আদ্-দ্বীনে ছয় নবজাতকের মৃত্যু এবং রাষ্ট্রের দায়

মৃত নাতনিকে কোলে নিয়ে আদ্-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ছাড়ছেন দাদিছবি: প্রথম আলো

গত ২৭ মে রাজধানীর মগবাজারে আদ্‌দ্বীন হাসপাতালে একই দিনে ছয় নবজাতকের মৃত্যু হয়েছে। রাজধানীর প্রাণকেন্দ্রে একটি তথাকথিত আধুনিক হাসপাতালে যখন একই দিনে ছয়টি শিশুর প্রাণ ঝরে যায়, তখন সেটাকে ‘অঘটন’ বলে পার পাওয়ার সুযোগ নেই। এই মৃত্যু শুধু একটি হাসপাতালের ব্যর্থতার গল্প নয়। বস্তুত এ ঘটনাকে একটি কাঠামোগত হত্যাকাণ্ড বললে একটুও বাড়িয়ে বলা হয় না। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এটি বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার প্রকৃত চেহারা উন্মোচন করেছে।

এ ঘটনায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তদন্ত প্রতিবেদন ৩ জুন সরকারের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে। তদন্ত কমিটির প্রাথমিক অনুসন্ধানে উঠে এসেছে পোস্ট-অপারেটিভ ওয়ার্ডের ভেন্টিলেশন ও শীতাতপনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার গুরুতর ত্রুটি। কক্ষের পরিবেশ ছিল নবজাতকদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। প্রশ্ন হলো, এই ত্রুটি কি এক দিনে তৈরি হয়েছিল? অবশ্যই না।

এই সমস্যাগুলো দিনের পর দিন ছিল। কোনো না কোনো পর্যায়ে সেগুলো দৃশ্যমানও ছিল। কিন্তু কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। সে কারণেই এই মৃত্যুগুলোকে নিছক দুর্ঘটনা বলে পাশ কাটিয়ে যাওয়া কঠিন। যখন ঝুঁকি দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যমান থাকে, যখন তদারকির দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলো তা শনাক্ত বা প্রতিকার করতে ব্যর্থ হয়, তখন মৃত্যু কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা থাকে না; তা একটি কাঠামোগত ব্যর্থতার ফল হয়ে ওঠে।

বাংলাদেশে প্রায় সব বড় দুর্ঘটনার পর একই চিত্র দেখা যায়। সড়ক দুর্ঘটনা ঘটলে জানা যায় গাড়ির ফিটনেস ছিল না, চালকের লাইসেন্স ছিল না। কারখানায় আগুন লাগলে জানা যায় অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা ছিল অপ্রতুল। ভবন ধসে পড়লে জানা যায় অনুমোদন ও তদারকিতে ঘাটতি ছিল। হাসপাতালে বিপর্যয় ঘটলে জানা যায় মানদণ্ড মানা হয়নি। ঘটনার পর সরকার সক্রিয় হয়। কিন্তু ঘটনার আগে সরকার কোথায় ছিল—সেই প্রশ্নের উত্তর সাধারণত পাওয়া যায় না।

এটাই আমাদের নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার সবচেয়ে বড় সংকট। রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানগুলো যেন ঝুঁকি প্রতিরোধের জন্য নয়, বরং বিপর্যয়ের পর ব্যাখ্যা দেওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকে। ফলে তদন্ত কমিটির সংখ্যা বাড়ে, কিন্তু বিপর্যয়ের পুনরাবৃত্তি কমে না। তাই আজ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হাসপাতালটির নয়; প্রশ্ন হলো নিয়ন্ত্রকের। এই নিয়ন্ত্রক কে?

