শিশুদের আরেকটু ঘুমাতে দিন

স্কুলে ক্লাসরুমেই ঘুমিয়ে পড়েছে শিশুছবি: এআই/প্রথম আলো

শরীয়তপুরের একটি শহরতলিতে সকালে হাঁটতে হাঁটতে কয়েকটি প্রাথমিক স্কুল চোখে পড়ল। গেট খুলবে আরেকটু বেলা হলে। তখন দেখা যাবে গেটের সামনে দাঁড়িয়ে আছে শিশুর দল। এমন দৃশ্য ঢাকার শেরেবাংলা নগর এলাকাতেও প্রতিদিন দেখি। চোখে ঘুম আর হাতে চিপসের প্যাকেট নিয়ে ক্ষুধার্ত শিশুদের গেটের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। প্রত্যেক শিশুর চোখে থাকে অসমাপ্ত ঘুমের ছবি।

বাংলাদেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে প্রাক্-প্রাথমিক চালু হয়েছে। চার বছর বয়স হলেই তারা স্কুলে আসতে পারে। প্রাক্-প্রাথমিকের ৪+ বছর বয়সী শিশুদের দৈনিক ক্লাসের সময় দুই ঘণ্টা। শিশুদের সকাল নয়টার মধ্যে স্কুলে আসতে হয়। সকাল সাড়ে নয়টা থেকে বেলা সাড়ে এগারোটা পর্যন্ত ক্লাস চলে। সমাবেশ ও ব্যায়াম, গল্প বলা, বর্ণ ও সংখ্যা চেনা, আঁকাআঁকি ও খেলাধুলা—এসবই তাদের শিখনচর্চার অংশ।

যারা ৫+ বয়সী, তাদের সময়সূচি ও শিখনচর্চাও প্রায় একই। ছুটি হয় বেলা সাড়ে এগারোটায়। প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির জন্যও একই সময়সূচি। দুপুর বারোটা থেকে শুরু হয় তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণির ক্লাস; চলে বেলা দুটো পর্যন্ত। প্রাক্-প্রাথমিকের মতো এদের অসমাপ্ত ঘুম নিয়ে স্কুলে আসতে হয় না। মোটামুটি ঘুম শেষ করে, কোচিং সেরে তারা স্কুলে আসতে পারে।

আরও পড়ুন

শিশুসহ সবারই পর্যাপ্ত ও নিরবচ্ছিন্ন ঘুম গুরুত্বপূর্ণ। মিজ রেবেকা স্পেন্সার ম্যাসাচুসেটস বিশ্ববিদ্যালয়ে শিশুদের ঘুমের ঘাটতি হলে কী বিপত্তি ঘটতে পারে এবং সেই ঘাটতি অন্য কোনো উপায়ে পূরণ করা যায় কি না, সেসব নিয়ে বিস্তর গবেষণা করেছেন। তাঁর গবেষণায় দেখা গেছে, রাতে পর্যাপ্ত ঘুম না হলে প্রি-স্কুল শিশুদের দিনের ঘুমের (ন্যাপ) ব্যবস্থা করা গেলে তা স্মৃতি সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

অনেক দেশেই শিশুদের স্কুলে ঘুমিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা চালু হয়েছে। আমরা হয়তো এখনই তা চালু করতে পারব না। তবে বিষয়টি নিয়ে ভাবা যেতেই পারে।

এশিয়ার এগিয়ে থাকা দেশগুলোর মধ্যে চীন, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া এখন শিশুদের ঘুমের গুরুত্ব বুঝতে পেরে নড়েচড়ে বসেছে। জাপানে মূলত নার্সারি, চাইল্ড কেয়ার ও প্রি-স্কুলে ১ থেকে ৪–৫ বছর বয়সী শিশুদের সাধারণত দুপুরে ১–২ ঘণ্টা পর্যন্ত ঘুমাতে দেওয়া হয়। চীনে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়েও টিফিনের বিরতিতে ন্যাপের ব্যবস্থা আছে; বিশেষ করে প্রাথমিক পর্যায়ে অঞ্চলভেদে প্রায় ৩০–৯০ মিনিট ন্যাপের ব্যবস্থা করা হয়। দক্ষিণ কোরিয়ায় ডে-কেয়ার, কিন্ডারগার্টেন ও ছোট শিশুদের জন্য এক থেকে দেড় ঘণ্টা ঘুমের ব্যবস্থা আছে।

রেবেকা স্পেন্সার তাঁর গবেষণায় প্রমাণ করেছেন, যেসব শিশু রাতের ঘুমের ঘাটতি মেটাতে দুপুরে বা দিনের নির্ধারিত সময়ে ঘুমিয়েছে, তারা শেখানো বিষয় পরে ভালোভাবে মনে রাখতে পেরেছে। তাঁর এই গবেষণা আরও ইঙ্গিত দেয় যে ন্যাপ আবেগ নিয়ন্ত্রণেও সহায়তা করে।

অবশ্য এটাও ঠিক, কোনো শিশু রাতে পর্যাপ্ত ঘুমালে তার বয়স অনুযায়ী দিনে অতিরিক্ত ঘুমের প্রয়োজন না–ও হতে পারে। অন্যদিকে নবজাতক, ইনফ্যান্ট ও টডলারদের ক্ষেত্রে দিনের বেলায়, বিশেষ করে সকালে বা দুপুরে, নিয়মিত ঘুম (ন্যাপ) স্বাভাবিক এবং উপকারী।

গবেষকেরা জানাচ্ছেন, শিশুদের জন্য সকালের ঘুম; অর্থাৎ ভোরের পরের ঘুম বা পর্যাপ্ত সকালের বিশ্রাম অনেক ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষ করে ছোট শিশুদের জন্য। কমপক্ষে ৮৬৪টি বৈজ্ঞানিক গবেষণা পর্যালোচনা করে গবেষকেরা শিশুদের ভালো ঘুমের যেসব উপকারের কথা বর্ণনা করেছেন, সেগুলো হলো—

 এক. মস্তিষ্কের বিকাশে সাহায্য করে—ঘুমের সময় শিশুর মস্তিষ্ক নতুন তথ্য প্রক্রিয়াজাত করে এবং শেখার ক্ষমতা উন্নত হয়।

দুই. শারীরিক বৃদ্ধি ত্বরান্বিত করে—গভীর ঘুমের সময় গ্রোথ হরমোন বেশি নিঃসৃত হয়, যা শিশুর স্বাভাবিক বৃদ্ধি এবং হাড় ও মাংসপেশির বিকাশে সহায়তা করে।

তিন. রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ায়—পর্যাপ্ত ঘুম শরীরের প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে শক্তিশালী করে।

চার. মেজাজ ও আচরণ ভালো রাখে—যথেষ্ট ঘুম না হলে শিশু খিটখিটে, অমনোযোগী বা অতিরিক্ত চঞ্চল হয়ে যেতে পারে।

পাঁচ. স্মৃতিশক্তি ও মনোযোগ বাড়ায়—ভালো ঘুম শেখা বিষয় মনে রাখতে এবং মনোযোগ ধরে রাখতে সাহায্য করে।

আরও পড়ুন

বয়সভেদে সাধারণত যতটা ঘুম প্রয়োজন

৪-১২ মাস: ১২-১৬ ঘণ্টা (দিনের ঘুমসহ)

১-২ বছর: ১১-১৪ ঘণ্টা

৩-৫ বছর: ১০-১৩ ঘণ্টা

৬-১২ বছর: ৯-১২ ঘণ্টা

১৩-১৮ বছর: ৮-১০ ঘণ্টা

তাই বলা যায়, শিশুদের জন্য সকালের ঘুম উপকারী হতে পারে। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো বয়স অনুযায়ী ২৪ ঘণ্টায় মোট পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করা।

শিশুদের ঘুম, বিশেষ করে দিনের ঘুম (ন্যাপ) এবং সকালের বা দিনের ঘুমের উপকারিতা নিয়ে মানসম্পন্ন প্রচুর গবেষণা হয়েছে এবং হচ্ছে। তবে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি—গবেষণাগুলো সাধারণত ‘সকালের ঘুম’কে আলাদাভাবে বিবেচনা করে না; বরং ২৪ ঘণ্টায় মোট ঘুম (রাতের ঘুম ও দিনের ঘুম) এবং বয়সভিত্তিক ন্যাপ নিয়েই বেশি আলোচনা করা হয়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২০১৯ সালে প্রকাশিত গাইডলাইনে বলেছে, ৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে ঘুম, শারীরিক কার্যকলাপ ও স্ক্রিন-টাইম—এই তিন বিষয়কে একসঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। পর্যাপ্ত ঘুম শিশুর সুস্থ বৃদ্ধি, মস্তিষ্কের বিকাশ এবং স্বাস্থ্যকর অভ্যাস গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

দেশে কী করা যায়?  

দেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর চলমান দুই শিফটে ‘আগে ছোট শিশু, পরে বড় শিশু’—এই বর্তমান চর্চা বদলে আগে বড় শিশু (৮ থেকে ১০ বছর), পরে ছোট শিশু (৪ থেকে ৭ বছর) করা হলে ছোটরা সকালে আরেকটু ঘুমানোর সুযোগ পাবে।

 এতে স্কুলের সিনিয়র শিক্ষকদের একটু অসুবিধা হবে। তাঁরা সাতসকালের কোচিং-বাণিজ্যের সুবিধা হারাবেন। কিন্তু শিশুদের স্বার্থে এটা করা যেতেই পারে।

 অনেক দেশেই শিশুদের স্কুলে ঘুমিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা চালু হয়েছে। আমরা হয়তো এখনই তা চালু করতে পারব না। তবে বিষয়টি নিয়ে ভাবা যেতেই পারে।

  • গওহার নঈম ওয়ারা লেখক ও গবেষক

    ই–মেইল: [email protected]

    মতামত লেখকের নিজস্ব