মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের আইটি খাতে যুক্ত করা যে কারণে জরুরি

মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের জন্য ‘ডিজিটাল স্কিলস ফর স্টুডেন্টস’ কার্যক্রম শুরু হয়েছেছবি: বাসস

বাংলাদেশে মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের প্রসঙ্গ উঠলেই আমরা প্রায়ই দুই ধরনের চরম অবস্থানে গিয়ে পৌঁছাই। একদিকে থাকে সহানুভূতির ভাষা। বলা হয়, তাদের জন্য কিছু করা দরকার। অন্যদিকে থাকে তাদের সক্ষমতা নিয়ে অবিশ্বাস। প্রশ্ন তোলা হয়, তারা কি আধুনিক খাতে টিকে থাকতে পারবে। বাস্তবে এই দুই অবস্থানের কোনোটিই সমস্যার কার্যকর সমাধান দিতে পারে না। কারণ, সহানুভূতি কখনোই নীতি নয়, আর অবিশ্বাস কোনো কৌশলও নয়।

বাংলাদেশে মাদ্রাসার শিক্ষার্থীর সংখ্যা ২৭ লাখের বেশি। এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে যদি আধুনিক দক্ষতা, প্রযুক্তি ও বৈশ্বিক অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করা না যায়, তাহলে শুধু একটি শিক্ষাধারাকেই নয়, জাতির সামগ্রিক উৎপাদনশীলতা ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাকেই সীমিত করে ফেলা হবে। মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের তথ্যপ্রযুক্তি খাতে যুক্ত করার প্রশ্নটি কোনো দয়া, কোটা বা প্রতীকী অন্তর্ভুক্তির বিষয় নয়। এটি সরাসরি মানবসম্পদ উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত একটি প্রশ্ন।

সমস্যার শিকড় ও সমাধানের পথ

মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ এখনো মূলধারার চাকরির বাজার ও আধুনিক দক্ষতাব্যবস্থার বাইরে রয়ে গেছে। এর পেছনে রয়েছে পাঠ্যক্রমের সীমাবদ্ধতা, ভাষাগত দুর্বলতা, প্রযুক্তির সীমিত প্রবেশাধিকার ও সমাজে বিদ্যমান কিছু নেতিবাচক ধারণা। এই বিচ্ছিন্নতা কোনো একক কারণে তৈরি হয়নি, আবার একক কোনো উদ্যোগে এর সমাধানও সম্ভব নয়।

উন্নত সমাজগুলোর অভিজ্ঞতা দেখলে স্পষ্ট হয়, ধর্মীয় জ্ঞান ও আধুনিক পেশাগত দক্ষতা পরস্পরের বিরোধী নয়। যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে দেখা যায়, বড় মসজিদের ইমামদের মধ্যে কেউ প্রকৌশলী, কেউ গবেষক, কেউ চিকিৎসাবিদ। সেখানে ধর্মীয় পরিচয় পেশাগত সক্ষমতার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায় না।

এই বাস্তবতা বিবেচনায় মাদ্রাসাশিক্ষার্থীদের আইটি খাতে যুক্ত করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভুল হবে জোরপূর্বক সংস্কার চাপিয়ে দেওয়া। বিশেষ করে কওমি মাদ্রাসার নিজস্ব ঐতিহ্য, লক্ষ্য ও দর্শন রয়েছে। সেগুলো উপেক্ষা করে নেওয়া কোনো উদ্যোগ দীর্ঘ মেয়াদে টেকসই হতে পারে না।

কার্যকর পথ হতে পারে একটি সমান্তরাল ও সম্পূর্ণ ঐচ্ছিক আইটি ধারার সুযোগ তৈরি করা। যেখানে আগ্রহী শিক্ষার্থীরা ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি ডিজিটাল সাক্ষরতা, কম্পিউটার ব্যবহার, ইন্টারনেট নিরাপত্তা, প্রাথমিক কোডিং ধারণা কিংবা প্রয়োগভিত্তিক তথ্যপ্রযুক্তি দক্ষতা অর্জনের সুযোগ পাবে। যে শিক্ষার্থী এই পথে আসতে চাইবে না, তাকে বাধ্য করার প্রশ্নও থাকা উচিত নয়।

সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রয়োজন

অতীত অভিজ্ঞতা আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। লক্ষ্যহীন, বাজার-বিচ্ছিন্ন ও সবার জন্য একই ধরনের প্রশিক্ষণ প্রকল্প শুধু বাজেট ব্যয় করে, বাস্তব কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারে না। এই ভুলের পুনরাবৃত্তি হলে মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রেও ফল ভিন্ন হবে না।

