মাচাদোকে পরিকল্পনা করেই নির্বাসনে পাঠিয়েছেন ট্রাম্প!

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে নিজের নোবেল শান্তি পুরস্কারের পদক উপহার দেন ভেনেজুয়েলার বিরোধী নেতা মারিয়া কোরিনা মাচাদোছবি: রয়টার্স

‘স্বাধীনতার সেই ঘণ্টা বেজে উঠেছে’—৩ জানুয়ারি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এমন ঘোষণাই দিয়েছিলেন ভেনেজুয়েলার বিরোধী নেতা ও নোবেল শান্তি পুরস্কারপ্রাপ্ত মারিয়া কোরিনা মাচাদো। ঠিক সেই মুহূর্তে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে ধরে নিয়ে নিউইয়র্কের পথে ছিল মার্কিন বাহিনী। তবে মাচাদোর সেই উচ্ছ্বাস মুহূর্তেই চূর্ণ হয়ে যায়। কারণ, কিছু পরেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেন, ভেনেজুয়েলার শাসনক্ষমতা গণতান্ত্রিক শক্তির হাতে দেওয়া হবে না; বরং তাঁর প্রশাসনই দেশটি চালাবে।

ট্রাম্পের এই ঘোষণার পর ভেনেজুয়েলার ভেতরে এবং প্রবাসী ভেনেজুয়েলানদের মধ্যে আনন্দের জায়গায় নেয় আতঙ্ক ও বিভ্রান্তি। গত বৃহস্পতিবার ট্রাম্পের সঙ্গে মাচাদোর বৈঠকও সেই ধোঁয়াশা কাটাতে পারেনি। এখন প্রশ্ন একটাই—ভেনেজুয়েলার মানুষের বহুদিনের স্বাধীনতার স্বপ্নের কী হবে? যে গণতান্ত্রিক অধিকার ২০২৪ সালের নির্বাচনে প্রকৃত বিজয়ী এদমুন্দো গোনসালেসের কাছ থেকে মাদুরো কেড়ে নিয়েছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র কি তা ফিরিয়ে দেবে?

মাচাদো এ মাসের শুরুতে আমেরিকানদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন, ‘আমাদের একজন নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট আছেন। জনগণ যে দায়িত্ব আমাদের দিয়েছে, তা পালনে আমরা প্রস্তুত।’ কয়েক দিনের মধ্যেই ভ্যাটিকানও তার সমর্থনের বার্তা দেয়। পোপ লিও চতুর্দশের সঙ্গে মাচাদোর একটি পূর্বঘোষণাহীন ব্যক্তিগত সাক্ষাতের ছবি তখন প্রকাশ করা হয়।

কিন্তু কারাকাসে মার্কিন হস্তক্ষেপের প্রায় দুই সপ্তাহ পর স্পষ্ট হয়ে উঠেছে—ট্রাম্প ভেনেজুয়েলার গণতন্ত্রকে পাশে সরিয়ে রেখে ‘শাসন-ধারাবাহিকতা’ বজায় রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ভোটে গোনসালেসকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করেছিল ভেনেজুয়েলার মানুষ। তবু ট্রাম্প সেই গণরায় উপেক্ষা করতেই দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। এমনকি মাচাদোর নোবেল শান্তি পুরস্কারও ট্রাম্পকে তাঁর বৈধতা মানতে রাজি করাতে পারেনি। বরং সেটিকে তিনি ব্যক্তিগত অপমান হিসেবেই দেখেছেন বলে মনে হয়।

ওয়াশিংটন পোস্ট লিখেছে, ‘তিনি (মাচাদো) যদি পুরস্কারটি ফিরিয়ে দিয়ে বলতেন, ‘ডোনাল্ড ট্রাম্পের হাত থেকে আমি এটি নিতে পারি না’, তাহলে আজ তিনিই ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট হতেন।’ এই মন্তব্য ঘিরে জল্পনা তৈরি হয়, যুক্তরাষ্ট্র ইচ্ছাকৃতভাবেই মাচাদোকে নির্বাসনে যেতে বাধ্য করেছে, যাতে মাদুরোকে অপসারণের পথে তিনি কোনো জটিলতা তৈরি করতে না পারেন। অথচ দীর্ঘদিন ধরেই তিনি দেশ ছাড়তে অনিচ্ছুক ছিলেন।

ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে, সিআইএর মূল্যায়ন অনুযায়ী চাভেজপন্থী নিরাপত্তা ও সামরিক কাঠামোর বিরুদ্ধে ভেনেজুয়েলার বিরোধীরা টিকে থাকতে পারবে না। পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও–ও একই সুরে বলেছেন—মাচাদো ‘অসাধারণ’ হলেও বাস্তবতা হলো, ‘বিরোধীদের বড় অংশ এখন আর ভেনেজুয়েলার ভেতরে নেই।’ তাঁর ভাষায়, এখন প্রশাসনের দৃষ্টি ‘স্বল্পমেয়াদি জরুরি বিষয়’-এর দিকে।

রুবিওর তিন ধাপের পরিকল্পনার প্রথম ধাপ হলো ‘স্থিতিশীলতা’, যার মেয়াদ কমপক্ষে দুই থেকে তিন মাস। এই সময়ে দেশটি শাসন করবেন মাদুরোর সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেস। কিন্তু গণতান্ত্রিক উত্তরণের কোনো অঙ্গীকার তিনি করেননি। উপরন্তু মাদুরোর গোপন পুলিশপ্রধান দিয়োসদাদো কাবেয়ো এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী ভ্লাদিমির পাদ্রিনো লোপেসের ক্ষমতার ছায়ায় তাঁর নিজেরই রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। ট্রাম্পের ‘পুতুল’ হিসেবে তাঁর অবস্থানও স্বভাবতই ভঙ্গুর।

এই পরিস্থিতিকে কারাকাস ক্রনিকলস যথার্থই ‘স্থবির উত্তরণ’ বলে অভিহিত করেছে। মাচাদো যদিও বলেছেন, হোয়াইট হাউসে ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর বৈঠক ‘খুব ভালো’ হয়েছে, তবু বাস্তব চিত্রে কোনো মৌলিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত নেই।

ট্রাম্পকে তুষ্ট করতে গিয়ে ১৫ জানুয়ারির সেই বৈঠকে তিনি তাঁকে নিজের নোবেল শান্তি পুরস্কারও উপহার দেন। ট্রাম্প খুব আগ্রহভরে তা গ্রহণও করেন। তবে যদিও নোবেল কমিটি স্পষ্ট করে জানিয়ে দেয়—এই পুরস্কার হস্তান্তরযোগ্য নয়। কিন্তু তোষামোদ দিয়ে মূল সমস্যার সমাধান হয় না। ট্রাম্প মাচাদোকে সমর্থন করেন না, কারণ তিনি ভেনেজুয়েলার জনগণের সার্বভৌমত্বে বিশ্বাসী; ট্রাম্পের তেলকেন্দ্রিক পরিকল্পনায় নয়।

ভেনেজুয়েলার বিরোধীদের এখন আর ট্রাম্পের অহংকারী মাথায় হাত বুলিয়ে চলার সুযোগ নেই। গত দুই বছরে দেশ-বিদেশের ভেনেজুয়েলানদের সংগঠিত করেই মাচাদো নোবেল পুরস্কার অর্জন করেছিলেন। রাজনৈতিক উত্তরণে নিজেদের কণ্ঠস্বর টিকিয়ে রাখতে হলে তাঁকে সেই পথেই আবার ফিরতে হবে। এক বিশ্লেষকের ভাষায়, সারা দেশে প্রতিবাদ সংগঠিত করার ক্ষমতাই মাচাদোর হাতে থাকা ‘একমাত্র অস্ত্র’।

মাচাদো একজন ধর্মভীরু রোমান ক্যাথলিক। তিনি জানেন, ভেনেজুয়েলার গণতান্ত্রিক নাগরিক সমাজ গড়ে উঠেছে মূলত খ্রিষ্টীয় গণতন্ত্রের নৈতিকতা ও সংগঠনী শক্তির ওপর। মাচাদো ও ট্রাম্পের মূল্যবোধ (নৈতিক হোক বা রাজনৈতিক) কখনোই এক পথে আসবে না। তাই ভেনেজুয়েলার বিরোধী নেত্রীকে ফিরতে হবে সেই কৌশলে, যেটি তাঁকে আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা এনে দিয়েছিল। সময় দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। গণতন্ত্রপন্থী শক্তিগুলোর সামনে এখন শেষ সুযোগ—নিজেদের অবস্থান পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা এবং দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ গঠনে অর্থবহ ভূমিকা নিশ্চিত করা।

  • পিওতর এইচ কোসিকি ইউনিভার্সিটি অব মেরিল্যান্ড-এর ইতিহাসের সহযোগী অধ্যাপক

  • স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট, অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