কোন বস্তুটি বেশি পরিমাণে আছে? জামা, প্যান্ট, শাড়ি, লুঙ্গি, তোয়ালে, বিছানার চাদর, বালিশের কভার, জানালার পর্দা, ব্যান্ডেজ, কটনবাড, বালিশ, ম্যাট্রেসসহ তুলার পরিমাণই বেশি। তুলা শুধু পোশাক তৈরির উপাদান নয়; এটি চিকিৎসা, শিল্প, গৃহস্থালি ও পরিবেশবান্ধব পণ্য তৈরিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আর শিল্পক্ষেত্রে? এককথায়, বাংলাদেশের শিল্পে সবচেয়ে বেশি পরিমাণে যে বস্তুটি ব্যবহৃত হয়, তার নামও তুলা। অথচ দেশে তুলার চাষই নেই। কী পরনির্ভরশীলতা!

চিলমারীর চরের নারীরা যদি বাড়িতে তুলা থেকে সুতা কাটতে পারেন আর সুতা থেকে কাপড় বানান এবং তা যদি প্রাকৃতিক রঙে মাখাতে পারেন, তা গড়বে টেকসই অর্থনীতি।

সিন্ধু সভ্যতার চাষিরা প্রথম তুলা থেকে সুতা এবং সুতা থেকে কাপড় তৈরি করেন। ১৯২৯ সালে মহেঞ্জোদারোর খননের পর সুতার যে ছেঁড়া অংশ উদ্ধার হলো, সেটি খ্রিষ্টপূর্ব ৩২৫০ থেকে ২৭৫০ সময়কাল। খ্রিষ্টপূর্ব ১৫০০ থেকে ১২০০ সালে লেখা বেদ–এ তুলা থেকে সুতা আর সুতা থেকে কাপড় তৈরির উদ্যমের প্রশংসা আছে। প্রাচীন গ্রিক ঐতিহাসিক হেরোডোটাস উপমহাদেশের মিহি কাপড় বোনার দক্ষতা সম্পর্কে অবগত ছিলেন।

মানবসভ্যতার আদিকাল থেকে উনিশ শতক পর্যন্ত ভারত, বিশেষ করে বাংলার কারিগরেরা বিশ্বের সবচেয়ে বেশি কাপড় উৎপাদনকারী শিল্প পরিচালনা করেছেন। এখানকার কৃষকেরা খাদ্যশস্যের পাশাপাশি তুলার চাষও করতেন। নিজেরা গাছ লাগাতেন, তুলা থেকে বীজ ছাড়ানোর রোলার জিন ব্যবহার ও তুলা থেকে নানান মিশ্রণ গাদ ও নোংরা বের করতেন। চরকা দিয়ে সুতা এবং দুটি গাছে টাঙানো তাঁত দিয়ে কাপড় তৈরি করতেন। লিডসের তুলাবিশেষজ্ঞ এডওয়ার্ড বেইনস বলেন, ‘অতুলনীয় নিখুঁত এই মসলিন সম্ভবত আসমানে পরিরা বানায়, অথবা এমন কোনো প্রাণী, যারা মানুষ নয়।’ সভেন বেকার্টের এম্পায়ার অব কটন: আ গ্লোবাল হিস্ট্রি বইয়ে এসব লেখা আছে।

দুই.

ধরা যাক পাটের কথা। পাট ঘরে আসতে লাগে চার মাস। পাট শুকানোর পর সোজা হাটে গিয়ে বিক্রি করতে হয়। কপাল ভালো হলে দাম পান, খারাপ হলে বাজারেই পাটে আগুন লাগিয়ে দিয়ে আসেন। অর্থাৎ পাট শতভাগ কারখানানির্ভর, কিন্তু তুলা নয়। তুলায় দাম না পেলে শ্রম লাগিয়ে সুতা, তেল ও খইল পাওয়া যায়। তারপর সুতা থেকে কাপড়। এখানেই তুলার সঙ্গে বাংলার কৃষক ও তাঁতিদের স্বাবলম্বী হওয়ার সম্পর্ক।