তথ্যপ্রযুক্তি প্রশিক্ষণ হতে হবে লক্ষ্যভিত্তিক ও বাজারের চাহিদা অনুযায়ী। কেউ কোডিংয়ে দক্ষতা গড়ে তুলবে, কেউ ডিজিটাল মার্কেটিংয়ে, কেউ আইটি সাপোর্ট বা কনটেন্টভিত্তিক কাজে। সবাইকে এক ছাঁচে ফেলার চেষ্টা করলে ব্যর্থতা প্রায় নিশ্চিত।

মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের আইটি খাতে যুক্ত করার আলোচনায় একটি বিষয় প্রায় নিয়মিত উঠে আসে। তা হলো ইংরেজি ভাষার দুর্বলতা। এই বাস্তবতা পুরোপুরি অস্বীকার করার সুযোগ নেই।

কার্যকর সমাধান হতে পারে ভাষা ও তথ্যপ্রযুক্তি দক্ষতাকে শিক্ষাজীবনের শুরু থেকেই একটি সমান্তরাল ধারায় গড়ে তোলা। দ্বিতীয় ও তৃতীয় ভাষা যদি ছোট বয়স থেকেই শেখানো হয়, তাহলে তা আর অতিরিক্ত চাপ হিসেবে দেখা দেয় না; বরং শিক্ষার স্বাভাবিক অংশ হয়ে ওঠে। এই পদ্ধতি শুধু ভাষা শেখার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থানের জন্য প্রয়োজনীয় সৃজনক্ষমতা ও সমস্যা সমাধানের দক্ষতা গঠনের ক্ষেত্রেও দীর্ঘমেয়াদি সুফল দেয়।

এখানে প্রযুক্তির ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বজুড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ভাষাভিত্তিক প্রযুক্তি দ্রুত অগ্রসর হচ্ছে। বাংলা ভাষাভিত্তিক বড় ভাষা মডেল তৈরির উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে ইংরেজি দক্ষতার সীমাবদ্ধতা অনেক ক্ষেত্রেই আর অপ্রতিরোধ্য বাধা হয়ে থাকবে না। এর অর্থ এই নয় যে ইংরেজির প্রয়োজন ফুরিয়ে যাবে।

বরং অর্থ হলো, ভাষাগত দুর্বলতা আর দক্ষতা অর্জনের পথে স্থায়ী দেয়াল হয়ে দাঁড়াবে না। সঠিক প্রযুক্তি ও প্রশিক্ষণ থাকলে মাতৃভাষাভিত্তিক শেখা ও বৈশ্বিক কাজের বাজারের মধ্যে একটি কার্যকর সেতু তৈরি করা সম্ভব।

বেসরকারি খাত ছাড়া এই উদ্যোগ টিকবে না। এখানে একটি বিষয় স্পষ্টভাবে স্বীকার করতে হবে যে সরকার একা এই কাজ সম্পন্ন করতে পারবে না। আইটি ও ডিজিটাল অর্থনীতি মূলত বেসরকারি খাতনির্ভর।

ডিজিটাল অর্থনীতি মানেই শুধু সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট নয়। আজকের বিশ্বে বিপিও, ডেটা লেবেলিং, কিউএ টেস্টিং, কনটেন্ট মডারেশন, ডিজিটাল মার্কেটিং ও আইটি সাপোর্টের মতো এন্ট্রি ও মিডলেভেল কাজগুলো দ্রুত কর্মসংস্থান তৈরি করছে। মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের জন্য এই ক্ষেত্রগুলো বিশেষভাবে সম্ভাবনাময়।

সফটওয়্যার কোম্পানি, বিপিও প্রতিষ্ঠান, ফ্রিল্যান্স প্ল্যাটফর্ম ও স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের চাকরিমুখী দক্ষতায় রূপান্তর সম্ভব নয়।

তবে দায়িত্ব শুধু সরকারের নয়, বেসরকারি খাতেরও। সরকারকে বাস্তবসম্মত নীতি, করছাড়, প্রশিক্ষণভিত্তিক প্রণোদনা ও নীতিগত নিশ্চয়তা দিতে হবে। একই সঙ্গে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকেও একটি মৌলিক মানসিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যেতে হবে। শিক্ষাগত পটভূমির বদলে কাজের মান ও ফলাফলের ভিত্তিতে মূল্যায়নের সংস্কৃতি গড়ে তোলা জরুরি।

বিশ্ববাজারে ক্লায়েন্টরা সাধারণত জানে না কে কোন ধারার শিক্ষা পেয়েছে। তারা দেখে কাজ সময়মতো হচ্ছে কি না, মান বজায় রাখা হচ্ছে কি না এবং ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানটি বিশ্বাসযোগ্য কি না। এই বাস্তবতা দেশীয় নিয়োগ সংস্কৃতিতেও প্রতিফলিত হওয়া প্রয়োজন।