ছয় নবজাতকের মৃত্যু তাই একটি হাসপাতালের গল্প নয়। এটি একটি শাসনব্যবস্থার গল্প। এমন একটি ব্যবস্থার গল্প, যেখানে বিপর্যয়ের পর সবাই দায় খোঁজে, কিন্তু বিপর্যয়ের আগে কার কী দায়িত্ব ছিল এবং সেই দায়িত্ব যথাযথভাবে পালিত হয়েছিল কি না, তার জবাবদিহি চাওয়ার কেউ নেই। যত দিন এই সংস্কৃতি বদলাবে না, তত দিন তদন্ত প্রতিবেদন জমা হবে, কমিটি গঠিত হবে, সংবাদ শিরোনাম বদলাবে; কিন্তু নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে না।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অধীন হাসপাতাল সার্ভিসেস ম্যানেজমেন্ট উইংয়ের হাসপাতাল অ্যান্ড ক্লিনিক সেকশন বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ব্লাড ব্যাংকের নিবন্ধন, লাইসেন্স, পরিদর্শন এবং মান নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে রয়েছে। অর্থাৎ কোনো বেসরকারি হাসপাতাল নিরাপদ পরিবেশে সেবা দিচ্ছে কি না, অবকাঠামোগত মানদণ্ড পূরণ করছে কি না, প্রয়োজনীয় জনবল ও সরঞ্জাম রয়েছে কি না—এসব দেখার দায়িত্ব মূলত এই বিভাগের। বাংলাদেশে ১৫ হাজার বেসরকারি হাসপাতালের মধ্যে মাত্র ৬ হাজারের কাছাকাছি নিবন্ধিত এবং বড় অংশেরই লাইসেন্স নবায়ন নেই। স্বাস্থ্য খাতে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর তদারকির অভাব ও লাইসেন্স প্রক্রিয়ার জটিলতা এখানে একটি বড় কাঠামোগত দুর্বলতা।

সুতরাং আদ্‌দ্বীন হাসপাতালের ঘটনায় শুধু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দায় খুঁজলেই হবে না। প্রশ্ন তুলতে হবে এই নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েও। যদি অপারেশন-পরবর্তী ওয়ার্ডের ভেন্টিলেশন ও পরিবেশগত নিরাপত্তায় গুরুতর ঘাটতি থেকে থাকে, তাহলে তা কি সাম্প্রতিক সময়ে তৈরি হয়েছিল? নাকি দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যমান ছিল? যদি দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যমান থাকে, তাহলে পরিদর্শন ব্যবস্থার মাধ্যমে সেটি শনাক্ত হলো না কেন? আর যদি শনাক্ত হয়ে থাকে, তাহলে সংশোধনের জন্য কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি কেন?

বাংলাদেশে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর একটি দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা হলো তারা প্রায়ই ‘লাইসেন্স প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান’ হিসেবে কাজ করে, কিন্তু ‘মান নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান’ হিসেবে নয়। লাইসেন্স দেওয়া হয়। নবায়নও হয়। কিন্তু নিয়মিত ও পেশাদার পরিদর্শন, ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং সংশোধনমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের সংস্কৃতি দুর্বল। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দুর্নীতির ইতিহাস অনেক পুরোনো। ওপেন সিক্রেট। আর এই অধিদপ্তরের মধ্যে অন্যতম দুর্নীতিগ্রস্ত বিভাগ হিসেবে পরিচিত হলো হাসপাতাল সার্ভিসেস ম্যানেজমেন্ট উইং। ফলে নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা অনেক সময় কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থাকে। বাস্তবে তা রূপ নেয় একটি প্রতিক্রিয়াশীল ব্যবস্থায়, যা বিপর্যয়ের আগে নয়; বিপর্যয়ের পরে সক্রিয় হয়।

আদ্‌দ্বীনের এই ঘটনা সেই পুরোনো প্রশ্নটিকেই আবার সামনে নিয়ে এসেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতাল অ্যান্ড ক্লিনিক সেকশন কি কেবল লাইসেন্সের ফাইল পরিচালনা করবে, নাকি নাগরিকের নিরাপদ চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার জন্য একটি কার্যকর নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করবে?

আরেকটি বিষয়ও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। আদ্‌দ্বীন একটি প্রভাবশালী সামাজিক ও দাতব্য প্রতিষ্ঠান। জনপরিসরে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনার সঙ্গে ইসলামপন্থী রাজনৈতিক ধারার ঘনিষ্ঠতার আলোচনা দীর্ঘদিন ধরেই রয়েছে। এই বাস্তবতা সত্য হোক বা না হোক, বাংলাদেশে রাজনৈতিক মেরুকরণের সংস্কৃতি
প্রায়ই সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহির প্রশ্নকে দুর্বল করে দেয়।

কোনো প্রতিষ্ঠান যদি কোনো রাজনৈতিক বা আদর্শিক বলয়ের কাছে গ্রহণযোগ্য হিসেবে বিবেচিত হয়, তাহলে তার বিরুদ্ধে সমালোচনা ও চাপ অনেক সময় তুলনামূলকভাবে সীমিত হয়ে যায়। এর ফলে সরকার এবং সরকারি দলের পক্ষ থেকে দায়বদ্ধতার প্রশ্নটি খুব সহজেই এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হয়। সাধারণত প্রশাসনের কাছে সরকারি দলের আশীর্বাদপুষ্ট প্রতিষ্ঠানের দোষ খুঁজে পাওয়া সব সময়ই কঠিন।

ফলে আশঙ্কা তৈরি হয় যে ঘটনাটিকে ঘিরে প্রকৃত জবাবদিহির পরিবর্তে একটি সুবিধাজনক ব্যাখ্যা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা হবে। নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোও দ্রুত সন্তুষ্ট হয়ে পড়তে পারে। আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির অভিজ্ঞতা অন্তত সে আশঙ্কাকে পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ দেয় না। একটি কার্যকর রাষ্ট্রের দায়িত্ব কেবল দুর্ঘটনার পর তদন্ত করা নয়; দুর্ঘটনার আগেই ঝুঁকি শনাক্ত করা এবং প্রতিরোধ করা। আমাদের সবচেয়ে বড় সংকট হাসপাতালের অবহেলা নয়; আমাদের সবচেয়ে বড় সংকট হলো এমন একটি রাষ্ট্র, যা বিপর্যয়ের আগে ঘুমায় এবং বিপর্যয়ের পরে জেগে ওঠে।

তবে সরকারের সাম্প্রতিক অবস্থান আমাদেরকে কিছুটা হলেও আশাবাদী হতে সাহস জোগাচ্ছে। স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন জানিয়েছেন, এ ঘটনায় জড়িত কেউ ছাড় পাবে না। ৪ জুন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন নিয়ে কথা বলতে গিয়ে মন্ত্রী জানান, তদন্ত প্রতিবেদনে হাসপাতাল ভবনকে চিকিৎসাসেবার জন্য অনুপযুক্ত, দায়িত্বপ্রাপ্ত নার্সদের চরম অবহেলা ও অসহযোগিতা এবং চিকিৎসক-নার্সসহ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অবহেলাকে মৃত্যুর কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এখন আমাদের দেখার বিষয় হলো যে এখন তদন্তের ফলাফলকে কতটা কার্যকর জবাবদিহিতে রূপ দেওয়া হচ্ছে।

ছয় নবজাতকের মৃত্যু তাই একটি হাসপাতালের গল্প নয়। এটি একটি শাসনব্যবস্থার গল্প। এমন একটি ব্যবস্থার গল্প, যেখানে বিপর্যয়ের পর সবাই দায় খোঁজে, কিন্তু বিপর্যয়ের আগে কার কী দায়িত্ব ছিল এবং সেই দায়িত্ব যথাযথভাবে পালিত হয়েছিল কি না, তার জবাবদিহি চাওয়ার কেউ নেই। যত দিন এই সংস্কৃতি বদলাবে না, তত দিন তদন্ত প্রতিবেদন জমা হবে, কমিটি গঠিত হবে, সংবাদ শিরোনাম বদলাবে; কিন্তু নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে না।

  • কাজী মারুফুল ইসলাম অধ্যাপক, উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

    মতামত লেখকের নিজস্ব