গ্রিনল্যান্ডে চীন আসলে যা করছে

চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংফাইল ছবি: রয়টার্স

এ বছর জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হঠাৎ করেই ডেনমার্কের কাছে এক অদ্ভুত ও উদ্বেগজনক দাবি তুলতে শুরু করেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, গ্রিনল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ যুক্তরাষ্ট্রের হাতে তুলে দিতে হবে। শুধু দাবি নয়, এর সঙ্গে যুক্ত ছিল স্পষ্ট হুমকি। প্রয়োজনে সামরিক শক্তিও ব্যবহার করা হতে পারে বলে তিনি ইঙ্গিত দেন। সাংবাদিকদের তিনি বলেন, আমাদের গ্রিনল্যান্ড দরকার। তারা চাক বা না চাক, আমরা গ্রিনল্যান্ড নিয়ে কিছু একটা করব।

ট্রাম্পের যুক্তি ছিল একটাই। চীন। তাঁর ভাষায়, যুক্তরাষ্ট্র যদি গ্রিনল্যান্ডের দখল না নেয়, তাহলে রাশিয়া বা চীন তা দখল করে নেবে। যুক্তরাষ্ট্র কোনোভাবেই রাশিয়া বা চীনকে প্রতিবেশী হিসেবে মেনে নেবে না। পরে নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে তিনি লেখেন, জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিনল্যান্ড প্রয়োজন। তাঁর প্রস্তাবিত গোল্ডেন ডোম ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থার জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ন্যাটোর উচিত এই উদ্যোগে নেতৃত্ব দেওয়া। তাঁর মতে, গ্রিনল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্রের হাতে না গেলে তা গ্রহণযোগ্য নয়।

আরও এক ধাপ এগিয়ে ট্রাম্প দাবি করেন, গ্রিনল্যান্ডের আশপাশে রুশ ও চীনা যুদ্ধজাহাজ অবস্থান করছে। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র কিছু না করলে রাশিয়া বা চীন গ্রিনল্যান্ড দখল করে নেবে। কিন্তু এখানেই ট্রাম্পের বক্তব্যের সবচেয়ে বড় সমস্যা। বাস্তবে চীনের পক্ষ থেকে গ্রিনল্যান্ডে কোনো সামরিক হুমকিই নেই। বিষয়টি মূলত কল্পনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ।

নরওয়ের আর্কটিক বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক এবং চীনের আর্কটিক কৌশল বিষয়ে বিশেষজ্ঞ মার্ক ল্যান্টিন স্পষ্ট করে বলেন, গ্রিনল্যান্ডের উপকূলে কোনো চীনা বা রুশ যুদ্ধজাহাজ নেই। সেখানে চীনের কোনো উল্লেখযোগ্য সামরিক উপস্থিতিও নেই। খনিশিল্পে চীনের অবস্থান প্রায় শূন্য। চীনের উপস্থিতি বলতে মূলত গ্রিনল্যান্ডের সামুদ্রিক খাবার কেনা এবং সীমিত পর্যটন কার্যক্রমকেই বোঝায়।

বাস্তবে গ্রিনল্যান্ডে বড় ধরনের কোনো চীনা বিনিয়োগ নেই। অবকাঠামো কিংবা খনিশিল্পে চীনা কোম্পানিগুলোর কার্যকর অংশগ্রহণ দেখা যায়নি। বিরল খনিজ নিয়ে আলোচিত কুয়ানারসুইট প্রকল্পে একটি চীনা প্রতিষ্ঠানের মাত্র ৬ দশমিক ৫ শতাংশ অংশীদারত্ব ছিল। সেটিও ২০২১ সালে গ্রিনল্যান্ড সরকার ইউরেনিয়াম খনন নিষিদ্ধ করার পর বন্ধ হয়ে যায়।