গ্রামীণ ও দরিদ্র শিক্ষার্থীদের বাস্তব প্রতিবন্ধকতা উপেক্ষা করাও সম্ভব নয়। নীতিগত আলোচনা যতই উন্নত হোক, মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা বিবেচনায় না নিলে সব উদ্যোগ ব্যর্থ হয়। মাদ্রাসাশিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ গ্রামীণ ও নিম্ন আয়ের পরিবার থেকে আসে। তাদের জন্য ল্যাপটপ, স্মার্ট ডিভাইস, ইন্টারনেট সংযোগ এবং প্রশিক্ষণ ফি সবই বাস্তব ও কঠিন বাধা।

অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন মানে শুধু প্রশিক্ষণ দেওয়া নয়; প্রয়োজনীয় অবকাঠামোতে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করাও এর অবিচ্ছেদ্য অংশ। বিনা মূল্যে বা সাশ্রয়ী ইন্টারনেট, স্কলারশিপ, গ্রান্ট ও কম খরচে ডিভাইস ব্যবহারের সুযোগ তাই কোনো দয়ার বিষয় নয়, বরং অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তির মৌলিক শর্ত।

আরও পড়ুন

তবে এখানে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কে কোন সুবিধা পাবে, কী মানদণ্ডে পাবে ও ফলাফল কী হবে, এসব প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর না থাকলে ভালো উদ্যোগও বিতর্কিত হয়ে উঠতে পারে।

ডিজিটাল অর্থনীতি মানেই শুধু সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট নয়। আজকের বিশ্বে বিপিও, ডেটা লেবেলিং, কিউএ টেস্টিং, কনটেন্ট মডারেশন, ডিজিটাল মার্কেটিং ও আইটি সাপোর্টের মতো এন্ট্রি ও মিডলেভেল কাজগুলো দ্রুত কর্মসংস্থান তৈরি করছে। মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের জন্য এই ক্ষেত্রগুলো বিশেষভাবে সম্ভাবনাময়।

কারণ, এসব কাজে শৃঙ্খলা, নির্ভরযোগ্যতা, মৌলিক ডিজিটাল দক্ষতা ও কাজের নৈতিকতা গুরুত্বপূর্ণ, যা অনেক মাদ্রাসার শিক্ষার্থীর মধ্যেই বিদ্যমান। সঠিক প্রশিক্ষণ ও সুযোগ পেলে তারা এই ভ্যালু চেইনে দ্রুত জায়গা করে নিতে পারে।

আন্তর্জাতিক বাজারে গ্রহণযোগ্যতা তৈরিতে সার্টিফিকেশনের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ।

বিশ্বজুড়ে আন্তর্জাতিক মানের আইটি ও ডিজিটাল স্কিল সার্টিফিকেশন ইতিমধ্যে উন্মুক্ত রয়েছে। নতুন করে কিছু উদ্ভাবনের চেয়ে এগুলোকে কার্যকরভাবে ব্যবহার করাই বেশি বাস্তবসম্মত। লক্ষ্য হওয়া উচিত, মাদ্রাসাশিক্ষার্থীরা যেন চাইলে ও সক্ষম হলে এসব সার্টিফিকেশন অর্জনের সুযোগ পায় এবং নিজের দক্ষতা প্রমাণ করতে পারে। এতে আন্তর্জাতিক ক্লায়েন্টের কাছে বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়বে এবং কাজের সুযোগও প্রসারিত হবে।

সবশেষে একটি মৌলিক সত্য স্মরণ করা জরুরি। লক্ষ্য ছাড়া পরিকল্পনা অর্থহীন। আইসিটি খাতে জিডিপিতে নির্দিষ্ট অবদান বা নির্দিষ্টসংখ্যক কর্মসংস্থানের লক্ষ্য তখনই অর্থবহ হবে, যখন এর সঙ্গে স্পষ্ট সময়সীমা, রোডম্যাপ ও নিয়মিত অগ্রগতি মূল্যায়ন যুক্ত থাকবে।

মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের আইটি খাতে যুক্ত করা কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর জন্য বিশেষ সুবিধা নয়। এটি বাংলাদেশের মানবসম্পদ উন্নয়ন, সামাজিক অন্তর্ভুক্তি ও অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের একটি কাঠামোগত প্রশ্ন। সহানুভূতি দিয়ে নয়, সক্ষমতা দিয়ে এই জনগোষ্ঠীকে এগিয়ে নিতে হবে। সুযোগ আছে, চ্যালেঞ্জও আছে। এখন প্রয়োজন বাস্তবসম্মত নীতি, সামাজিক মানসিকতার পরিবর্তন ও কঠোর জবাবদিহি। এই পথেই টেকসই সমাধান সম্ভব।

  • এ কে এম ওয়াহিদুজ্জামান বিএনপির তথ্য ও প্রযুক্তিবিষয়ক সম্পাদক

    *মতামত লেখকের নিজস্ব