স্পিকার না থাকলে সংসদ সদস্যদের শপথ কী করে হবে

জাতীয় সংসদ ভবনফাইল ছবি: প্রথম আলো

বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ পড়ানোর উপযুক্ত ব্যক্তি হলেন স্পিকার অথবা ডেপুটি স্পিকার। তাঁদের অনুপস্থিতি বা অসমর্থতার কারণে সেটি সম্ভব না হওয়ায় বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে বিভিন্ন ধরনের মতামত শোনা যাচ্ছে।

এসবের মধ্যে যে মতামতটি প্রাধান্য পাচ্ছে, সেটি হলো রাষ্ট্রপতি কর্তৃক মনোনীত কোনো ব্যক্তিকে দিয়ে শপথ পড়ানো; অথবা তিন দিন অপেক্ষা করে সংবিধান অনুযায়ী প্রধান নির্বাচন কমিশনার কর্তৃক শপথ পড়ানো। কিন্তু ওপরে বর্ণিত দুটি পদ্ধতির মধ্যে প্রথম পদ্ধতিটি অবলম্বন করলে নানা ধরনের আইনগত বিতর্কের জন্ম দিতে পারে।

বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি কখন প্রতিনিধি নিয়োগ করতে পারেন। রাষ্ট্রপতি কেবল সেসব শপথের ক্ষেত্রে প্রতিনিধি নিয়োগ করতে পারেন, যেখানে তিনি নিজেই শপথ পাঠ করানোর জন্য নির্ধারিত কর্তৃপক্ষ। যেমন স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের শপথ। তাঁদের শপথ পাঠ করান রাষ্ট্রপতি। ফলে রাষ্ট্রপতি চাইলে সংবিধানের ১৪৮ অনুচ্ছেদের ২ দফা অনুযায়ী কোনো প্রতিনিধি, যেমন প্রধান বিচারপতি নিয়োগ করতে পারেন। একইভাবে প্রধান বিচারপতির শপথ রাষ্ট্রপতি পাঠ করান, তাই এখানেও প্রতিনিধি নিয়োগের সুযোগ রয়েছে।

কিন্তু সংসদ সদস্যদের শপথের ক্ষেত্রে সংবিধান নির্ধারিত ব্যক্তি হলেন স্পিকার। ফলে প্রতিনিধি নিয়োগসংক্রান্ত কোনো নথি বা নির্দেশ কার্যকর করতে হলে সেখানে স্পিকারের স্বাক্ষর থাকা আবশ্যক। স্পিকার না থাকলে বা অসমর্থ হলে কী হবে? বর্তমান পরিস্থিতিতে যেখানে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার উভয়েই অনুপস্থিত বা অসমর্থ, সেখানে সংবিধান দুটি পথ নির্দেশ করেছে।

প্রথম বিকল্প, ১৪৮ অনুচ্ছেদের ২-এর ‘ক’ উপদফা অনুযায়ী, স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকার অসমর্থ হওয়ার তিন দিন পর প্রধান নির্বাচন কমিশনার শপথ পাঠ করাবেন। এখানে রাষ্ট্রপতির কোনো প্রতিনিধি নিয়োগের সুযোগ রাখা হয়নি।

সংবিধানে সংসদ সদস্যদের শপথের জন্য রাষ্ট্রপতির প্রতিনিধি নিয়োগের কোনো সুযোগ রাখা হয়নি। এটি একান্তভাবেই স্পিকারের এখতিয়ার। স্পিকার অসমর্থ হলে সেই ক্ষমতা সরাসরি প্রধান নির্বাচন কমিশনারের কাছে স্থানান্তরিত হয়।

দ্বিতীয় বিকল্প, ৭৪ অনুচ্ছেদের ৩ উপদফা অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি স্পিকারের কার্যাবলি পালনের জন্য একজনকে নিযুক্ত করতে পারেন। কিন্তু এই বিধান সংসদ চালু থাকা অবস্থায় কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি এবং সেখানে সংসদ সদস্য হওয়ার শর্ত সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে। আরও পরিষ্কারভাবে বললে, ৭৪ অনুচ্ছেদের ৩ উপদফা মূলত সংসদ কার্যকর থাকা অবস্থায় স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকারের অনুপস্থিতিতে সংসদের অধিবেশন পরিচালনার পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করে। সেখানে সংসদের কোনো সদস্য শব্দগুচ্ছটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

নির্বাচনের পর শপথ গ্রহণের আগপর্যন্ত কোনো বিজয়ী ব্যক্তি আইনগতভাবে সংসদ সদস্য হিসেবে পূর্ণতা পান না। তিনি কেবল গেজেটভুক্ত নির্বাচিত ব্যক্তি। ফলে শপথ না নেওয়া কাউকে দিয়ে অন্য সদস্যদের শপথ পাঠ করানো একটি গুরুতর আইনগত জটিলতার জন্ম দিতে পারে। এখন প্রশ্ন হলো, বর্তমান সংকটের আইনগত নিরসন কীভাবে সম্ভব?

আরও পড়ুন

যদি তিন দিন অপেক্ষা না করে দ্রুত শপথ করাতে হয়, তবে বর্তমান সরকার বা রাষ্ট্রপতি কর্তৃক কোনো প্রতিনিধি নিয়োগ করা হলে তা সংবিধানের ১৪৮ অনুচ্ছেদের ২ দফা বা ২-এর ‘ক’ উপদফার সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক হতে পারে। কারণ, সংবিধান একটি নির্দিষ্ট সময় অতিক্রান্ত হওয়ার পর সরাসরি প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে এই দায়িত্ব প্রদান করেছে।

সংবিধানে সংসদ সদস্যদের শপথের জন্য রাষ্ট্রপতির প্রতিনিধি নিয়োগের কোনো সুযোগ রাখা হয়নি। এটি একান্তভাবেই স্পিকারের এখতিয়ার। স্পিকার অসমর্থ হলে সেই ক্ষমতা সরাসরি প্রধান নির্বাচন কমিশনারের কাছে স্থানান্তরিত হয়।

সংবিধানের আক্ষরিক ব্যাখ্যার নীতির ওপর গুরুত্ব আরোপ আইনি নিশ্চয়তার জন্য অপরিহার্য। এই মতামতের সঙ্গে একমত হওয়ার পেছনে কয়েকটি শক্তিশালী আইনগত যুক্তি রয়েছে।

প্রথমত, সংবিধানের সুনির্দিষ্ট বিধান। আইনশাস্ত্রের একটি প্রতিষ্ঠিত নীতি হলো, সাধারণ বিধান বিশেষ বিধানকে খর্ব করতে পারে না। যেহেতু সংবিধানের ১৪৮ অনুচ্ছেদের ২-এর ‘ক’ উপদফায় নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথসংক্রান্ত সংকটের একটি সুনির্দিষ্ট সমাধান দেওয়া আছে, তাই সেখানে রাষ্ট্রপতির সাধারণ ক্ষমতা বা প্রয়োজনীয়তার নীতি প্রয়োগের সুযোগ অত্যন্ত সীমিত।

দ্বিতীয়ত, সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা। ১৪৮ অনুচ্ছেদের ২-এর ‘ক’ উপদফায় বাধ্যতামূলক ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে। অর্থাৎ স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকার অসমর্থ হওয়ার তিন দিন অতিক্রান্ত হলে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের ওপর এই দায়িত্ব পালন করা বাধ্যতামূলক হয়ে পড়ে। এই সময়সীমা পূর্ণ হওয়ার আগেই অন্য কাউকে দিয়ে শপথ পাঠ করানো হলে তা প্রক্রিয়াগত ত্রুটি হিসেবে ভবিষ্যতে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।

তৃতীয়ত, সংবিধান লঙ্ঘনের ঝুঁকি। যখন সংবিধান একটি সরাসরি পথ নির্ধারণ করে দিয়েছে, তখন বিকল্প কোনো শর্টকাট বা প্রতিনিধি নিয়োগের পথ বেছে নেওয়া সংবিধানের চেতনার পরিপন্থী হতে পারে। এটি শুধু বর্তমান সময়ের জন্য নয়, ভবিষ্যতের জন্যও একটি ভুল দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে।

চতুর্থত, আইনি নিরাপত্তা। তিন দিন অপেক্ষা করা আপাতদৃষ্টিতে বিলম্ব মনে হলেও আইনগত দৃষ্টিকোণ থেকে এটিই সবচেয়ে নিরাপদ পথ। কারণ, প্রধান নির্বাচন কমিশনারের মাধ্যমে সম্পন্ন শপথের বৈধতা নিয়ে ভবিষ্যতে প্রশ্ন তোলার কোনো সুযোগ থাকবে না, যেহেতু সংবিধান নিজেই তাঁকে এই ক্ষমতা প্রদান করেছে।

সবশেষে বলা যায়, তিন দিন অপেক্ষা করে সংবিধানের ১৪৮ অনুচ্ছেদের ২-এর ‘ক’ উপদফা অনুসরণ করাই হবে সবচেয়ে সঠিক ও নিরাপদ সাংবিধানিক পদ্ধতি। বিকল্প কোনো পথ বা রাষ্ট্রপতির প্রতিনিধি নিয়োগের চেষ্টা প্রকৃতপক্ষে সংবিধানের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনার ব্যত্যয় ঘটাতে পারে।

  • হুমায়ুন কবির সাবেক সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ; সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী

*মতামত লেখকের নিজস্ব