আরও পড়ুন

একসময় অবশ্য গ্রিনল্যান্ড নিজেই চীনা বিনিয়োগ আকর্ষণের চেষ্টা করেছিল। ২০০৯ সালে স্বায়ত্তশাসন আইনের মাধ্যমে প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ পাওয়ার পর গ্রিনল্যান্ডের নেতৃত্ব চীনকে সম্ভাব্য বিনিয়োগকারী হিসেবে দেখেছিল। স্বাধীনতার পথে অর্থনৈতিক স্বাবলম্বন অর্জনের আশায় তাঁরা নিয়মিত চীনের খনি সম্মেলনে অংশ নিতেন। কিন্তু সেটি ছিল ২০১০–এর দশকের শুরুতে। সময়ের সঙ্গে চীন বদলেছে, আর বদলেছে গ্রিনল্যান্ডের দৃষ্টিভঙ্গিও।

গত কয়েক বছরে চীনের অর্থনৈতিক চাপ ও কূটনৈতিক আচরণ বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে। গ্রিনল্যান্ডও বুঝতে পেরেছে, চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক সম্পর্ক রাজনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। ফলে এখন তারা অনেক বেশি সতর্ক।

চীন অবশ্য আর্কটিক অঞ্চলে আগ্রহ হারায়নি। তারা নিজেদের নিকট আর্কটিক রাষ্ট্র বলে পরিচয় দেয় এবং ২০১৮ সালে পোলার সিল্ক রোডের ঘোষণা দেয়। বরফ গলে যাওয়ার ফলে নতুন নৌপথ ও প্রাকৃতিক সম্পদের সম্ভাবনা তাদের আকৃষ্ট করে। কিন্তু বাস্তবে এই কৌশলের বড় অংশই বাস্তবায়িত হয়নি।

ডেনমার্কও এই বিষয়টি গভীরভাবে নজরে রেখেছে। ২০১৮ সালে ডেনমার্ক গ্রিনল্যান্ডে বিমানবন্দর নির্মাণের একটি চীনা রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাব বাতিল করে দেয়। এর আগেই একটি পরিত্যক্ত নৌঘাঁটি চীনা মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রি বন্ধ করা হয়। এসব সিদ্ধান্ত প্রমাণ করে, ডেনমার্ক যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা উদ্বেগ পুরোপুরি উপেক্ষা করেনি।

গ্রিনল্যান্ডের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও বড় পরিবর্তন এসেছে। ২০২১ সালে ক্ষমতায় আসা নতুন সরকার পরিবেশ সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দেয়। খনিশিল্পে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। তেল ও গ্যাস অনুসন্ধান বন্ধ করা হয়। ইউরেনিয়াম খনন আবার নিষিদ্ধ করা হয়। এর ফলে চীনের সবচেয়ে আলোচিত খনি প্রকল্প কার্যত বাতিল হয়ে যায়।

সব মিলিয়ে চীনের জন্য গ্রিনল্যান্ডে কাজ করার সুযোগ ক্রমেই সংকুচিত হয়েছে। শুধু রাজনৈতিক কারণে নয়, অর্থনৈতিক বাস্তবতাও চীনের আগ্রহ কমিয়েছে। বরফাচ্ছন্ন পরিবেশ, অবকাঠামোর অভাব এবং বছরের অর্ধেক সময় জাহাজ চলাচলের সীমাবদ্ধতা গ্রিনল্যান্ডে খনিশিল্পকে লাভজনক করে তোলে না। ফলে অনেক চীনা কোম্পানি লাইসেন্স নিয়েও প্রকৃত বিনিয়োগ করেনি এবং পরে সেই লাইসেন্স বাতিল হয়ে গেছে।

আরও পড়ুন

চীন অবশ্য আর্কটিক অঞ্চলে আগ্রহ হারায়নি। তারা নিজেদের নিকট আর্কটিক রাষ্ট্র বলে পরিচয় দেয় এবং ২০১৮ সালে পোলার সিল্ক রোডের ঘোষণা দেয়। বরফ গলে যাওয়ার ফলে নতুন নৌপথ ও প্রাকৃতিক সম্পদের সম্ভাবনা তাদের আকৃষ্ট করে। কিন্তু বাস্তবে এই কৌশলের বড় অংশই বাস্তবায়িত হয়নি। বর্তমানে আর্কটিকে চীনের প্রধান অংশীদার কেবল রাশিয়া এবং সেখানেও তাদের ভূমিকা সীমিত।

