প্রথম আলো নিয়ে দ্য ডিসেন্টের লেখার একটি সমালোচনামূলক পাঠ

দ্য ডিসেন্টে প্রকাশিত লেখার স্ক্রিনশট

ঢাকাভিত্তিক একটি ডিজিটাল অনুসন্ধানমূলক সংবাদমাধ্যম দ্য ডিসেন্টে ‘শিরোনামে ফ্রেমিংয়ের মাধ্যমে আওয়ামী লীগকে সুবিধা দিচ্ছে প্রথম আলো?’ শীর্ষক রবি হোসাইনের একটি লেখা প্রকাশিত হয়েছে। লেখাটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তোলে—প্রথম আলোর শিরোনাম কি রাজনৈতিক পক্ষভেদে ভিন্নভাবে মানুষ, ঘটনা ও অপরাধকে দৃশ্যমান করছে? প্রশ্নটি অপ্রাসঙ্গিক নয়।

সংবাদমাধ্যমের ক্ষমতা শুধু কী প্রকাশিত হচ্ছে, সেখানে সীমাবদ্ধ নয়; বরং কীভাবে প্রকাশিত হচ্ছে, কোন পরিচয় সামনে আনা হচ্ছে, কোন পরিচয় পেছনে রাখা হচ্ছে, কোন অতীত স্মরণ করানো হচ্ছে এবং কোন অতীত নীরব রাখা হচ্ছে, তার মধ্যেও সংবাদমাধ্যমের রাজনৈতিক ভূমিকা তৈরি হয়। এই অর্থে লেখাটির উদ্বেগকে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই।

কিন্তু উদ্বেগ গুরুত্বপূর্ণ হলেই বিশ্লেষণ পদ্ধতিগতভাবে শক্তিশালী হয়ে যায় না। দ্য ডিসেন্টের লেখাটি তীক্ষ্ণ, রাজনৈতিকভাবে আকর্ষণীয় এবং কিছু ক্ষেত্রে সংবাদ শিরোনামের ভাষা নিয়ে জরুরি অস্বস্তি তৈরি করে। কিন্তু ফ্রেমিং বিশ্লেষণ হিসেবে এটি দুর্বল। লেখাটি কিছু গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণকে পদ্ধতিগত প্রমাণে রূপ দিতে পারেনি। আরও নির্দিষ্টভাবে বললে, লেখাটি একটি সম্ভাব্য প্যাটার্ন দেখায়, কিন্তু সেই প্যাটার্নকে প্রমাণ করে না।

আরও পড়ুন

ফ্রেমিং তত্ত্বের ভাষায়, সংবাদমাধ্যম বাস্তবতার কিছু অংশ নির্বাচন করে, কিছু অংশকে বেশি দৃশ্যমান করে, কিছু অংশকে গুরুত্ব দেয়, আর কিছু অংশকে পেছনে সরিয়ে রাখে। এভাবেই পাঠকের কাছে কোনো ঘটনা ‘কী’ এবং ‘কেন’ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। একটি মানুষকে ‘বৈষম্যবিরোধী নেতা’, ‘থানা পুড়িয়ে দেওয়ার হুমকিদাতা’, ‘মুক্তিযোদ্ধা’, ‘আওয়ামী লীগ নেতা’, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক’, ‘সাবেক সংসদ সদস্য’, ‘হত্যা মামলার আসামি’ কিংবা ‘শিল্পী’ হিসেবে পরিচয় করানো একই ঘটনা সম্পর্কে ভিন্ন নৈতিক প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে। এই জায়গাতেই দ্য ডিসেন্টের লেখাটির শক্তি। এটি দেখাতে চায়, প্রথম আলো রাজনৈতিক পরিচয় ও অতীত অপকর্ম নির্বাচনে নিরপেক্ষ নয়। কিন্তু এই দাবি প্রমাণ করতে হলে শুধু উদাহরণ যথেষ্ট নয়; দরকার পদ্ধতি, নমুনা, কোডিং, তুলনামূলক কাঠামো এবং বিকল্প ব্যাখ্যার সঙ্গে লড়াই।

লেখাটির কেন্দ্রীয় উদাহরণ মাহদী হাসানকে নিয়ে প্রথম আলোর শিরোনাম: ‘“থানা পুড়িয়ে দিয়েছি” হুমকি দেওয়া সেই বৈষম্যবিরোধী নেতা “ধাওয়া খেয়ে” আশ্রয় নিলেন থানায়।’ দ্য ডিসেন্টের লেখক এই শিরোনামকে প্রথমে ‘চমৎকার’ বলেছেন। তাঁর যুক্তি হলো, এখানে একটি প্যারাডক্স আছে: যে ব্যক্তি অতীতে থানাকে নিয়ে হুমকিসূচক ভাষা ব্যবহার করেছিলেন, তিনিই পরে বিপদে পড়ে থানায় আশ্রয় নিয়েছেন। সংবাদমূল্যের দিক থেকে এটি সত্যিই একটি শক্তিশালী শিরোনাম হতে পারে। সংবাদে এগুলো পাঠকের দৃষ্টি টানে। এই দিক থেকে লেখকের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ যৌক্তিক।

লেখক নিজেই স্বীকার করেছেন, এটি কোনো গবেষণা নয় এবং খুব কঠোর কোনো মেথডলজি অনুসরণ করা হয়নি। তিনি প্রথম আলোর ওয়েবসাইটে বিচ্ছিন্নভাবে কিছু প্রতিবেদন খুঁজেছেন এবং সব প্রতিবেদন সমানভাবে উঠে এসেছে কি না, সেটাও নিশ্চিত নন। এই সততা প্রশংসনীয়, কিন্তু সেটা লেখার দাবির শক্তি কমিয়ে দেয়। কারণ, এরপরই লেখাটি দাবি করছে, প্রথম আলো ‘কিছু প্যাটার্ন’ অনুসরণ করছে।

কিন্তু এখান থেকেই প্রথম তাত্ত্বিক সমস্যা শুরু। ফ্রেমিং কেবল সংবাদমূল্যের প্রশ্ন নয়; এটি নৈতিক অবস্থান তৈরিরও প্রশ্ন। মাহদীর আক্রান্ত হওয়ার ঘটনার শিরোনামে তাঁর অতীতের হুমকির প্রসঙ্গ জুড়ে দেওয়ায় পাঠকের মনোযোগ ‘আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা’ থেকে সরে গিয়ে তাঁর অতীত আচরণের দিকে চলে যায়। এর ফলে ‘সিমপ্যাথি ফ্রেম’ দুর্বল হয়ে ‘আইরনি ফ্রেম’ শক্তিশালী হয়। অর্থাৎ পাঠক তাঁকে প্রথমে ভুক্তভোগী হিসেবে নয়, বরং নিজের কথার ফাঁদে পড়া এক চরিত্র হিসেবে পড়তে পারেন।

দ্য ডিসেন্টের লেখক এই প্রভাবটি দেখেছেন, কিন্তু এর তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা যথেষ্ট পরিষ্কার করেননি। এ ক্ষেত্রে ‘অ্যাট্রবিউশন থিউরি’ ব্যবহার করা যেত। পাঠক যখন কোনো ঘটনা পড়ে, তখন সে ভুক্তভোগীকে কীভাবে দেখে, তা নির্ভর করে দায় কার ওপর আরোপ করা হচ্ছে তার ওপর। মাহদীর শিরোনামে ‘ধাওয়া খেয়ে থানায় আশ্রয় নেওয়া’ একটি ভুক্তভোগী অবস্থান তৈরি করে, কিন্তু ‘থানা পুড়িয়ে দিয়েছি হুমকি দেওয়া সেই’ অংশটি তাঁর ওপর নৈতিক দায় ফিরিয়ে দেয়। ফলে ‘ভিক্টিমহুড’ আংশিকভাবে ‘ডিজার্ভডনেস’-এ রূপ নেয়: পাঠক ভাবতে পারেন, ‘যা করেছে, তাই হয়েছে।’ দ্য ডিসেন্টের লেখক ফেসবুকের ‘হা হা’ প্রতিক্রিয়া দিয়ে এই পাঠপ্রতিক্রিয়া বোঝাতে চেয়েছেন। কিন্তু পদ্ধতিগতভাবে এটিই দুর্বল জায়গা।

আরও পড়ুন

ফেসবুক প্রতিক্রিয়া কোনো নির্ভরযোগ্য ‘অডিয়েন্স ইফেক্ট মিজার’ নয়। লেখাটি বলছে, ওই পোস্টে ১১ হাজারের বেশি প্রতিক্রিয়ার মধ্যে ৭ হাজার ৭০০-এর বেশি ছিল ‘হা হা’। এ তথ্য একটি অনলাইন প্রতিক্রিয়ার ইঙ্গিত দেয়। কিন্তু ‘ক্যাজুয়াল প্রুফ’ দেয় না। কেন মানুষ ‘হা হা’ দিয়েছে? শিরোনামের কারণে? মাহদীর পূর্বপরিচয়ের কারণে? দলীয় বিদ্বেষের কারণে? সংগঠিত অনলাইন ট্রলিংয়ের কারণে? অ্যালগরিদমিকভাবে পোস্টটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক গোষ্ঠীর কাছে বেশি পৌঁছানোর কারণে? নাকি বাংলাদেশের ফেসবুক-সংস্কৃতিতে রাজনৈতিক সহিংসতাকে মিমে পরিণত করার প্রবণতার কারণে? লেখাটি এগুলো আলাদা করে না। ফলে ফেসবুক প্রতিক্রিয়া দিয়ে শিরোনামের প্রভাব প্রমাণের চেষ্টা দুর্বল ‘ক্যাজুয়াল ইনফারেন্স’ তৈরি করে।

দ্বিতীয় বড় সমস্যা হলো লেখাটির ‘স্যাম্পলিং ফ্রেম’ নেই। লেখক নিজেই স্বীকার করেছেন, এটি কোনো গবেষণা নয় এবং খুব কঠোর কোনো মেথডলজি অনুসরণ করা হয়নি। তিনি প্রথম আলোর ওয়েবসাইটে বিচ্ছিন্নভাবে কিছু প্রতিবেদন খুঁজেছেন এবং সব প্রতিবেদন সমানভাবে উঠে এসেছে কি না, সেটাও নিশ্চিত নন। এই সততা প্রশংসনীয়, কিন্তু সেটা লেখার দাবির শক্তি কমিয়ে দেয়। কারণ, এরপরই লেখাটি দাবি করছে, প্রথম আলো ‘কিছু প্যাটার্ন’ অনুসরণ করছে।

প্যাটার্ন দাবি করতে হলে আগে জানতে হবে, মোট কতটি প্রতিবেদন দেখা হয়েছে। কোন সময়সীমা ধরা হয়েছে? ৫ আগস্ট ২০২৪ থেকে ১৩ জুন ২০২৬? নাকি শুধু সাম্প্রতিক কয়েক মাস? কোন কি–ওয়ার্ড ব্যবহার করা হয়েছে? ‘আওয়ামী লীগ’, ‘ছাত্রলীগ’, ‘জুলাই’, ‘এনসিপি’, ‘বৈষম্যবিরোধী’, ‘হামলা’, ‘গ্রেপ্তার’, ‘রিমান্ড’, ‘আগুন’, ‘মামলা’, ‘মুক্তিযোদ্ধা’—এসব কি আলাদা করে সার্চ করা হয়েছে? কতটি শিরোনাম পাওয়া গেছে? কতটি বাদ দেওয়া হয়েছে? বাদ দেওয়ার নিয়ম কী ছিল? একই ঘটনার একাধিক আপডেট কি আলাদা শিরোনাম হিসেবে গণনা করা হয়েছে? প্রথম আলো শিরোনাম পরে পরিবর্তন করেছে কি না, তা কি আর্কাইভ দিয়ে যাচাই করা হয়েছে? এসব প্রশ্নের কোনো উত্তর লেখাটিতে নেই।

এটি শুধু পদ্ধতির সৌন্দর্যবর্ধনের বিষয় নয়। এটি বিশ্লেষণের বৈধতার প্রশ্ন। গবেষণার ভাষায় এটিকে বলা যায় ‘সিলেকশন অন দ্য ডিপেন্ডেন্ট ভেরিয়াবল’: লেখক মূলত যেসব শিরোনামে তাঁর দাবি সমর্থিত হয়, সেগুলো সামনে এনেছেন। তিনি কিছু ব্যতিক্রম স্বীকার করেছেন, কিন্তু ব্যতিক্রমের অনুপাত দেননি। ফলে পাঠক জানেন না, উদাহরণগুলো মোট ছবির কত শতাংশ। ১০টি নির্বাচিত উদাহরণ দিয়ে প্যাটার্ন বোঝানো যায়, কিন্তু প্যাটার্ন প্রমাণ করা যায় না। প্যাটার্ন প্রমাণ করতে ‘ডেনোমিনেটর’ লাগে।

উদাহরণ হিসেবে লেখক মাহদীর শিরোনামের পাশাপাশি ছাত্রশক্তির এক নেতার গ্রামের বাড়িতে আগুন দেওয়ার খবরের শিরোনাম টানেন: ‘ঢাবিতে ছাত্রলীগ অভিযোগ তুলে মারধরের ঘটনায় “জড়িত” ছাত্রশক্তি নেতার গ্রামের বাড়িতে আগুন।’ লেখকের মতে, এখানে আক্রান্ত ব্যক্তির অতীত–সংশ্লিষ্টতা শিরোনামে আনা হয়েছে। এরপর তিনি বলেন, ওবায়দুল কাদের, সাদ্দাম হোসেন, সেলিম খান বা শামীম ওসমানের ক্ষেত্রে প্রথম আলো একই কাজ করেনি। এই তুলনা রাজনৈতিকভাবে আকর্ষণীয়, কিন্তু পদ্ধতিগতভাবে অসম্পূর্ণ।

কারণ, এখানে ঘটনাগুলোর ধরন এক নয়। মাহদীর ঘটনা ব্যক্তির সরাসরি বক্তব্য ও বর্তমান আশ্রয় নেওয়ার মধ্যে একটি তাৎক্ষণিক ‘আইরনি’ তৈরি করে। ছাত্রশক্তি নেতার ক্ষেত্রে অভিযোগ, মারধর এবং বাড়িতে আগুনের মধ্যে রাজনৈতিক প্রতিশোধের প্রেক্ষাপট থাকতে পারে। কিন্তু ওবায়দুল কাদেরের গ্রামের বাড়িতে আগুন, সাদ্দাম হোসেনের বাড়িতে আগুন, সেলিম খান ও শান্ত খানকে পিটিয়ে হত্যা, শামীম-সেলিম ওসমানের বাড়িতে হামলা, এগুলো সম্পত্তি, জনরোষ, সহিংসতা, গণ–অভ্যুত্থান-পরবর্তী প্রতিশোধ এবং ব্যক্তিগত রাজনৈতিক দায়ের ভিন্ন ভিন্ন স্তরের ঘটনা। এগুলোকে একই ফ্রেমিং নিয়মে তুলনা করতে হলে ‘ইভেন্ট টাইপ কন্ট্রোল’ দরকার। লেখাটিতে তা নেই।

আরেকটি সমস্যা হলো লেখক অনেক ক্ষেত্রে ‘শিরোনাম হওয়া উচিত ছিল’ ধরনের বিকল্প শিরোনাম তৈরি করেছেন। যেমন ওবায়দুল কাদেরের ক্ষেত্রে তিনি প্রস্তাব করেছেন, শিরোনামে আন্দোলনকারীদের হুমকির প্রসঙ্গ আসা উচিত ছিল। সেলিম খানের ক্ষেত্রে তিনি প্রস্তাব করেছেন, জনতার ওপর গুলি ছোড়ার প্রসঙ্গ আসা উচিত ছিল। শামীম ওসমানের ক্ষেত্রেও একই ধরনের বিকল্প শিরোনাম দিয়েছেন। এগুলো পাল্টা-ফ্রেম হিসেবে কার্যকর, কিন্তু প্রমাণ নয়। এগুলো দেখায় লেখক কোন নৈতিক সামঞ্জস্য চান। কিন্তু এগুলো দেখায় না যে প্রথম আলোর বাস্তব শিরোনাম রাজনৈতিক পক্ষপাত থেকেই তৈরি হয়েছে। সংবাদ শিরোনাম বিচার করতে হলে শুধু লেখকের কাঙ্ক্ষিত শিরোনামের সঙ্গে বাস্তব শিরোনাম তুলনা করলেই হবে না; দেখতে হবে, সংবাদমাধ্যমটি একই ধরনের সব ঘটনায় একই নিয়ম অনুসরণ করে কি না।

তৃতীয় বড় সমস্যা হলো শ্রেণিবিভাগ। লেখক ‘জুলাইপন্থী’ ও ‘জুলাইবিরোধী’ দুই শ্রেণি তৈরি করেছেন। কিন্তু এই দুই শ্রেণি নিজেই রাজনৈতিকভাবে নির্মিত। লেখক ‘জুলাইপন্থী’ বলতে মূলত বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন, এনসিপি, ইনকিলাব মঞ্চ, জাতীয় নাগরিক পার্টি ইত্যাদি জুলাই-পরবর্তী সংগঠন ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বোঝাচ্ছেন। বিএনপি ও জামায়াতের মতো পূর্বপ্রতিষ্ঠিত দলগুলোকে তিনি এই আলোচনার বাইরে রেখেছেন। অন্যদিকে ‘জুলাইবিরোধী’ বলতে আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনকে বোঝানো হয়েছে।

এখানে ‘ক্যাটাগরি বায়াস’ তৈরি হয়। ‘জুলাইপন্থী’ একটি আন্দোলন-পরবর্তী রাজনৈতিক পরিচয়, যেখানে সংগঠন, নৈতিক দাবি, আন্দোলনের স্মৃতি ও নতুন রাজনৈতিক অবস্থান একত্র। ‘আওয়ামী লীগ–সংশ্লিষ্ট’ একটি দলীয় পরিচয়, যার ভেতরে সাবেক মন্ত্রী, এমপি, স্থানীয় নেতা, ছাত্রলীগ, যুবলীগ, আওয়ামী লীগপন্থী শিক্ষক, মুক্তিযোদ্ধা, শিল্পী, সাবেক জনপ্রতিনিধি সবাই ঢুকে যেতে পারেন। ফলে দুটি শ্রেণি একই মাত্রার নয়। একটি ‘ন্যারো মুভমেন্ট ক্যাটাগরি’ অন্যটি ‘ব্রড পার্টি–অ্যাফিলিয়েশন ক্যাটাগরি’। এই অসম শ্রেণিবিন্যাস থেকে তুলনাও অসম হয়ে যায়।

এখানে স্টুয়ার্ট হলের ‘রিপ্রেজেন্টেশন’ ধারণা প্রাসঙ্গিক হতে পারত। পরিচয় কোনো নিরপেক্ষ লেবেল নয়; এটি অর্থ উৎপাদন করে। কাউকে ‘মুক্তিযোদ্ধা’ বলা, ‘আওয়ামী লীগ নেতা’ বলা, ‘সাবেক সংসদ সদস্য’ বলা, ‘শিল্পী’ বলা, বা ‘হত্যা মামলার আসামি’ বলা, প্রতিটি লেবেল আলাদা সামাজিক স্মৃতি সক্রিয় করে। দ্য ডিসেন্টের লেখাটি এ জায়গাটি ধরেছে, কিন্তু পদ্ধতিগতভাবে ‘আইডেন্টিটি কোডিং’ করেনি। কোন ক্ষেত্রে কোন পরিচয় ‘প্রাথমিক পরিচয়’ হিসেবে গণ্য হবে, সেটি নির্ধারণের নিয়ম নেই। একজন মানুষ একই সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধা, আওয়ামী লীগ নেতা, স্থানীয় প্রভাবশালী, মামলার আসামি এবং ভুক্তভোগী হতে পারেন। সংবাদমাধ্যম কোন পরিচয় বেছে নিচ্ছে, সেটি গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্লেষক নিজেও কোন পরিচয় বেছে নিচ্ছেন, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। লেখাটিতে এই ‘আত্মপ্রতিফলন’ নেই।

কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের মুক্তিযোদ্ধা আবদুল হাই ওরফে কানুর উদাহরণ এই সমস্যা পরিষ্কার করে। লেখক বলেন, প্রথম আলো তাঁকে ‘মুক্তিযোদ্ধা’ পরিচয়ে সামনে এনেছে, অথচ তিনি স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা ছিলেন এবং তাঁর বিরুদ্ধে অতীত অভিযোগ ছিল বলে অন্য সংবাদমাধ্যমে এসেছে। এখানে লেখকের প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ: কেন একজন ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিচয় পেছনে যায় এবং মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় সামনে আসে? কিন্তু এখানেও পদ্ধতিগত প্রশ্ন থাকে। কোনো মুক্তিযোদ্ধাকে জুতার মালা পরিয়ে লাঞ্ছিত করা হলে ‘মুক্তিযোদ্ধা’ পরিচয় সংবাদমূল্যের কেন্দ্রে চলে আসতে পারে। কারণ, ঘটনাটির নৈতিক ধাক্কা ওই প্রতীকী পরিচয়ের ওপরই দাঁড়ায়। কিন্তু সেই ব্যক্তি যদি একই সঙ্গে আওয়ামী লীগ নেতা হন, তাহলে রাজনৈতিক পরিচয় বাদ দিলে ঘটনা ‘ডিপলিটিসাইজড’ হয়। এই দ্বৈততা বিশ্লেষণ করা দরকার ছিল। লেখাটি একে প্রায় একরৈখিকভাবে ‘আওয়ামী পরিচয় আড়াল’ হিসেবে দেখায়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আ ক ম জামাল উদ্দীনের উদাহরণও একই ধরনের। লেখাটিতে বলা হয়েছে, তিনি যখন ৩২ নম্বরে গিয়ে মারধরের শিকার হন, তখন প্রথম আলো তাঁকে ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক’ হিসেবে পরিচয় করায়। পরে গ্রেপ্তারের সময় তাঁকে ‘আওয়ামী লীগপন্থী শিক্ষক’ হিসেবে পরিচয় করায়। লেখক এটিকে একই ব্যক্তির ক্ষেত্রে ভিন্ন প্রেক্ষাপটে ভিন্ন পরিচয় ব্যবহারের উদাহরণ হিসেবে দেখান। পর্যবেক্ষণটি মূল্যবান। কিন্তু এখানেও বিকল্প ব্যাখ্যা আছে। ৩২ নম্বরে মারধরের ঘটনায় ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক’ পরিচয় সংবাদমূল্য তৈরি করতে পারে; গ্রেপ্তারের ঘটনায় তাঁর রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা আইনি বা রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠতে পারে। এটিকে পক্ষপাত বলার আগে দেখাতে হবে, প্রথম আলো অন্য রাজনৈতিক পক্ষের অধ্যাপক, শিল্পী, মুক্তিযোদ্ধা বা পেশাজীবীদের ক্ষেত্রে কীভাবে পরিচয় ব্যবহার করে। সেই তুলনা নেই।

আওয়ামী লীগকে সুবিধা দেওয়া বলতে কী বোঝানো হচ্ছে? দলীয় পুনর্বাসন? সহানুভূতি তৈরি? অপরাধের স্মৃতি মুছে দেওয়া? পাঠকের ক্ষোভ কমানো? জুলাইপন্থীদের নৈতিক অবস্থান দুর্বল করা? নাকি আওয়ামী লীগ–সংশ্লিষ্টদের ‘ভিকটিমহুড’ শক্তিশালী করা? এগুলো ভিন্ন জিনিস। একটি শিরোনাম আওয়ামী লীগ–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিচয় আড়াল করতে পারে, কিন্তু তা সরাসরি আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক সুবিধায় রূপান্তরিত হয়েছে কি না, তা আলাদা প্রশ্ন।

চতুর্থ সমস্যা হলো ‘আক্রান্ত’ ধারণার অতিরিক্ত বিস্তার। লেখক ‘আক্রান্ত’ বলতে হামলার শিকার, মামলার শিকার, কারাগারে থাকা, গ্রেপ্তার, রিমান্ড, সম্পত্তিতে আগুন, শারীরিক হেনস্তা ইত্যাদি একসঙ্গে ধরেছেন। কিন্তু এগুলো সাংবাদিকতার ভিন্ন ধরন। একটি হামলার ঘটনা, একটি গ্রেপ্তারের ঘটনা, একটি সম্পত্তি ধ্বংসের ঘটনা, একটি মবের দ্বারা হেনস্তার ঘটনা কিংবা একটি আইনগত প্রক্রিয়ার ঘটনা একইভাবে লেখা হয় না। ফলে এগুলোকে এক বিশ্লেষণী পাত্রে ফেলে ‘ফ্রেমিং’ তুলনা করলে ‘কনস্ট্রাক্ট ভ্যালিডিটি’ দুর্বল হয়।

ধরা যাক, সাবেক সংসদ সদস্য বা মন্ত্রী গ্রেপ্তার হলে শিরোনাম হয় ‘সাবেক নৌমন্ত্রী শাজাহান খান গ্রেপ্তার’ বা ‘সাবেক সংসদ সদস্য হাজি সেলিম গ্রেপ্তার।’ লেখক দাবি করেন, এতে গ্রেপ্তারের পেছনের অভিযোগ শিরোনামে নেই। ফলে পাঠকের মনে হতে পারে তাঁদের কেবল সাবেক এমপি বা আওয়ামী নেতা হওয়ার কারণেই গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এই যুক্তি সম্ভাব্য। কিন্তু প্রমাণ করতে হলে আওয়ামী লীগ নেতা ছাড়া অন্যদের গ্রেপ্তারের ঘটনার শিরোনামের সঙ্গে তুলনা করা দরকার। বিএনপি, জামায়াত, এনসিপি, বৈষম্যবিরোধী বা ছাত্রশক্তি সংশ্লিষ্ট কেউ গ্রেপ্তার হলে প্রথম আলো কি নিয়মিতভাবে শিরোনামে ‘হত্যা মামলা’, ‘অস্ত্র মামলা’, ‘সহিংসতা’, ‘ভাঙচুর’ ইত্যাদি আনে? যদি আনে, লেখকের দাবি শক্তিশালী হবে। যদি না আনে, তাহলে এটি একটি গ্রেপ্তারের ঘটনার সাধারণ নিয়ম হতে পারে। লেখাটি এই নিয়ন্ত্রিত তুলনা দেয়নি।

এখানে ‘মিডিয়া রুটিন থিউরি’ প্রাসঙ্গিক। সংবাদ শিরোনাম সব সময় রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থেকে তৈরি হয় না; অনেক সময় বার্তাকক্ষের সাধারণ চর্চা, আইনি সতর্কতা, সার্চ ইঞ্জিন অপটিমাইজেশন (এসইও) সূত্রের ওপর নির্ভরশীলতা, শিরোনামের দৈর্ঘ্য এবং সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যমের নিজস্ব স্টাইল শিরোনামকে প্রভাবিত করে। কোনো অভিযোগ আদালতে প্রমাণিত না হলে সংবাদমাধ্যম অনেক সময় শিরোনামে ‘হত্যাকারী’ বা ‘দুর্নীতিবাজ’ না লিখে ‘গ্রেপ্তার’ লিখতে পারে। আবার পুলিশের ভাষা, মামলা নম্বর কিংবা রাজনৈতিক চাপও কাজ করে। দ্য ডিসেন্টের লেখাটি প্রায় সব ‘অমিশন’কে ‘পলিটিক্যাল কনসিলমেন্ট’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু ‘অমিশন’ সব সময় ‘কনসিলমেন্ট’ নয়। কখনো তা ‘সম্পাদকীয় সতর্কতা’, কখনো ‘সাধারণ সংকোচন’, কখনো যাচাইকরণের সীমাবদ্ধতা।

তবে এটাও সত্য, ‘অমিশন’ রাজনৈতিক প্রভাব তৈরি করতে পারে, উদ্দেশ্য থাকুক বা না থাকুক। এখানেই লেখাটি আরও শক্তিশালী হতে পারত। লেখক যদি বলতেন, ‘প্রথম আলোর উদ্দেশ্য কী, তা এই লেখায় প্রমাণ করা যাচ্ছে না; কিন্তু শিরোনামের নির্বাচন পাঠকের কাছে আওয়ামী লীগ–সংশ্লিষ্টদের অপরাধ-পরিচয় কম দৃশ্যমান করে এবং জুলাই-সংশ্লিষ্টদের অতীত দায় বেশি দৃশ্যমান করে তুলতে পারে।’ তাহলে তাঁর দাবি বেশি মজবুত হতো। কিন্তু লেখাটি শিরোনাম থেকে সরাসরি ‘আওয়ামী লীগকে সুবিধা’ দেওয়ার সিদ্ধান্তে চলে গেছে। এটাই ‘ক্যাজুয়াল ওভাররিচ’।

পঞ্চম সমস্যা হলো ‘সুবিধা’ ধারণার অস্পষ্টতা। আওয়ামী লীগকে সুবিধা দেওয়া বলতে কী বোঝানো হচ্ছে? দলীয় পুনর্বাসন? সহানুভূতি তৈরি? অপরাধের স্মৃতি মুছে দেওয়া? পাঠকের ক্ষোভ কমানো? জুলাইপন্থীদের নৈতিক অবস্থান দুর্বল করা? নাকি আওয়ামী লীগ–সংশ্লিষ্টদের ‘ভিকটিমহুড’ শক্তিশালী করা? এগুলো ভিন্ন জিনিস। একটি শিরোনাম আওয়ামী লীগ–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিচয় আড়াল করতে পারে, কিন্তু তা সরাসরি আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক সুবিধায় রূপান্তরিত হয়েছে কি না, তা আলাদা প্রশ্ন।

এখানে ‘এজেন্ডা–সেটিং’ ও ‘প্রাইমিং’ ধারণা ব্যবহার করা যেত। কোনো সংবাদমাধ্যম যদি ধারাবাহিকভাবে এক পক্ষের অপরাধ স্মরণ করায় এবং অন্য পক্ষের অপরাধ আড়াল করে, তাহলে পাঠকের স্মৃতিতে একপক্ষ বেশি অপরাধী আর অন্যপক্ষ বেশি ভুক্তভোগী হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। কিন্তু এটি প্রমাণের জন্য ‘লঙ্গিচ্যুডিনাল ডেটা’ দরকার। শুধু কয়েকটি শিরোনাম নয়, সময় ধরে ধরে শতাধিক শিরোনাম, লিড, ছবি, ক্যাপশন, ফেসবুক পোস্ট এবং পাঠকপ্রতিক্রিয়া বিশ্লেষণ দরকার। দ্য ডিসেন্টের লেখাটি সেই কাজ করেনি। ফলে ‘সুবিধা’ শব্দটি বিশ্লেষণী ধারণার চেয়ে রাজনৈতিক অভিযোগ হয়ে গেছে।

ষষ্ঠ সমস্যা হলো ‘এজেন্সি’ বা দায় আরোপের বিশ্লেষণ অসম্পূর্ণ। লেখাটি ‘প্যাসিভ ফ্রেমিং’ নিয়ে কথা বলেছে, বিশেষ করে আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্ট অভিযুক্তদের পরিচয় বা সক্রিয় ভূমিকা শিরোনামে না আসার অভিযোগে। উদাহরণ হিসেবে নেত্রকোনার জুলাই শহীদ স্মৃতিস্তম্ভে আগুনের শিরোনাম: ‘নেত্রকোনায় গভীর রাতে জুলাই শহীদ স্মৃতিস্তম্ভে দুর্বৃত্তদের আগুন।’ লেখক বলছেন, প্রতিবেদনের ভেতরে বা অন্য সূত্রে আওয়ামী স্লোগানের তথ্য থাকলেও শিরোনামে ‘দুর্বৃত্ত’ বলা হয়েছে। একইভাবে ‘নেত্রকোনায় জাহাঙ্গীরনগরের শিক্ষার্থীকে হেনস্তার ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে’ শিরোনামে তিনি দেখছেন, আওয়ামী লীগ–সংশ্লিষ্টদের সক্রিয় দায় ও ঘটনায় ব্যবহৃত সহিংসতা নরম করা হয়েছে। এই উদাহরণগুলো গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ভাষায় ‘এজেন্সি’ লুকানো হলে রাজনৈতিক দায় ম্লান হয়।

কিন্তু এখানেও মেথডলজিক্যাল সতর্কতা দরকার। ‘দুর্বৃত্ত’ শব্দটি অনেক সময় সংবাদমাধ্যম ব্যবহার করে যখন অভিযুক্তের পরিচয় নিশ্চিত নয়, অথবা আইনগতভাবে নাম বা দলীয় পরিচয় উল্লেখে সতর্কতা থাকে। আবার ‘হেনস্তা’ শব্দটি অবশ্যই ঘটনার গুরুত্ব কমিয়ে দিতে পারে, যদি ঘটনার ভেতরে জোর করে বিবস্ত্র করা, মারধর বা ভিডিও ধারণের মতো গুরুতর উপাদান থাকে। কিন্তু লেখাটি দেখায় না, প্রথম আলো একই ধরনের ঘটনায় অন্য রাজনৈতিক পক্ষের ক্ষেত্রে কী শব্দ ব্যবহার করে। ভাষাগত তুলনা ছাড়া ‘প্যাসিভ ফ্রেমিং’ অভিযোগ শক্তিশালী হয় না।

সপ্তম সমস্যা হলো ‘ইন্টারমিডিয়া এজেন্ডা–সেটিং’ বা সংবাদমাধ্যমের পারস্পরিক প্রভাব নিয়ে লেখাটির দাবি। লেখক দেখিয়েছেন, মাহদীর ‘থানা পুড়িয়ে দিয়েছি’ ফ্রেমটি প্রথম আলো প্রকাশের পর আরও ১২টি সংবাদমাধ্যমে একই বা কাছাকাছি শিরোনামে আসে। তিনি সময়তালিকাও দিয়েছেন: প্রথম আলো সন্ধ্যা ৭: ৫৩, প্রিয়ডটকম ৮: ২২, সমকাল ৮: ৫১, পরে ডেইলি স্টার, ইত্তেফাক, সময় টিভি, বাংলাভিশন, যুগান্তর, ঢাকা ট্রিবিউন, রাইজিংবিডি ইত্যাদি। এই অংশটি লেখাটির সবচেয়ে কংক্রিট অংশগুলোর একটি। এখানে অন্তত একটি অনুসন্ধানযোগ্য ক্রম আছে।

কিন্তু এখানেও প্রমাণ সীমিত। একই শব্দগুচ্ছ বহু সংবাদমাধ্যমে ব্যবহৃত হলেই নিশ্চিতভাবে বলা যায় না যে সবাই প্রথম আলো থেকে কপি করেছে। তারা একই ভাইরাল ভিডিও, একই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভাষা, একই পুলিশি বয়ান বা একই প্রচলিত উদ্ধৃতি থেকে শিরোনাম করতে পারে। লেখক স্ক্রিনশটে কিছু কপি-পেস্টের মিল দেখানোর চেষ্টা করেছেন, বিশেষ করে সমকাল ও ইত্তেফাক–এর ক্ষেত্রে। কিন্তু ‘ইন্টারমিডিয়া ইনফ্লুয়েন্স’ প্রমাণ করতে হলে আরও শক্তিশালী পদ্ধতি দরকার: আর্কাইভড টাইমস্ট্যাম্পস, ফুল টেক্সট সিমিলারিটি, সোর্স অ্যাট্রিবিউশন অ্যানালিসিস, সিন্ডিকেইটেড কন্টেন্ট ট্রেসিং এবং হেডলাইন রিভিশন হিস্ট্রি। লেখাটিতে এগুলো নেই। ফলে এখানে বলা যায়: প্রথম আলো সম্ভবত এই ফ্রেমটি ছড়াতে ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু নিশ্চিতভাবে বলা যায় না: বাকি সব সংবাদমাধ্যম প্রথম আলো থেকেই ফ্রেমটি নিয়েছে।

অষ্টম সমস্যা হলো লেখাটির নৈতিক অবস্থান দ্বিধাগ্রস্ত। শুরুতে লেখক মাহদীর শিরোনামকে ‘চমৎকার’ বলেছেন এবং বলেছেন, মাহদীর আচরণে ‘প্যারাডক্স’ আছে, সংবাদমাধ্যম সেটি ঠিকভাবেই ধরেছে। এমনকি পাঠকের নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার দায়ও তিনি প্রথম আলোর ওপর দেননি। কিন্তু পরে তিনি অভিযোগ করছেন, জুলাইপন্থী আক্রান্তদের ক্ষেত্রে অতীত অপকর্ম সামনে আনা হলেও আওয়ামী লীগ–সংশ্লিষ্টদের ক্ষেত্রে তা আনা হয় না।

এখানে দুটি আলাদা নৈতিক প্রশ্ন আছে। প্রথম প্রশ্ন—কেউ আক্রান্ত হলে তাঁর অতীত অপকর্ম শিরোনামে আনা কি নৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য? দ্বিতীয় প্রশ্ন—যদি আনা হয়, তাহলে তা কি সব রাজনৈতিক পক্ষের ক্ষেত্রে একইভাবে আনা হচ্ছে? লেখক দ্বিতীয় প্রশ্নটি তুলেছেন, কিন্তু প্রথম প্রশ্নটি এড়িয়ে গেছেন। ফলে সমালোচনাটি ‘ভিকটিম ব্লেমিং-এর বিরুদ্ধে নয়, বরং অসম ‘ভিকটিম ব্লেমিং-এর বিরুদ্ধে মনে হয়। রাজনৈতিকভাবে এটি বোধগম্য হতে পারে, কিন্তু নৈতিকভাবে আরও স্পষ্টতা দরকার।

ধরা যাক, মাহদীর ক্ষেত্রে অতীত হুমকি শিরোনামে আনা হলো। প্রশ্ন হলো, তিনি আক্রান্ত হওয়ার সময় তাঁর আগের হুমকি কতটা প্রাসঙ্গিক? যদি বলা হয় প্রাসঙ্গিক। তাহলে একই যুক্তি আওয়ামী লীগ নেতাদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হতে পারে। কিন্তু যদি বলা হয় কোনো ভুক্তভোগীর অতীত অপরাধ দিয়ে বর্তমান আক্রমণকে নৈতিকভাবে হালকা করা উচিত নয়, তাহলে মাহদীর শিরোনামও সমস্যাজনক। লেখাটি এই দ্বন্দ্ব মীমাংসা করেনি।

‘জুলাইপন্থী’, ‘জুলাইবিরোধী’, ‘অপকর্ম’, ‘পলাতক দল’, ‘আওয়ামীদের’, ‘ভিকটিমহুড’, ‘সুখানুভূতি’ ইত্যাদি শব্দ বিশ্লেষণের ভাষা হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। এগুলো লেখাটিকে রাজনৈতিকভাবে প্রাণবন্ত করেছে, কিন্তু গবেষণাগত নিরপেক্ষতা কমিয়েছে। অবশ্য কোনো বিশ্লেষণই পুরোপুরি নিরপেক্ষ নয়। কিন্তু যখন কেউ অন্যের ফ্রেমিং বিশ্লেষণ করেন, তখন নিজের ফ্রেমিং নিয়েও সচেতন থাকা দরকার। দ্য ডিসেন্টের লেখাটি প্রথম আলোর ভাষা বিশ্লেষণ করছে, কিন্তু নিজের ব্যবহৃত রাজনৈতিক শ্রেণি ও নৈতিক শব্দের প্রভাব বিশ্লেষণ করতে পারেনি।

নবম সমস্যা হলো টেক্সচুয়াল অ্যানালাইসিস ও ডিসকোর্স অ্যানালাইসিস-এর স্তর গুলিয়ে ফেলা। ভালো ক্রিটিক্যাল ডিসকোর্স অ্যানালাইসিস সাধারণত তিনটি স্তর দেখে—টেক্সটের ভাষা, সংবাদ উৎপাদনের প্রক্রিয়া এবং বৃহত্তর সামাজিক-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট। দ্য ডিসেন্টের লেখাটি মূলত টেক্সট, বিশেষত শিরোনাম বিশ্লেষণ করছে। মাঝে মাঝে ছবি-ক্যাপশন, ফেসবুক প্রতিক্রিয়া, অন্য সংবাদমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া, রাজনৈতিক সুবিধা ইত্যাদি স্তরে যাচ্ছে। কিন্তু প্রতিটি স্তরে আলাদা পদ্ধতি দরকার। শিরোনাম বিশ্লেষণের পদ্ধতি এক, ‘নিউজরুম প্রোডাকশন’ বোঝার পদ্ধতি আরেক, ‘অডিয়েন্স রিসেপশন’ বোঝার পদ্ধতি আরেক এবং রাজনৈতিক প্রভাব বোঝার পদ্ধতি আরেক। লেখাটি এসব স্তরকে একসঙ্গে টেনে এনে একটি বড় রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে। ফলে বিশ্লেষণী শৃঙ্খলা দুর্বল হয়েছে।

দশম সমস্যা হলো পুরো প্রতিবেদনের ফ্রেম বনাম শিরোনাম ফ্রেম। মাহদীর ক্ষেত্রে লেখক শুধু শিরোনাম নয়, প্রতিবেদনের ভেতরের ছবি ও ক্যাপশনও দেখিয়েছেন। ক্যাপশনে বলা হয়েছে, ২ জানুয়ারি হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জ থানায় গিয়ে ওসিকে হুমকি দেওয়ার ঘটনার ছবি ব্যবহার করা হয়েছে। লেখকের যুক্তি হলো, শুধু শিরোনাম নয়, ছবির মাধ্যমেও মাহদীর অতীত অপকর্মকে দৃশ্যমান করা হয়েছে। এই পর্যবেক্ষণ শক্তিশালী। কারণ, ছবি ও ক্যাপশন অনেক সময় শিরোনামের চেয়েও বেশি কার্যকর ফ্রেমিং তৈরি করে।

কিন্তু লেখাটি বাকি উদাহরণগুলোর ক্ষেত্রে একই স্তরের বিশ্লেষণ করে না। ওবায়দুল কাদের, সাদ্দাম হোসেন, সেলিম খান, শামীম ওসমান, মুক্তিযোদ্ধা কানু, জামাল উদ্দিন, সাবেক এমপি-মন্ত্রীদের ক্ষেত্রে শুধু শিরোনাম দেখা হয়েছে, নাকি প্রতিবেদনের লিড, ছবি, ক্যাপশন, ভেতরের তথ্য, সোশ্যাল মিডিয়া কার্ডও দেখা হয়েছে, তা স্পষ্ট নয়। ফলে এক ক্ষেত্রে মাল্টিমোডাল ফ্রেমিং, অন্য ক্ষেত্রে শুধু শিরোনামের ফ্রেমিং ব্যবহৃত হয়েছে। পদ্ধতিগতভাবে এটি অসম।

একাদশ সমস্যা হলো ব্যতিক্রমগুলোর বিশ্লেষণ দুর্বল। লেখাটি নিজেই স্বীকার করেছে, কিছু ক্ষেত্রে প্রথম আলো আওয়ামী লীগ–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার বা রিমান্ডের পেছনের অভিযোগ শিরোনামে এনেছে। যেমন ‘দুই হত্যা মামলায়’, ‘হত্যা মামলায়’, ‘হত্যা ও অস্ত্র মামলায়’ ধরনের শিরোনাম উদ্ধৃত হয়েছে। এই ব্যতিক্রমগুলো খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এগুলো দেখায়, প্রথম আলো একেবারে ধারাবাহিকভাবে আওয়ামী লীগ–সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ আড়াল করছে, এমন সরল দাবি করা যায় না। কিন্তু লেখাটি ব্যতিক্রমগুলোকে শুধু ‘ব্যতিক্রম আছে’ বলে পাশ কাটিয়েছে। পদ্ধতিগতভাবে ব্যতিক্রমের সংখ্যা, প্রকৃতি এবং কোন ধরনের ঘটনায় ব্যতিক্রম ঘটেছে, তা বিশ্লেষণ করা দরকার ছিল।

ধরা যাক, বড় জাতীয় নেতাদের ক্ষেত্রে অভিযোগ শিরোনামে কম আসে, কিন্তু স্থানীয় নেতাদের ক্ষেত্রে বেশি আসে। অথবা হত্যা মামলায় অভিযোগ আসে, দুর্নীতি মামলায় আসে না। অথবা দ্রুত আপডেট নিউজে অভিযোগ থাকে না, পরে ব্যাখ্যামূলক প্রতিবেদনে থাকে। এসব সম্ভাবনা পরীক্ষা করা হয়নি। ফলে প্যাটার্নটি অতিরিক্ত সরলীকৃত হয়ে গেছে।

দ্বাদশ সমস্যা হলো লেখাটির নিজস্ব রাজনৈতিক ভাষা। ‘জুলাইপন্থী’, ‘জুলাইবিরোধী’, ‘অপকর্ম’, ‘পলাতক দল’, ‘আওয়ামীদের’, ‘ভিকটিমহুড’, ‘সুখানুভূতি’ ইত্যাদি শব্দ বিশ্লেষণের ভাষা হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। এগুলো লেখাটিকে রাজনৈতিকভাবে প্রাণবন্ত করেছে, কিন্তু গবেষণাগত নিরপেক্ষতা কমিয়েছে। অবশ্য কোনো বিশ্লেষণই পুরোপুরি নিরপেক্ষ নয়। কিন্তু যখন কেউ অন্যের ফ্রেমিং বিশ্লেষণ করেন, তখন নিজের ফ্রেমিং নিয়েও সচেতন থাকা দরকার। দ্য ডিসেন্টের লেখাটি প্রথম আলোর ভাষা বিশ্লেষণ করছে, কিন্তু নিজের ব্যবহৃত রাজনৈতিক শ্রেণি ও নৈতিক শব্দের প্রভাব বিশ্লেষণ করতে পারেনি।

  • আসিফ বিন আলী গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

* মতামত লেখকের নিজস্ব