কৃষি সমাজগুলোয় যেহেতু বছরের নানা সময় শ্রমের চাহিদার হেরফের হয় এবং তুলা যেহেতু মাসের পর মাস রেখে দেওয়া যায়, তাই চাষ না হওয়া মৌসুমে কাপড় বোনার কাজ চলে। যেহেতু নারীরা বাড়ির কাজ করেন, তাঁরা ফাঁকা সময় কাপড় তৈরিতে নিযুক্ত থাকেন। কাপড় বোনার কাজ আবার পুরুষদের একচেটিয়া। আর কাপড়ে রং করতেন বসাকরা। তাঁরা জানতেন, কোন উদ্ভিদের কোন অংশ দিয়ে কোন রং হয়।

উলিপুরের সাহেবের আলগা থেকে রৌমারী-চিলমারীর চরগুলোয় কয়েক হাজার তাঁত চলছে। কেউ কাপড় বোনেন, অধিকাংশই গামছা ও গায়ের চাদর বানান। তাঁরা প্রসেস করা পাট্টা তুলা কিনে আনেন। সাধারণত ৫ থেকে ৩০ কাউন্ট পর্যন্ত সুতা চরকায় কাটা হয়।

সময়মতো সুতা না পাওয়া ও কৃত্রিম সংকট আছেই। সমাধান হলো তুলার চাষ। রংপুর তুলা উন্নয়ন বোর্ডের একজন কর্মকর্তা জানান, ‘তুলা উন্নয়ন বোর্ডই একমাত্র প্রতিষ্ঠান, যেটি কৃষককে বীজ ও সার সরবরাহ থেকে শুরু করে তুলা কিনে নেওয়ার কাজটিও করে থাকে।’

তবু তুলার চাষ ছড়িয়ে পড়ছে না কেন? খোলাবাজারে তুলাবীজ পাওয়া যায় না এবং উপজেলা পর্যায়ে পরামর্শকেন্দ্র না থাকা। ব্রহ্মপুত্রের চরের যে কৃষকের কাছে উপজেলা সদরই সারা দিনের মামলা, সেখানে বিভাগীয় শহর রংপুরে গিয়ে তুলাবীজ ও জ্ঞান সংগ্রহ করা অসম্ভব ঘটনা।

গবেষক ওম প্রকাশ তাঁর ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি অব বেঙ্গল ১৬৩০-১৭২০ গ্রন্থে বলেছেন, ইউরোপীয় কোম্পানিগুলোর বস্ত্র চাহিদা ১০ লাখ গজ থেকে ১০ কোটি গজে উন্নীত হলো। ফলে বাংলায় এক লাখ অতিরিক্ত কর্মসংস্থান হলো। এই উৎপাদন বৃদ্ধি বাংলা সামাল দিয়েছিল কারখানাব্যবস্থা তৈরি করে নয়, সামাল দিয়েছিল অতিরিক্ত জমিতে তুলা চাষ করে, তাঁত ও দক্ষ কারিগর এবং বিকেন্দ্রীকৃত কাঠামো বাড়িয়ে। কারিগরি উৎপাদনব্যবস্থার শর্ত মেনে গ্রামে গ্রামে বাড়িভিত্তিক উৎপাদনব্যবস্থা বৃদ্ধি পেল। এটাই তৎকালীন পৃথিবীর ধনীতম রাষ্ট্র বাংলার নিজস্ব অর্থনৈতিক ব্যবস্থা।

বড় পুঁজি বড় কারখানায় বড় হন গোটা কয়েক ব্যক্তি। যাঁদের শেষ ঠিকানা সিঙ্গাপুরের নাগরিকত্ব। কিন্তু চিলমারীর চরের নারীরা যদি বাড়িতে তুলা থেকে সুতা কাটতে পারেন আর সুতা থেকে কাপড় বানান এবং তা যদি প্রাকৃতিক রঙে মাখাতে পারেন, তা গড়বে টেকসই অর্থনীতি। নারীদের মুখে আবার শোনা যাবে, ‘চরকা আমার সোয়ামী পুত/ চরকা আমার নাতি।/ চরকার দৌলতে হামার/ দুয়ারে বান্ধা হাতি।।’