এই প্রেক্ষাপটে ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড নিয়ে হুমকি উল্টো বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে। ১৯৫১ সাল থেকেই ন্যাটোর আওতায় যুক্তরাষ্ট্র, ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের নিরাপত্তাকাঠামো কার্যকর রয়েছে। গ্রিনল্যান্ডে কোনো আগ্রাসন মানেই ন্যাটোর পঞ্চম অনুচ্ছেদ কার্যকর হওয়ার ঝুঁকি। এ কারণেই রাশিয়া বা চীন কখনোই সেখানে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার কথা ভাবেনি।

কিন্তু ট্রাম্প যখন ন্যাটো মিত্রদের বিরুদ্ধেই সামরিক শক্তির ইঙ্গিত দেন, তখন জোটের ভেতর ফাটল তৈরি হয়। এই বিভক্তি যদি গভীর হয়, তাহলে সেটিই চীন বা রাশিয়ার জন্য সুযোগ তৈরি করতে পারে। অর্থাৎ যে পরিস্থিতি ট্রাম্প এড়াতে চান, তাঁর আচরণই সেটির সম্ভাবনা তৈরি করছে।

২০২৬ সালের জানুয়ারিতে ন্যাটো মহাসচিবের সঙ্গে আলোচনার পর ট্রাম্প একটি কথিত সমঝোতার কথা জানান। সেখানে ন্যাটোর উপস্থিতি বাড়ানো, গ্রিনল্যান্ডে গোল্ডেন ডোম ব্যবস্থার ব্যবহার, খনিজ সম্পদে যুক্তরাষ্ট্রের অগ্রাধিকার এবং ন্যাটোর বাইরে থাকা দেশগুলোর প্রবেশ ঠেকানোর বিষয় থাকার কথা বলা হয়। তবে ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ড স্পষ্ট করে জানায়, এটি কোনো চূড়ান্ত চুক্তি নয়। এটি কেবল আলোচনার সূচনা।

গ্রিনল্যান্ডের সার্বভৌমত্ব তাদের কাছে অচল সীমারেখা। ট্রাম্পের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের দাবি সেখানে গ্রহণযোগ্য নয়। ফলে এই উত্তেজনা ভবিষ্যতে আবারও ফিরে আসতে পারে।

আর্কটিক অঞ্চল নিয়ে ট্রাম্পের দৃষ্টিভঙ্গি যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহ্যগত মিত্রদের দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। অন্য দেশগুলোর কাছে জলবায়ু পরিবর্তন একটি গুরুতর সংকট হলেও ট্রাম্প বিষয়টিকে অস্বীকার করেছেন। এর ফলে আর্কটিক কাউন্সিল কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সেই শূন্যতায় চীন বিকল্প কাঠামো দাঁড় করানোর সুযোগ পেতে পারে এবং নিজেকে বিজ্ঞান ও জলবায়ু সচেতন শক্তি হিসেবে তুলে ধরতে পারে।

সবশেষে বলা যায়, গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ট্রাম্পের আগ্রাসী অবস্থান কোনো বাস্তব চীনা হুমকির প্রতিক্রিয়া নয়। বরং এটি এমন এক অস্থিরতা তৈরি করতে পারে, যা ভবিষ্যতে সত্যিকারের চীনা উপস্থিতির পথ খুলে দেবে। যে আশঙ্কা তিনি দেখাচ্ছেন, তাঁর নীতিই হয়তো শেষ পর্যন্ত সেটিকে বাস্তবে রূপ দেবে।

*দ্য ডিপ্লোম্যাটের ভিডিও বিশ্লেষণ থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত